সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্সের আলোকে অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া শপথ ও গঠনপ্রক্রিয়া বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ রিটকারীর লিভ টু আপিল খারিজ করে দিয়ে এক আদেশে বলেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ ও গঠনপ্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট খারিজের হাইকোর্টের আদেশ সঠিক ও যথার্থ। আপিল বিভাগ এ কারণে হাইকোর্টের আদেশে হস্তক্ষেপ করছে না। গত বছরের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী মহসিন রশিদ। রিট খারিজ করে হাইকোর্ট বলেন, দেশের জনগণ বৈধতা দেয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না।
এ রায়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের নিষ্পত্তি ঘটল। এখন অপেক্ষা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সব কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে করা রিটের বিষয়টি। গুরুত্ব বিচারে রিটটি মারাত্মক। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সব কার্যক্রম স্থগিতের আবেদন জানানো যেনতেন বিষয় নয়। আবেদনে নির্বাহী বিভাগ থেকে নির্বাচন কমিশনের সচিব, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোর অংশ হিসেবে একটি ‘ইলেক্ট্রোরাল সার্ভিস কমিশন’ গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। রিটে আরো অনুরোধ করা হয়েছে, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন যেন স্থগিত রাখা হয়। আবেদনটি করেছেন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব অ্যাডভোকেট ইয়ারুল ইসলাম। বিবাদি করা হয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। রিট আবেদনে বলা হয়েছে, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, আর নির্বাহী বিভাগ কেবল সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করবে। আবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, অতীতে নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগকে দেয়ার ফলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এখন তাদের দ্বারা স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আবেদনকারী পক্ষ। তাদের মতে, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জনবল থেকে সচিব, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগই হতে পারে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার অন্যতম উপায়। রিটকারী বলেন, সরকারের কার্যক্রম ও মতবিনিময় প্রক্রিয়ায় জেলা প্রশাসকদের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এটি হলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরো বলেন, জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে এবং কমিশনের সচিবকে সরিয়ে নতুন নিয়োগ দিতে হবে- অন্যথায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন।
কিছু উপাদান, ম্যারিট ও যুক্তি দিয়েই রিট করা হয়। তা গ্রাহ্য হওয়া বা নাকচ করা পরের বিষয়। রিট করে আলোচনায় আসা বা ভাইরাল হওয়ার হালকা ঘটনার সাথে বাঙালি বেশ পরিচিত। কিন্তু রাষ্ট্র, সরকার বা শক্তিমান কেউ চাইলে ঠুনকা-মামুলি বিষয়ও বড় বিষয় হয়ে যাওয়ার ঘটনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে রিটটি বেশ আলোচিত। নির্বাচনে গণ্ডগোল বাধাতে পেছন থেকে কারো মদদে এটি হয়েছে কি না; এ প্রশ্ন ও সন্দেহ বেশ প্রবল। যেখানে সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার কথা সামনের কয়েক দিনের মধ্যেই। ভোটের যাবতীয় প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। নির্বাচন কমিশনের দম ফেলার অবস্থা নেই। অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে আছে রাজনৈতিক দলগুলো। এ অবস্থায়ই কিনা এমন একটি রিট। এরপরও নমুনা বলছে, এ সপ্তাহেই এর একটি ফয়সালা আসবে।
এর মাত্র দু’দিন আগে কিন্তু একটি ঐতিহাসিক আইনি ফয়সালাও এসেছে, যা নিয়ে বছরের পর বছর কেবল কথাই হয়েছে। তা এখন বাস্তব হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ জারির মাধ্যমে। এর আগে গত ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ অধ্যাদেশের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়, যা পৃথক বিচারবিভাগীয় সচিবালয় গঠনের দীর্ঘ দিনের দাবিকে বাস্তবে রূপ দেয়ার পথ সুগম করে। উল্লেখ্য, বিচার বিভাগের কাঠামোগত স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতাকে আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে গত বছরের ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট পৃথক বিচারবিভাগীয় সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। প্রস্তাবে সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের আলোকে হাইকোর্ট বিভাগের অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর তত্ত¡াবধান ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে পালনের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। সাথে অধ্যাদেশের খসড়া, নতুন সচিবালয়ের অর্গানোগ্রাম এবং রুলস অব বিজনেস ও অ্যালোকেশন অব বিজনেস সংশোধনের সম্ভাব্য রূপরেখা পাঠানো হয়।
তারপরও সন্দেহ-অবিশ্বাস প্রথাগতভাবে আমাদের মজ্জাগত। প্রশ্ন করতে কোনো বাধা নেই, বিচার বিভাগ কি আসলে স্বাধীন হলো এ অধ্যাদেশে? সুপ্রিম কোর্টের জন্য আলাদা সচিবালয়ের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার গেজেট প্রকাশ করলেও পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এটি অনুমোদন না করলে কী হবে? বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে যে আশা তৈরি হয়েছে তা মুখ থুবড়ে পড়বে না? প্রশ্ন অবান্তর নয়। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করার দাবিতে ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন ও তার সহকর্মীরা মামলা করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দেন। সেই রায়ের ২৬ বছর পর বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় স্থাপন করা হলো। আশাবাদীরা বলছেন, এখন আর প্রশাসন বা সরকার বিচারকদের চাপ দিয়ে বিচার প্রভাবিত করতে পারবে না। জামিন দিতে বাধ্য করা, রায় পাল্টে দিতে বাধ্য করা, বিচার প্রভাবিত করা- এগুলো আর সম্ভব হবে না। কারণ সরকারের হাতে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, শাস্তি- এগুলো এখন আর কিছুই নেই। পুরোটাই দেখবে সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয়, প্রধান বিচারপতি।
এ আশা শেষতক কতটা বাস্তব হবে, তা দেখতে নির্বাচিত সরকার ও সংসদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। কারণ এখনো একটি বিষয় বাকি আছে। জুডিশিয়াল সার্ভিসে থাকলেও যারা আইন মন্ত্রণালয়, শ্রম আদালত বা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে কাজ করছেন, তাদের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে তা এখনো অস্পষ্ট। তাদেরকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের অধীনে আনা ছাড়া বাস্তব দৃশ্যমান হবে না। জারিকৃত গেজেটে বলা হয়েছে, শুধু বিচারকাজে নিয়োজিত যারা আছেন, সেই বিচারকদের বিষয়গুলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের হাতে চলে গেছে। কিন্তু বিচার বিভাগের যারা অন্য কোনো জায়গায় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন, যেমন- নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, আইন কমিশনের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবে, তাদের নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা ইত্যাদি বিষয়গুলো আইন মন্ত্রণালয়ের হাতেই রয়ে গেছে। এখন বিচারপতি ও বিচারকদের জবাবদিহিতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে। আর প্রধান বিচারপতির জবাবদিহিতা রাষ্ট্রপতির কাছে। এতে স্বেচ্ছাচারী হওয়ার আশঙ্কা চলে গেছে?
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একটি সম্পূর্ণ পৃথক সচিবালয় এখন থেকে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। এ সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে প্রধান বিচারপতির হাতে। এ অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও নিয়োগর সবকিছুই পরিচালিত হবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের মাধ্যমে। আগে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা সব আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল। এখন সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয়ের হাতে চলে এলো। এতে বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পথ খুলে গেল। কিন্তু মানুষ তো রাগ, অনুরাগ, বিরাগ বা আবেগের ঊর্ধ্বে নয়। সেটি দেখার জন্য এখন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে। তারা কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে দেখবে। আর প্রধান বিচারপতির বাপারে রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ করা যাবে। রাষ্ট্রপতি সেটিকে তদন্তযোগ্য মনে করলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠাবেন। তবে সেই কাউন্সিলে প্রধান বিচারপতি থাকবেন না, যেহেতু তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ। তারপরও বাংলাদেশের বিচার বিভাগ স্বাধীন করার এ পদক্ষেপ প্রশাসনিক সংস্কারের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। সম্ভাবনা দেখিয়েছে। নির্বাহী ও বিচার বিভাগের সীমারেখা স্পষ্টভাবে কার্যকর হলে জনগণ প্রকৃত আইনের শাসন অনুভব করবে।
এখন প্রধান বিচারপতি স্বাধীনভাবে সব করে ফেলবেন বা তা পারবেন? প্রধান বিচারপতির নিয়োগ কিন্তু রাষ্ট্রপতির হাতেই আছে। রাষ্ট্রপতি এ ক্ষেত্রে কাজ করেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। তাহলে প্রধান বিচারপতির নিয়োগ কিভাবে রাজনীতিমুক্ত হবে? আইন সংস্কার কমিশনে এ নিয়ে কিছু কথাবার্তা হয়েছে। তাই আশা করতে বাধা নেই যে, এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ। সেই বিবেচনায় প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে পুরোপুরি স্বাধীন করতে হলে অনেকগুলো প্রশাসনিক রদবদল করতে হবে। এটি সময়সাপেক্ষ।
দেখতে হবে অধস্তন আদালত থেকে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, শৃঙ্খলা, বেতনভাতা- এগুলো তারা এখন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারে কি না। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এখন তাদের এটি প্রমাণ করতে হবে। স্বাধীন করে দেয়ার পরও বিচার বিভাগ মানসিকভাবে স্বাধীন না হলে বাইরের শাসন-হুকুম সেখানে ভর না করে পারে না। এসব সন্দেহ-শঙ্কার মধ্যেও আইন ও বিচারাঙ্গনের বিশেষ অংশীজন আইনজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে একটি ফুরফুরে মন-মেজাজ কাজ করছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক সোনালি সংযোজন ও মাইলফলক হিসেবে দেখছেন তারা। আশা করছেন, এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের ক্ষমতায়ন করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশের ফলে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটার আশাও তাদের। বাকিটা অপেক্ষার বিষয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট



