আসন সমঝোতায় জোটের নির্বাচন কী বার্তা দেয়

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ছাড়া সরকারের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে কার্যনির্বাহ সম্ভব নয়। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের জন্য চাই রাজনৈতিক নেতাদের দিকনির্দেশনা এবং সরকারি কর্মচারীদের নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে দায়িত্ব পালন।

বাংলাদেশে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়া নতুন কিছু নয়। ইতঃপূর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষত ১৯৯০ সাল-পরবর্তী দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- উভয় দল তাদের সহযোগী দল নিয়ে জোটবদ্ধ হয়ে নিজস্ব প্রতীক অর্থাৎ- আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে নৌকা ও বিএনপির ক্ষেত্রে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। নব্বই-পরবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন বলতে সপ্তম, অষ্টম ও নবম- এ তিনটি নির্বাচনকে বুঝায়। সপ্তম ও নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট বিজয়ী হয়েছিল, অপর দিকে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট বিজয়ী হয়েছিল। অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অন্যতম সহযোগী দল ছিল জামায়াতে ইসলামী। এর আগে পঞ্চম সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বিএনপি সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জামায়াতে ইসলামী শুধু সংরক্ষিত দু’টি মহিলা আসনের বিনিময়ে বিএনপিকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে সরকার গঠনে সহায়তা করে। যদিও পরবর্তী সময়ে তত্ত¡াবধায়ক সরকার ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের সাথে একাত্ম হয়ে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিল।

দশম, একাদশ ও দ্বাদশ- এ তিনটি নির্বাচন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় জোটবদ্ধ হয়ে করলেও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরে ছিল। আর তাই একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট তাদের বিজয় হাসিলে সমর্থ হয়। উপরোক্ত তিনটি নির্বাচনের প্রতিটির ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগের প্রধান সহযোগী ছিল এরশাদের জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগ জোটের অপর শরিক দলের অন্যতম ছিল জাসদ (ইনু), ওয়ার্কার্স পার্টি (মেনন) এবং জাতীয় পার্টি (মঞ্জু)।

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ ব্যতিরেকেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী দলগুলোর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হবে- এমনটি অনুভূত হয়। ইতোমধ্যে আরপিও (রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার) সংশোধনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে, জোটের সহযোগী দলগুলো নিজ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হবে।

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিএনপিসহ ১২টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জোটের মধ্যে আসন সমঝোতা হয়েছে। অপর দিকে জামায়াতে ইসলামীসহ ১০টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জোটের মধ্যে আসন সমঝোতা হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পৃথকভাবে কত শতাংশ জনসমর্থন রয়েছে তা আনুষ্ঠানিক ভোটপর্ব সম্পন্ন হওয়ার আগে নিরীক্ষা করা কঠিন। এ দু’টি জোটের সহযোগী যেসব দল রয়েছে এর অধিকাংশই নেতাভিত্তিক দল এবং এ দু’টি জোটের সমর্থন ব্যতীত পৃথকভাবে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হলে তাদের পক্ষে জিতে আসা কঠিন।

১২ মে ২০২৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ঘোষণার ফলে আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু এ কথাটি অনস্বীকার্য, আওয়ামী লীগের একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের নির্বাচনের সময় ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, তবে বিএনপি ও জামায়াত জোট আওয়ামী লীগের ভোটারদের নিজ নিজ জোটের বা দলের পক্ষে আনার ব্যাপারে যে সচেষ্ট, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

আমাদের পাশের রাষ্ট্রসহ অপর কিছু প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থা অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লুসিভ) নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তাদের ভাষ্যমতে- নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে তা আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য হবে না এবং পুনঃনির্বাচন আয়োজনের আবশ্যকতা দেখা দেবে।

উভয় জোটের সহযোগী দলগুলো বিশেষত বিএনপি জোটের সহযোগী দলগুলোর মধ্যে কিছু ইতোমধ্যে নিজ দলের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে বিএনপিতে একীভূত হয়েছে। এর মূল কারণ- নিজ প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এরপরও কথা থাকে, বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা একনিষ্ঠ ও নিঃস্বার্থভাবে কাজ না করলে দলের অস্তিত্ব বিপন্নকারীদের বিজয়ী হওয়া দুরূহ।

জামায়াতে ইসলামীর সাথে যেসব দলের আসন সমঝোতা হয়েছে এরা সম্ভবত নিজ নিজ প্রতীকেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। সে ক্ষেত্রে তাদের জন্য জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থকদের অকুণ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন। তবে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগে বলা মুশকিল, দলটির নেতাকর্মীরা কিভাবে নিজেদের নির্বাচনের সাথে সম্পৃক্ত করে বিজয় অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবেন।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘ দিন ধরে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে এবং ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী দল দু’টির প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অভিজ্ঞতা নেই। এ বাস্তবতায় আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন দল দু’টির নেতা ও কর্মী-সমর্থকদের জন্য নব উদ্যমে কাজ করার ক্ষেত্র প্রস্তুতে সহায়ক। এ কারণে প্রতিটি পদক্ষেপেই সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

বিএনপির কিছু নেতা জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১ সালের ভূমিকাকে সামনে এনে দলটির বিপক্ষে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকাসহ আরো নানাবিধ অভিযোগে অভিযুক্ত করার প্রয়াস নিচ্ছে। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ ৫৪ বছর আগে সংঘটিত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী রাজনীতির সাথে বর্তমানে যারা সম্পৃক্ত এদের অধিকাংশেরই ৫৪ বছর আগে এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগ ছিল না। তা ছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকার কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পাঁচ নেতাকে প্রহসনের বিচার-পরবর্তী ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। অতএব, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রাখার অবকাশ আছে কি না, এ প্রশ্নে সংশয় থাকাই স্বাভাবিক।

একদা বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত এবং একাধিকবার বিএনপি থেকে নির্বাচিত দু’জন সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান ও কর্নেল অলি আহমদ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সাথে একাত্ম হয়ে প্রথমোক্তজন জামায়াতে ইসলামীতে এবং শেষোক্তজন জামায়াতের জোটে যোগদান করেছেন। এরা উভয়ই বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার প্রাথমিক পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের ভূমিকার কঠোর সমালোচক ছিলেন। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। অতীতের শত্রু আজ মিত্র, আর আজকের শত্রু অতীতের মিত্র। বিএনপির সাথে সংশ্লিষ্ট উভয় রাজনীতিকের মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। জামায়াতে ইসলামী বিষয়ে তাদের বর্তমান অবস্থান তাদের অতীতের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেও তারা তাদের বর্তমানের অবস্থানের পক্ষে অনড়। আর এ কারণেই বলতে হয় দেশ ও জনগণের স্বার্থে ৫৪ বছরের আগের ঘটনা নিয়ে বোধকরি বিতর্কে না জড়ানোই উত্তম।

বিএনপি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী চেতনার সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচিত। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’-এর সংযোজনসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামীও বিএনপির মতো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী চেতনার ধারক এবং বাহক। বিএনপির একটি অংশ এখন ত্রয়োদশ নির্বাচনকে ঘিরে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও অপর একটি অংশ এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। আর সে কারণেই প্রশ্নের উদয় হয়, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামী যখন প্রথমত নিঃস্বার্থ সমর্থন জুগিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে সরকার গঠনে এবং দ্বিতীয়ত জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে মন্ত্রিত্ব গ্রহণপূর্বক সরকারের অংশ হিসেবে কাজ করেছিল, তখন কেন দলের মধ্য থেকে প্রতিবাদ বাক্য উচ্চারিত হয়নি।

ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন অভূতপূর্ব বিজয় অর্জন করেছে। এ বিজয় থেকে ধারণা পাওয়া যায়, বর্তমান প্রজন্মের বড় অংশ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী চেতনায় বিশ্বাসী।

বড় পরিসরে দেখলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির মধ্যে আদর্শগত তফাত খুব একটা নেই। সুতরাং আসন সমঝোতায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে একটি জোট হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করবে এবং অপর জোট বিরোধীদলীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে নির্বাচনে জয়লাভ করলে জাতীয় সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও নির্বাচন-পরবর্তী জাতীয় সরকার গঠন বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে যে জাতীয় সরকারের কথা বলা হয়েছে- নির্বাচন-পরবর্তী তা বাস্তবায়ন করা হলে আশা করা যায়, আগামী পাঁচ বছর একটি স্থিতিশীল সরকার দেশ পরিচালনা করবে।

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ছাড়া সরকারের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে কার্যনির্বাহ সম্ভব নয়। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের জন্য চাই রাজনৈতিক নেতাদের দিকনির্দেশনা এবং সরকারি কর্মচারীদের নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে দায়িত্ব পালন। আশা করা যায়, আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। আর নির্বাচন-পরবর্তী যে সরকার গঠিত হবে তা যেন জন-আশার প্রতিফলনে একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে সর্বতোভাবে সহযোগিতার সব হস্ত প্রসারিত করে- এটিই হোক আমাদের কামনা।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক