এক. বাংলাদেশে সুশাসনের জন্য মনস্তত্ত্ব বোঝা জরুরি। বিশ্লেষণ করা দরকার কর্তৃত্ব-মনস্তত্ত্ব, জবাবদিহির-মনস্তত্ত্ব এবং ভয়ের সংস্কৃতি বনাম আস্থার সংস্কৃতির। কর্তৃত্ব-মনস্তত্ত্ব কিভাবে গড়ে ওঠে, তা দেখতে গেলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। বাংলাদেশে এটি ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র, পাকিস্তানি সামরিক শাসন এবং পরবর্তী কেন্দ্রীভূত দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। এই প্রক্রিয়ায় একটি কেন্দ্রমুখী ক্ষমতা-মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়। যেখানে ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণের অধিকার হিসেবে দেখা হয়, পদকে ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রতীক হিসেবে, সমালোচনাকে অপমান হিসেবে নেয়া হয় এবং আনুগত্যকে যোগ্যতার চেয়ে বেশি মূল্য দেয়া হয়। এ ধরনের মনস্তত্ত্ব মূলত নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকে আসে। যে নেতা বা কর্মকর্তা নিজের অবস্থানকে নৈতিক বৈধতার বদলে ক্ষমতার জোরে টিকিয়ে রাখতে চান, তিনি স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনাকে হুমকি মনে করেন।
কর্তৃত্ব-মনস্তত্ত্বের ফল হিসেবে প্রশাসনে ভয়ভিত্তিক আনুগত্য তৈরি হয়। নীতিনির্ধারণে বিকল্প মত অনুপস্থিত থাকে। তথ্য গোপন করার প্রবণতা বেড়ে যায়। দুর্নীতি আড়ালে থাকে এবং ব্যক্তিপূজা জন্ম নেয়। ফলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, কিন্তু ব্যক্তি শক্তিশালী হয়। এ অবস্থার বিপরীতে জবাবদিহির-মনস্তত্ত্ব একটি মানসিক কাঠামো হিসেবে কাজ করে।
যেখানে ক্ষমতা একটি আমানত, পদ একটি দায়িত্ব, সমালোচনা উন্নতির সুযোগ এবং বিরোধী মত নীতির পরিমার্জনের জন্য গ্রহণযোগ্য। এখানে নেতৃত্বের পরিচয় বদলায়। তিনি শাসক নন, বরং সেবক ও নেতা।
জবাবদিহির-মনস্তত্ত্ব গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। তথ্যের উন্মুক্ততা। স্বাধীন গণমাধ্যম। কার্যকর সংসদীয় নজরদারি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ। তবে এসব কেবল কাঠামোগত নয়; এগুলোর পেছনে থাকে যে মানসিক প্রস্তুতি সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গভীর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন ব্যক্তি ক্ষমতাকে চূড়ান্ত সত্য মনে না করেন, নৈতিক বৈধতাকে রাজনৈতিক বৈধতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন এবং আত্মসমালোচনার ক্ষমতা অর্জন করেন।
দ্বিতীয়ত, ভয়ের সংস্কৃতি বনাম আস্থার সংস্কৃতির প্রসঙ্গ। ভয়ের সংস্কৃতি তখনই কাজ করে, যখন রাষ্ট্র আইন প্রয়োগে পক্ষ-বিপক্ষ বাছাই করে, প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে থাকে, বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ ও অনিশ্চিত হয় এবং দুর্নীতি সাধারণ বাস্তবতা হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকরা আইনকে নৈতিক কর্তব্য হিসেবে নয়, বরং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উপায় হিসেবে দেখে। তারা ভাবতে থাকে, ‘ধরা না পড়লে সমস্যা নেই।’ এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। ভয়ের সংস্কৃতির ফল হিসেবে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন থেমে যায়। প্রশাসনে সত্য নিরুৎসাহিত হয়। রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি পায় এবং আইনের প্রতি সম্মান নষ্ট হয়। ভয় মানুষকে নীরব করে, কিন্তু নৈতিক বানায় না।
এর বিপরীতে আস্থার সংস্কৃতি তখন তৈরি হয়, যখন আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। যখন দুর্নীতির বিচার হয় দৃশ্যমান। যখন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গতভাবে ব্যাখ্যা করা হয় এবং নাগরিককে শত্রু নয়, বরং অংশীদার হিসেবে দেখা হয়, তখন আস্থা জন্মায় পূর্বানুমানযোগ্যতা থেকে। যখন মানুষ জানে আইন ন্যায়সঙ্গত ও ধারাবাহিক, তখন তারা আইন মানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আস্থার সামাজিক প্রভাবও হয় ব্যাপক। কর আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়ে, নাগরিক অংশগ্রহণ বেড়ে যায়, সামাজিক সংহতি ও রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সম্ভব হয়। আস্থা একধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলো হলো : ন্যায়বিচারের দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করা, পুলিশি ও প্রশাসনিক সংস্কার, নাগরিক সেবায় প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা, দলীয় প্রভাবমুক্ত নিয়োগ এবং রাজনৈতিক সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা। এসব পরিবর্তন ছাড়া শুধু আইন কঠোর করলেই সুশাসন আসবে না।
দুই. বাংলাদেশে সুশাসনের সওয়াল যখন আসে, তখন পৃষ্ঠপোষকতা-মনস্তত্ত্ব এবং দুর্নীতির মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করা জরুরি। পৃষ্ঠপোষকতা-মনস্তত্ত্ব একটি সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো। যেখানে ব্যক্তি তার অধিকার ও সুযোগ হাসিল করতে ক্ষমতাবান ব্যক্তির আশ্রয়ের ওপর নির্ভর করে। কোনো প্রতিষ্ঠান ও কানুন সেখানে কাজ করে না। এই কাঠামোয় রাষ্ট্র নয়, ব্যক্তি হয়ে ওঠে সুযোগের উৎস। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি তিনটি স্তরে কাজ করে। ক. নিরাপত্তার বিনিময়ে আনুগত্য। খ. সুযোগের বিনিময়ে সমর্থন এবং গ. ব্যক্তিগত লাভের বিনিময়ে নৈতিক আপস।
বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক উত্তরাধিকার, দলীয়করণ, স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সমন্বয়ে। ফলে মানুষ মনে করে, যোগ্যতা থাকলেই হবে না; পরিচয় থাকতে হবে। এ মনস্তত্ত্ব নাগরিককে অধিকার-সচেতন মানুষ থেকে নির্ভরশীল আবেদনকারীতে পরিণত করে। এর মানসিক প্রক্রিয়ায় থাকে অনিরাপত্তা ও নির্ভরতা; যা মানুষকে শক্তিশালী কারও ছায়া খুঁজতে বাধ্য করে। তখন আনুগত্যের বিনিময়ে নিজের স্বাধীন নৈতিক অবস্থান বিসর্জন দেওয়া হয়। মানে আমাদের লোক হলে দুর্নীতি মাফযোগ্য।
এর ক্ষতি স্পষ্ট। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, ন্যায়বিচার ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে, প্রশাসনে যোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ে এবং দলীয় বিভাজন গভীর হয়। সুশাসনের জন্য প্রয়োজন মানসিক পরিবর্তন। প্রয়োজন দলীয় আনুগত্যের চেয়ে নৈতিক মানদণ্ডের প্রাধান্য, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা।
দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন নয়। এটি নৈতিক আত্মপ্রবঞ্চনার ফল। মানুষ নিজেকে খারাপ মনে না করবার জন্য বিভিন্নভাবে দুর্নীতির যৌক্তিকীকরণ করে। যেমন— সবাই তো করছে, আমি না নিলে অন্য কেউ নেবে, এটা ঘুষ নয়, হাদিয়া। যখন পুরো অফিস বা প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিগ্রস্ত, তখন ব্যক্তি অপরাধবোধ হারায়, কারণ সে একা নয়; সবাই করছে।
ক্ষমতা আবার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দেয়। ক্ষমতাবান ব্যক্তি মনে করেন, তিনি ধরা পড়বেন না, তার কাজের জবাবদিহি নেই। তিনি ক্ষমতাবান, তাই তিনি ‘ব্যতিক্রম’। এর ফলে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।
বাংলাদেশে দুর্নীতির মূল কারণ হলো স্বল্প বেতন, উচ্চ প্রত্যাশা, সামাজিক মর্যাদা অর্জনের চাপ, রাজনৈতিক সুরক্ষা, দুর্বল শাস্তির সংস্কৃতি এবং সামাজিক সহনশীলতা। এর ক্ষতি গভীর। ন্যায়বিচার ধ্বংস হয়, মেধা ও দক্ষতা নিরুৎসাহিত হয়, বৈষম্য বাড়ে, নাগরিক আস্থা নষ্ট হয় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো মানুষের বিবেকের বিনাশ।
এর প্রতিরোধে প্রয়োজন নৈতিক পরিচয়ের পুনর্গঠন। তাকওয়া বা খোদাভীতির হাত দিয়ে মানসিক গঠন নিশ্চিত করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, আমি সৎ মানুষ, ঘুষ নেওয়া আমার পরিচয়ের বিরোধী। দৃশ্যমান ও সমান শাস্তি ন্যায়ের বোধ সৃষ্টি করে। স্বচ্ছতা ডিজিটাল সেবা, উন্মুক্ত তথ্য ও অডিট ব্যবস্থার মাধ্যমেও নিশ্চিত করা যায়। সামাজিকভাবে দুর্নীতিকে লজ্জার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে ।
