ভূমি জরিপ কী এবং কেন করা হয়

জমিদারদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্ততে এসএ জরিপ বা খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়েছিল। যার কারণে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে যায়। এ ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করার জন্য সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরেজমিন ভূমি জরিপ করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা আরএস বা রিভিশনাল সার্ভে হিসেবে পরিচিত। এ জরিপে প্রস্তুতকৃত নকশা এবং খতিয়ান নির্ভুল হিসেবে গ্রহণীয়। এটি ভূমির বর্তমান দখল ও মালিকানার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য রেকর্ড হিসেবে গণ্য, কারণ এতে আগের জরিপের ভুল সংশোধন করা হয়। ভূমির সঠিক মালিকানা নিশ্চিত করতে বা নামজারি (মিউটেশন) করতে এ খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ

ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমির সঠিক সীমানা নির্ধারণে ভূমি জরিপ করা হয়। জরিপ-পরবর্তী যে খতিয়ান প্রস্তুত হয় তাতে ভূমির মালিকানা, সীমানা, দাগ নম্বর, পরিমাণ ও শ্রেণিবিভাগের উল্লেখ থাকে। খতিয়ান একটি সরকারি আইনি দলিল। এটি ভূমি মালিকের পরিচয়পত্র বা রেকর্ড বই হিসেবে কাজ করে, যা জমির মালিকানা প্রমাণ এবং ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়।

১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সাল অবধি ব্রিটিশ শাসনামলে এ উপমহাদেশে যে জরিপ চালানো হয়, সেটি কেডাস্ট্রাল সার্ভে নামে অভিহিত। এ জরিপের সংক্ষিপ্ত রূপ হলো সিএস। এ জরিপ ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাতন্ত্র আইনের দশম পরিচ্ছেদ অনুসারে সিলেট ও পার্বত্য জেলা ছাড়া সারা দেশে পরিচালিত হয়। এ জরিপের মাধ্যমে ভূমির বিস্তারিত মৌজা, নকশা প্রস্তুত করা হয় এবং প্রত্যেক মালিকের জন্য দাগ নম্বর উল্লেখপূর্বক ভূমির বাস্তব অবস্থা, আয়তন, শ্রেণী, পরিমাণ, খাজনার পরিমাণ প্রভৃতি উল্লেখপূর্বক খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়।

সিএস জরিপ ১৮৮৮ সালে কক্সবাজারের রামু থানা থেকে শুরু হয় এবং ১৯৪০ সালে দিনাজপুর জেলায় শেষ হয়। সে সময় সিলেট জেলা আসাম প্রদেশের অধীন থাকায় সিলেট জেলায় সিএস জরিপ হয়নি; তবে জরুরি বিবেচনায় ১৯৩৬ সালের সিলেট প্রজাস্বত্ব আইনের আওতায় সিলেট জেলার কেডাস্ট্রাল সার্ভে ১৯৫০ সালে শুরু হয় এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর অধীনে এ জরিপ ১৯৬৩ সালে শেষ হয়।

সিএস জরিপের সময় প্রস্তুতকৃত খতিয়ানে জমিদারদের নাম খতিয়ানের উপরিভাগে এবং দখলদার রায়তের নাম খতিয়ানের নিচে লেখা হতো। সে সময় জমিদাররা সরকার পক্ষে ভূমির মালিক ছিলেন এবং রায়তরা প্রজা হিসেবে শুধু ভোগদখলদার ছিলেন।

সিএস জরিপের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত নকশা ও খতিয়ান খুবই নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে স্বীকৃত। ভূমির মামলায় বা ভূমির জটিলতা নিরসনের ক্ষেত্রে এ জরিপকে অনেক সময় ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাজিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি পৃথক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ তখন পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৫০ সালে জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাস হওয়ার পর তৎকালীন সরকার ১৯৫৬ সালে পুরো পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে জমিদারি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২ এপ্রিল ১৯৫৬ সালে এ আইনের ৩ ধারার আওতাধীন বিজ্ঞপ্তিমূলে সরকার সব জমিদারি দখল নেয়ার পর ওই আইনের ১৭ ধারা মোতাবেক যে খতিয়ান প্রস্তুত করা হয় তা এসএ খতিয়ান নামে অভিহিত। এ খতিয়ানটি এসএ জরিপের (স্টেট অ্যাকুজিশন সার্ভে) মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত।

উল্লেখ্য, জমিদারি ও মধ্যস্বত্ব বিলোপ করে জমিদারদের প্রদেয় ক্ষতিপূরণের তালিকা প্রণয়ন এবং ভূমি মালিকদের/রায়তকে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে যে সংক্ষিপ্ত জরিপ ও রেকর্ড সংশোধনী কার্যক্রম পরিচালিত হয় তা এসএ খতিয়ান নামে পরিচিত। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এ জরিপ পরিচালিত হয়। এ জরিপে ভূমি মালিকের নাম ও ভূমির বিবরণ সম্বলিত হাতে লেখা রেকর্ড বা খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়। সে সময় এ রেকর্ড মোট তিন কপি প্রস্তুত করা হয়, যার মধ্যে একটি জেলা রেকর্ড রুমে, একটি তহশিল (ইউনিয়ন ভূমি অফিস) অফিসে এবং অন্যটি সার্কেল পরিদর্শন (উপজেলা রাজস্ব) অফিসে দেয়া হয়। জরুরি তাগিদে জমিদার থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ জরিপ বা খতিয়ান কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। এ এসএ জরিপ পিএস (পাকিস্তান সার্ভে) জরিপ নামেও অভিহিত।

