বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কল্পকাহিনী শুরু হয় ২০০২ থেকে ২০০৩ সালে। সে সময় কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের মহাবোধি সোসাইটি হলে গঠন হয় ‘ক্যাম্পেইন অ্যাগেইনস্ট অ্যাট্রোসিটিস অন মাইনোরিটিস ইন বাংলাদেশ’ বা ‘ক্যাম্ব’। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল আমরা হিন্দু, হিন্দু সংহতি। তাতে ঘি ঢেলে দেয় বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। ঘি ঢেলে আগুনটা দ্বিগুণ জ্বালিয়ে দেয় এই সংগঠন। এ ছাড়া বাংলাদেশ মাইনোরিটি পার্টি (বিএমপি), বাংলাদেশে গড়ে উঠা ‘আর এস এস’, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও হিন্দু মহাসভার গোপন প্রচার তো আছেই।
যেকোনো দেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনকে অবশ্যই আমি ঘৃণার বলে মনে করি। কিন্তু কল্পকাহিনী প্রচার করে যখন উন্মাদনা তৈরি করা হয়, তখন তা হয় আরো বিপজ্জনক। যে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়, সেই দেশের আইনে তার বিচার হওয়া দরকার বলে মনে করি। শুধু তাই নয়, সেই দেশে নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই-আন্দোলন তীব্র হোক, সেটিই মনে করি আমি।
২০০৪ সালের ২২ ও ২৩ জানুয়ারি দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ শিক্ষাসদনে বড় অনুষ্ঠান করেছিল ক্যাম্ব। সেই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সদস্যরা। ক্যাম্বের পক্ষ থেকে ছিলেন বিমল প্রামাণিক, মোহিত রায়, অচিন্ত গুপ্তরা। এরা জন্মসূত্রে বাংলাদেশের ভূমিপুত্র।
বালিগঞ্জ শিক্ষাসদনে সে দিন আসেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রয়াত সন্তোষ ভট্টাচার্য ও শিবনারায়ণ রায়রা। ওই দিন এই দুই ব্যক্তি একটি দারুণ সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, ওপারের সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা বলতে এসে এপারের সংখ্যালঘু নির্যাতনকে ভুলি কী করে। কেননা, এখানেও গুজরাট, নেলি, ভাগলপুর, সুরাট ও মুম্বাই হয়েছে। সেই সভায় ছিলেন বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তিনি সে দিন গুজরাট ও বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নির্যাতন নিয়ে একটি প্রতিবাদী কবিতা পাঠ করেন। কিন্তু পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে দেন বাংলাদেশের আরেক বিতর্কিত লেখক সালাম আজাদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের বাঁচাতে হলে এখানকার সংখ্যাগুরুদের হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। আর এখানকার সংখ্যালঘুদের পেটাতে হবে। তখন এই সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশের সংখ্যাগুরুদের বলবে, তোমরা তোমাদের সংখ্যালঘুদের বাঁচাও, নইলে আমরা বাঁচতে পারছি না। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। সাথে সাথে বিষয়টি কলকাতা পুলিশের গোচরে চলে যায়। তার পর এতে কড়া রাশ টানা হয়। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার শঙ্কায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
বালিগঞ্জ শিক্ষা সদনে বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ে দু-একবার সম্মেলন হলেও কলকাতায় সেভাবে কিছু হয়নি। কিন্তু সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নকল সিডি প্রদর্শন করে এই মিথ্যা কল্পকাহিনীকে আরো ঢালাও প্রচার করে ক্যাম্ব। এর মাধ্যমে বেশ কিছুটা প্রভাব বিস্তার করে তারা।
সেই ধারাবাহিকতায় এবার শুভেন্দু অধিকারীর প্রজেক্ট। আর জি করের ঘটনায় নবান্ন অভিযান ফ্লপ মেরেছে। তাই ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনকে সামনে রেখে শুভেন্দু বাবুরা ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করে এগিয়ে যেতে চাইছেন।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে বলে ভুয়া খবর প্রচার করছে তারা। দেখা গেছে, ভারতের উত্তর প্রদেশের শহর হাথরাসের সংখ্যালঘু নির্যাতনের ছবি দেখিয়ে এটিকে বাংলাদেশের নির্যাতন বলে চালিয়ে দিয়েছে এখানকার অন্তত ৫০ টিভি চ্যানেল। আর ইসকনের বহিষ্কৃত সমাজবিরোধী চিন্ময় দাসকে একেবারে হিরো বানানোর চেষ্টা করেছে তারা। কিন্তু চট্টগ্রামের আইনজীবী সাইফুল ইসলামকে খুনের ঘটনা পুরো পাশ কাটিয়ে গেছে। ঘটনার সত্যতা জানার জন্য আমি চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশের অর্ধশত হিন্দুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তারা জানালেন, ভারতের ৫০টির মতো বেসরকারি টেলিভিশন পরিস্থিতি উসকে দিচ্ছে। আমরাও এখানে অস্বস্তিতে ছিলাম।
এ কথা সত্য যে, শুভেন্দু বাবু সুপার ফপ। বেলডাঙার সায়ন হালদার, কার্তিক মহারাজ বা ভরতনাথ ঝাওয়াররা বহু সাধনার ফল। এটিই বাস্তব। বেলডাঙার ঘটনা স্বাভাবিক হওয়ার পর ১৫ ডিসেম্বর (২০২৪) মুর্শিদাবাদের বহরমপুর জেলা বই মেলায় কী ঘটনা ঘটাল আরএসএসের দোসররা! পুলিশের প্রচেষ্টা বা সাধারণ মানুষের ভূমিকার জন্য সে দিন বড়সড় সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা ঠেকানো গেছে। ক্যাম্ব কিন্তু মিথ্যা কল্পকাহিনী নিয়ে এখনো তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বেলডাঙায় কার্তিক লড়াইয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, তার আগেও পাশেই নওদা থানার ত্রিমোহিনীর কাছে ঝাউবোনা হাইস্কুলে সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে বড়সড় ঘটনা ঘটেছিল। ওখানে তিন মুসলিম যুবক খুন হয়েছিল। এর মূলেও ছিল ওইসব নাটের গুরুরা। একশ্রেণীর মিডিয়া এদেরকে উসকে দিয়েছিল। একশ্রেণীর মিডিয়া প্রতিনিধি এলাকায় মুসলিম দরদ দেখাতে গিয়ে কার্যত মুসলিমদের মনন নিয়ে আবার বিজেপি-আরএসএসকে গোপন রিপোর্ট সরবরাহ করেছিল। এটি ছিল বিপজ্জনক। আমাদের মিডিয়া জানেই না সাহারগাছি রামকৃষ্ণ মিশন, বেলডাঙার ভারত সেবাশ্রমের জায়গা দান করেছেন এলাকার অভিজাত মুসলিমরা। তারা ওই এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ করেছিল। সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি ঠিক রাখতে কাজ করেছেন ড. আসাদুজ্জামান, বেলডাঙা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সনৎ কর বা অরূপ চক্রবর্তীসহ সাধারণ মানুষ। তাদেরকে শ্রদ্ধা। আমাদের মিডিয়া এই লোকদের কথা বলে না।
যখন দেখা যাচ্ছে, ভারতের অন্যান্য প্রদেশে কর্মরত বাঙালি শ্রমিকদের ১৯০ জনকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো এবং তাদের খুনিদের বিরুদ্ধে কোনো ‘এফআইআর’ নেই, তখন বাংলাদেশে দীপু দাসের খুনে সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়। কলকাতার মিডিয়ায় এই খবরটি একেবারেই আসে না।
ভারতে এই খুনের শুরুটা হয়েছিল মালদহের পরিযায়ী শ্রমিক আফরাজুলকে দিয়ে। আর শেষ হলো উড়িষ্যায় কাজ করতে যাওয়া জুয়েল রানাকে খুনের মাধ্যমে। গুজরাট গণহত্যা, মজফফরনগর, ভাগলপুর, সুরাট, আহমেদাবাদের মতো একপেশীয় আক্রমণের কথা বাদ দিলাম। কিংবা বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়া তৎপরবর্তী সময়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ৩০০ মসজিদের ঘটনায় ক্যাম্ব নীরব থাকে। মব করে ১৯০ বাঙালি শ্রমিককে খুন করা হলেও কথা বলে না এই সংস্থাটি।
ভারতে ১৯৯০ সালে প্রথমবার কর সেবকদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের চেষ্টার ঘটনায় বাংলাদেশেও কিছু কিছু মন্দির আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু তখনকার এরশাদ সরকার দুই সপ্তাহের মধ্যে সেগুলো নতুন করে বানিয়ে দিয়েছে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উন্মত্ত কর সেবকরা আরএসএস-বিজেপির শীর্ষ নেতাদের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ মাটিতে মিশিয়ে দেয়। তখন বাংলাদেশে খালেদা জিয়ার সরকার। জামায়াত আমির অধ্যাপক গোলাম আজমের নেতৃত্বে তখন লংমার্চ বের হলে সীমান্ত এলাকায় থামিয়ে দেয়া হয়।
বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন ভারতে থেকেও এগুলোর প্রতিবাদ করেন না কেন? মুঘল ইতিহাস-ঐতিহ্য-নামকরণগুলোকে পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। মুঘলসরাই, ইলাহাবাদ, করিমগঞ্জ, অরঙ্গবাদ শহরের নামও বদলে ফেলা হয়। বিজেপির এই কাজগুলোতে ভারতের সংবিধান ও গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে না কি? বিজেপি-আরএসএস নিজেদের পাপ ঢাকতে ক্যাম্বকে মাঠে নামিয়েছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের কল্পকাহিনী প্রচার করতে। আর এসব কাহিনীকে উত্তপ্ত করছে গদিমিডিয়া।
বিমল প্রামাণিক প্রতিষ্ঠিত ক্যাম্ব কেবল পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ, ক্যাম্ব বাংলাদেশের হিন্দু-নির্যাতনের কল্পকাহিনী ছড়িয়ে দিচ্ছে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতেও। এই রাজ্যগুলো ‘সেভেন সিস্টার্স’ বলে পরিচিত।
লেখক : কলকাতার কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও কবি