তিন. বাংলাদেশে নাগরিক চেতনা ও আত্মমর্যাদাবোধ এবং নেতৃত্বের মনস্তত্ত্বকে বোঝা মানে সুশাসনের গভীর কাঠামোর দিকে তাকানো। দেশের সামাজিক মনস্তত্ত্বে এখনো একটি অবচেতন ‘প্রজা-চেতনা’ কাজ করে। যেখানে মানুষ ভাবেন রাষ্ট্র তার অধিকারের অধিক। ক্ষমতা তার বাইরের বিষয়। তার উচিত কেবল মেনে নেওয়া, পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়া। অন্য দিকে সচেতন নাগরিকের মানসিকতা পুরো ভিন্ন। রাষ্ট্র তারও, ক্ষমতা জনগণের অর্পিত এবং সে অধিকার ও দায়িত্ব উভয়ের অংশীদার। এই মানসিক পার্থক্য সুশাসনের মূল ভিত্তি নির্ধারণ করে।
আত্মমর্যাদা ছাড়া নাগরিকত্ব পূর্ণতা পায় না। যে ব্যক্তি নিজের মর্যাদা অনুভব করে, সে ঘুষ দিতে লজ্জা পায়। সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহসী হয়। আইন মানাকে সে নিজের দায়িত্ব মনে করে। ভোটকে সে মূল্যবান সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু আত্মমর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষ হয়ে যায় সুবিধাবাদী। তখন সে হয় নীরব দর্শক এবং পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়া মানুষ।
বাংলাদেশের নাগরিক চেতনা দুর্বল হওয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরুকরণ, শিক্ষায় নাগরিক মূল্যবোধের ঘাটতি ও সামাজিক বৈষম্য। একই সাথে ন্যায়বিচারের অনিশ্চয়তা এবং পরিবার ও সমাজে কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতিও এজন্য দায়ী।
নাগরিক চেতনা গঠনের জন্য কয়েকটি উপাদান অপরিহার্য। প্রথমত, আইনের জ্ঞান। মানুষ যদি জানে তার অধিকার কী, তবে সে দাবি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, অংশগ্রহণের সংস্কৃতি। স্থানীয় সরকার, সামাজিক উদ্যোগ এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের মাধ্যমে নাগরিক দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। তৃতীয়ত, নৈতিক সাহস। ভুলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি। চতুর্থত, সমালোচনামূলক চিন্তা। গুজব ও প্রচারণা থেকে আলাদা করে সত্য যাচাই করার ক্ষমতা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নাগরিকের সচেতনতায়। তারা কি শুধু ভোটার হিসেবে থাকবে, নাকি নীতিনির্ধারণের অংশীদার হবে। সুশাসনের প্রাণ হলো সচেতন নাগরিক, নাগরিক সচেতনতা।
নেতৃত্বের মনস্তত্ত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা মানুষের আচরণকে বদলে দেয়। এটি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, কিন্তু সহমর্মিতা কমাতে পারে। এখানে জবাবদিহি কমলে আত্মনিয়ন্ত্রণও কমে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা প্রায়ই ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে। দায়িত্বের চেয়ে প্রতিষ্ঠাই এখানে মুখ্য। সুস্থ নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য হলো নৈতিক স্থিতি; সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিবেকের সাথে সংলাপ। সুস্থ নেতৃত্বের থাকবে ক্ষমতার সীমাবোধ; ‘আমি ভুল করতে পারি’ এই উপলব্ধি। তার মধ্যে থাকবে সমালোচনা গ্রহণের সক্ষমতা; ইনসাফপূর্ণ সমালোচনাকে তিনি আক্রমণ নয়, উন্নতির উপকরণ হিসেবে দেখবেন। নেতৃত্বের থাকবে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার চেয়ে স্থায়ী নীতি গ্রহণ করবেন নেতৃত্ব।
অনিরাপত্তা থেকে অনেক সময় নেতৃত্ব অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণপ্রবণ হয়ে ওঠে। যে সব নেতা মনে করেন ‘আমি ছাড়া সব ভেঙে পড়বে’, তারা দল ও প্রতিষ্ঠানকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেন। ফলে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি হয় না, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয় এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি সংকুচিত হয়।
চার. বাংলাদেশে সুশাসন কেবল নির্বাচনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ক্ষমতার শীর্ষে থাকার বিষয় নয়। এটি মূলত সংলাপের সংস্কৃতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। নির্বাচন ক্ষমতা নির্ধারণ করে, কিন্তু সংলাপ ক্ষমতার ব্যবহারকে নৈতিক ও গ্রহণযোগ্য করে। যে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক, সেখানে সংলাপের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তিনটি মূল উপাদানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথমত, ভিন্নমতের বৈধতা স্বীকার। দ্বিতীয়ত আত্ম-সংশোধনের প্রস্তুতি। তৃতীয়ত, প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, অংশীদার হিসেবে দেখা। সংলাপ তখনই সম্ভব যখন ব্যক্তি নিজের অবস্থানকে চূড়ান্ত সত্য মনে না করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়ই দেখা যায় মতভেদ ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়। বিরোধিতা এক দিকে ইনসাফের বদলে জুলুমে রূপান্তরিত হয়, অন্য দিকে সরকারের বিরোধিতা রাষ্ট্রবিরোধী তকমা পায়। সমালোচনাকে এখানে ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এটি সরকারী ও বিরোধী দলের সম্পর্ককে প্রতিযোগিতামূলক শত্রুতায় রূপ দেয়।
সুস্থ রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে মতভেদকে চিন্তার বৈচিত্র্য হিসেবে দেখা হয়। বিরোধিতাকে দেখা হয় নীতির বিকল্প হিসেবে। সমালোচনাকে বিচার করা হয় নীতির পরিমার্জনের উপকরণ হিসেবে। সংলাপকে গ্রহণ করা হয় পারস্পরিক শেখার মাধ্যম হিসেবে । লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস বা পরাজিত করা নয়, বরং রাষ্ট্রকে উন্নত করা। সংলাপের সংস্কৃতি গড়তে হলে কার্যকর ও সম্মানজনক সংসদীয় বিতর্ক প্রয়োজন। গণমাধ্যমে যুক্তিনির্ভর আলোচনার চর্চা, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধাচারের বিকল্প নেই। একই সাথে সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্বশীল যোগাযোগ এবং শিক্ষায় বিতর্ক ও সংলাপচর্চা অপরিহার্য। যেখানে সংলাপ নেই, সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু সম্মতি জন্মায় না।
শিক্ষাব্যবস্থা হলো সুশাসনের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি। তথ্যভিত্তিক, পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও চাকরিমুখী শিক্ষার মাধ্যমে তথ্য মুখস্থ হয়। কিন্তু নৈতিক বিচারবোধ ও নাগরিক চেতনা তৈরি হয় না। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন চারটি স্তম্ভ। ক. নৈতিক শিক্ষা, খ. যুক্তিবোধ, গ. সমালোচনামূলক চিন্তা এবং ঘ. সামাজিক দায়িত্ববোধ। নৈতিক শিক্ষা মানে সততা, ন্যায় ও দায়িত্ববোধকে জীবনের অংশ বানানো। যুক্তিবোধ মানে গুজব ও বিভ্রান্তিপূর্ণ ন্যারেটিভ থেকে সত্যকে পৃথক করার ক্ষমতা। সমালোচনামূলক চিন্তা মানে প্রশ্ন করার সাহস ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা। সামাজিক দায়িত্ববোধ মানে শুধু নিজের সাফল্য নয়, সমাজের কল্যাণচিন্তা।
বাংলাদেশে সুশাসন কেবল আইন, নির্বাচন বা প্রশাসনিক কাঠামোর বিষয় নয়। এটি গভীরভাবে একটি মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক রূপান্তরের প্রশ্ন। কর্তৃত্ব-মনস্তত্ত্ব, পৃষ্ঠপোষকতা-সংস্কৃতি, দুর্নীতির আত্মপ্রবঞ্চনা এবং প্রজা-চেতনার সমাহারেই একটি কেন্দ্রমুখী, ব্যক্তি-নির্ভর ও ভয়ভিত্তিক শাসন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল, আস্থা ক্ষীণ এবং ন্যায়বোধ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এর বিপরীতে প্রয়োজন জবাবদিহির-মনস্তত্ত্ব, আস্থার সংস্কৃতি, অধিকার-সচেতন নাগরিকত্ব এবং নৈতিক নেতৃত্ব। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্বচ্ছতা, আইনের সমান প্রয়োগ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং সংলাপের সংস্কৃতি। এসব কেবল নীতিগত নয়, মানসিক প্রস্তুতিরও বিষয়।
সুশাসন তখনই টেকসই হবে, যখন নাগরিক নিজেকে অধিকার ও দায়িত্বের অংশীদার ভাববে। যখন দুর্নীতিকে অস্তিত্বগত পাপ ও সামাজিক লজ্জা হিসেবে দেখা হবে , তখন স্বচ্ছতা মন থেকে বিকশিত হবে। নেতৃত্ব যখন ক্ষমতাকে মর্যাদা নয়, আমানত হিসেবে গ্রহণ করবে, তখন স্বৈরাচারী হবার প্রবণতাকে সে রোধ করবে। বাংলাদেশের আগামী নির্ভর করছে এই মানসিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ওপর।
লেখক: কবি, গবেষক



