গণভোটই জুলাই সনদের গণভিত্তি

৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে রাজনীতির চেহারা বদলে গেছে-জনগণ এখন পরিবর্তন চায়, কেবল শাসক পরিবর্তন নয়, ব্যবস্থা পরিবর্তন। জুলাই সনদ সেই পরিবর্তনের রূপরেখা। একে আইনি ভিত্তি দিতে গণভোটের বিকল্প নেই।

সরদার ফরিদ আহমদ

জুলাই জাতীয় সনদ এখন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। স্বাধীনতার পর এমন একটি সময় আর আসেনি, যখন রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিক সমাজ একই সাথে নতুন ভিত্তি খুঁজতে শুরু করেছে। এই সনদের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের দিকনির্দেশনা দিয়েছে-যেখানে দল নয়, মানুষই হবে কেন্দ্রবিন্দু।

গত মঙ্গলবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সনদ বাস্তবায়নের উপায় ও পদ্ধতি নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দিয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত সংস্কারের যাত্রাপথ নির্ধারিত হলো। এখন প্রশ্ন একটাই- এই সনদের আইনি ভিত্তি কিভাবে দেয়া হবে? সরকারের উত্তর স্পষ্ট : গণভোটের মাধ্যমে।

গণভোট নিয়ে বিতর্ক তোলার চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী। তাদের যুক্তি, জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর বৈধ প্রতিষ্ঠান হলো সংসদ, তাই গণভোট প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সংসদীয় গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা ও দলীয় প্রভাবের পরিণতি ভোগ করছে।

আমরা জানি, বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী হয়ে গিয়েছিল সংখ্যালঘু। সংস্কৃতি, রাজনীতি সব ক্ষেত্রে। গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্টের পতনের পাশাপাশি ভারতীয় আধিপত্যবাদের পরাজয় ঘটেছে। এ কারণে বাংলাদেশের নব-উত্থানকে যেমন দিল্লি মেনে নিতে পারছে না, তেমনি পারছে না তাদের দোসররা। গণভোটকে কোনো রাজনৈতিক দল অবহেলা করতে পারে না, পারবে ন। রাষ্ট্র সংস্কারে জনগণের এই অংশগ্রহণকে যারা মেনে নিতে পারছে না তারাই গণভোট নিয়ে বিতর্ক তোলার ষড়যন্ত্রে নেমেছে।

৫ আগস্টের পর দেশে এক ধরনের প্যারাডাইম শিফট ঘটেছে। সেই দিনটা কেবল রাজনৈতিক ঘটনার দিন নয়, মানসিক পরিবর্তনেরও দিন। মানুষ বুঝে গেছে- পুরনো রাজনীতির যন্ত্রণা, দুর্নীতি, দলীয় প্রভাব আর সহিংসতার রাজনীতিতে ভবিষ্যৎ নেই। তারা চায় একটা নতুন সূচনা, যেখানে ন্যায়, জবাবদিহি আর অংশগ্রহণের মূল্য থাকবে।

এই নতুন সূচনাকে আইনি কাঠামো দিতে হলে জনগণকে সরাসরি মতামত দেয়ার সুযোগ দিতে হবে। গণভোট ছাড়া সেই বৈধতা আসবে না। নির্বাচিত সংসদ আসলে জনগণের প্রতিনিধি ঠিকই, কিন্তু জনগণের চূড়ান্ত রায় কেবল গণভোটেই পাওয়া যায়।

গণভোটের বিরোধিতার আড়ালে আসলে একটা ভয় কাজ করছে-ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের ভয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামোয়। প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ হবে, নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি দলনিরপেক্ষ হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেশাদারভাবে চালানোর উদ্যোগ নেয়া হবে।

এই সংস্কারগুলো বিদ্যমান রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠীর জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। তাই গণভোট ঠেকাতে কিছু সংবাদমাধ্যম ও স্বার্থগোষ্ঠী এখন নানাভাবে সংশয় তৈরি করছে। তারা বলছে, জনগণ নাকি প্রস্তুত নয়। কিন্তু গত ১৪ মাসে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সচেতন, যুক্তিপূর্ণ এবং পরিবর্তনের পক্ষে।

জুলাই সনদ কেবল একটি প্রশাসনিক নথি নয়-এটি এক নতুন সামাজিক চুক্তি। রাষ্ট্র ও নাগরিক পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধতার নতুন সংজ্ঞা খুঁজছে এখানে। দলীয় আনুগত্য নয়, নাগরিক মর্যাদাই হবে ভবিষ্যতের রাজনীতির মানদণ্ড- এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি এর ভেতরে নিহিত আছে।

এই চুক্তিকে কার্যকর করতে হলে জনগণের স্বীকৃতি অপরিহার্য। গণভোটই সেই স্বীকৃতির সবচেয়ে পরিষ্কার ও গণতান্ত্রিক উপায়। কেউ যদি মনে করে সংসদ গঠন না করেই গণভোট অগণতান্ত্রিক-তাহলে প্রশ্ন উঠবে, গণতন্ত্রের উৎস কি সংসদ, না জনগণ নিজে?

জুলাই সনদ কোনো দলের পক্ষে নয়। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের চেষ্টা। তাই গণভোট হতে পারে বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের নতুন মঞ্চ।

এখানে মানুষ দলীয় পরিচয় ভুলে দেশ নিয়ে ভাবতে পারবে। যেমন ১৯৭১ সালে জাতি এক হয়েছিল স্বাধীনতার জন্য, ২৪-এ তারা এক হয়েছিল ফ্যাসিস্টকে উচ্ছেদ করে নতুন বাংলাদেশ গড়তে, তেমনি এবার এক হবে রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের জন্য।

জনগণের সম্মতি অর্জনের এই সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। কারণ গণভোট মানে হলো-দল নয়, জনগণ নিজের ভাগ্য নিজের হাতে নেয়ার সাহস করছে।

আজকের বিশ্বে রাজনৈতিক বৈধতা কেবল নির্বাচনের ফল নয়, বরং জনগণের অংশগ্রহণ ও সম্মতির ওপর নির্ভর করে। ইউরোপের বহু দেশে, এমনকি উন্নত গণতন্ত্রেও সংবিধান সংশোধন বা বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত গণভোটের মাধ্যমেই হয়।

বাংলাদেশ যদি এই পথ অনুসরণ করে, তাহলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক সংস্কারে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক পরিসরে আস্থা তৈরি করতে পেরেছে, গণভোট সেই আস্থাকে আরো শক্তিশালী করবে।

এই গণভোট আসলে তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নের পরীক্ষাক্ষেত্র। যে প্রজন্ম রাজনীতির হিংসা ও দুর্নীতিতে ক্লান্ত, তারা চায় অংশগ্রহণমূলক ও সৃজনশীল রাজনীতি। জুলাই সনদ সেই প্রজন্মের সাথে কথা বলে-যাদের হাতেই এর ভবিষ্যৎ। এই প্রজন্মই ঠিক করবে, তারা পুরনো দলীয় আনুগত্যের ঘূর্ণি পেরিয়ে এক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে প্রস্তুত কি না।

গণভোট নিয়ে মতলববাজরা যতই বিতর্ক তৈরির অপচেষ্টা করুক, লাভ নেই। জনগণ বিশেষ করে তরুণরা, মুখোশধারীদের আসল চেহারা দেখে ফেলেছে। চিনে গেছে। আমরা জানি, ইতিহাসের গতি এক জায়গায় থেমে থাকে না। নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের সংগ্রাম থামবে না। জুলাইযোদ্ধারা সজাগ।

৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে রাজনীতির চেহারা বদলে গেছে-জনগণ এখন পরিবর্তন চায়, কেবল শাসক পরিবর্তন নয়, ব্যবস্থা পরিবর্তন। জুলাই সনদ সেই পরিবর্তনের রূপরেখা। একে আইনি ভিত্তি দিতে গণভোটের বিকল্প নেই।

যারা এই গণভোট ঠেকাতে চান, তারা মূলত জনগণের কণ্ঠ রোধ করতে চাইছেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী-বাংলাদেশে জনগণের কণ্ঠ কখনো থেমে থাকে না। রোধ করা যায় না। থেমে থাকে না প্রতিরোধ। এবারো থামবে না।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন