ড. শাহজাহান খান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু প্রতীক্ষিত ও বহুল আলোচিত ডাকসু নির্বাচন গত ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। এর দু’দিন পর অনুষ্ঠিত হয় দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগরের জাকসু নির্বাচন।
দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের ফলাফল অনেক সচেতন নাগরিক ও প্রতিবেশী দেশকে চমকে দেয়। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে। যদিও সাধারণ শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে ছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের কারণে শিবির প্রায় অপ্রত্যাশিত বিজয় ছিনিয়ে নেয়, তারা কোনো বিজয় মিছিল বা উল্লাস করেনি; বরং নীরবে শুকরিয়া আদায় করেছে।
ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান ও তার সহকর্মীদের জাতি প্রশংসা করেছে। দীর্ঘ ম্যানুয়ালি ভোট গণনা সত্তে¡ও জাকসু নির্বাচন শেষ করায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন কমিশন ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ঘোষণা করেছেন, তারা এই বিজয়ে আনন্দ না করে দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সব মতাদর্শের শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ করবেন।
নব-নির্বাচিত ডাকসু নেতারা কোনো প্রচার ছাড়াই নির্বাচনী কার্যক্রম কাভারেজের সময় মৃত্যুবরণকারী সাংবাদিকের পরিবার ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কবরস্থানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে দোয়া করেছেন। তারা প্রাক্তন ডাকসু ভিপি মাহমুদুর রহমান ও নুরুল হক নুরের সাথে দেখা করে দিকনির্দেশনা চেয়েছেন।
কে জিতেছে বা কোন দল বিজয়ী হয়েছে, সেটি বড় বিষয় নয়- ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে জয় হয়েছে ৩৬ জুলাইয়ের চেতনা ও সংগ্রামের। প্রতিটি নির্বাচিত প্রার্থীই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিজ ভূমিকা, অবদান ও ত্যাগের জন্যই শিক্ষার্থীদের সমর্থন পেয়েছেন।
জাতির তরুণ ও শিক্ষিত প্রজন্ম প্রমাণ করেছে, তারা ১৪০০ শহীদ ও ৪০ হাজার আহত সংগ্রামীর স্বপ্ন ভুলে যায়নি। তারা তাদের সহযাত্রীদের ত্যাগ বিস্মৃত হয়নি বা তাদের রক্ত ও ঘামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। শিবিরের বিজয়ের মূল কারণ জুলাই আন্দোলনে তাদের নেতৃত্বদান ও ছাত্রদের হৃদয়ে স্থান করে নেয়া। এ ছাড়া তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গ্রাফিক ও ভার্চুয়াল প্রদর্শনীসহ হৃদয়গ্রাহী কর্মসূচি পালন করেছে। তারা ছাত্রীদের নিরাপত্তা বিধান ও সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার করেছে। নির্বাচনের আগেই তারা অনেক শিক্ষার্থীকে ভর্তি প্রস্তুতি, আবাসনের ব্যবস্থা, একাডেমিক ও আর্থিক সঙ্কটে সহায়তা করেছে।
কিছু ব্যক্তি শিক্ষার্থীদের মনোভাব ভুল বুঝে পুরনো গোপন চুক্তি পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিনিধি নিজেরাই বেছে নিয়েছে।
ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগরে শিবিরের বিজয় কোনো আদর্শিক বিপ্লব নয়; এটি অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিজয়। হিজাব না পরা ছাত্রী, অন্ধ ও অমুসলিম প্রার্থীও তাদের প্যানেলে থাকা আমাদের সমাজের বৈচিত্র্যের বাস্তব প্রতিফলন। কোনো ধর্মনিরপেক্ষ বা জাতীয়তাবাদী দল আগে কখনো এমনটি করেনি। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় ৩৭ বছরের বসবাসের অভিজ্ঞতা, বহু-ধর্ম ও বহু-সংস্কৃতি সংস্থার সাথে কাজ করা এবং বিভিন্ন অস্ট্রেলিয়ান সরকারি সংস্থা থেকে পুরস্কার পেয়ে আমি বলতেই পারি, একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামী ছাত্রশিবিরের এই অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অসাধারণ ও যুগান্তকারী। তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মদিনা সনদের অন্তর্নিহিত বার্তার মিল রয়েছে, যা বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশে পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ব নিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা দেয়।