বিবেকের আদালত

বিবেকের আদালতের অনুশাসন এই যে, সবার ‘ভালো’র জন্য প্রত্যেকের উচিত নির্মোহ ও নিরপেক্ষ থাকতে সচেষ্ট থাকা। কেননা আজ তার দৃষ্টিতে যা সঠিক বলে মনে হবে কালান্তরে তা অসার সাব্যস্ত হতে পারে। তাই সবাইকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে। সোমবার সোমবারে শেষ হয়, তবে সোমবারের পরে মঙ্গলবার আছে, বুধবার আসবে। সবাইকে শুধু তার সময়ের, তার পরিপার্শ্বের বিবেচনাতে সীমিত বা সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, তাকে তাকাতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। কালোর কপোলতলে সবাইকে সত্য সুন্দর ও সাফল্যের তিলক আঁকতে হবে। তা না হলে তার সুবিচারের ক্যানভাস ও নেতৃত্বের পরিসর সীমিত ও সমস্যার ফেরে পড়ে যাবে। শুধু বিচারক বা নেতা নিজে একা নন, সবাইকে সবার জন্য নীতি ও নৈতিকতার বলে বলীয়ান হতে হবে

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের মুহিবুল্লা মজুমদার গ্রাম্য সালিশে হাত পাকাতে শুরু করেছিলেন চার দশক আগে। কারো গরু খোঁয়াড়ে দেয়া-নেয়ার কাইজ্জা থেকে শুরু করে বউ-ঝিদের ঝগড়াঝাঁটির বিচারও তাকে করতে হতো। নিজে জোতদার মাতবর বা পঞ্চায়েত প্রধান এ জাতীয় কিছু নন, কিন্তু গ্রামের সবাই তাকে মোটামুটি মান্যগণ্য করে। তার দিব্যজ্ঞান ততটা প্রখর না হলেও বিচার-আচারে শলা-পরামর্শে সবাই সায় দিত। মজুমদার সাহেব ক্রমান্বয়ে ইউনিয়ন উপজেলা জেলা এমনকি জাতীয় পর্যায়ে ওঠাবসা করার সুবাদে তার আদালতের এখতিয়ারও বেড়ে চলে। কিন্তু আত্মসমালোচনার বা তার বিবেকের আদালত এজলাসে প্রায়ই ঢুকে যাচ্ছেন তিনি, তার মাথায় সারাক্ষণ নানান চিন্তাভাবনারা এসে পান তামাক খেয়ে যাচ্ছে, ‘তার কাছ থেকে সবাই কি সুবিচার পাচ্ছেন?’ কারো প্রতি অতি সদয় বা নির্দয় হতে গিয়ে তার মধ্যে এমন অবিচারসুলভ কোনো পোকামাকড় ঢুকে পড়ছে কি নাÑ এটা তিনি আগেও ভাবতেন; এখন একটু বেশি করে ভাবার পক্ষপাতী।

একসময় রঘুনাথপুরের প্রতিদ্বন্দ্বী আপন দুই ভাই জলিল ও জব্বারের সংসারের মালিকানা নিয়ে গোলমাল। একপক্ষ জলিল সংসার ভাঙনে জব্বার যত দোষ করেছে, তার তালিকা করে পরিষদে প্রতিকার বিচার প্রার্থী হয়েছে। জব্বার দোষ অসার প্রমাণে ব্যর্থ হয়ে, রায় তার বিরুদ্ধে যাবে জেনেও মুরুব্বিদের নিষ্পত্তির পরামর্শে সাড়া না দিয়ে সরাসরি ভাইয়ের বিরুদ্ধাচরণে ষড়যন্ত্র পাকিয়ে আশপাশের পাড়া-প্রতিবেশীদের খেপিয়ে দিয়ে বিচার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে। এ ধরনের ঘটনা শুধু রঘুনাথপুরের জলিল-জব্বারের সংসারে নয়, অনেক দেশ ও সংসারে ঘটছে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে যৌথ সংসারে এ ধরনের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে বিচার আচারের রূপকল্প চিত্রায়িত হয়েছে।

