ড. খালেদ হোসেন
১৯৪৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ দেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে আর বারবার প্রতারিত হয়েছে। কৃত্রিম ক্ষমতার বলয় নির্মাণ করে কিছু অভিজাত গোষ্ঠী ও শাসক পরিবারই সুযোগ-সুবিধা পুরোটা ভোগ করেছে। জনগণের সেবা করার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসে তারা রাষ্ট্রের মালিক বনে যায়। শেখ হাসিনা প্রকাশ্যেই বলেছিল, ‘এই দেশ আমার বাবার, শাসন করার নৈতিক অধিকার শুধু আমার’; সে জন্য জুলাই আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান ছিল- ‘লাখ শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারো বাপের না’। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এটিই ছিল স্বাভাবিক যে, এই দেশের চাষা, কুলি-মজুর, জেলে-কুমার যত যোগ্যই হোক না কেন, তাদের শাসনক্ষমতায় আসা বা তাদের নিজস্ব কোনো কণ্ঠের জাগরণ যেন এলিটদের চোখে মহা অপরাধ।
রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের মধ্যেই ভাগাভাগি হবে- এই পক্ষ নয় তো ওই পক্ষ। কেউ ক্ষমতায় আসতে বা টিকতে পারবে না যতক্ষণ না সে ওই একই শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় কাজ শুরু না করে। তার সাথে যুক্ত ছিল আরেকটি শর্ত- এই দেশে ক্ষমতার বলয়ে অংশ নিতে হলে বিদেশীদের বিশেষ করে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে এবং নিজের ধর্ম, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে বিদ্রুপ করতে হবে। ব্যাংক ডাকাত ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদীদের কথা শুনতে হবে, যারা জনগণের রক্তের টাকায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে। এটিই হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ ও মিডিয়া মুঘলদের সম্মিলিত মানসিক কাঠামো।
এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তথা রাষ্ট্রকে কতিপয় গোষ্ঠীর হাত থেকে মুক্ত করে প্রকৃত মালিক জনতার হাতে ফিরিয়ে দিতেই ২০২৪ সালের বিপ্লব সংঘটিত হয়। দেড় হাজারেরও বেশি মানুষের জীবন এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষের রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচারী হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে। আর সেই ঐতিহাসিক ত্যাগের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশকে নতুন করে বিনির্মাণের লক্ষ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, জুলাই-পরবর্তী সময়ে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত হয় জুলাই সনদ, যা নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের মৌলিক দলিল। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ধাপে জুলাইয়ের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার নৈতিক, আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি এই সনদেই নিহিত। আর এই ভিত্তিকে চূড়ান্ত বৈধতা দিতে প্রয়োজন জনগণের সরাসরি রায়, অর্থাৎ গণভোট। এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের চতুর্থ গণভোট, যেখানে প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের পাশাপাশি প্রবাসে থাকা প্রায় সাত লাখ ভোটার জুলাইয়ের পক্ষে তাদের রায় দেবেন; ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে একজন প্রার্থীকে ভোট দেয়ার পাশাপাশি ভোটারদের হাতে একটি অতিরিক্ত ব্যালট পেপার দেয়া হবে, যার মাধ্যমে তারা জুলাই সনদের প্রতি সম্মতি জানাবেন এবং সেখানে স্পষ্টভাবে প্রশ্ন থাকবে : ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’
চারটি প্রশ্ন কেন্দ্র করে এই গণভোট হবে- ১. ‘নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।’ ২. ‘আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।’ ৩. ‘সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।’ ৪. ‘জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভিডিওবার্তা দিয়ে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার চাবি এখন আপনার হাতে। ‘হ্যাঁ’-তে সিল দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে। সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণভোটে না ভোট দেয়া মানেই চব্বিশের বিরুদ্ধে যাওয়া। না ভোট দেয়া মানে স্বৈরাচারের পক্ষে দাঁড়ানো। গণভোটে হ্যাঁ বলতে হবে। কারণ গণভোটে কোনো নিরপেক্ষতা বজায় রাখার সুযোগ নেই। গণভোটে হ্যাঁ দিয়ে নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করতে হবে। উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘হ্যাঁ’ সিল না দিলে আমরা আগের তিমিরেই ফিরে যাবো। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর দায়িত্ব সব রাজনৈতিক দলেরই ছিল। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল, তারা ‘না’ ভোটের পক্ষে কথা বলা শুরু করছে। তারা ইনিয়ে-বিনিয়ে না ভোটের পক্ষে মানুষ যাতে ভোট দেয়, সেই প্রচারণার চেষ্টা করছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের যাত্রা শুরু হবে, আর ‘না’ জিতলে দেশ ফিরে যাবে সেই পুরনো, পচে যাওয়া কাঠামোর কাছে, যে কাঠামো থেকেই বারবার ফ্যাসিবাদ জন্ম নেয়, ফিরে আসে জুলুম, আর জনতার কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সেই পুরনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতেই আজ মাঠে নেমেছে পতিত স্বৈরাচার ও তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আওয়ামী লীগ, তাদের ক্ষমতার দোসর জাতীয় পার্টি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দালাল ও এজেন্টরা। সাথে যুক্ত হয়েছে কিছু সুবিধাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মিডিয়াকর্মী ও টকশোবিদ, যারা প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে একটিই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে : যেন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হয়, যেন রাষ্ট্র আবার জনগণের নয়, গোষ্ঠীর দখলেই থেকে যায়।