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন এক প্রজন্মগত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। সেটি হলো- আত্মপরিচয় পুনরাবিষ্কার এবং আত্মনির্ধারণের মাধ্যমে শিক্ষিত, সৎ, দেশপ্রেমিক ও দক্ষ পেশাজীবীদের নেতৃত্বে দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দৃঢ় অবস্থান নেয়া। এটি কোনো অন্ধ দলীয় সমর্থন নয় বা আদর্শিক বিপ্লব নয়। শিক্ষার্থীরা কোনো রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ পছন্দ করে না বা ধর্মবিরোধী আক্রমণ সহ্য করে না। তারা উদার মনে ধর্ম সম্পর্কে জানতে এবং তার অনুশীলনে আগ্রহী।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এই সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই জাতীয় নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ওপর প্রভাব ফেলবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন শিক্ষার্থীদের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেদের নীতি-অবস্থান সাজাতে হবে। কারণ, শিক্ষার্থীরা ভোট জালিয়াতি, জোর করে ক্ষমতা দখল বা ভোটারদের হুমকি দেয়া ঘৃণা করে। তারা এরই মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা, প্রশাসক, সাংবাদিক, বিচারক, শিক্ষক, শিল্পী, ব্যবসায়ীদের আসল চেহারা দেখেছে এবং তারা চায় না ওই দুষ্কৃতকারীরা আর ফিরে আসুক।
তরুণরা বুঝেছে, ভারতের নগ্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হস্তক্ষেপ প্রমাণিত এবং দেশটি বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু নয়। যেকোনো দল বা বুদ্ধিজীবী/সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী যারা ভারতের স্বার্থে কাজ করছে, তারা শিক্ষার্থী ও জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হবে।
আমার বিশ্বাস, ছাত্রশিবির শিক্ষা সংস্কারে কাজ করবে আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন, নৈতিকভাবে দৃঢ় ও চারিত্রিকভাবে সৎ মানুষ তৈরি করতে। তবে ডাকসু ও জাকসুর উচিত উচ্চশিক্ষা খাতে গঠনগত পরিবর্তন এবং গবেষণা-উদ্ভাবনের সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনা, যাতে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার হয়।
নব-নির্বাচিত ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম ও তার দলের অনেক কাজ আছে। ছাত্রদের আবাসন, খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, সুবিধা উন্নয়ন; বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপদ্ধতি সংস্কার, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি পদ্ধতির পুনর্গঠন; মূল্যায়ন পদ্ধতি সংস্কার; মানসম্পন্ন পিএইচডি ছাত্র ভর্তি ইত্যাদি।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা বিশাল। তরুণরা প্রতিভাবান ও সৃজনশীল। তাদের প্রয়োজন দিকনির্দেশনা, সহায়তা ও অর্থায়ন।
বাংলাদেশের বহু মানুষ এখনো পুরনো ধাঁচে আটকে আছে। তারা রুটিনমাফিক কাজ করেই খুশি। এতে জাতির ভবিষ্যৎ বদলাবে না। তারা স্বাচ্ছন্দ্যের অবস্থান ছাড়তে নারাজ। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং তার পরের প্রজন্মের জন্য এখনই আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে আগামী দিনে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে ওঠে।
ডাকসু, জাকসু এবং দেশের অন্যান্য সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানের নতুন নেতৃত্বের সামনে বিশাল দায়িত্ব এই জাতির পুনর্গঠন।
লেখক : উপাচার্য, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি এবং এমিরেটস প্রফেসর, সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া