পিএস জরিপ সম্পন্ন হওয়ার পর আরএস জরিপ পরিচালিত হয়। সিএস ও এসএ জরিপের পর ভূমির প্রকৃত মালিকানা ও সীমানায় ব্যাপক পরিবর্তন হওয়ার কারণে এ জরিপ করা হয়েছিল। এসএ জরিপের সময় সরেজমিন তদন্ত বা জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। জমিদারদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্ততে এসএ জরিপ বা খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়েছিল। যার কারণে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে যায়। এ ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করার জন্য সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরেজমিন ভূমি জরিপ করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা আরএস বা রিভিশনাল সার্ভে হিসেবে পরিচিত। এ জরিপে প্রস্তুতকৃত নকশা এবং খতিয়ান নির্ভুল হিসেবে গ্রহণীয়। এটি ভূমির বর্তমান দখল ও মালিকানার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য রেকর্ড হিসেবে গণ্য, কারণ এতে আগের জরিপের ভুল সংশোধন করা হয়। ভূমির সঠিক মালিকানা নিশ্চিত করতে বা নামজারি (মিউটেশন) করতে এ খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ।

সিটি জরিপ (সিটি সার্ভে) হলো মূলত নগর বা পৌর-এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তি (জিপিএস/জিআইএস) ব্যবহার করে ভূমির মালিকানা, সীমানা, শ্রেণী ও পরিমাণ নির্ধারণের একটি হালনাগাদ রেকর্ড বা খতিয়ান। এটি ঢাকা মহানগরীসহ বিভিন্ন বড় শহরে ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য পরিচালিত হয়। আরএস জরিপের পর বাংলাদেশ সরকারের অনুমতিক্রমে এ জরিপ ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়। এটি আরএস জরিপের পরবর্তী জরিপ, যা অনেক সময় বিএস জরিপ হিসেবেও পরিচিত।

দিয়ারা সার্ভে বা জরিপ হলো নদীভাঙন বা পলি জমার ফলে নদী বা সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় নতুন জেগে ওঠা চর (পয়স্তি) বা তলিয়ে যাওয়া (সিকস্তি) ভূমির মালিকানা ও সীমানা নির্ধারণের জন্য পরিচালিত বিশেষ ভূমি জরিপ। এ জরিপে নকশা ও রেকর্ড প্রস্তুত করা হয়। দিয়ারা জরিপে সাধারণ জরিপের জন্য প্রযোজ্য সব স্তর অনুসরণ করে পয়স্তি ভূমির নকশা ও রেকর্ড প্রস্তুত করা হয়। দিয়ারা সেটেলম্যান্ট অফিসারের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক অফিস ও ক্যাম্পের মাধ্যমে সারা দেশের সুনির্দিষ্ট কিছু মৌজায় এ জরিপ চালানো হয়। এ জরিপের লক্ষ্য হলো নতুন চরের সীমানা নির্ধারণ ও নতুন ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করা এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা। জেলা প্রশাসকের চাহিদার ভিত্তিতে এটি সিএস বা আরএস জরিপের মতোই নকশা ও খতিয়ান প্রস্তুত করে। নদীর কারণে ভূমির যে নতুন রেকর্ড তৈরি হয় তাকে দিয়ারা খতিয়ান বলা হয়, যা নতুন চরের মালিকানার আইনি দলিল। এ জরিপ ১৯৬২ সাল থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে আসছে।

ডিজিটাল সার্ভে হলো জিপিএস, ড্রোন, টোটাল স্টেশন এবং জিআইএসের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্ভুল ভূমির পরিমাপ নকশা তৈরি এবং ভূমির তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (বিডিএস) নামক আধুনিক জরিপ চলছে, যা আগের জরিপগুলোর ভুল সংশোধন করে ডিজিটাল রেকর্ড নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে পরিচালিত হচ্ছে, যা আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনার অংশ। এটি ভূমির সঠিক মাপজোক, মালিকানা নির্ধারণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা যেমন— রাস্তা, ভবন নির্মাণ, গ্রহণে সাহায্য করে। এটি দ্রুত, অধিকতর সঠিক এবং দুর্গম এলাকায়ও ভূমি জরিপ করতে সক্ষম।

এসএ জরিপ সরেজমিন না হওয়ায় মূলত সিএস জরিপ এবং তৎপরবর্তী মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে জমি কেনাবেচা হয়ে থাকলে তার ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত হওয়ায় এর নির্ভুলতা নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে। এরপর যে দু’টি জরিপ হয়, যেমন— আরএস ও সিটি জরিপ, তা সরেজমিন হওয়ায় নির্ভুল। এ বিষয়ে কারো সংশয় থাকার কথা নয়।

জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে সাধারণত শেষ জরিপ অর্থাৎ সিটি জরিপের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত খতিয়ানের ভিত্তিতে নিরূপণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে যদি দেখা যায় আরএস ও সিটি জরিপ— এ দু’টি জরিপে খতিয়ান ও দাগ নম্বর নির্ভুল, সে ক্ষেত্রে অতীতে সিএস বা এসএ খতিয়ানের সাথে আরএস ও সিটি জরিপের অমিল পরিলক্ষিত হলেও শেষোক্ত জরিপ দুটির ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত খতিয়ানই মুখ্য বিবেচিত।

ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমির মালিকানা নির্ধারণে জরিপ গুরুত্বপূর্ণ। জরিপ নির্ভুল হলে ভূমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয় না। আর নির্ভুল না হলে জটিলতা দেখা দেয়। তাই মালিকানা নির্ণয়ে জরিপের নির্ভুলতা অপরিহার্য।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]