সনাতন নিয়মে একজন বিচারক এটা অবশ্যই বিবেচনায় নিয়ে থাকেন যে, কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে গিয়ে যাতে নির্দোষ কেউ যেন দোষী সাব্যস্ত না হয়; তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ দোষী সাব্যস্ত করতে গিয়ে নির্দোষ কাউকে শাস্তি দেয়া যাবে না। এটা সব বিচারকের বিবেকের আদালতের চিরন্তন অনুশাসন পর্যবেক্ষণ। এজন্য বিচারক তার সামনে উপস্থাপিত সমুদয় সাক্ষ্যপ্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা পর্যালোচনা ও শুনানি করবেন যেন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সুবিচার নিশ্চিত করতে পারেন। তার সামনে সাক্ষ্যপ্রমাণ যেটুকু যেভাবে উপস্থাপন করা হবে বিচারক সেই ভিত্তিতে রায় দেবেন। প্রমাণ উপস্থাপনে বাদি কিংবা বিবাদি পক্ষ ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে থাকলে বিচারকের পক্ষে সঠিক রায় দেয়া কঠিন হতে পারে। তবে সাক্ষ্যপ্রমাণের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সে কারণে সাক্ষ্যপ্রমাণের বাইরে, বাইরের পরিপার্শ্ব যাই হোক বা থাকুক না কেন, যার দ্বারা তিনি প্রভাবিত বা প্রতারিত হতে পারেন এমন আশঙ্কা আভাসেও কোনোভাবে বিচলিত হতে পারবেন না।

দোষীর শাস্তি সাব্যস্তকরণে বিচারককে কঠোর, নির্মোহ ও নিরপেক্ষ থাকতে হয়। কেননা বাদি-বিবাদির সব বিষয়-আশয় ন্যায়নিষ্ঠভাবে পরীক্ষার ব্যাপারে বিবেকের আদালতে বিচারক অবশ্যই জেরার সম্মুখীন হবেন। আল কুরআনের সূরা আল বাকারার শেষ রুকুর শেষ আয়াতে (২৮৬) এ ব্যাপারে বিবেকের আদালতে বিচার্যবিষয় হয়ে দাঁড়াবে- ‘আল্লাহ কারো ওপরই তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না। ভালো ও মন্দ যে যা উপার্জন করবে, তার প্রতিফল সে-ই পাবে।’ এখানে বিচারকও কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে নন। বিবেকের আদালতে তিনি অবশ্যই এ ব্যাপারে আত্মসমালোচনায় বাধিত হবেন। মজুমদার সাহেব প্রতিদিন সকালে সূরা আর রাহমান তেলাওয়াত করেন। তিনি ৫৫তম সূরা আর রাহমানের ৭-৯ নম্বর আয়াতের মহাসত্য ও নির্দেশনাকে সবার উপলব্ধির আওতায় আনার অনিবার্যতা লক্ষ করেন, ‘তিনি (আল্লাহ রাব্বুল আলামিন) আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং সব কিছুর জন্যই তৈরি করেছেন মানদণ্ড। তোমরা কখনো ভালোমন্দ বিচারের মানদণ্ড লঙ্ঘন করো না। সবকিছুর ওজনে ন্যায্যমান প্রতিষ্ঠা করো এবং ওজন বা বিচারে কারচুপি করো না।’

মজুমদার নিজের বিবেকের আদালতে এটা অনুভব করেন যে, তার তরফে মানদণ্ড, ওজন ও বিচারে কারচুপি না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকাকে বিচারপ্রার্থীরা বিভ্রান্ত করতে তৎপর। এমনকি তারা স্বয়ং বিচারপ্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাকে দোষারোপে মেতে উঠতে পারে। অভিযোগ বা বিচার্যবিষয়ের প্রতি অবিচার করা হয় যদি বিচারককে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা চলে। সীমানা বা এখতিয়ারবহির্ভূত এরূপ কার্যকলাপের দ্বারা বিচারপ্রার্থী নতুন আরেকটি অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার মতো কাজ করে বসতে পারেন।

ধ্রুব সত্য এই যে, বিচারক বা যে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। সেই সাথে তিনিও ভালো ও মন্দ যা উপার্জন করেন তাই-ই পাবেন। অর্থাৎ তিনি তার ভুল বা অন্যায়ের জন্য আজ হোক কাল হোক শাস্তি পাবেন। সেই শাস্তিকে ত্বরান্বিত করার কাজে বিচারপ্রার্থী নিজে বা কাউকে বিশৃঙ্খলা করতে প্ররোচিত করতে পারেন না । তাবৎ ঐশীগ্রন্থে এটা আছে- তুমি যদি কারো উপকার করো প্রতিদানে তুমি উপকৃত হবে। আর তুমি যদি কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করো, প্রতিদানে বা প্রকারান্তরে তুমিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিবেকের আদালতে অনেক বিচার্যবিষয় থাকে। তার মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিবর্গের পারস্পরিক হক, আদব ও সামাজিক রীতিনীতি নির্দেশ পালন। আল কুরআনে বলা হয়েছে-‘তাদের অধিকাংশ অনুমানের অনুসরণ করে, সত্যের পরিবর্তে অনুমান কোনো কাজে আসে না। তারা যা করে আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ (সূরা ইউনুস, আয়াত ৩৬) ‘তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নামে ডাকা গর্হিত কাজ। হে মুমিনগণ! তোমরা বহুবিধ অনুমান করা থেকে দূরে থাকো, কারণ অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করো না।... (সূরা হুজুরাত, আয়াত ১১-১২)

এখানে ১. অনুমান করা ২. কারো গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করা ৩. কাউকে ঠাট্টা ও উপহাস করা ৪. কাউকে দোষারোপ করা এবং ৫. কারো পশ্চাতে নিন্দা করা বা গিবত করা। অনুমান বা ধারণা করা থেকে বিরত থাকার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, কতক ধারণা পাপ। প্রত্যেক ধারণাই পাপ নয়। অতএব কোন্ ধারণা পাপ তা জানা জরুরি সাব্যস্ত করতে সাবধানতা অবলম্বনের এই নির্দেশ।

কারো গোপনীয় বিষয় বা দোষ অনুসন্ধান প্রসঙ্গে ভাষ্য এই যে, যে দোষ প্রকাশ্য তা ধরা যায়, কিন্তু যে দোষ প্রকাশ্য নয়, তা সন্ধান করতে যাওয়া সমীচীন নয়। কেননা, যে তার দোষ অনুসন্ধান করে, অপর পক্ষও তার দোষ অনুসন্ধান করবে। কোনো ব্যক্তির দেহে, আকার আকৃতিতে কিংবা কর্মকাণ্ডে কোনো দোষ দৃষ্টিগোচর হলে তা নিয়েও তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হেয় করা বিবেকের আদালতে এটা পরিত্যাজ্য হিসেবে দেখা হবে। কারো দোষ বের করা, দোষ প্রকাশ করা এবং দোষের কারণে ভর্ৎসনা করা এক ধরনের আত্মঘাতী প্রবণতা। কেউ অন্যের দোষ বের করলে সেও তার দোষ বের করবে। পারস্পরিক দোষারোপের ফলে শত্র“তা বৃদ্ধি পায়, অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং মানবিক মূল্যবোধে অবক্ষয় সৃষ্টি হয়। সুস্থ ও সম্মানজনক সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে তা হয়ে ওঠে এক দুঃখজনক প্রতিবন্ধকতা।

সব নাগরিকের নিত্য এই প্রার্থনা হওয়া উচিত, আমি যেন কারো ক্ষতির কারণ না হই বা ক্ষতি করি। কেননা ক্ষতির প্রতিদান বা প্রতিক্রিয়া ক্ষতি এবং ভালোর প্রতিদান ভালো।

বিবেকের আদালতের অনুশাসন এই যে, সবার ‘ভালো’র জন্য প্রত্যেকের উচিত নির্মোহ ও নিরপেক্ষ থাকতে সচেষ্ট থাকা। কেননা আজ তার দৃষ্টিতে যা সঠিক বলে মনে হবে কালান্তরে তা অসার সাব্যস্ত হতে পারে। তাই সবাইকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে। সোমবার সোমবারে শেষ হয়, তবে সোমবারের পরে মঙ্গলবার আছে, বুধবার আসবে। সবাইকে শুধু তার সময়ের, তার পরিপার্শ্বের বিবেচনাতে সীমিত বা সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, তাকে তাকাতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। কালোর কপোলতলে সবাইকে সত্য সুন্দর ও সাফল্যের তিলক আঁকতে হবে। তা না হলে তার সুবিচারের ক্যানভাস ও নেতৃত্বের পরিসর সীমিত ও সমস্যার ফেরে পড়ে যাবে। শুধু বিচারক বা নেতা নিজে একা নন, সবাইকে সবার জন্য নীতি ও নৈতিকতার বলে বলীয়ান হতে হবে। সবাইকে বিবেকের আদালতে এজলাসে উঠতে হবে সৎকর্ম সাধনের স্বার্থে। সমাজ বা সরকারের কাছ থেকে ন্যায় ন্যায্যতা প্রত্যাশা করেও অন্যায় অব্যাহত রাখলাম, কেউ নিজের লাভের জন্য তার দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করতে পারবেন না । ফলে টেকসই হবে না কারো নিজের অবস্থানও।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সঙ্কট শুরু হয়েছে। বাংলাদেশেও। অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নিয়ে মজুদ কিংবা পাচারের মতো আত্মঘাতী প্রবণতায় থাকায় তেলের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হচ্ছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে কর্মজীবী মানুষের তেল পেতে অবর্ণনীয় বেগ পেতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের ব্যবহার পরস্পর প্রযুক্ত প্রায় সব কাজে, সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক সঙ্কট চলছে, সেটা জানা সত্ত্বেও তেলের অপব্যবহার, মজুদ, পাচার, অন্যের জন্য অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্টের কারণ সৃষ্টি করা কি দায় দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক নয়? আত্মঘাতী সেই সব বাংলাদেশীকে তাদের বিবেকের আদালতে সোপর্দ করা বাঞ্ছনীয়।

লেখক : সাবেক সচিব ও এনবিআরের প্রাক্তন চেয়ারম্যান