যেমন আসন্ন গণভোটে ‘না’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় পার্টি-জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তিনি বলেন, স্বৈরাচার রোধের নামে যে সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা দেয়া হয়নি, তার হাত-পা বেঁধে দেয়া হয়েছে। দেশ চালানোর ব্যক্তিক্ষমতা দিতে হবে, ক্ষমতা না দিলে কোনো দিন দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। তিনি আরো বলেন, এই গণভোট সংবিধানবিরোধী, অবাস্তব এবং বাস্তবায়িত হলে দেশ অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাবে।
মিডিয়া টকশোতে আব্দুন নুর তুষার মন্তব্য করেছেন, সরকার নাকি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারে না; অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কতিপয় ফ্যাসিবাদী দুর্বৃত্ত ও তাদের দোসররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে, হ্যাঁ ভোট মানে পাকিস্তান, না ভোট মানে বাংলাদেশ। এই ভয়ঙ্কর ও বিভ্রান্তিকর বয়ান ছড়িয়ে তারা গোপনে ও প্রকাশ্যে গণভোটে ‘না’ ভোট আদায়ের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে; এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে যদি সরকার ও জনগণ সময়মতো সচেতন না হয়, তাহলে ২০২৪ সালের বিপ্লবে দেয়া রক্ত ও ত্যাগ বৃথা যাওয়ার বাস্তব আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং শুধু তাই নয় চব্বিশের বিপ্লবী নেতৃত্ব, সিপাহসালার, এমনকি বিপ্লবে অংশ নেয়া সাধারণ জনগণের জান-মাল ও ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
আবার মিডিয়ায় অনেকে মন্তব্য করছেন ‘ভোটের সাথে গণভোট হবে শুনছি; কিন্তু কীভাবে হবে, কী ভোট দেবো, কোন ভোট দিলে কী হবে! কিছুই জানি না’-এই কথাগুলো স্পষ্ট করে দেয়, জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে জনগণের সম্মতি নেয়ার যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, তা এখনো সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশের কাছে ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়ে গেছে। যদিও সরকার হ্যাঁ ভোটের প্রচারণা চালানো শুরু করেছে শেষমেশ, তবে এই অজ্ঞতাও সরকারের অবহেলার ফল, আর যদি এই ধোঁয়াশা কাটিয়ে জনগণকে সময়মতো জানানো ও সম্পৃক্ত করা না হয়, তবে এর মাশুল দিতে হবে জনগণকেই। গণভোটের ফলাফলের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে ভবিষ্যতের রাষ্ট্র কাঠামো এবং অজান্তেই সেই সিদ্ধান্ত যদি পুরনো শোষণমূলক ব্যবস্থার পক্ষেই চলে যায়, তবে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না কারো।
তাই সরকার, রাজনৈতিক দল, মিডিয়া ও সচেতন মহলের কার্যকর কর্মপদ্ধতি। যেমন সরকার সবাইকে নিয়ে তৈরি করতে পারে ‘জাতীয় গণভোট নাগরিক সংলাপ ও তথ্য-ন্যায়নীতি’, যার মূল দর্শন হবে গণভোটকে শুধু ব্যালটের দিন নয়; বরং একটি ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক সংলাপে রূপান্তর করা; এই নীতির অধীনে গণভোট ঘোষণার সাথে সাথে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে তিন স্তরের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে : প্রথমত, প্রতিটি ভোটারের কাছে সহজ ভাষায়, চিত্র ও উদাহরণসহ একটি ‘নাগরিক বোঝাপড়া কিট’ পৌঁছে দেয়া হবে (যেটি অলরেডি সরকার শুরু করছে কিছুটা), যেখানে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ দুই পথের রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক ও নাগরিক প্রভাব সমানভাবে ব্যাখ্যা থাকবে; দ্বিতীয়ত, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড কমিউনিটিতে বাধ্যতামূলক ‘নাগরিক সংলাপ দিবস’ আয়োজন করা হবে, যেখানে রাজনৈতিক স্লোগান নয়, প্রশ্ন উত্তর ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারবে; তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি রাষ্ট্রীয়ভাবে যাচাইকৃত কিন্তু সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ‘গণভোট তথ্য প্ল্যাটফর্ম’ চালু করা হবে, যেখানে যেকোনো নাগরিক মিথ্যা প্রচারণা রিপোর্ট করতে পারবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রমাণভিত্তিক জবাব পাবে- এই নীতি কার্যকর হলে গণভোট আর বাকশালী লীগ ও তাদের সহযোগী এলিটদের কৌশলের মাঠ থাকবে না; বরং তা রূপ নেবে জনগণের জ্ঞাত, সচেতন ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র-নির্মাণের উৎসবে।
লেখক : একাডেমিক ডিরেক্টর, সেন্টার ফর গভারনেন্স অ্যান্ড সিভিলাইজেশনাল স্টাডিজ (সিজিসিএস)



