মইনুল হোসেন : গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নির্ভীক যোদ্ধা

ভুল-ত্রুটি এবং অসম্পূর্ণতা মানুষের জীবনে থেকে যায়। মইনুল হোসেনও তার ব্যতিক্রম নন। তবে সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং সৎ কাজের জন্য মানুষ স্মরণীয় ও বরণীয় হয়।

ঝড় উঠবে, তুফান ছুটবে, দুঃশাসনের অবসান ঘটবে, এ বিষয়ে মইনুল হোসেনের মনে ছিল না কোনো দ্বিধা, ছিল না কোনো দ্ব›দ্ব। তবে তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের অনুসারী এবং সে কারণে সরকার পরিবর্তনের নিয়মতান্ত্রিক পথের সন্ধানী। যেমনটি নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি রচনায় ৩১ জন বুদ্ধিজীবীর বিবৃতিতে তিনি শাসনতন্ত্র মেনে সঙ্কট উত্তরণের পথনির্দেশনা দিয়েছিলেন। তাই নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির সীমানা সম্পর্কে সর্বদা সচেতন থেকে তিনি জনগণের চেতনা শাণিত করার লক্ষ্যে নিজের কলম সচল রেখেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য জাতির, অর্বাচীন শাসকদল আওয়ামী লীগ চেয়েছিল শাসনতন্ত্রে পরিবর্তন এনে, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির সব পথ বন্ধ করে, এমনকি জনগণের ভোটাধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে। এ ব্যাপারে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের কেউ কেউ বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা দিয়েছিলেন। তারা ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত নির্বাচনকালীন তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের অনুকূলে রায় দিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পথ সুগম করে দিয়েছিলেন। তাদের এ অনাকাক্সিক্ষত ভূমিকা মইনুল হোসেনকে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করেছিল। দেশ নিয়ে তার দুর্ভাবনা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এ অর্জন বিসর্জন দেয়ার পর মইনুল হোসেন সুধীজনের সাথে আলাপচারিতায় প্রায়ই সখেদে প্রশ্ন তুলতেন, এ জন্য কি একাত্তরে এ দেশের ছাত্র-যুবক-জনতা জীবন দিয়েছিল? নারীরা হারিয়েছিলেন তাদের সম্ভ্রম? তার কাছে গণতন্ত্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের মহতী অর্জন। সেই গণতন্ত্র বিসর্জন দেয়ার পর স্বৈরশাসনাধীনে জীবনযাপন করা তার পক্ষে কতটা গ্লানিকর হয়েছিল, তা তার ঘনিষ্ঠজনরা সম্যক জানেন। সেই মনোবেদনা প্রকাশ পেত তার প্রতিটি লেখায় ও বক্তৃতায়। অজুহাত দেখিয়ে তিনি কলম থামিয়ে দেয়ার লোক ছিলেন না। এমনকি শেষ মুহূর্তে যখন গুরুতর অসুস্থ তখনো দেশের কথা ভেবেছেন এবং যথাসাধ্য লিখেছেন। অদম্য ইচ্ছাশক্তির স্বাক্ষর রেখে গেছেন তিনি তার শেষপর্যায়ের লেখাগুলোতে। শরীর রুগ্ণ হলেও চিন্তাশক্তি সক্রিয় ছিল।

আগেই বলেছি, জনস্বার্থ-সম্পর্কিত কোনো বিষয়কে মইনুল হোসেন পরিস্থিতির অজুহাতে এড়িয়ে যাননি। তার চরিত্রে পলায়নী মনোভাব ছিল না। লেখালেখির ক্ষেত্রে তিনি সর্বদা সুবিধাবাদী মনোভাব ও হঠকারী চিন্তাভাবনা এড়িয়ে চলতেন। আইনজ্ঞ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে সরকারি নীতির সমালোচনা করেছেন ক্ষুরধার যুক্তির ভাষায়। একজন নাগরিকের মৌলিক ও শাসনতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘন করে যখন আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বাড়াবাড়ি করেছে কিংবা জুলুম-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে, তখন কঠোর ভাষায় তার নিন্দা করেছেন। বিচারব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার সুবাদে তিনি এর শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত ছিলেন। বিচারকদের মধ্যে বিচারকসুলভ মনোভাবের অভাব দেখলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দ্বিধা করতেন না।

সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তার লেখকসত্তার কয়েকটি দিক সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রথমত, তিনি ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণীর সংবাদপত্র প্রকাশনা সংস্থার শীর্ষস্থানীয় কর্ণধার। সেই সুবাদে বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য তিনি পেতেন সাংবাদিকদের কাছ থেকে, যা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পেত তার বাইরেও অনেক বেশি খবর তিনি রাখতেন। ছিলেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পত্রিকার সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় কলামের সচেতন পাঠক। বিভিন্ন বিষয়ে কে কী ভাবছেন এবং লিখছেন, সে সম্পর্কে তার ছিল স্পষ্ট ধারণা। বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমায় জড়িত লোকজনের সাথে আলাপ করেও সাধারণ মানুষের অবস্থা জানার বাড়তি সুযোগ ছিল তার, যা অনেক লেখক, সাংবাদিকের ছিল না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল মনের মানুষ। সাধারণ মানুষের দুরবস্থা দেখলে তিনি লিখতে অনুপ্রাণিত হতেন।

আমাদের জাতীয় জাগরণ, সংগ্রাম ও স্বাধীনতা অর্জনের সাথে আওয়ামী লীগের নাম আর দৈনিক ইত্তেফাকের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যেমন জড়িয়ে আছে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সাথে নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার নাম। কিন্তু ইতিহাসের এমনই পরিহাস, সেই মানিক মিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র সংসদ থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এটি কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থসঙ্ঘাত-জনিত বিষয় ছিল না। কপট ভক্তিভাব দেখিয়ে তিনিও শেখ মুজিবের স্নেহধন্য থাকতে পারতেন; কিন্তু তাতে তার আদর্শিক শুদ্ধতা রক্ষা পেত না।

রাজনীতিকে তিনি কখনো ব্যক্তিপূজার বিষয় হিসেবে দেখেননি। যদিও পারিবারিক সম্পর্কের গভীরতার কারণে তার জন্য কঠিন ছিল সেই রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সরে দাঁড়ানো; ঝুঁকিও ছিল। কিন্তু এলোমেলো কিংবা ঢিলেঢালা বিশ্বাস নিয়ে তিনি রাজনীতি চর্চা করেননি। এ ক্ষেত্রে ছিলেন গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য। অনেকটা সে কারণে একাত্তরে স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে সোহরাওয়ার্দীর গড়া দল আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের পথ পরিত্যাগ করে একদলীয় রাজনীতি চর্চা নিরাপদ মনে করলে, তিনি সে দিন চলমান স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নেন। সেই সাথে সংসদ সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। বিষয়টি এভাবেও দেখা যায়, আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠনের পর তিনি আওয়ামী লীগকে ধারণ করেন। ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় ইঙ্গিতে অত্যাল্পকালের মধ্যে শেখ মুজিব ও তার স্বজনদের মর্মান্তিকভাবে জীবন দিয়ে সেই ভুলের মাশুল জোগাতে হয়।

একবার ভুল পথে গেলে দেশকে ঠিক রাস্তায় পুনরায় ফিরিয়ে আনতে অনেক বেগ পেতে হয়। তারপরও প্রত্যাবর্তন ঘটলে তাকে জন-আকাক্সক্ষার অনুকূলে রাখা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটতে দেখা গেছে। বাংলাদেশকে পুনরায় কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জনগণ সুশাসন থেকে বঞ্চিত থেকেছে। জেল-জুলুম, হামলা-মামলা, পুলিশি অত্যাচার এবং হত্যা-গুমের মাধ্যমে এক নারকীয় পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেখানে মানুষের সভ্য অস্তিত্ব অসম্ভব হয়ে ওঠে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ভোটের মাধ্যমে সরকার বদলের নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার কবর রচনা করা হয়। নির্বাচনী রাজনীতিকে কলঙ্কিত করা হয় দিনের ভোট রাতে সেরে। একশ্রেণীর সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক ও আমলা ব্যক্তিস্বার্থে সরকারি দলদাসে পরিণত হয়। দেশের সুশীল সমাজ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। এই দলীয়করণের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির বিরুদ্ধে অন্যতম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এ জন্য তার সাথে নিষ্ঠুর ব্যবহার করা হয়। জামিনযোগ্য একটি মানহানি মামলায় তাকে কারাবন্দী করা হয়। বিভিন্ন জেলায় তার বিরুদ্ধে ২০টিরও বেশি মামলা দেয়া হয়।

মইনুল হোসেন বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বিকাশে গণতান্ত্রিক বিশ্বের সাহায্য-সহযোগিতা অপরিহার্য। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক কারণে ও ব্যবসায়িক স্বার্থে যথাসময়ে সে সাহায্য বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগোষ্ঠী পায়নি। তাই দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির অভিশাপ জনগণকে ভোগ করে যেতে হয়েছে বছরের পর বছর। শিল্পপতি ও বণিকশ্রেণী নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে স্বৈরশাসনের সাথে আঁতাত করে গণবিরোধী ভূমিকা পালন করে গেছে। এদের একটি অংশ দেশের বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করে একাধিক ব্যাংককে ফাঁকা করে দিয়েছে।

দীর্ঘ দিন কর্মসূত্রে তার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার সুবাদে তাকে দেখা ও বোঝার যে সুযোগ হয়েছে, সেই সুবাদে এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারি- তিনি ছিলেন সত্যিকারের গণতন্ত্রে দৃঢ়প্রত্যয়ী একজন রাজনীতিমনস্ক মানুষ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দেশকে বারবার বিপথগামী করে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত করা হয়েছে। দলীয় সরকারকে ক্ষমতাসীন রেখে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের অভিনব বিধান পর্যন্ত সংবিধানে সংযোজিত করা হয়েছে। এসবের প্রতিবাদে আইন আদালতের মানুষ হিসেবে রাজনৈতিক নিবন্ধ লিখে তিনি তার বক্তব্য ও অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। দলীয় সরকারের অদূরদর্শী কার্যক্রম তাকে সর্বদা ব্যথিত, বিস্মিত ও প্রতিবাদী করেছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি শুভশক্তি ও শুভবুদ্ধির ওপর আশা ও বিশ্বাস রেখে গেছেন। তিনি তার একাধিক লেখায় তারুণ্যের ভেতর থেকে প্রতিবাদী শক্তির উত্থান ঘটবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে গেছেন। প্রত্যাশা করেছেন, তারুণ্য পারবে অদম্য শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। শেষ পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছে। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ও সংযমী ভূমিকায় নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনের দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এ কথা সত্য বটে, তিনি সেই ছাত্র-জনতার জাগরণ, লাখ লাখ মানুষের গণভবন অভিমুখে দৃপ্তপদে অগ্রসরমান মিছিল, ফ্যাসিস্ট শাসনের পতন ও শেখ হাসিনার পলায়ন দেখে যেতে পারেননি, মৃত্যু তাকে আগেই আমাদের মাঝ থেকে নিয়ে গেছে; কিন্তু আমরা নিশ্চিত যে- তার লেখাগুলো জুলাই মহাজাগরণে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে।

জাতীয় জীবনের পুনর্গঠনের এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মইনুল হোসেনের মননশীল চিন্তাভাবনা, শাসনতন্ত্র, নির্বাচনী ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, পুলিশি ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন ব্যবস্থা, আর্থিক ব্যবস্থা সংস্কারের প্রেরণা ও দিকনিদের্শনা দেবে। সেটি হলে লেখালেখির পরিশ্রম ও প্রত্যাশা সার্থক হবে। একজন সচেতন ও কর্মযোগী মানুষ এ পার্থিব জীবনে নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে থাকেন। কারো পক্ষেই পরিপূর্ণ শুদ্ধতা অর্জন করা সম্ভব হয় না। ভুল-ত্রুটি এবং অসম্পূর্ণতা মানুষের জীবনে থেকে যায়। মইনুল হোসেনও তার ব্যতিক্রম নন। তবে সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং সৎ কাজের জন্য মানুষ স্মরণীয় ও বরণীয় হয়। আইনজীবী ও সংবাদপত্রসেবী হিসেবে তার বহুমুখী কর্মকাণ্ড ও বিশেষভাবে লেখাগুলো তাকে স্মরণীয় করে রাখবে।

লেখক : সাহিত্যিক ও উপদেষ্টা সম্পাদক, দ্য নিউ নেশন