বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের অবদান গভীর অথচ স্মরণে তাদের নাম খুব কম উচ্চারিত হয়। কবি আব্দুস সাত্তার তাদেরই একজন। তার মৃত্যুদিবসও নিয়মিতভাবে পালিত হয় না– এ যেন আমাদের সাংস্কৃতিক বিস্মৃতির প্রতীক। ২০০০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বা ১ মার্চের তারিখ-জটিলতায় তার প্রয়াণদিন নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও বাস্তবতা হলো– প্রাপ্য সম্মানটুকু তিনি কখনো পাননি। অথচ আরবি কবিতার বাংলা অনুবাদের ইতিহাস লিখতে গেলে তার নাম প্রথম সারিতে উঠে আসে।
১৯২৭ সালের ২০ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার গোলরা গ্রামে তার জন্ম। বাবা মরহুম মৌলভী আবদুস সোবহান ও মা মরহুমা সাবির উন-নেসা। শৈশব থেকে বই, ভাষা ও শব্দের সাথে তার অদ্ভুত সখ্য। কৈশোরে লেখালেখির সূচনা– ১৯৪৩ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকার ‘মুকুলের মহফিল’-এ তার প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৪৬ সালে ‘মাসিক মোহাম্মদী’তে ছাপা হয় প্রথম কবিতা। সেই শুরু– তারপর আর থামেননি। নিজের সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাকে কিছু না কিছু লিখতেই হবে। লেখা আমার অস্থিমজ্জার সাথে জড়িত। আমিই লেখা’। এই স্বীকারোক্তি তার জীবনদর্শনের সারাংশ।
আব্দুস সাত্তারের টাঙ্গাইলের মানুষ। তার অনেক সিনিয়র রিয়াজ উদ্দিন আল মাসাদি, সিনিয়র প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, ১৮৯৪ সমসাময়িক ড. আশরাফ সিদ্দিকী, জুনিয়র কবি রফিক আজাদ, আবু কায়সার ও জাহাঙ্গীর ফিরোজও টাঙ্গাইলের লোক। টাঙ্গাইলে বহু কবি-সাহিত্যিক জন্ম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আবদুস সাত্তারকে স্মরণ করা হয় না। অথচ আরবি কবিতা অনুবাদকের নাম বলতে আব্দুস সাত্তারের নাম প্রথমে আসে। আমার দুলাভাই এক সময় মাসিক মাহেনও পত্রিকা বাসায় এনেছিলেন। এই মাসিক মাহেনও-তে কবি আবদুস সাত্তারের ছবি দেখি যখন তিনি পুরস্কার পেয়েছিলেন ‘আরণ্য জনপদে’ বইটির জন্য।
১৯৬৬ সালে প্রকাশিত তার গবেষণাগ্রন্থ ‘আরণ্য জনপদে’ বাংলা সাহিত্যে এক মাইলফলক। পার্বত্য চট্টগ্রামে জনশিক্ষা জরিপের কাজে গিয়ে তিনি সেখানকার ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাপন নিয়ে সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশের উপজাতি ও ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের জীবন নিয়ে এমন পূর্ণাঙ্গ গবেষণা আগে খুব কম হয়েছে। বইটির ইংরেজি সংস্করণ বিদেশেও সমাদৃত হয়; অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের গবেষক জন এম ডানহাম চিঠিতে তার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু এই স্বীকৃতির পেছনে ছিল ব্যক্তিগত ত্যাগের গল্প–নিজের অলঙ্কার বিক্রি করে, বন্ধুদের সহায়তায় বইটি প্রকাশ করেছিলেন। বইটি তাকে অনেক প্রচার ও পরিচিতি দিয়েছিল। তিনি ‘আরণ্য জনপদের’ লেখক হিসেবে পরিচিত। তার এ পুস্তকে তিনি পাহাড়ি জনপদের অধিবাসীদের উপর গবেষণা করেছিলেন।
আবদুস সাত্তার শুধু কবি নন–প্রাবন্ধিক, গবেষক, ভাষাবিদ, অনুবাদক, স্মৃতিকথক, সম্পাদক ও শিশুসাহিত্যিকÑ একজন বহুমাত্রিক সাহিত্যমানুষ। তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা শতস্পর্শী। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বৃষ্টিমুখর’ তাকে পাঠকমহলে পরিচিত করে তোলে। পরবর্তীতে একের পর এক কাব্যগ্রন্থ, প্রবন্ধ, অনুবাদ ও গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। অনুবাদক হিসেবেও তার কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। লেবাননি-আমেরিকান কবি খলিল জিবরানের বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য প্রোফেটসহ বহু আরবি কবিতার অনুবাদ তিনি বাংলায় তুলে আনেন। স্কুলজীবনে লাইব্রেরিতে নিয়মিত আসা সওগাত পত্রিকায় তার অনুবাদ পড়ে আমরা আরবি সাহিত্যের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। ভাষান্তরে তিনি কেবল শব্দ বদলাতেন না, কবিতার আত্মাকেও বাংলায় বাঁচিয়ে তুলতেন।
আবদুস সাত্তার মাসিক ‘মাহেনও’ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন, এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন আবদুল কাদির। সেখানে তার ‘শীতে সাহেজ ভ্যালী’ কবিতা পাঠকমনে রেখাপাত করেছিল। কবি মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ, কবি তালিম হোসেন ‘মাহেনও’-এর সহকারী সম্পাদক ছিলেন। পরে এর সম্পাদক হন কবি তালিম হোসেন। ড. আশরাফ সিদ্দিকী কবি আবদুস সাত্তারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার পরিচয় দিতেন না। ড. আশরাফ সিদ্দিকী ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর আপন ফুফাত ভাই।
আমি যখন দৈনিক সংগ্রামে চাকরি করতাম ১৯৮৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে তদানীন্তন চিফ রিপোর্টার সালাহউদ্দিন বাবর ভাই আমাকে আবদুস সাত্তারের সাক্ষাৎকার নিতে পাঠালেন। উনার বাসা ছিল শুক্রাবাদ। তার ছেলে নাজমুস সাকিব বিয়ে করেছিলেন উজবেকিস্তানের মেয়ে। ছেলে সেখানে পড়তেন। ছেলের শ্বশুর থাকতেন ইউক্রেনে। সাপ্তাহিক ‘বিক্রম’ পত্রিকার মাধ্যমে কবি আবদুস সাত্তারের সাথে পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়। এখানে লেখা নিয়ে যেতাম শুক্রবারে। লেখা পৌঁছাতাম মাসুদ মজুমদার ভাই বা সুলতান আহম্মদ ভাইয়ের কাছে। উনারা না থাকলে অন্যদের কাছে। সেখানে কবি আবদুস সাত্তারের দেখা পেতাম। তিনি স্মৃতি কথা লিখতেন। উনার স্মরণ শক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। অথচ তাকে স্মরণ করা হয় না। তিনি বলতেন প্রতিদিন রাতে কিছু না লিখলে ভালো লাগে না। তখন তিনি সোবহানবাগ সরকারি কলোনিতে থাকতেন। রাতে কিছু লিখে তিনি হাঁটতে যেতেন। অধ্যাপক আবু তালিব এবং ড. আশরাফ সিদ্দিকী ছিলেন তার প্রিয় লেখক।
পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন স্নেহশীল মানুষ। স্ত্রী বেগম ফাতেমা জোহরা, তিন পুত্র ও দুই কন্যার জনক তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তেও তার কলম থামেনি। সামান্য অভাব-অভিযোগ নিয়েও কবিতা লিখেছেন। কবি আবদুস সাত্তার এতজনকে স্মরণ করেছেন কিন্তু তাকে কেউ স্মরণ করছেন না। তার সময়ের প্রায় সব পত্রপত্রিকাতে তিনি লিখতেন। তিনি যেসব পত্রিকাতে বেশি লিখতেন সেসব পত্রিকাও তাকে স্মরণ করে না। তিনি বহু ব্যক্তিকে নিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন। তার মতো লেখককে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। ২০০০ সালে উনার মৃত্যু হয়। তিনি মৃত্যুর আগে তার স্ত্রীর গাড়ির অভাবের আফসোসের উপর কবিতা লিখেছিলেন। তার গাড়ির অভাব ছিল, কিন্তু লেখার অভাব ছিল না। প্রায় প্রত্যেক রাতে তিনি লেখা নিয়ে পত্রিকা অফিসে হাজির হতেন।
বাংলা সাহিত্য পরিষদ অফিসে যেতাম; সেখানে তনার সাথে প্রায় কথা হতো। তিনি প্রাণ খুলে হাসতেন আর কবিতা লিখতেন। সিনিয়র জুনিয়র তার কাছে পার্থক্য ছিল না। সবার সাথে মিশতেন, প্রাণ খুলে কথা বলতেন। এমন দিলখোলা মানুষ খুব কম দেখা যায়। বাংলা সাহিত্যের এই নিভৃতচারী সাধককে তাই বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। তার রচনা পুনর্মুদ্রণ, পাঠচক্র, গবেষণা ও স্মরণসভা– এসবের মাধ্যমে তার যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব। কারণ আব্দুস সাত্তার শুধু একজন কবি নন; তিনি আমাদের ভাষা-সংস্কৃতির নীরব প্রহরী, এক অনামা আলোকবর্তিকা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



