চিলড্রেন মে বি ওয়াইজার দ্যান দেয়ার এল্ডার্স-এটি বিশ্বখ্যাত লেখক টলস্টয়ের একটি গল্পের শিরোনাম। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় এরকম, ‘ছোটরা বড়দের চেয়ে বুদ্ধিমান হতে পারে’। টলস্টয় তার নানা ধরনের লেখার মাধ্যমে আদর্শ জীবনবোধের কথা বলেছেন। এ গল্পে তিনি দেখিয়েছেন, অনেকসময় বড়রা অনেক ভুল করে। শিশুরা তাদের সবুজ সজীব মন দিয়ে সেরকম ভুল করে না। বড়দের আচার-আচরণ, চিন্তাভাবনা থাকে রিপু তাড়িত, স্বার্থসংশ্লিষ্ট। যেহেতু শিশুদের মধ্যে সেই জটিলতা ও কুটিলতা প্রবেশ করেনি, তাই তাদের আচার-আচরণ সহজ, সরল ও স্বাভাবিক। টলস্টয়ের গল্প থেকে আমাদের শেখার আছে, জানার আছে। গল্পটি একসময় ইন্টারমিডিয়েটের পাঠ্যসূচিতে ছিল। তখনকার দিনে শিক্ষার্থীদের ‘মানুষ’ বানানোর তাগিদ ছিল। অবশেষে অমানুষরা যখন ক্ষমতায় এসেছে, তখন নীতি হয়েছে পদদলিত, আর পরিহার্য হয়েছে এ ধরনের নীতিগল্প।
গল্পটি মজার। নতুন করে আবার শুনে নিই গল্পটি :
‘শীতের উৎসবের সময়টা সে বছর আগেভাগেই এসে পড়েছিল। দ্রুত চলাচলের জন্য তখন স্লেজ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ঘরবাড়ির ছাদে ছাদে বরফ জমে ছিল, আর গ্রামাঞ্চলে ছোট ছোট নালাগুলোতে বরফ গলে জল টুপটাপ করে ঝরছিল। দু’টি বাড়ির মাঝখানে থাকা একটি সার-স্ত‚প থেকে গলে আসা পানি একটি গলির ভেতর বড়সড় কাদামাখা জলাভূমি তৈরি করেছিল। এই জলকাদার দিকেই টান পড়ল দু’টি ছোট শিশুর- একটি খুব ছোট, অন্যটি একটু বড়; তারা ছিল দুই ভিন্ন বাড়ির। দুই শিশুর মা-ই তাদের নতুন সারাফান (রুশ পোশাক) পরিয়ে দিয়েছিলেন। ছোট শিশুর সারাফানটি ছিল নীল রঙের, আর বড়টির হলুদ, সুন্দর নকশা করা। দু’জনের মাথায়ই ছিল রঙিন রুমাল বাঁধা। দুপুরের খাবার শেষে তারা বাইরে এসে জলাভূমির ধারে দাঁড়াল, একে-অন্যকে নিজেদের সুন্দর পোশাক দেখাতে লাগল এবং খেলায় মেতে উঠল। কিছুক্ষণ পর পানিতে ছপছপ করার লোভ তাদের পেয়ে বসল। ছোট মেয়েটি স্যান্ডেল পরেই পানির দিকে নামতে চাইলে বড়টি বলল, যেও না মালাশকা, মা বকবে। তবে যদি চাও, আমি জুতো খুলব, তুমিও খুলে ফেলো।’
দু’জনেই জুতো খুলে, কাপড় গুটিয়ে, দু’দিক থেকে জলাভূমির মধ্যে নামল। মালাশকা হাঁটু পর্যন্ত পানিতে নেমে ভয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘এত গভীর আকুলিউশকা, আমার ভয় লাগছে!’। ‘ও কিছু না, আর গভীর হবে না। সোজা আমার দিকে এসো।’ ওরা ধীরে ধীরে কাছে এলো। একটু পর আকুলিউশকা বলল, ‘সাবধানে মালাশকা! এত জোরে ছিটিও না, আস্তে চলো!’ কথা শেষ হতে না হতেই মালাশকার পা পিছলে ছলাৎ করে পড়ল, আর পানির ছিটা আকুলিউশকার সারাফানজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। শুধু তাই নয়, তার চোখ-নাকেও জল ঢুকে গেল। নিজের সারাফানে বড় বড় দাগ দেখে আকুলিউশকা ভীষণ রেগে গেল। সে মালাশকাকে বকাঝকা করতে করতে তাড়া করল, এমনকি মারতে উদ্যত হলো। ভয়ে মালাশকা কাঁপতে লাগল। বুঝল সে ভুল করেছে। সাথে সাথে জল থেকে লাফিয়ে উঠে দৌড়ে বাড়ি চলে গেল। এই সময় আকুলিউশকার মা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। মেয়ের নোংরা, ভেজা পোশাক দেখে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘কোথায় ছিলি তুই, এ কী অবস্থা!’ ‘মালাশকা ইচ্ছে করেই আমাকে ভিজিয়েছে’ মেয়ে বলল। আকুলিউশকার মা মালাশকাকে ধরে কানের ওপর সজোরে চড় কষালেন। মালাশকা এমনভাবে কাঁদতে লাগল যে পুরো রাস্তা কেঁপে উঠল। তার মা দৌড়ে বেরিয়ে এলেন, ‘আমার মেয়েকে মারছ কেন?’ বলে তিনি প্রতিবেশীকে গালাগাল করতে শুরু করলেন।
এক কথা থেকে আরেক কথা, দুই নারীই একে- অপরকে যা খুশি তাই বলতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর পুরুষরাও বেরিয়ে এলো। রাস্তার মাঝখানে এক বিশাল ভিড় জমে গেল। সবাই একসাথে কথা বলছে, কেউ কারো কথা শুনছে না। গালাগালি, চিৎকারের একপর্যায়ে একজন আরেকজনকে মারল, আর মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হলো ধস্তাধস্তি।
এই মারামারি থামাতে এগিয়ে এলেন এক বৃদ্ধা, আকুলিউশকার দাদী। তিনি ভিড়ের মধ্যে ঢুকে শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘হে আত্মীয়েরা, এ কী করছ তোমরা? এভাবে কি দিন কাটাতে হয়? আনন্দের সময়ে এভাবে পাপ করছ কেন?’ কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না; প্রায় তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিচ্ছিল। হয়তো তিনিও ব্যর্থ হতেন, যদি না হঠাৎ আকুলিউশকা আর মালাশকার দিকে তার চোখ পড়ত। ঝগড়ার ফাঁকে আকুলিউশকা তার সারাফান শুকিয়ে আবার গলির জলাভূমির কাছে এসেছে। সে একটি ছোট পাথর তুলে নিয়ে মাটি ফেলে জলাভূমি ভরাট করতে লাগল, যাতে জল রাস্তায় গিয়ে পড়ে। একটু পর মালাশকাও এসে কাঠের একটি টুকরো দিয়ে তাকে সাহায্য করতে লাগল।
এ দিকে পুরুষরা তখনো ঝগড়া করেই চলেছে। আর ঠিক সেই সময় ছোট মেয়েদের বানানো নালার মধ্য দিয়ে জল গড়িয়ে যেতে যেতে পৌঁছে গেল ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে বৃদ্ধা লোকদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। দু’টি মেয়ে নালার দু’পাশ দিয়ে দৌড়াতে লাগল। ‘থামো মালাশকা! থামো!’ চিৎকার করল আকুলিউশকা। মালাশকা কিছু বলতে চাইল; কিন্তু অট্টহাসিতে তার কথা বেরোলো না। কাঠের টুকরোটি জলে ভেসে ওঠানামা করছে দেখে তারা হাসতে হাসতে দৌড়াতে দৌড়াতে সোজা পুরুষদের ভিড়ের মাঝখানে ঢুকে পড়ল। বৃদ্ধা তাদের দেখে বললেন, ‘তোমরা কি ঈশ্বরকে ভয় করো না? এই শিশুদের নিয়ে তোমরা এত ঝগড়া করছ, অথচ দেখো- ওরা নিজেরাই সব ভুলে আবার একসাথে খেলছে, ভালোবাসায় মেতেছে। ওরাই তোমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী।’ পুরুষরা শিশুদের দিকে তাকাল। তারা লজ্জা পেল। তারপর নিজেরাই নিজেদের নিয়ে হাসতে লাগল। ধীরে ধীরে ঝগড়া থামল, সবাই যার যার বাড়ি ফিরে গেল। আর তখনই মনে পড়ল সেই মহান বাণী, ‘তোমরা যদি শিশুদের মতো না হও, তবে স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করতে পারবে না।’
গল্পটির মর্মার্থ হচ্ছে এই যে, শিশুরা সরল, বড়রা গরল। শিশু দু’টি সরল মন নিয়ে খেলেছে। শিশু মন নিয়ে ঝগড়া করেছে। সময় তাদের ঝগড়া ভুলিয়ে দিয়েছে। বিকেলে যখন শিশু দু’টি সকাল ভুলে অনায়াসে খেলায় নেমে গেছে, তখনো কিন্তু বড়রা ঝগড়া করছে। বড় হলে বুদ্ধি হয়, জ্ঞান হয়, সেই সাথে স্বার্থবুদ্ধিও বড় হয়। ঘটনাকে সহজ সরল ও স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করার মন ও মানসিকতা বড়রা হারিয়ে ফেলতে পারে। তারা নিজেদের অজান্তেই মানবিকতা, সহযোগিতা ও সহনশীলতার উল্টো কাজ করছে। এটি অস্বাভাবিক। আর স্বাভাবিকতা ‘ফরগেট অ্যান্ড ফরগিভ’- ভুলে যাওয়া এবং ক্ষমা করা।
জাইমার কারণে গল্পটি আবার মনে এলো। জাইমা বিএনপি চেয়ারম্যান, তারেক রহমানের একমাত্র সন্তান, কন্যা। সে আমাদের কাছে শিশুর মতো। রাজনীতির ডামাডোলে সে এখনো আক্রান্ত হয়নি। এখনো সে রাজনীতির কাদামাটিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেনি। সে দিন সে একটি সভায় কথা বলেছে। এটি ছিল জাতি গঠনে নারী : নীতি, সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শীর্ষক একটি আলোচনা সভা। রাজধানীর খামার বাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ঢাকা ফোরাম এই সভার আয়োজন করে। নারীর ক্ষমতায়ন-বিষয়ক এই আলোচনায় সব কিছু ছাড়িয়ে যে বিষয়টি আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে, সেটুকুর জন্যই এই নিবেদন। অনেকসময় আমাদের অনেক কথা বন্দনার মতো হয়ে যায়। বিগত দিনগুলোতে বন্দনা শুনতে শুনতে আমাদের মন বন্দী হয়ে গেছে। ভালো কথাকে ভালোভাবে নেয়ার গরজে, দেশের প্রয়োজনে প্রসঙ্গটির অবতারণা। যাই হোক, জাইমার কথায় ফিরে যাই : ‘দলমত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের দেশের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা থাকা উচিত।’ সে আরো বলেছে, ‘আমরা সবাই একরকম নই। আমাদের আদর্শ, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তারপরও আমরা একসাথে বসেছি, আলোচনা করছি। কারণ আমরা সবাই দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য ভাবছি এবং কিছু করতে চাচ্ছি। এই ভিন্নতার মধ্য দিয়েই একসাথে কথা বলা, একে-অপরের কথা শোনা- এটিই গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য।’ এটি ছিল জাইমা রহমানের জনপরিসরে প্রথম বক্তব্য। সে সরলভাবেই বলেছে, ‘আজ আমি এখানে এসেছি মূলত শুনতে, শিখতে এবং ভবিষ্যতে একসাথে কাজ করার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে।’
এই আলোচনা সভায় নারী উন্নয়নের বিষয়ও সে নানা কথা বলেছে। স্বাভাবিকভাবেই তার মর্যাদাপূর্ণ উত্তরাধিকারের কথা এসেছে। আমার কাছে সেসব কথার চেয়ে ভালো লেগেছে তার গণতান্ত্রিক মন-মানস। আমরা আসলেই যে একরকম নই, আমাদের আদর্শ, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা সত্ত্বেও আমরা একই ধারার যাত্রী- এ কথা তার বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। এ ধরনের ভিন্নতা সত্ত্বেও আমাদের সবাইকে একসাথে বসতে হচ্ছে, কাজ করতে হচ্ছে এবং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য তৈরি করতে হচ্ছে- এটিই বাস্তব। বাংলাদেশের সব মানুষ যে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য ভাবে এবং কিছু করতে চায়- এ কঠিন উপলব্ধি জাইমার কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে। এই ভিন্নতা নিয়েই যে আমাদেরকে একসাথে কথা বলতে হবে এবং মিলেমিশে কাজ করতে হবে, গণতন্ত্রের এসব সূত্র সে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে।
জাইমা রহমানের এসব কথা যখন শুনছি, সে সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চালচিত্রের দিকে তাকালে আমাদের হতাশ হতে হয়। একটি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর আমরা যখন অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার চেষ্টা করছি, জাতির নেতা নির্বাচনের প্রান্তিক সময় অতিক্রম করছি, তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভেদ বিভাজন, হিংসা-প্রতিহিংসার কথাবার্তা ও সহিংসতা আমাদেরকে বিচলিত করে। আমাদের পরিপক্ব রাজনীতিবিদদের মুখে যখন অপরিপক্ব, অপ্রত্যাশিত ও অনাকাক্সিক্ষত উচ্চারণ লক্ষ করি, তা গোটা জাতিকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। সে ক্ষেত্রে আমাদের জাইমা, আমাদের সন্তান আমাদের ভুল শুধরে দেবে- এই আশা নাগরিক সাধারণের। অবশেষে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে শিল্পী মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের উচ্চারিত গানের কলি দিয়ে শেষ করি, ‘আমাদের সন্তানেরা দেবে সে ভুল ভেঙে দেবে/আমাদের সন্তানেরা হিসাব করে বুঝে নেবে/আমাদের পাওনাটুকু আদায় করে তারাই নেবে।’
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



