ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান
বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় যে ক’জন মানুষ আজও প্রাসঙ্গিক, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তাদের অগ্রভাগে অবস্থান করছেন। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না- তিনি ছিলেন একটি যুগের প্রতীক, একটি আন্দোলনের নাম, এক অনমনীয় প্রতিবাদের ইতিহাস। তার রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল শোষণ, জুলুম-বৈষম্যহীন সমাজ ও জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সঙ্কটে ভাসানীর চিন্তাধারাকে পুনরায় আলোচনায় আনা আজ সময়ের দাবি।
জনগণের রাজনীতি ও মজলুমের নেতৃত্ব মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের মূল সুর ছিল ‘মজলুমের রাজনীতি’ অর্থাৎ- নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে অবস্থান। তিনি কখনো শাসকশ্রেণীর রাজনীতি করেননি; বরং সমাজের নিচুতলার মানুষ- চাষি, মজুর, জেলে, শ্রমিক, বেকার যুবক, উপেক্ষিত নারী, এই জনগোষ্ঠীকেই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিলেন। ভাসানী বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি মানে ক্ষমতার দখল নয়; বরং জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার সংগ্রাম। তার বিখ্যাত আহ্বান- ‘মজলুম জনতা এক হও’ ছিল সমাজতান্ত্রিক মানবতাবাদের বাস্তব প্রয়োগ।
রাজনীতিকে তিনি দেখেছেন নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে, ক্ষমতার লালসা নয়; বরং দায়িত্ব ও ত্যাগের ক্ষেত্র হিসেবে। এ জন্যই তিনি নিজের নামের সাথে ‘মওলানা’ উপাধি ধরে রেখেছিলেন, যা ছিল ধর্মীয় নেতৃত্ব ও জনকল্যাণের প্রতীক। তার রাজনীতি ধর্মকে বিভাজনের হাতিয়ার নয়; বরং ইনসাফভিত্তিক ন্যায়ের দর্শন হিসেবে ব্যবহার করেছে।
শোষণমুক্ত সমাজ ও অর্থনৈতিক ন্যায় ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। তিনি বুঝেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ যখন অর্থনৈতিক মুক্তি আসে জনগণের জীবনে। পাকিস্তান আমলে যেমন তিনি কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণীর অধিকার রক্ষায় লড়াই সংগ্রাম করেছিলেন, তেমনি স্বাধীনতার পর তিনি শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হন।
ভাসানীর দৃষ্টিতে বৈষম্যের মূল উৎস পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতি। তিনি বলেছিলেন, ‘এই দেশে ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে, গরিবরা আরো গরিব হচ্ছে- এ কেমন স্বাধীনতা?’ এই প্রশ্ন আজও সমানভাবে প্রযোজ্য। তার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক মডেল ছিল- স্বনির্ভর কৃষিভিত্তিক সমাজ, যেখানে উৎপাদন ও বণ্টনে সমতা থাকবে। ভাসানী বিশ্বাস করতেন, বিদেশী প্রভুত্ব ও একচেটিয়া পুঁজির শৃঙ্খল ভাঙা ছাড়া শোষণমুক্ত অর্থনীতি সম্ভব নয়। তিনি জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা এবং ন্যায্য মজুরির দাবিকে রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি করতে চেয়েছিলেন। ভাসানীর চিন্তায় অর্থনীতি ও নৈতিকতা অভিন্ন। তিনি বলতেন, ‘ইনসাফ ছাড়া উন্নয়ন হয় না’। তার ইনসাফভিত্তিক সমাজ মানে শুধু অর্থনৈতিক বণ্টন নয়; বরং ন্যায়বোধের ভিত্তিতে রাষ্ট্রচর্চা।
ধর্ম, মানবতা ও রাজনীতি : মওলানা ভাসানী ছিলেন গভীর ধর্মপ্রাণ মানুষ; কিন্তু তার ধর্মচিন্তা ছিল অন্ধ আনুগত্য নয়; বরং সামাজিক ন্যায়ের হাতিয়ার। তিনি ইসলামকে দেখেছিলেন মানবমুক্তির দর্শন হিসেবে। এ জন্যই তিনি বলতেন, ‘ইসলাম মানে ইনসাফ, ইসলাম মানে সাম্য, ইসলাম মানে শোষণের বিরোধিতা।’
ভাসানীর রাজনীতি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ অর্থে নয়; বরং ধর্মসচেতন ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি। তার চিন্তায় ধর্ম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে, বিভক্ত নয়। তিনি ধর্মকে ব্যবহার করেছেন সমাজ-সংস্কারের শক্তি হিসেবে, যা জনগণকে আত্মবিশ্বাস ও মুক্তির দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম ও জাতীয় স্বাধীনতা : মওলানা ভাসানী ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দিকের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নেতা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলের পশ্চিম পাকিস্তানি আধিপত্য এবং স্বাধীনতার পর ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী অবস্থান- সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন এক আপসহীন কণ্ঠস্বর।
১৯৭৬ সালের ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ ছিল তার জাতীয় সার্বভৌমত্ববোধের বাস্তব রূপ। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিবাদে লাখো মানুষের এই মিছিল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ গণ-আন্দোলনগুলোর একটি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নদী বাঁচাতে এসেছি, আমি দেশ বাঁচাতে এসেছি।’ এই আন্দোলন শুধু পানি বা নদীর জন্য নয়- এটি ছিল জাতীয় স্বার্থ, পরিবেশ, প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারের জন্য এক ঐতিহাসিক লড়াই। আজ যখন দেশী-বিদেশী প্রভাব, ঋণের ফাঁদ ও অর্থনৈতিক পরনির্ভরতার মধ্যে জাতি জর্জরিত, তখন ভাসানীর স্বনির্ভরতা ও জাতীয় মর্যাদার দর্শন আবারো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
ভাসানীর কৃষক-শ্রমিক সমাজ ও গণতন্ত্রের বিকল্প ভাবনা : ভাসানী ছিলেন জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণভিত্তিক গণতন্ত্রের প্রবক্তা। তার মতে, ভোটের রাজনীতি বা সংসদীয় গণতন্ত্র কেবল তখনই অর্থবহ, যখন তা শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। তিনি বলতেন, ‘গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়, গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন।’ এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি কৃষক-শ্রমিক সরকারের ধারণা দেন- যেখানে প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণে কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে। আজকের দিনে যখন রাজনীতি ধনীদের লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, তখন ভাসানীর এই জনগণের শাসন-ধারণা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ন্যায্য দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
মানবিক রাজনীতি ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত ভাসানী ছিলেন এমন এক নেতা যিনি ক্ষমতার অলিন্দে নয়, রাজপথে বেঁচে ছিলেন। তিনি কখনো মন্ত্রিত্ব, রাজপ্রাসাদ বা বিলাসিতা চাননি। তার শেষজীবন কেটেছে কুঁড়েঘরে, সাধারণ কৃষক-শ্রমিকের সান্নিধ্যে। তিনি রাজনীতিকে দেখেছিলেন ত্যাগ ও দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র হিসেবে। তাকে বলা হয় ‘মজলুম জননেতা’। মওলানা ভাসানী প্রমাণ করেছেন, নেতৃত্ব মানে শুধু দিকনির্দেশনা নয়; বরং আদর্শের প্রতীক হওয়া।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মওলানা ভাসানীর প্রাসঙ্গিকতা : বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ে জর্জরিত। ধনী-গরিবের ব্যবধান ভয়াবহ, শ্রমিক-কৃষক ও মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন নানাভাবে বঞ্চিত। রাষ্ট্রযন্ত্র হয়ে উঠেছে সুবিধাভোগীদের রক্ষাকবচ। এই পরিস্থিতিতে ভাসানীর চিন্তাধারার পুনর্জাগরণ নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে ।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন- রাজনীতি মানে ক্ষমতা নয়, দায়বদ্ধতা। নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। স্বাধীনতা মানে শুধু পতাকা নয়, মানুষের পেট ভরার নিশ্চয়তা। ইসলাম মানে ইনসাফ, সমতা ও মানবতা। পররাষ্ট্রনীতি মানে আত্মমর্যাদা, বিদেশী দাসত্ব নয়। গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন, দালালের নয়। ভাসানীর শোষণমুক্ত রাষ্ট্রধারণা আজকের রাষ্ট্র সংস্কারের মূল প্রেরণা হতে পারে।
মওলানা ভাসানী আমাদের জাতীয় চেতনার এমন এক প্রতীক, যিনি আজও আমাদের মুক্তির পথ দেখান। শোষণ, জুলুম, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম আজও অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি দেখিয়েছিলেন, রাজনীতি যদি জনগণের মুক্তির জন্য হয়, তবে তা ইবাদতের সমান মর্যাদা পায়। অতএব, আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব- ভাসানীর চিন্তাকে শুধু স্মরণ নয়; বরং বাস্তবায়ন করা। ভাসানীর স্বপ্ন ছিল- একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ, যেখানে মানুষ মানুষকে শোষণ করবে না। এই স্বপ্নই হতে পারে আগামী বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি।
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ লেবার পার্টি



