ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, একটি জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, জ্ঞান এবং পরিচয়ের ধারক-বাহকও বটে; ভাষা বিলুপ্ত হলে এসব চিরতরে হারিয়ে যায়, যা বিশ্বকে বৈচিত্র্য থেকে বঞ্চিত করে। একটি মানবগোষ্ঠীর শেকড় উপড়ে ফেলে। একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে মানবজাতির জ্ঞানভাণ্ডার থেকে কিছু হারিয়ে যাওয়া, যা বিশ্বকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ নষ্ট করে।
ইউনেস্কোর মতে, পৃথিবীর অনেক ভাষা বিপন্ন এবং এদের বিলুপ্তি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানগত বৈচিত্র্য কমায়। ভাষাগত বৈচিত্র্য মস্তিষ্কের সৃজনশীলতা বাড়ায়। একটি ভাষা হারালে এর সৃজনশীলতার একটি অংশও নষ্ট হয়। ইথিওপিয়ার মতো দেশে ভাষা বিলুপ্তির কারণে সেখানকার মানুষের প্রথাগত জ্ঞান ও জীবনপদ্ধতি ঝুঁকির মুখে পড়ছে, যা তাদের শেকড়কে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই ভাষা সংরক্ষণ করা মানে শুধু শব্দ নয়; বরং একটি সম্পূর্ণ বিশ্বকে, তার জ্ঞান ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা, যা মানবজাতির বিকাশে অপরিহার্য।
আমাদের ভাষা বাংলা। এই ভাষা হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের শেকড়ও। শেকড় রক্ষার অপরিহার্য কার্যাদি সম্পাদনে রয়েছে বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমির মূল লক্ষ্য– বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ, গবেষণা, উন্নয়ন এবং বিকাশ, যা মূলত দেশজ সংস্কৃতি ও জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে জাতির মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত করা। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ঐতিহ্য নিয়ে মৌলিক গবেষণা করা ও তা প্রকাশ করা। দেশজ সংস্কৃতি ও জাতির আত্মপরিচয়ের বিকাশে কাজ করা এবং সেগুলো সংরক্ষণ ও প্রসারিত করা। বাংলা ভাষার মানোন্নয়ন, প্রয়োগ এবং গবেষণার মাধ্যমে ভাষাকে সমৃদ্ধ করা। সংক্ষেপে বাংলা একাডেমি ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির গবেষণা ও বিকাশের মাধ্যমে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তি মজবুত করার কাজ করে। এসব বিষয়ে সবাইকে সচেতন করতে, লেখক ও প্রকাশকদের উজ্জীবিত করতে বইমেলার আয়োজন করে থাকে জাতীয় এই প্রতিষ্ঠান।
এ বছর বইমেলা শুরু হবে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে। চলবে ১৫ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত। খোলা থাকবে প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। ছুটির দিন শুরু হবে বেলা ১১টায়। পবিত্র রজান মাস শুরু হবে ১৮ কিংবা ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে। অর্থাৎ– ২০২৬ সালে প্রায় একসাথে চলবে রমজান ও বইমেলা। রমজান মাসে বইমেলা আয়োজিত হওয়ায় প্রকাশকরা মনোক্ষুণ্ন, কারণ রোজা, ইফতার ও তারাবিহর ব্যস্ততায় পাঠক সমাগম কম হবে, ফলে বিক্রিও কম হবে। ব্যবসায়ীরা এবারের মেলায় ব্যবসায়িক লোকসানের আশঙ্কা করছেন; এর ওপর নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রকাশনা শিল্পে এমনিতে এর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই রমজান মাসকে তারা মেলার জন্য উপযুক্ত সময় মনে করছেন না। গত কয়েক বছর ধরে করোনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রকাশনাশিল্প ক্ষতির মুখে, এ সময়ে মেলা আয়োজন তাদের সঙ্কট আরো বাড়াবে। কাগজ ও মুদ্রণ খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা প্রকাশনা ব্যয় আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভাষাশহীদদের স্মরণে এই বইমেলার নাম একুশে বইমেলা। তাই বরাবর এ মেলা ফেব্রুয়ারিতেই হয়ে থাকে। যেহেতু এ বছর ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন এবং শেষার্ধে পবিত্র রমজান। অন্য দিকে রোজা রেখে অনেকের জন্য বইমেলায় আসা বেশ কষ্টসাধ্য হবে। বিধায় বইমেলার এবারের যে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে কাক্সিক্ষত ক্রেতা আসবে বলে মনে করছেন না প্রকাশকরা। তাই বইমেলা ঈদের পর আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তারা, যাতে পাঠক ও প্রকাশকদের সুবিধা হয় এবং মেলা একটি লাভজনক ইভেন্ট হতে পারে। ঈদের আমেজ থাকতে থাকতে যেন শুরু হয় একুশে বইমেলার আমেজ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস) সরকারের কাছে মতামত পেশ করেছে। এক কথায়– রমজান মাসের পরিবেশ, পাঠক আচরণ এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রকাশকরা চান এবারের মেলাটি ঈদের পরে অনুষ্ঠিত হোক।
বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলার শুরু। সেই থেকে প্রতি বছর বইমেলায় বাড়তে থাকে বিক্রেতা ও ক্রেতা। একসময় ক্রেতা-বিক্রেতার চাপ এত বেশি বৃদ্ধি পায় যে, একাডেমি চত্বরে ঠাঁই দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। শুরু হয় সম্প্রসারণ। ২০১৪ সাল থেকে মূলত এ সম্প্রসারণ শুরু হয়েছিল, যেখানে বাংলা একাডেমির মূল চত্বরের পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেও মেলার জন্য ব্যবহার করা হয়। বর্ধিত পরিসরে মেলা আয়োজনে বইপ্রেমীদের জন্য আরো বেশি বই এবং প্রকাশকদের জন্য আরো বেশি স্টলের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়। শুধু স্থান সম্প্রসারণ নয়; বাড়তে থাকে বই বিক্রিও। যে মেলা ১৯৭২ সালে ৩২টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই মেলায় ২০২৪ সালে ৬০ কোটি টাকার বেশি বই বিক্রি হয়েছিল।
সবকিছুতে জোয়ার-ভাটা রয়েছে। ভাটার টান শুরু হয়েছে বই পাঠে। তারপরও একুশে বইমেলায় প্রকাশকরা বিভিন্ন কৌশলে পাঠক ও বিক্রি বাড়িয়ে থাকেন। যেমন আকর্ষণীয় ছাড়, আকর্ষণীয় স্টল সজ্জা, তারকা লেখক দিয়ে স্টল সাজানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং বিভিন্ন ধরনের বই (অনুবাদ, আত্ম-উন্নয়ন, ইতিহাস) এনে পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টি করা, যা মেলায় অংশগ্রহণ ও বিক্রির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাস, আত্মজীবনী ও উপন্যাসসহ বিভিন্ন ধারার বই প্রকাশ করা। নবীন লেখকদের বই প্রকাশ করে নতুন পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করা।
বইয়ে আকর্ষণীয় ছাড় দেয়া এবং বিশেষ বান্ডিল অফার দেয়া। সুন্দর ও আকর্ষণীয় ডিজাইনের প্রচ্ছদ তৈরি, যাতে সহজে চোখে পড়ে। লেখকের সাক্ষাৎকার ইত্যাদি দিয়ে প্রচারণা চালানো। মেলা ঘিরে বিশেষ কোনো প্রকাশনা (যেমন– স্মারক গ্রন্থ) প্রকাশ করা। যত বেশি নতুন বই প্রকাশিত হয় এবং পাঠক পায়, তত লাভ বাড়ে। নির্দিষ্ট কোনো বছর যদি ফিকশন বা অন্য কোনো ধারার বই বেশি বিক্রি হয়, তাহলে সেই বছর লাভ বেশি হয়। পাঠকের সুবিধায় বইয়ের ক্যাটালগ বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করা। বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আলোচনা সভা ও সেমিনার আয়োজন করা।
অনেক শৌখিন লেখক প্রকাশককে উজ্জীবিত করতে ফেসবুক বন্ধুদের কফি পানের দাওয়াত দিয়ে বইমেলায় নিয়ে আসেন। তারা লেখকের টাকায় কফি পান করে দল বেঁধে আড্ডা দেন ও বই কিনে নিয়ে যান। এসব কলা-কৌশলের মাধ্যমে প্রকাশকরা বই বিক্রি ও পাঠক উপস্থিতি দুটোই বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন, যা মেলাকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে। এসব কারণে বই পাঠে ভাটা পড়লেও বই বিক্রিতে জোয়ারটা ঠিকই ধরে রেখেছেন। পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশকের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে আয়োজন করলে বিক্রি কমে গিয়ে বইমেলায়ও ভাটার টান শুরু হতে পারে।
লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক



