অ্যাডভোকেট শফিকুল হক
আমিরে জামায়াত ডা: শফিকুর রহমানের সুসংগঠিত, দূরদর্শী ও গতিশীল নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী ও তার কৌশলগতভাবে প্রগতিশীল জোট বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। ভোটাররা আগ্রহভরে দেখছে তারা আগামী সরকারের নেতৃত্বে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। একসময় নিষিদ্ধ এবং সীমিত ক্ষমতার এই দল এখন দেশের নির্বাচনী মঞ্চে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত, যা রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘ সময় ধরে একচেটিয়াভাবে একটি দলের আধিপত্যে ছিল। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনে বিরোধী দলের কার্যক্রম সীমিত ছিল। কখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ বর্জন করা হতো, কখনো শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের কারণে মাঠে উপস্থিতি খুব কম থাকত। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এবার দেশবাসী সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে এবং রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি নির্বাচনের প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাদেরই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট কৌশলগত অংশীদার এবং প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এককভাবে যদি সরকার গঠন করতে নাও পারে, তবু তাদের ভোট এবং নীতি প্রভাব দেশের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গত ১৫ বছরের বিরোধহীন শাসনের পর, এই নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের নয়, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্র নির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জেনারেশন জেড ভোটাররা এবার সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছেন। মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই প্রজন্মের। তারা রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, এবার তা ভোটের মাধ্যমে বাস্তব নির্বাচনী শক্তিতে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট এই প্রজন্মের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
জামায়াতের সুসংগঠিত দলীয় কাঠামো, নতুন জোটের সমর্থন এবং কৌশল তাদেরকে ভোট ও নীতি প্রভাবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে জোটের তরুণ নেতৃত্বাধীন দলগুলো তাদের জনসমর্থনকে ভোটে রূপান্তর করতে একযোগে কাজ করছে।
অর্থনীতির দিক থেকে নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে তৈরী পোশাক খাত ও অন্যান্য শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ। শিল্প খাতের অস্থিরতা দেশীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা আছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিনিয়োগ, রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব আশা করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক কূটনীতিতেও নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। শেখ হাসিনাকে ভারতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হলেও তার ক্ষমতাচ্যুতির পর ভারতের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য পাল্টেছে। তা ছাড়া বেইজিংয়ের প্রভাব বাড়ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে সরকারের নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের নতুন প্রভাব দেখা যাবে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করছে, যাতে দেশের স্বার্থ ও আঞ্চলিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় থাকে।
ভোটারদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব। জরিপে দেখা গেছে, ভোটাররা মূলত এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন। জামায়াতের সুসংগঠিত ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এই প্রত্যাশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাদের জনমুখী প্রচারণা, পরিষ্কার রাজনৈতিক নীতি ও স্বচ্ছতা ভোটারদের কাছে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দেশে প্রথমবার ভোট দিতে আসা যুবকরা আশা করছেন, নির্বাচিত সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভোটাধিকারের সুযোগ নিশ্চিত করবে।
দেশব্যাপী প্রচারণার অভিনবত্ব এবার চোখে পড়ার মতো। সড়ক, গাছ ও দেয়ালে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক ও জোটের অন্যান্য দলের পোস্টার ঝুলছে। রাজনৈতিক নেতারা সরাসরি জনসভা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভোটারদের সাথে সংযোগ স্থাপন করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও রাজনৈতিক আলোচনার ঘনত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও দুর্নীতিবিষয়ক সমস্যা নিয়ে ভোটারদের সচেতনতা বাড়ছে। তারা এখন শুধু প্রতীক বা ধর্মীয় অবস্থানের উপর নয়, দায়িত্বশীল ও দক্ষ নেতৃত্বের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে প্রভাব ফেলবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিনিয়োগ, রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে এই নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট শুধু ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়, জনমত ও নির্বাচনী সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবশালী অংশীদার হবে। জামায়াতের দূরদর্শী ও জনমুখী নেতৃত্ব দলটিকে ভোট এবং নীতি প্রভাবের ক্ষেত্রে শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ প্রেক্ষাপটে তাদের জন্য সরকার গঠনের সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত হতেই পারে। কারণ ভোটাররা আগ্রহভরে দেখতে চাচ্ছে— এরা নেতৃত্ব দিতে কতটা সক্ষম।
লেখক : সাবেক মেয়র, টাওয়ার হ্যামলেটস, লন্ডন, যুক্তরাজ্য



