আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিষয়ে কিছু কথা

শরীরের একটি অঙ্গ পঙ্গু রেখে যেমন শরীর সুস্থ থাকে না, তেমনি আর্থিক খাতের এই অঙ্গকে দুর্বল রেখে কোনোভাবে দেশে অর্থনীতির উন্নতি করা যাবে না।

দেশের ব্যাংকিং খাতসহ আর্থিক খাত দীর্ঘদিন ধরে ভগ্নদশায়। বিগত সরকারের দুর্নীতি, অর্থপাচার, নির্বিচার লোপাটে দেশের অর্থনীতি প্রায় ধ্বংস হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ উদ্যোগের ফলে ধীরে ধীরে আর্থিক খাতের কিছুটা উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে আরো বেশি দৃশ্যমান উন্নতি জাতি আশা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অর্থনীতির তদারকি সব সংস্থা বিগত সরকার আমলে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ লুটপাট ও পাচারে জড়িত ছিল। শুধু প্রতিষ্ঠানকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব এই ক্ষেত্রে অনেক বেশি। সেই দায়ভার তাদেরকেও নিতে হবে।

যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না এবং যাদের খেলাপি ঋণ অনেক বেশি, সেগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না এমন ২০টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) নিবন্ধন সনদ বা লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব এনবিএফআইয়ের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে এই চিঠির জবাব দিতে বলা হয়েছে।

এর আগে দীর্ঘদিন ধরে সঙ্কটে থাকা, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে না পারা ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের যে ঋণ রয়েছে, তার বিপরীতে জামানতও খুবই কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিঠির জবাব পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাতে এসব প্রতিষ্ঠান একীভূত বা অবসায়নের উদ্যোগ নেয়া হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ আদায় করে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা এখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংককে তার চিঠির জবাব দেবে এবং নিজেদের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক যে ২০টি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে, সেগুলো হলো- সিভিসি ফাইন্যান্স, বে লিজিং, ইসলামিক ফাইন্যান্স, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, হজ ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, আইআইডিএফসি, প্রিমিয়ার লিজিং, প্রাইম ফাইন্যান্স, উত্তরা ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, ফিনিক্স ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বিআইএফসি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স ও এফএএস ফাইন্যান্স।

আর্থিক খাতের বহুল আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যে অনিয়ম করে গেছেন, তার জের টানতে হচ্ছে পুরো খাতকে। পি কে হালদারের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় ছিল, এমন কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে এই তালিকায়। পি কে হালদার যখন এসব অনিয়ম করেন, তখন তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ মোহাম্মদ সাইফুল আলমের (এস আলম) নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। পি কে হালদারের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের পর ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোরও একই দশা করেন এস আলম। তাতে পুরো আর্থিক খাতই এখন ধুঁকছে।

সমস্যার স্বরূপ : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথিপত্র থেকে জানা যায়, দেশে মোট এনবিএফআই রয়েছে ৩৫টি। এর মধ্যে ২০টির অবস্থা খুবই নাজুক। গত ডিসেম্বরে এসব প্রতিষ্ঠানের আমানতের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা, এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আমানত ১৬ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা ও ব্যক্তি আমানত পাঁচ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এই ঋণের ৮৩ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে, যার পরিমাণ ২১ হাজার ৪৬২ কেটি টাকা। ঋণের বিপরীতে জামানতের পরিমাণ ছয় হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। জামানতের অর্থ দিয়ে ব্যক্তি আমানতকারীর অর্থ ফেরত দেয়া সম্ভব। সব মিলিয়ে ২০টি প্রতিষ্ঠানের ক্রমপুঞ্জিত ক্ষতির পরিমাণ ২৩ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে ভালো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। এতে পুরো খাতের ওপর আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ও বাজার বিরূপভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, যা থেকে উত্তরণ আবশ্যক। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চিহ্নিত ২০টি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বছরে বেতন ১৭২ কোটি টাকা ও এমডিদের বেতন ১২ কোটি টাকা। ভাড়া, অন্যান্য খরচসহ সব মিলিয়ে ব্যয় ২০৬ কোটি টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কোনো সুদ আয় নেই। তাই আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন ও একত্রীকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি আর যাতে খারাপ না হয়, এ জন্য কঠোর তদারকির মধ্যে রাখা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান চলতে পারছে না, সেগুলোর বিষয়ে সামনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। তবে খেলাপি ঋণ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় কিছুটা কমেছে। সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৬ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। আর ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের মোট ঋণের ২৯ দশমিক ২৭ শতাংশ।

অবশ্য ২০টি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে পুরো খাতের খেলাপি ঋণ বেশি। ২০ প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য ১৫ এনবিএফআইয়ের গড় খেলাপি ঋণের হার ৮ শতাংশের কম, অনেক ব্যাংকের চেয়েও এই ১৫ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের অবস্থা ভালো।

যে উদ্যোগ প্রয়োজন : সব আর্থিক খাত দুর্বল ঢালাওভাবে এমনটা বলা যায় না। যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে লুট করা হয়েছে, শুধু তাদেরকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। সবগুলোর লাইসেন্স বাতিল করা হলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক বার্তা যাবে। একটি বিশেষ মহল চায় অর্থনীতিতে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে। তাতে তাদের রাজনৈতিক সুবিধা হবে। সকল স্তরে স্বৈরাচারের দোসররা বসে বসে নানা অপকর্ম করছে।

১) দেখা যাচ্ছে, সরকার ব্যাংক ও আর্থিক খাতের উপর দু’মুখো নীতি গ্রহণ করছে। ব্যাংকগুলোকে নগদ অর্থ সরবরাহ করে সহযোগিতা করছে। অন্যদিকে আর্থিক খাতকে নানা বিধিনিষেধ দিয়ে অচল করে ফেলছে। এমনকি ৫০ লক্ষের অধিক কোন আমানতকারী লিজিং কোম্পানিতে রাখতে পারবে না। অথচ ব্যাংকে এমন কোনো সীমা নেই। এই সীমা তুলে নেয়া দরকার।

অন্যদিকে সরকার লিজিং কোম্পানিতে অর্থ জমা রাখতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিরুসাহিত করছে। এটিও ঠিক কাজ নয়। যেসব লিজিং কোম্পানি সক্ষম ও উন্নতি করছে তাদেরকে আর্থিক ও নীতি সহযোগিতা করা প্রয়োজন।

২) বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠিপত্র লেখার ব্যাপারে আরও বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ এসব চিঠি মিডিয়ায় চলে এলে অর্থনীতি খাতে নেতিবাচক বার্তা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংককে তদারকি বাড়াতে হবে। স্বচ্ছতা আনতে হবে। ঘুষ ও নীতি সব স্তর থেকে দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

৩) ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির ক্ষেত্রে সরকারকে আরও বেশি ইতিবাচক উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব ঋণখেলাপি ইচ্ছাকৃত প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ঋণ আদায় করতে হবে।

৪) আর্থিক খাতে সুশাসন খুবই প্রয়োজন। বিগত সরকার আমলে আইনের শাসন ছিল না। আইন অর্থ ছিল সরকারি দল ও দলের ব্যক্তিদের সহযোগিতা। সত্যিকার ব্যবসায়ীগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঠিকমতো ঋণ না পাওয়ায় অনেকে খেলাপি হয়েছে। অন্যদিকে অনেক খেলাপি বিদেশে অর্থ পাচার করে দেউলিয়া হয়েছে। এদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ঋণ আদায়ে আইনি সহযোগিতা অনেক বেশি জোরালো হওয়া প্রয়োজন।

৫) যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান অর্থের অভাবে বিনিয়োগ করতে পারছে না তাদেরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক ঋণ দিতে হবে।

শরীরের একটি অঙ্গ পঙ্গু রেখে যেমন শরীর সুস্থ থাকে না, তেমনি আর্থিক খাতের এই অঙ্গকে দুর্বল রেখে কোনোভাবে দেশে অর্থনীতির উন্নতি করা যাবে না।

লেখক : সাবেক সহসভাপতি এফবিসিসিআই