১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংস্কার ঘিরে বিরোধ ও বিতর্ক ক্রমে তীব্র হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এক দিকে জুলাই সনদকে এবং অন্য দিকে সেই সনদের পেছনের গণ-অভ্যুত্থানকেও দুর্বল করার উপায় খুঁজছে। সর্বশেষ ঘটনাটি হলো সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী– চৌধুরী মো: রেদওয়ান-ই-খুদা এবং গাজী মো: মাহবুব আলম হাইকোর্টে দু’টি রিট পিটিশন দায়ের করে এ পুরো প্রক্রিয়াকে (জুলাই সনদ) চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। রিটগুলোর বক্তব্য মূলত বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার সেই অবস্থানের প্রতিফলন, যেখানে তারা জুলাই সনদের বৈধতা এবং তা অনুমোদনকারী গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তা ছাড়া যারা এ পিটিশন দাখিল করেছেন এবং যারা এর পক্ষে লড়ছেন– তাদের পরিচয় বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এসব মামলা মূলত বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের একটি কৌশল। আজকের নিবন্ধে এই রিট আবেদনগুলোর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করব এবং জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর এগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা করব।
জুলাই সনদ ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৫ সালের জুলাই মাসে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের আগে পর্যন্ত বিএনপি, তাদের সমর্থক বা সংশ্লিষ্ট কোনো আইনজীবী এ সনদের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আইনি প্রশ্ন উত্থাপন করেননি। অন্য দিকে ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয় ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর এবং নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে বিএনপি এর বিরুদ্ধেও কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। একই পরিস্থিতি দেখা যায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর ক্ষেত্রেও। জাতীয় নির্বাচনের বেশ আগে এ আদেশ জারি করা হলেও নির্বাচন পর্যন্ত এটিকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি; বরং পুরো সময়জুড়ে বিএনপি ভোটারদের কাছে এমন ধারণা সৃষ্টি করেছিল যে, তারা জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারের প্রতি সমর্থনশীল। এমনকি দলের নেতা তারেক রহমান যেখানে প্রকাশ্যে জুলাই সনদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটে সমর্থনের ডাক দিয়েছিলেন, সেখানে নির্বাচনোত্তর প্রেক্ষাপটে বিএনপির অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন তারা পরিকল্পিতভাবে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ উভয়কে আইনি কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন, যা তাদের আগের অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক। এতে স্পষ্টত প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে যে অবস্থান তুলে ধরা হয়েছিল, তা কি বিভ্রান্তিকর ছিল না? সমালোচকদের মতে, ক্ষমতায় আসতে না আসতে জুলাই সনদের সংস্কারগুলো পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই এখন তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে।
রিট পিটিশনগুলোর মূল বক্তব্য হলো– অন্তর্বর্তী সরকার গণভোট এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের মতো প্রক্রিয়া ব্যবহার করে সংসদে একটি ‘উচ্চকক্ষ’ গঠনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা মূলত সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের এক প্রচেষ্টা। রিট পিটিশনগুলোতে দাবি করা হয়েছে যে, সংবিধানের ১৪২ নং অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী কেবল সংসদ দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানে এ জাতীয় সংশোধনী আনার এখতিয়ার রাখে। এখানে একটি সূক্ষ্ম আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা বিএনপি ও তাদের অনুসারীরা এড়িয়ে যাচ্ছেন, সেটি হলো সংবিধানের ১৪২নং অনুচ্ছেদের অধীন সংসদ সব ধরনের সংশোধনীর অধিকার রাখে না। এমন কিছু মৌলিক বিষয় আছে, যা এ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে কখনো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো নীতির মূল কথা হলো– সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেয়া হলেও, সেই ক্ষমতার নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। ১৪২নং অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে সংসদ এমন কোনো পরিবর্তন করতে পারে না, যা সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নস্যাৎ করে। অনেকে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছেন যে, বাংলাদেশের সংবিধানে এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদব্যবস্থা নিজে একটি মৌলিক কাঠামোর অংশ। সে ক্ষেত্রে সংসদের মাধ্যমে ১৪২নং অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা করার যুক্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ মৌলিক কাঠামোর ওপর আঘাত হানে এমন সংশোধন সংসদ নিজে করতে পারে না। এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকার একটি বিকল্প পদ্ধতির কথা ভেবেছিল। সেই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে মৌলিক কাঠামো সম্পর্কিত পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছিল। এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণয়ন করে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল মৌলিক কাঠামোর মতো সংবেদনশীল বিষয়েও জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে সাংবিধানিক পরিবর্তন আনা। কিন্তু এখন বিএনপি এবং তাদের আইনজীবীরা এ প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করছেন। এতে একটি প্রশ্ন সামনে আসে, তারা কি সত্যি সংস্কারের ব্যাপারে আন্তরিক? কারণ বিএনপি যদি সংসদের মাধ্যমে সংস্কার এগিয়ে নিতে চায়, তাহলে এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে জুলাই সনদের বাস্তবায়িত সংস্কারগুলো ভবিষ্যতে সুপ্রিম কোর্টেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ফলে পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াটি আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
বিএনপি এবং রিট আবেদনকারী তাদের সমর্থকরা আরো একটি মৌলিক বিষয় অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তাহলো– ‘জুলাই সনদ’ কেবল একটি আইনি নথি নয়, বরং এটি জুলাইবিপ্লব-পরবর্তী একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত; যা এ দেশের আপামর জনতা সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করেছেন। তাই এ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সরাসরি বিদ্যমান সংবিধানের মানদণ্ডে বিচার করা সবসময় যথাযথ নয়। জুলাইবিপ্লব তখনই সঙ্ঘটিত হয়েছিল, যখন এদেশের মানুষ বুঝতে পেরেছিলেন যে বিদ্যমান সংবিধান তাদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এ গণ-অসন্তোষ থেকে মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। সেই সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে এমন একটি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, যা বিরোধীদের হত্যা ও গুম করার মতো ভয়াবহ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিল। এ প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়; যাতে ক্ষমতা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত না হয়। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হিসেবে সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে সংসদের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের। এর উদ্দেশ্য হলো নিম্নকক্ষের ওপর একটি সাংবিধানিক ভারসাম্য তৈরি করা, বিশেষত যখন নিম্নকক্ষে প্রধানমন্ত্রী অবস্থান করেন। এ ছাড়া নিজের দলের মনোনীত স্পিকারের মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রমের ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য আমাদের অতি সাম্প্রতিক সময়ের শিক্ষাগুলো মনে রাখাটা অত্যন্ত জরুরি হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে করা ত্রয়োদশ সংশোধনীটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন প্রধান দলগুলোর রাজনৈতিক ঐকমত্যের একটি সাংবিধানিক রূপ। ত্রয়োদশ সংশোধনীর আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের আর কোনো আস্থা ছিল না। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি ব্যাপক জনমত তৈরি হয়েছিল যে, দলীয় সরকারের অধীনে আয়োজিত নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেট প্রতিফলিত হওয়া অসম্ভব; ফলে নাগরিকদের অধিকার সেখানে চরমভাবে উপেক্ষিত থাকে। এ বাস্তবতা থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়, যেখানে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অস্থায়ীভাবে প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি ত্রুটিমুক্ত ছিল না ঠিকই, তবে এটি জনগণের ব্যাপক আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। কালক্রমে একে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় এবং যুক্তি দেয়া হয় যে, এটি সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ ‘গণতন্ত্র’কে ক্ষুণ্ন করছে। এক বিতর্কিত রায়ে, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে ব্যবস্থাটি রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ফসল এবং যা জনগণের বিশাল অংশের আস্থা অর্জন করেছিল, তাকে আইনি মারপ্যাঁচে নস্যাৎ করে দেয়া হলো। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের পর্যবেক্ষণ ছিল– যেহেতু ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার কোনো সমঝোতা বা ঐকমত্য একে টিকিয়ে রাখতে যথেষ্ট নয়। ফলস্বরূপ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল হয়ে যায়। এ সিদ্ধান্তের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। কেয়ারটেকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের পথ খুলে যায়। এর ফলে ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী এবং ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী শাসনের সুযোগ তৈরি হয়, যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে সক্ষম হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপ মূলত সেই রাজনৈতিক সঙ্কটের বীজ বপন করেছিল, যা কালক্রমে জুলাই বিপ্লবে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই সরকারের পতন ঘটায়।
আজ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের সেই রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণিত ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে সর্বমহলে বিবেচিত। যে প্রধান বিচারপতি মূল রায়টি লিখেছিলেন, তিনি পরবর্তীতে দেশের বিচারিক ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিত্বদের একজন হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন তিনি। সেই রায় ঘিরে যে তীব্র ক্ষোভ আজো বিদ্যমান, তার মূলে রয়েছে এ উপলব্ধি যে, তৎকালীন আদালত তথাকথিত ‘সংবিধান রক্ষার’ দোহাই দিয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং জনগণের সামগ্রিক ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের সেই অধ্যায়টি আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে একটি ‘সতর্কতামূলক দৃষ্টান্ত’ হয়ে আছে, যা বারবার মনে করিয়ে দেয়, জনআকাক্সক্ষা উপেক্ষা করার ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ইতিহাস আমাদের বারবার সতর্ক করেছে, বিপুল জনসমর্থনপুষ্ট কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা যদি আইনি মারপ্যাঁচে নস্যাৎ করা হয়, তবে রাষ্ট্রকে তার জন্য চড়া মাশুল দিতে হয়। তাই বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের উচিত হবে ইতিহাসের সেই শিক্ষাগুলো নিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা; ত্রয়োদশ সংশোধনীকে ঘিরে যে ঐতিহাসিক ভুলের সূচনা হয়েছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার পুনরাবৃত্তি হবে আত্মঘাতী।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি


