মোহাম্মদ সাদউদ্দিন
আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্বের প্যারামিটার এতই প্রসারিত যে, শুধু মোগলদেরই ইতিহাসের পাতা থেকে বাদ দেয়া হয়নি, তাদের ঘনিষ্ঠ হিন্দু রাজা বা তাদের হিন্দু সেনাপতিদের পর্যন্ত জাতীয় সিলেবাস থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। ভারতের শিক্ষানির্ধারক সংস্থা ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ট্রেনিং বা এনসিইআরটি অষ্টম শ্রেণীর ইতিহাসের পাঠ্যবইতে এমনই পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদও ধ্বনিত হয়েছে খোদ বিজেপি শাসিত রাজস্থানে। রাজস্থানের শুধু ছাত্রছাত্রী বা সুশীল সমাজই নয়, রাজ পরিবারের তরফ থেকেও প্রতিবাদ করা হয়েছে এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে। রাজস্থান থেকে এই প্রতিবাদের ঢেউ গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ এবং জম্মু-কাশ্মিরে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
কী পরিবর্তন করা হয়েছে? অষ্টম শ্রেণীর ইতিহাসের সিলেবাসে দিল্লি সুলতানি আমল এবং মোগল সাম্রাজ্যের আমলের ইতিহাস পুরো বাদ দিয়ে স্র্রেফ টিকায় সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখ করা হয়েছে। সুলতানি এবং মোগল আমলের রাজনৈতিক ইতিহাস, সংস্কৃতি, দুই আমলের স্থাপত্যকীর্তির কিছুই আর শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে না। কিন্তু তাজমহল, আগ্রা ফটক, নিজামুদ্দিন দরগা, লখনৌয়ের ঘুলঘুলাইয়া এসব বাস্তবে রয়েই যাবে। পর্যটকরা সেসব দেখে শুধুই অজানা বিষয় হিসেবে বিস্ময় প্রকাশ করবেন। উত্তর ভারতে রাজপুত বংশের সেই তামার থেকে শুরু করে চৌহান, সোলাঙ্কি, প্রতিহার, মধ্য ভারতের চাণ্ডেল, পারমারদের কথা, পূর্ব ভারতের সূর্যবংশীয় ক্ষত্রিয় এবং কাল্লিছুরি বংশের কথা সব মিলিয়ে দুই পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে। মারাঠা রাজ্যের কথা দীর্ঘ ২২ পৃষ্ঠা ধরে বিশদ বর্ণনা করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের কারণ, রাজপুত থেকে শুরু করে উপরোক্ত রাজবংশগুলো সুলতান এবং মোগল সম্রাটদের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে চলতেন। কেবল মারাঠাদের মুসলিম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু মারাঠা রাজারাও দীর্ঘকাল দাক্ষিণাত্যের সুলতান এবং মোগল সম্রাটদের অধীনতা মেনে নিয়ে রাজত্ব চালিয়েছে। ইতিহাসের সেই অংশটুকু অবশ্য বাদ দেয়া হয়েছে। আওরঙ্গজেবের অধীনে ৯৬ জন মারাঠি মনসবদার ছিলেন। ৭২ জন রাজপুত মনসবদার ছিলেন। শিবাজির বাবা শাহজি ভোঁসলে বিজাপুরে মুসলিম শাসকের অধীনে সেনাপতি ছিলেন। সে তথ্য চেপে যাওয়া হয়েছে। সেই কারণেই মারাঠাদের কথা ছাত্রছাত্রীদের বেশি করে জানতে হবে। আরো একটি কারণ রয়েছে। আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা থেকে শুরু করে কাজকর্মের কেন্দ্র বরাবরই ছিল মারাঠা অঞ্চল। তবে মারাঠারা কখনোই ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি। সিন্ধিয়া, হোলকার, গাইয়োকার, ভোঁসলেরা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করতেন। পেশোয়াকে বীর হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে পরিবর্তিত ইতিহাসে; সেই পেশোয়া মোগল সম্রাটদের দেয়া উপাধি আমির উল উমরাহ নিয়ে ধন্য মনে করতেন নিজেকে। তিনি মোগল সম্রাটদের হয়ে কর আদায় করে মোগল সম্রাটদের খুশি করেছিলেন। পাঠ্যবই বলছে, মারাঠারা নাকি হিন্দু ভারতের ত্রাতা ছিলেন। এই ইতিহাস বই লিখতে লেখকরা বলিউডের বিকৃত ইতিহাসের ফিল্ম বাজিরাও মাস্তানি, তানহাজি, ছাওয়াকে অনুসরণ করেছেন। সব মিলিয়ে হিন্দুত্ববাদের জয়গান করা হয়েছে।
আরো উল্লেখ্য, আরএসএস নিয়ন্ত্রিত বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর একে একে মোগলদের তৈরি করা মোগলসরাইকে দিনদয়াল, এলাহাবাদকে প্রয়াগরাজ বা করিমগঞ্জকে শ্রীভ‚মিতে পরিণত করেছে। এমনকি রাজধানী দিল্লির বুকেও অরঙ্গাবাদ মার্গের নাম বদলে হয়ে গেছে এপিজে আব্দুল কালাম রোড। কালাম সাহেবের নামে কি নতুন কোনো রাস্তার নাম করা যেত না? আবার কত জায়গার যে নাম বদল হবে তার তো কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। এবার তো শোনা যাচ্ছ, আলিগড়ের নাম বদলে ফেলবে। কলকাতা মহানগরীর কলকাতা বন্দরের নাম ছিল নেতাজী সুভাষ বসু বন্দর। এখন তা বদলে হয়েছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর। এতে পশ্চিবঙ্গের মানুষ ক্ষুব্ধ হলেও করার কিছু ছিল না। কেন না ওটা ছিল কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান যেখানে ক্ষমতায় বিজেপি নিজেই। এই দক্ষিণপন্থী সা¤প্রদায়িক দলটি কোনো সংবিধান মানে না। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধার ধারে না। তাই তাদের পক্ষে সব কিছুই সম্ভব।
আমরা জানি গৌড়বঙ্গে দীর্ঘদিন তুর্কি সুলতানদের আমল ছিল। সেই তুর্কি সুলতানদের স্মৃতিবিজড়িত গৌড়-মালদহের আদিনা মসজিদের মাটির নিচে মন্দিরের অস্তিত্বের গল্প জোরকদমে প্রচার করছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। দখলের জন্য সেখানে অভিযান চালানো হয়েছিল। নবাবী মুর্শিদাবাদে ইংরেজবিরোধী নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্থাপনাগুলো অবহেলার শিকার। ইংরেজদের সহযোগী বণিক জগৎ শেঠ, রায়দুর্লভ, দেবী সিং, মীর জাফর বা ইয়ারলতিফদের স্থাপনাগুলো সংস্কার করা হয় আর শহীদ ও বীর যোদ্ধা মীর মদনের কবর (ফরিদপুর, রেজিনগর, মুর্শিদাবাদ) বা হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার আরেক দেশপ্রেমিক মোহন লালের কবরের কোনো সংস্কার হয় না কেন? আজো পলাশীকে কেন একটি উপর্যুক্ত পর্যটনকেন্দ্র করা হয় না। এটিই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। একদা বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যার রাজধানী মুর্শিদাবাদের প্রতিষ্ঠাতা নবাব মুর্শিদা কুলি খাঁর স্মৃতিবিজড়িত কাটরা মসজিদকেও নিশানা বানাতে চায় হিন্দুত্ববাদীরা। সেখানেও মন্দির ছিল বলে গল্পটা বানাতে লেগেছে। ব্রিটিশ বীর যোদ্ধা টিপু সুলতানদের বংশধরদের বানানো কলকাতার টালিগঞ্জের ঐতিহাসিক টিপু সুলতান মসজিদকেও পরবর্তী নিশানা করতে চাইছে হিন্দুত্ববাদীরা।
লেখক : পশ্চিমবঙ্গের কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও কবি



