মেধার মূল্যায়ন ও শিক্ষা

শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য বন্ধ না হলে মেধার অবমূল্যায়ন বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। শিক্ষকতায় মেধাবী সৃজনশীলদের আকৃষ্ট করতে হলে তাদের বেতন কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা বিধান জরুরি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। এখনো তা চলমান থাকলে পরিবর্তন শব্দটিই হারিয়ে যাবে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উৎপাদনশীল জনশক্তি সৃষ্টিতে উদ্যোগী করার প্রয়োজনে গবেষণা কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করার বিকল্প নেই।

অতিসাম্প্রতিক একটি ঘটনা নিয়েই আজকের লেখা। যারা মানুষ গড়ার কারিগর, যারা অপত্য স্নেহে ছাত্রদের লালন করেন, হাত ধরে শেখান, শিশুর বৃদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীলতা, চারিত্রিক গুণাবলির বিকাশ ঘটান এবং নিজে জ্ঞানের অতল সমুদ্রে শিশুদের সাঁতার কাটতে শেখান, শেখান আচার ব্যবহার ও নৈতিকতা, ঘটনাটি তাদের নিয়ে। একজন শিক্ষক অসদাচরণের কারণে এক ছাত্রকে তিরস্কার করেছিলেন। তিরস্কারের মাত্রা কতটুকু ছিল তা সঠিকভাবে জানা যায়নি; কিন্তু ছাত্রের দোর্দণ্ড প্রতাপ মান্যবর বাবার তা সহ্য হয়নি। সন্তানের এই অপমান (?) হজম করতে না পেরে তিনি তার ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে প্রধান শিক্ষককে বাধ্য করেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে তার ছেলের কাছে ক্ষমা চাইতে। ব্যাপারটি এখানেই শেষ হয়নি। তিনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে তার আদরের সন্তানের পা ছুঁয়ে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলেন। কেন জানি সেদিন ধরণী খণ্ডিত হয়ে যায়নি। একজন শিক্ষক হিসেবে রাগে দুঃখে ক্ষোভে আমি হতবাক হয়েছিলাম। ছাত্রের ক্ষমতাধর বাবার ক্ষমতার আস্ফালন দেখে সম্ভবত সবাই অবাক বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি সম্ভবত তার ক্ষমতার এই উচ্চমার্গে পৌঁছানোর পেছনে যাদের অবদান রয়েছে, সেই কোনো একজন নিরীহ, ছাপোষা কল্যাণকামী শিক্ষক বা মক্তবের ওস্তাদের অবদান বেমালুম ভুলে গিয়ে নিজেকে সেলফ মেড বা স্ব-প্রতিষ্ঠিত ভেবেছিলেন।

সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছিলাম মানবাধিকারকর্মীদের ভূমিকা দেখে। তারা এ বিষয়টিকে মোটেই আমলে নেননি অথবা কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। আমলে নেননি শিক্ষক সমিতি বা এর নেতারা। সবাই এ ব্যাপারে কেন যেন আজও নিশ্চুপ।

এ ধরনের একজন উন্নাসিক ব্যক্তি কিভাবে সরকারের দায়িত্বশীল পদে পদায়িত হন এবং এ ঘটনার পরও স্বপদে বহাল থাকেন, তা অবশ্যই আলোচনার দাবি রাখে। ঘটনাটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অধঃপতনের মান নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে। সভ্যসমাজের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা যারা সামান্য কারণে আগে যমুনায় ছুটে যেতেন, তারা এ ব্যাপারে রহস্যজনক কারণে নিশ্চুপ। শিক্ষকের যে হাত দোয়ার জন্য ছাত্রের মাথায় থাকার কথাÑ সেই হাত আজ ক্ষমতার দোর্দণ্ড প্রতাপে ছাত্রের পায়ে ক্ষমাপ্রার্থী। শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী, বিশিষ্ট নাগরিক, সুশীলসমাজÑ এ ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটেছে। এ ঘটনার পর মেধা ও আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন কেউ কি এই পেশায় আসতে চাইবেন? এ ঘটনার সৃষ্ট চরিত্রগুলো চলমান শিক্ষা পদ্ধতির ফসল। এটি যত দিন চলমান থাকবে তত দিন এ ধরনের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি হওয়া বন্ধ হবে না।

দ্বিতীয় আরেকটি ঘটনা বলি। এটি আমার নিজের জীবনের। ১৯৭৩ সালের পর যোগাযোগহীন থাকার পর ২০২৬ সালের এক সন্ধ্যায় আমার এক শিক্ষকের সান্নিধ্যে হাজির হই দীর্ঘ ৫৩ বছর পর। আমার পরিচয়ের জন্য খানিকক্ষণ বিরতি নিলেন স্মৃতি হাতড়ানোর জন্য। পরে আশ্চর্যজনকভাবে তিনি আমার সহপাঠীদের নামোল্লেখ করে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন তাদের কথা। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম এই ভেবে যে, ছাত্রদের প্রতি কতটুকু অপত্য স্নেহ থাকলে একজন শিক্ষক এত বছর পরও তাদের মনে করতে পারেন। এর মধ্যে আমার শিক্ষকের নতুন আত্মীয়স্বজন এসে হাজির। তিনি সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। সেদিন সে মুহূর্তে তার বয়োবৃদ্ধ চেহারায় যে তৃপ্তির হাসি আর আনন্দের আভা দেখেছি তা ভোলবার নয়। এরাই শিক্ষক সমাজের প্রতিভূ। এভাবেই তারা তাদের ছাত্রদের লালন করেন পরম অপত্য স্নেহে। তাদের হাত ধরে গড়ে ওঠে সভ্যতা। উন্মেষ ঘটে ইতিহাসের অমর মহামানবদের। এ জন্য ইসলামে তাদের সম্বোধন করা হয়েছে ‘মুর্শিদ’ অভিধায়।

ইদানীং শিক্ষামন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী শিক্ষার অবক্ষয়ের কথা বলেছেন, বলেছেন নৈতিকতার কথা। বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদায়নের ক্ষেত্রে যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দলীয়করণ শুরু হয়েছে, যে বয়ানের ছত্রছায়ায় দুর্বৃত্তায়ন চলছে তা চলমান রেখে নৈতিকতা, চারিত্রিক গুণাবলির কথা ‘উলুবনে মুক্তো ছড়ানোর’ মতোই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্মোহ আচরণ দেখতে চায় জাতি। প্রত্যাশা করে মেধার যথাযোগ্য মূল্যায়ন, নৈতিকতা ও চরিত্র মাধুর্যের অধিষ্ঠান।

শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য বন্ধ না হলে মেধার অবমূল্যায়ন বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। শিক্ষকতায় মেধাবী সৃজনশীলদের আকৃষ্ট করতে হলে তাদের বেতন কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা বিধান জরুরি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। এখনো তা চলমান থাকলে পরিবর্তন শব্দটিই হারিয়ে যাবে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উৎপাদনশীল জনশক্তি সৃষ্টিতে উদ্যোগী করার প্রয়োজনে গবেষণা কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করার বিকল্প নেই। বর্তমানে প্রচলিত বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা শিক্ষাসহ শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভাজিত অদ্ভুতুড়ে অবস্থা থেকে বেরিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অবিভাজিত নৈতিকতাসংবলিত পাঠক্রমের বিকল্প নেই।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]