বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটের দোতলার লাইব্রেরিতে যেতে-আসতে প্রায়ই দেখতাম সারি সারি জৌলুসপূর্ণ সব দোকান। বিশেষ করে ঝলমলে জুয়েলারি শপগুলো। যা সাধ্যের বাইরে তা সবসময়ই আকর্ষণ করে। মার্কেটের এক-দু’টি দোকান ছিল ব্যতিক্রম। যেমন অস্ত্রের দোকান। একটি দোকানের মাথায় বিশাল আকারের অক্ষরে লেখা ছিল ‘বন্দুকের দোকান’। কোনো কারণ ছাড়াই মনে প্রশ্ন জাগত এটিকে ইংরেজিতে কী বলে, গান শপ, নাকি আর্মস শপ? পরে জেনেছি, কানাডার লেখক এ ই ভ্যান ভোগটের একটি কল্পবিজ্ঞান গল্পের নাম ‘দ্য ওয়েপন শপ’। সে যাক। ‘বন্দুকের দোকান’ সাইনবোর্ডের নিচে গুটানো কলাপসিবল গেটের একপাশের আংটায় ঝুলত আরেকটি মিনি সাইনবোর্ড ‘এখানে ছুরি কাঁচি শান দেয়া হয়’। বন্দুকের দোকানে ছুরি ধার দেয়া! কী আশ্চর্য! এই বৈপরীত্য, কাব্যের ভাষায় বিরোধাভাস, প্রথম যেদিন দেখি, কৌতুক বোধ করেছি। মুখটিপে নিঃশব্দে হেসেছিও। যদিও ছুরি ধার করার নয়, ওরা সত্যিই পিস্তল-রিভলবার-রাইফেলের মতো স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদের ইমপোর্টার ও সেলার। হয়তো লাখ বা কোটি টাকার ট্রানজেকশন ওদের। আর দোকানের পাশে সাইকেলের প্যাডেলে শানের চাকতি ঘুরিয়ে ছুরি ধার দেয় এক গরিব হকার। সেদিন হাসি পেলেও এখন আর হাসি না। কারণ ওর চেয়েও অনেক বড় বড় কৌতুকপ্রদ ঘটনার উদাহরণ এখন জানা। বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক দল তিন তিনবার শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তিনবারই গণতন্ত্র হত্যা এবং জনগণের সব অধিকার হরণ করে নির্ভেজাল একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে, নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে গায়ের জোরে একের পর এক মসনদ হাইজ্যাক করেছে সেই দলটিকে বলা হয় দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রসেনানী। দলটি দেশের সব স্বার্থ এমনকি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বও তুলে দিয়েছে বিদেশী প্রভুর কাছে। তারপরও এই দলের অনুসারীরাই নাকি স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি। এর চেয়ে বড় কৌতুক আর কী হতে পারে!
একইরকম কৌতুক বোধ করি আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের কথা উঠলেও। ভারত নামের সুপারশপের কপালে বিপুলায়তনের একখানা অদৃশ্য সাইনবোর্ড আছে। তাতে লেখা ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র’। এর পাশেই যে ছুরি কাঁচি শান দেয়া হয়-এর মতো আরো একটি বোর্ড লাগানো আছে সেটি অনেকেরই নজর কাড়ে না। সাধারণের নজর এড়ালে সমস্যা নেই। কিন্তু যারা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক চালচিত্র বিচার-বিশ্লেষণ করেন তারা যদি ভারতের কপালে ও পেটের ভাগে সাঁটা দু’টি আলাদা বোর্ড দেখতে না পান তাহলে সমস্যাই বটে।
এত কথা বলা মূলত একটি বই পাঠের প্রতিক্রিয়া উপস্থাপনের গৌরচন্দ্রিকা হিসেবে। তো চলুন এবার মূল প্রতিপাদ্যে ঢুকে পড়া যাক। পড়ছিলাম টিম মার্শালের একটি বই। টিম ব্রিটিশ সাংবাদিক। তিন দশক ধরে পেশায় সক্রিয় থেকে শীর্ষ ছুঁয়েছেন। সাংবাদিকতা না পড়েও স্কাই নিউজের বৈদেশিক সংবাদদাতা ও কূটনৈতিক সম্পাদক হয়েছেন।
বিশ্বের নানা প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ-সঙ্ঘাতের বেশির ভাগই তিনি অকুস্থলে হাজির থেকে কভার করেন। যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন, বসনিয়ায় বর্বর সার্বদের মুসলিম নিধন, কসোভো সঙ্কট, ইরাকে বুশ-ব্লেয়ারের মিথ্যাচারের যুদ্ধ, আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসন, মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, ইসরাইলের তথাকথিত আত্মরক্ষার লড়াই তিনি প্রত্যক্ষ করেন কাছ থেকে। সোভিয়েতের ভাঙন, বার্লিন প্রাচীরের পতন, জার্মানির একীভবন এগুলোও। এসব সঙ্কটকালে দেদার লিখেছেন ব্রিটেনের সব প্রভাবশালী পত্রিকাসহ বৈশ্বিক গণমাধ্যমে।
মার্শাল তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় জেনেছেন, দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে অথবা ঘোরতর যুদ্ধে দেশগুলোর ভৌগোলিক পরিবেশ কিভাবে অন্যতম কুশীলব হয়ে ওঠে, কিভাবে জয়-পরাজয়ের সীমারেখা টেনে দেয় অথবা নির্দিষ্ট ফলাফলের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।
ভূগোল বা জিওগ্রাফি মানে তো কেবল পৃথিবী ও তার গঠন বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা নয়; বরং এতে ভূ-প্রকৃতির সাথে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় মানুষ, তাদের ধর্ম ভাষা সংস্কৃতি, জীবজগৎ, জলবায়ু, পরিবেশ, পাহাড়-নদী সাগর অরণ্য এবং এই সব কিছুর পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য অথবা অপ্রতুলতা হতে পারে কোনো জাতির আত্মরক্ষার বীজমন্ত্র বা বিপর্যয়ের সুপ্ত বিষের বড়ি। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে মার্শাল লিখেছেন তার বই ‘প্রিজনার্স অব জিওগ্রাফি-টেন ম্যাপস দ্যাট টেল ইউ এভরিথিং ইউ নিড টু নো অ্যাবাউট গ্লোবাল পলিটিক্স।’ আইডিয়াটা খুব কি নতুন? মোটেও না। পরাক্রান্ত বৈদেশিক শক্তির আগ্রাসনে বারবার পদানত হয়েও আফগানিস্তান কিভাবে অজেয় থেকেছে সেই আলোচনায় অনেক আগেই বিশ্লেষকরা দেশটির বিপুল বিস্তৃত পাহাড়শ্রেণী বেষ্টিত রুক্ষ ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর ভূমিকা দেখেছেন। সুউচ্চ ও বিশাল হিমালয় পর্বতমালা কিভাবে ভারতের জন্য চীনের মতো পরাশক্তির সর্বাত্মক আক্রমণের প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে সে তথ্যও সবার জানা। তিন হাজার বছর আগে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট সিন্ধু নদের পাড় থেকে ফিরে যেতে বাধ্য হন ভারত আক্রমণ না করেই সেটি কে না জানে? বাংলা যে বেশ অনেককাল বাইরের শক্তির অধীনতামুক্ত থাকতে পেরেছে এর প্রমত্ত নদীজাল ও ঘনঘোর বর্ষার কারণে তা কি অজানা আমাদের! অথবা হিটলারের রাশিয়া অভিযানের ব্যর্থতার কারণ!
সুতরাং বিশ্বজয়ী সেনাপতি বা রাষ্ট্রনায়করা ভূগোলের কাছে প্রায়শ অসহায় এবং কার্যত হাত-পা বাঁধা, এই আইডিয়া অভিনব তো নয়ই, কোনো সবিশেষ উদ্ভাবনও নয়। বাকি থাকে মার্শালের আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক, স্বার্থের সঙ্ঘাত, আজ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ ইত্যাদির বিশ্লেষণ ও উপসংহারে তার অনুসিদ্ধান্তগুলো। ২০১৫ সালে প্রথম প্রকাশ পায় লন্ডনে। এত বছর পর পড়া হলো। ধন্যবাদ ঢাকার পাইরেসি মাস্টার্স। কিন্তু ভাবছি, মাঝের ১০ বছরে ভূ-রাজনীতি কি ওই কালপর্যায়েই আটকে আছে?
