অমর একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি দিন নয়; এটি ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের প্রতীক। এ দিন ঘিরে যে সাংস্কৃতিক আয়োজনটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত, তা হলো বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলা। বহু দশকের পথচলায় এ বইমেলা এখন কেবল একটি বই কেনাবেচার বাজার নয়; বরং এটি বাংলাদেশীদের জ্ঞানচর্চা, সাহিত্যসৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক চেতনার বৃহত্তম মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হলেও সময়ের সাথে সাথে বইমেলার পরিসর এতটা বেড়েছে যে, এখন এর বড় অংশ অনুষ্ঠিত হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। গত কয়েক বছর ধরে এ বিস্তৃত আয়োজনে লাখো মানুষ প্রতিদিন বইমেলায় আসেন। কেউ বই কিনতে, কেউ প্রিয় লেখকের সাথে দেখা করতে, আবার কেউ শুধু বইমেলার পরিবেশ উপভোগ করতে। ফলে একুশের বইমেলা আজ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক উৎসব। এবারের বইমেলার উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, তার সরকার দেশকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশের সাহিত্য এক দিন বিশ্বসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এ বক্তব্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বই ও জ্ঞানচর্চা ছাড়া কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যেতে পারে না। তিনি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলেছেন, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মানুষের মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করে, যা স্মৃতিশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়ায় এবং আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিও কমায়।
প্রধানমন্ত্রী আরো উল্লেখ করেন, ১৯৭৮ সালে শুরু হওয়া অমর একুশে বইমেলা এখন জাতির মেধা ও মননের প্রতীক। বিশ্বের অনেক দেশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশের বইমেলার একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে– এটি মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের স্মৃতি বিজড়িত। ফলে বইমেলা এখানে কেবল সাহিত্যিক আয়োজন নয়; এটি ইতিহাস ও জাতীয় চেতনারও বহিঃপ্রকাশ।
বইমেলার বর্তমান চিত্রে দেখা যায়, সারি সারি স্টলে বই সাজানো থাকে। পাঠকদের ভিড়ও কম নয়। জনপ্রিয় লেখকদের বইয়ের চাহিদা সব সময় বেশি থাকে। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের বই এখনো বিপুল পাঠকপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিকদের মধ্যেও অনেকের বই পাওয়া যায়। তবে বইমেলার এই বাহ্যিক সাফল্যের আড়ালে প্রকাশকদের নানা ধরনের সঙ্কটও আছে। প্রথমত, স্টল বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ছোট ও মাঝারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দাবি করে, তারা মেলার ভালো জায়গায় স্টল পায় না। অন্য দিকে বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক স্থান পেয়ে যায়– এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। স্টল ভাড়া ও সাজসজ্জার ব্যয়ও গত কয়েক বছরে অনেক বেড়েছে। ফলে ছোট প্রকাশকদের জন্য মেলায় অংশ নেয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া প্রকাশনা শিল্পের বড় সঙ্কট হয়ে উঠেছে। কাগজ, মুদ্রণ, বাঁধাই ও পরিবহন খরচ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কাগজের দাম কয়েক দফা বেড়ে যাওয়ায় নতুন বই প্রকাশের খরচও অনেক বেড়েছে। এর ফলে অনেক প্রকাশক আগের মতো বিপুলসংখ্যক নতুন বই প্রকাশ করতে পারছেন না। আবার বইয়ের দাম বাড়ালে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
তৃতীয়ত, বই বিক্রি কমে যাওয়ার অভিযোগও আছে। বইমেলায় মানুষের উপস্থিতি ব্যাপক হলেও সবসময় সেই অনুপাতে বই বিক্রি বাড়ছে না বলে প্রকাশকদের একটি অংশ মনে করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বিনোদন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসারে পাঠাভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। অনেকে বইমেলায় ঘুরতে আসেন, ছবি তোলেন, পরিবেশ উপভোগ করেন, কিন্তু বই কেনার প্রবণতা তুলনামূলক কমে গেছে বলে প্রকাশকদের বক্তব্য।
আরেকটি সমস্যা হলো অনিয়ন্ত্রিত নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ। মেলায় অনেক নতুন প্রকাশনা সংস্থা অংশ নেয়, যাদের প্রকাশনার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। এর ফলে বাজারে নিম্নমানের বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে মানসম্মত প্রকাশকদের সাথে প্রতিযোগিতায় ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সময়ের ব্যবস্থাপনাও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কখনো কখনো অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে পাঠকদের জন্য বই দেখা বা কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে আরো কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন বলেও প্রকাশকরা মনে করেন।
এ পরিস্থিতিতে প্রকাশকদের সংগঠনগুলো কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের মতে, স্টল বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। ছোট প্রকাশকদের জন্য বিশেষ সহায়তা বা কম ভাড়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সাথে বইয়ের কাগজ ও মুদ্রণ শিল্পে সরকারি নীতিগত সহায়তাও প্রয়োজন। প্রকাশনা খাতে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে নিবন্ধন ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা দরকার।
সব সঙ্কট সত্ত্বেও অমর একুশে বইমেলা এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোর একটি। এটি শুধু বই বিক্রির বাজার নয়; বরং ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, সাহিত্যচর্চা ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। তবে এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
প্রথমত, বইমেলার সময়সূচি কঠোরভাবে মেনে চলা প্রয়োজন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে মেলা খোলা ও বন্ধ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, মেলার ভেতরের ব্যবস্থাপনা আরো সুশৃঙ্খল করতে হবে। খাবারের দোকানগুলো নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখা যেতে পারে, যাতে বইয়ের স্টলগুলোর পরিবেশ বজায় থাকে। তৃতীয়ত, লিটল ম্যাগাজিন কর্নারের মতো সৃজনশীল প্ল্যাটফর্মগুলো আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন, কারণ এখান থেকে অনেক নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
সবচেয়ে বড় কথা, বইমেলার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চা ও পাঠাভ্যাস শক্তিশালী করা। যদি বইমেলা শুধু উৎসবমুখর ভিড়ের জায়গায় পরিণত হয়, তবে এর মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। তাই প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত নীতি, যেখানে প্রকাশক, লেখক, পাঠক এবং আয়োজকদের স্বার্থের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা যাবে। বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলা বাংলাদেশী আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এই প্রতীক টিকিয়ে রাখতে হলে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে বইমেলা আরো সৃজনশীল, স্বচ্ছ ও পাঠকবান্ধব করে তোলা সময়ের দাবি।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক


