বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে রাজনীতির মাঠে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী নেতাকর্মীরা ধীরে ধীরে এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে। বিদেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীরাও ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, এমন একটা সুযোগের অপেক্ষাতেই ঘাপটি মেরে বসেছিল। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা দৌড়ের ওপর ছিল। তখন তারা রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি পালন করতে সাহস পায়নি। ফলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শপথ নেয়ার পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিসের তালা খুলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে বিভিন্ন স্লোগান দিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা তোলা হয়। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংবলিত একটি ব্যানার টাঙিয়ে ‘ভাঙা কার্যালয়’ এর ‘উদ্বোধন’ ঘোষণা করে এবং কিছুক্ষণ অবস্থান করে দ্রুত চলে যায়। ব্যানারে উল্লেখ করা হয়- ‘বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ছিল, আছে এবং থাকবে’। ২৭ ফেব্রুয়ারি খুব সকালে ধানমন্ডিতে ঝটিকা মিছিল বের করে ২০-২৫ জন মহিলা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। ‘মুজিবপ্রেমিক বাংলার নারী’ ব্যানারে এই মিছিল হয়। যদিও মিছিল থেকে মহিলা আওয়ামী লীগের সাত নেতাকর্মীসহ মোট আটজনকে আটক করে পুলিশ। ২১ ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামীপন্থী কয়েকজন শিক্ষক ও নেতাকর্মী ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিতে যায়। এর আগে ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিতে যান আওয়ামী লীগপন্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিনসহ কয়েকজন। সেখান থেকেও তিনজনকে আটক করে পুলিশ। পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে, ১৪ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড় সদরের চাকলাহাট, ১৫ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, ১৬ ফেব্রুয়ারি বরগুনার বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের কাযালয়, ১৮ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুরে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, ২১ ফেব্রুয়ারি জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলেছেন দলটির কর্মীরা। এ ছাড়া কক্সবাজারের উখিয়া, হবিগঞ্জ, রাজবাড়ী, পাবনা, রাজশাহী ও যশোরসহ ২০টি এলাকায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলার চেষ্টা করা হয়েছে।
ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নতুন এই রাজনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই দলটির বেশ কিছু নেতার জামিন মিলেছে। জামিন মঞ্জুরের তালিকায় আছে নারায়ণগঞ্জ সিটির সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, কক্সবাজারের আবদুর রহমান বদি, বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি তালুকদার মো: ইউনুস, সাবেক এমপি জেবুন্নেছা আফরোজ। এ ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় আটক শত শত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ইতোমধ্যেই জামিনে মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন।
এ অবস্থায় বিগত ১৭ বছর যারা রাজপথে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছে, বিরোধী দলগুলোর যে সমস্ত নেতাকর্মী শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা গুম, খুন জেল-জুলুম, গায়েবি মামলার হুলিয়া নিয়ে রাতের পর রাত নদী-নালা, পাটক্ষেত ও জঙ্গলে ঘুমিয়েছে। সেই সময় অবস্থা এতটাই ভয়ঙ্কর হয়ে পড়েছিল যে, সারা দেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ৬০ লাখ মামলা দায়ের করে লাখ লাখ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার-নির্যাতন করা হয়েছে। ওই সমস্ত মামলার ভয়ে অনেক শিক্ষিত দলীয় নেতাকর্মী জীবন বাঁচাতে শহরে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছে।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদী থাবা থেকে রেহাই পায়নি বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়াও। আদালতকে ব্যবহার করে ভুয়া মামলায় সাজা দিয়ে জেলে রেখে চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসনে থাকতে বাধ্য করেছে। তার অনুপস্থিতিতেই বিভিন্ন মামলায় সাজা দেয়া হয়েছিল।
সর্বশেষ ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টের ৩৬ দিনের আন্দোলনে অংশ নিয়ে ফ্যাসিবাদী একনায়ক আওয়ামী রেজিম পরিবর্তন করে শেখ হাসিনা সরকারকে পালিয়ে যেতে যে সমস্ত ছাত্র-জনতা বাধ্য করেছে, তাদের হৃদয়েও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কারণ স্বীকৃত মতেই আওয়ামী লীগ একটি প্রতিশোধপরায়ণ ও ভয়ঙ্কর দল। ক্ষমতায় থাকলে দলটি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। যা এই দেশের মানুষ ১৯৭২ থেকে ’৭৫ এবং গত প্রায় দেড় দশকের শেখ হাসিনার শাসনামলে জীবন যৌবন সব কিছু দিয়ে অনুভব করেছে।
আওয়ামী লীগের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭২ থেকে ’৭৫ সাল পর্যন্ত সদ্য স্বাধীন দেশে রক্ষীবাহিনী দ্বারা প্রকাশ্যে নাগরিকদের হত্যা, লুটপাট, গণতন্ত্র ধ্বংস করে একটিমাত্র দল ছাড়া সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল কায়েম, তাঁবেদার চার সংবাদপত্র ছাড়া সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা দলীয় নেতাকর্মীদের দুর্নীতির মাধ্যমে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে চুরি ডাকাতি রাহাজানি পেশিশক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে দেশে ভয়ঙ্কর ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল সেনাকর্মকর্তা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। সৌভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা বিদেশে অবস্থান করায় বেঁচে যান। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেক চড়াই উতরাই ও নাটকীয়তার পর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় চলে আসেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটালে শেখ হাসিনা পিতার নবগঠিত বাকশালে না গিয়ে ভারত থেকে ফিরে এসে আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এদিকে বিগত এক-এগারোর জরুরি সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ হিসেবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে দেশটিকে আওয়ামী লীগের অধীনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত করতে সব আয়োজন সম্পন্ন করার প্রয়াস অব্যাহত রাখে। নির্বাচনী ব্যবস্থাকে গোরস্থানে পাঠিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে বিনাভোট, রাতের ভোট ও ডামি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিলেন।
আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শুরুতেই শেখ হাসিনার সরকার নিজের অনুগত কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রশাসনকে সাজিয়েছিলেন।
সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে দল এবং ব্যক্তি আনুগত্যের বিবেচনায় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে আজ্ঞাবহ লোভী লুটেরা দুর্নীতিবাজদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলেন।
দলকানা প্রশাসনের এসব কর্মকর্তাকে দিয়ে তৎকালীন বিরোধী দল এবং সরকারবিরোধী প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করতে বেছে নিয়েছিলেন গুম-খুন, ক্রসফায়ার, গায়েবি মামলা, গণগ্রেফতার ও নির্যাতনের নৃশংস পথ। সৃষ্টি করা হয়েছিল বীভৎস মানবাধিকার বিবর্জিত অমানবিক ‘আয়নাঘর’ খ্যাত টর্চার সেল। বাকস্বাধীনতা ও সভা-সমাবেশ বন্ধ করতে তৈরি করা হয়েছিল বিভিন্ন কালো আইন।
বন্ধ করা হয়েছিল একাধিক মিডিয়া, নিষিদ্ধ করা হয়েছিল রাজনৈতিক দল। গোটা রাষ্ট্রটি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও ভিন্নমতাবলম্বীদের জন্য কারাগারে পরিণত করে ভয়ের আবহ তৈরি করে দাম্ভিকতা ও অহঙ্কার প্রদর্শন করতেন। দেশে দুঃশাসনের ওই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার টানা ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী একগুঁয়েমি দাম্ভিক স্বৈরশাসন, দুর্নীতি অব্যবস্থাপনা লুটপাট আর প্রতিহিংসা, পরিবারতান্ত্রিক অপশাসনের রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ইস্পাতকঠিন আন্দোলনে দিশেহারা শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৩৬ দিনের ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। এই আন্দোলন চলাকালে নারী শিশুসহ ১৪ শ’ মানুষ শহীদ হয়েছেন। ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। অনেকে হাত-পা ও চোখ হারিয়ে চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছে। এত কিছুর পরও এই দলটির তাদের অতীত কৃতকর্মের জন্য কোনো প্রকার অনুতাপ-অনুশোচনা বোধ নেই। দলটি পুনরায় রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হলে দেশবাসীর সাথে আবার একই আচরণ করবে না— তার গ্যারান্টি কে দেবে। দলটির প্রধান শেখ হাসিনা এখনো ভারতের মাটিতে বসে দেশে ফিরে এসে বিচার করার হুমকি দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একটি উক্তি তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ২০১২ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীতে এক পথসভায় বলেছিলেন- ‘সাপকে বিশ্বাস করা যায়; কিন্তু আওয়ামী লীগকে নয়।’
বাস্তবতা হচ্ছে- পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বিগত ১৬ বছরের শাসনামল এবং স্বাধীনতা-উত্তর আওয়ামী শাসনামলে এই দেশের সাধারণ মানুষ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সাথে যে দমন-পীড়ন ও নিপীড়নমূলক আচরণ করেছে, অনিয়ম-দুর্নীতি, লুটপাট, গুম-খুন, আয়নাঘর, গণগ্রেফতার ও গায়েবি মামলা দিয়ে নির্মমতা প্রদর্শন করেছে, এর জন্য এই দলটিকে প্রথমে অনুতপ্ত হয়ে প্রকাশ্যে জাতির সামনে ক্ষমা চাইতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উপর যেভাবে পাখির মতো গুলি করে নিরস্ত্র নিরপরাধ মানুষ হতাহতের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে, পাশাপাশি দল হিসেবে তাদের এই কুকর্মের আর পুনরাবৃত্তি হবে না মর্মে জাতির সামনে তওবা করে রাজনীতিতে ফিরতে হবে। অন্যথায় জাতি তাদেরকে কোনো দিনই ক্ষমা করবে বলে মনে হয় না।
লেখক : আইনজীবী



