সংগ্রামী নেত্রী : ঠিকানা বাংলাদেশ

আপনি বাংলাদেশে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। আপনার একমাত্র ঠিকানা এটাই। আপনি শান্তিতে থাকুন। গুডবাই ম্যাডাম খালেদা জিয়া।

শফিক রেহমান

ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে বলা হয় আপসহীন নেত্রী। কিন্তু আমার বিবেচনায় তিনি আপসহীন তো ছিলেন বটেই। তবে তার চারিত্রিক গুণাবলি সংক্ষিপ্তভাবে বলার জন্য তাকে সাহসী ও সংগ্রামী নেত্রী বলা আরো উপযুক্ত ও সঙ্গত। ভেবে দেখুন, তিনি মৃত্যুর সঙ্গেই আপস করতে চাননি।

আমরা সবাই জানি, আমাদের সবার মৃত্যুই অবধারিত। কিন্তু ফেব্রুয়ারি ২০১৮-তে তাকে কারাবন্দী করার পর তিনি অসুস্থতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। জীবন যুদ্ধে তিনি পরাজিত হননি। বিদেশী চাপে তাকে এক সময় জেল থেকে তার ভাড়াটে বাড়িতে গৃহবন্দী করে রাখা হয় ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত। অর্থাৎ- প্রায় সোয়া ছয় বছর। এই বন্দী অবস্থায় অসুস্থতা গুরুতর হয়ে পড়লেও তাকে বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি।

ধরে নেয়া যায়, তাকে বন্দী করে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছিল। এর মধ্যে পদ্মা সেতু উদ্বোধনকালে তাকে এনে ‘টুস’ করে পদ্মায় ফেলে দেয়ার, অর্থাৎ- প্রকাশ্যেই হত্যার উসকানি দেয়া হয়েছিল। অপর্যাপ্ত চিকিৎসা ও হত্যার উসকানির চেয়েও মর্মান্তিক যন্ত্রণা দেয়া হয়েছিল ম্যাডামকে তার প্রিয় স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার কোনো সুযোগ না দিয়ে। দীর্ঘ বন্দিজীবনে ম্যাডাম তার সন্তান তারেক রহমান, পুত্রবধূ জুবাইদা এবং সিথি ও তিন নাতনীর সাথে দেখা করতে পারেননি। তার এই পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা যে কত নিষ্ঠুর ও অমানবিক, সেটি সবাই বুঝবেন। তবুও তখন ম্যাডাম খালেদা জিয়া অবিচল থেকেছেন।

৫ আগস্ট ২০২৪-এ তিনি যখন বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পান তখন তিনি নিশ্চয়ই ব্যাকুল ছিলেন ওই পরিজন লন্ডন প্রবাসী সন্তান, দুই পুত্রবধূ এবং নাতনীদের সাথে দেখা করতে। অবশেষে লন্ডন ক্লিনিকের চিকিৎসা নেয়ার জন্য তিনি লন্ডনে যান। পারিবারিক পুনর্মিলন হয়।

কিন্তু ম্যাডাম তো বারবারই বলেছেন, ‘বাংলাদেশই তার একমাত্র ঠিকানা’। তাই তিনি লন্ডনের উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার আগ্রহ ছেড়ে আবার ফিরে আসেন বাংলাদেশে। আবার মেনে নেন ঢাকার একাকী জীবন। ভেবে দেখুন, জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে এটি দেশপ্রেমের কত বড় সংগ্রামী সিদ্ধান্ত ছিল।

ম্যাডামের সংগ্রাম শুরু হয় অল্প বয়সেই। ১৯৭১-এ তার স্বামী জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। দুই শিশুসন্তান পিনো (তারেকের ডাকনাম) এবং কোকো (আরাফাতের ডাক নাম) এদের নিয়ে তাকে অনিশ্চিত অবস্থায় থাকতে হয়েছিল প্রায় ৯ মাস। স্বামী কি যুদ্ধে নিহত হবেন? আহত হবেন? পঙ্গু অথবা মৃত হয়ে ফিরবেন?

তার সৌভাগ্য ১৯৭১-এ তার স্বামী ফিরে এসেছিলেন এবং পরবর্তীতে দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। কিন্তু ৩০ মে ১৯৮১-তে জিয়ার অকাল মৃত্যুর পর খালেদাকে অকাল বিধবা হতে হয়। সেই দুর্ভাগ্য মেনে নিয়ে তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে তার প্রয়াত স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতেই থাকতেন।

এরপর নেতৃত্ববিহীন তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সংক্ষেপে বিএনপির হাল ধরার জন্য দলীয় চাপে তিনি পার্টির চেয়ারপারসন হন। একজন অন্তর্মুখী গৃহবধূ থেকে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিতে তিনি রাজি হন। তার এই রূপান্তর হয়েছিল সফল। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তার বিশাল সততা, প্রখর প্রজ্ঞা, দুর্লভ দূরদর্শিতা এবং বিস্তীর্ণ মানবিকতার পরিচয় দিয়ে বিএনপিকে আরো শক্তিশালী দলে পরিণত করেন।

প্রেসিডেন্ট এরশাদের শাসনামলে বিএনপি প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। ওই সময় আওয়ামী লীগ ও অন্য রাজনৈতিক শক্তি একপর্যায়ে এরশাদ সরকারকে সহযোগিতা করে। কিন্তু খালেদা জিয়ার অটল অবস্থান তাদের জন্য সুফল নিয়ে আসে ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে এরশাদ সরকারের পতনের পর। প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনের অন্তর্বর্তী সময়ের ১৯৯১-এর ইলেকশনে বিএনপি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়।

খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। অনেকেই এখন স্বীকার করেন, ১৯৯১-১৯৯৬-এর খালেদা জিয়ার সরকারের আমলই ছিল শ্রেষ্ঠ সময়। সেই সরকারের আমলে দুর্নীতি ছিল ন্যূনতম এবং বাকস্বাধীনতা ছিল সর্বোচ্চ। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম ছিল সাধারণ মানুষের কেনার ক্ষমতার মধ্যে।

এ সময় ম্যাডাম খালেদা জিয়া বাংলাদেশকে তার শ্রেষ্ঠ উপহারটি দেন। সেটি হলো- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রতি পাঁচ বছর একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ ইলেকশন। পরপর দু’টি ইলেকশন হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে এখানে খালেদা জিয়ার একটি পার্থক্য আছে। প্রেসিডেন্ট জিয়া ক্ষমতায় থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন। কিন্তু ম্যাডাম অতি অল্প সময়ের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাস করিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দেন এবং সবার সঙ্গে একই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে থেকে ইলেকশনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। ১৯৯৬ ওই ইলেকশনে আওয়ামী লীগ জোটবদ্ধ হয় জামায়াতের সঙ্গে। এর ফলে তারা বিজয়ী হলেও বিএনপি ১১৬টি আসন পেয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বিরোধী রাজনৈতিক দল হয়। ‘স্থ’ূল কারচুপি, সূ² কারচুপি’-এসব ফালতু অভিযোগ না তুলে খালেদা জিয়া পার্টিকে প্রস্তুত করেন ২০০১-এর পরবর্তী ইলেকশনে বিজয়ী হওয়ার জন্য। এ জন্য তিনি ও তার পার্টি কোনো সহিংসতা, অশালীনতা ও অনিয়মের আশ্রয় নেয়নি। তার ও তার পার্টির এই শান্তিপ্রিয় আচরণের সুফল তারা পায় অক্টোবর ২০০১-এর ইলেকশনে। আবার তারা নির্বাচিত হন।

কিন্তু সরকার গঠন করলেও এবার খালেদাকে ভিন্নধর্মী সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়। ২০০৪-এ ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকা যখন যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন তারা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সহায়তা চেয়েছিল। ম্যাডাম খালেদা জিয়া রাজি হবেন না ভেবে আমেরিকার জর্জ বুশ প্রশাসন তখন তাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়ালকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল। উভয়েই চেয়েছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যেন ইরাকে যায়। ম্যাডাম খালেদা জিয়া রাজি হননি। আর তখনই তার ক্ষমতাচ্যুতি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ম্যাডামকে আমি একদিন প্রশ্ন করেছিলাম, কেন আপনি আমেরিকান প্রস্তাবে রাজি হননি।

তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, অকাল বিধবাদের বেদনা আমি বুঝি। আমি চাই না আমার দেশের কোনো নারীকে যেন সেই বেদনা সহ্য করতে হয়।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে সামরিক ক্যু হয়, যার কৌশলে ম্যাডামের বিএনপিকে রাজনীতিতে দুর্বল এবং আওয়ামী লীগকে সবল করা হয় এবং ডিসেম্বর ২০০৮-এর ইলেকশনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়।

তাদের এই বিজয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনৈক আজ্ঞাবহ এক বিচারপতির রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তকরণ, এটি হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের পরামর্শেই। এভাবে চলতে থাকে প্রায় ১৫ বছরব্যাপী সুষ্ঠু ইলেকশনবিহীন আওয়ামী দুঃশাসন।

আজ এই মুহূর্তে দেশবাসীর আশা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবার ফিরে আসবে- ম্যাডাম খালেদা জিয়া দেশবাসীকে যে সবচেয়ে মূল্যবান উপহারটি দিয়েছেন, সেটি সযতেœ আবার লালিত হবে- এ কামনাই সবাই করছেন।

মনে রাখতে হবে, ম্যাডাম খালেদা জিয়ার সংগ্রামী জীবন ছিল সুদীর্ঘ। ১৯৮১-তে অকাল বিধবা, এরশাদ আমলে বহুবিধ নির্যাতন, জেনারেল মইন ইউ আহমেদের আমলে সাবজেলে জীবনযাপন, এরপর আওয়ামী দুঃশাসনের সময় কয়েক দশকের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে বলপূর্বক বিতাড়িত এবং ২০১৮-২৪ পর্যন্ত বন্দী অবস্থায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা- এসব বহু সংগ্রামে তিনি থেকেছেন অসাধারণ অটল। তিনি তার মূল্যবোধ ও আদর্শ থেকে কখনোই সরে যাননি এবং মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাননি। নিখাদ সততা ও সদা সংগ্রামী এটিই খালেদা জিয়ার প্রকৃত সৌন্দর্য।

আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ তাদের এক ঘোষণাপত্রে বলেছিল, লিবার্টি ইজ অলওয়েজ এন আনফিনিশড বিজনেস। অর্থাৎ- স্বাধীনতা সবসময়ই একটি অসমাপ্ত সংগ্রাম। বাংলাদেশও তাই।

২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। আমি বিশ্বাস করি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নিয়মিতভাবে সাধারণ ইলেকশন হলে মুক্তি আন্দোলন চলমান থাকবে এবং এক সময় সাধারণ মানুষ দারিদ্র্য ও বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাবে। সেটি বাস্তবায়ন করলেই হবে ম্যাডাম খালেদা জিয়ার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন।

আপনি বাংলাদেশে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। আপনার একমাত্র ঠিকানা এটাই। আপনি শান্তিতে থাকুন। গুডবাই ম্যাডাম খালেদা জিয়া।

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, মঙ্গলবার

ঢাকা