মার্শালের নিজের দেশ ব্রিটেনে উপর্যুপরি সরকারের বদল হয়েছে। বিশ্বের অনেকগুলো দেশে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার এসেছে। বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট শাসকের পৈশাচিক নৃশংসতায় প্রায় দুই হাজার ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য মানুষের অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট শাসকের অভাবিত পতন ও পলায়নের ঘটনা বিশ্বের বিস্ময়। সিরিয়ায় একনায়কের পতনে প্রায় ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান গোটা মধ্যপ্রাচ্যের দৃশ্যপটের খোলনলচে পাল্টে যাওয়ার আলামত দেখা যাচ্ছে। ফিলিস্তিনের গাজায় মুক্তিকামী হামাস যোদ্ধাদের অতর্কিত ও অবিশ্বাস্য আক্রমণে হতচকিত ইসরাইলের নির্বিচার গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে বিশ্ব স্তম্ভিত।
এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত ৮০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে বিশ্বের একক পরাশক্তি আমেরিকায়। যেখানে একজন মাত্র ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফিরে বিপুল পরাক্রমে তার ইনিংস শুরু করেছেন। আর মাত্র ৬০ দিনেরও কম সময়ের মধ্যে একাই গোটা নিয়মতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা তছনছ করে ছেড়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে মার্শালের বিশ্ববীক্ষণ এখনো কতটা প্রাসঙ্গিক সে প্রশ্ন অযৌক্তিক নয়। তবু আমরা অন্তত এশিয়া ও উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতি নিয়ে টিমের পর্যবেক্ষণ সাগ্রহে পাঠ করতে চাই। কারণ, এই নাট্যমঞ্চ থেকেই উত্থান হতে যাচ্ছে পরবর্তী বৈশ্বিক সুপার পাওয়ারের। একই কারণে বর্তমান সুপার পাওয়ারসহ বিশ্বশক্তির যারা প্রোটাগনিস্ট তাদের নতুন রঙ্গমঞ্চ হয়ে উঠেছে এই এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল। আসুন টিমের পর্যবেক্ষণ দেখি। মাঝে মধ্যে ফোড়ন কাটার মতো আমাদের মন্তব্য ঢুকে যাবে। আগেই জোড়হাত হই।
রাশিয়া প্রসঙ্গ : বইয়ের প্রথম পরিচ্ছেদ রাশিয়া নিয়ে। দেশটির বিশাল আয়তন, প্রাকৃতিক সুবিধা ও প্রতিবন্ধক সবিস্তারে তুলে ধরলেও ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার তির্যক মন্তব্য মনে করেন টিম, ওবামা বলেন, রাশিয়া এখন আরেকটি আঞ্চলিক পরাশক্তির চেয়ে বেশি কিছু নয়।
চীন প্রসঙ্গ : চীন অর্থনৈতিক শক্তিতে আমেরিকার সমকক্ষতা অর্জন করতে যাচ্ছে, এতে তার বৈশ্বিক প্রভাবও বেড়েছে। কিন্তু সামরিক দিক থেকে দেশটি এখনো কয়েক দশক পিছিয়ে। চীন যতক্ষণ এই ব্যবধান ঘোচানোর চেষ্টায় ব্যয় করবে সেই সময়ে আমেরিকা তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে যা কিছু করণীয় সবই করে ফেলবে। টিম বলছেন, যে যাই বলুক, আমেরিকার জায়গায় পৌঁছতে আরো শতাব্দীকাল লেগে যেতে পারে চীনের।
চীনের সমস্যাগুলো অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেন টিম মার্শাল, যা কৌতূহলোদ্দীপক। বলেছেন, মধ্য-এশিয়া হয়ে যেকোনো হুমকি ঠেকাতে উত্তর-পশ্চিমের উইঘুর মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য জিনজিয়াং এবং ভারতের দিক থেকে সম্ভাব্য হামলা মোকাবেলায় দক্ষিণ-পূর্বের তিব্বত দখলে রাখতেই হবে চীনকে।
ভারত ও পাকিস্তান প্রসঙ্গ : ভারত ও পাকিস্তান নিয়ে টিম লিখেছেন সপ্তম পরিচ্ছেদে। পশ্চিম ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক পরিচ্ছেদের পর। আলোচনার শুরুতে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একটি ঐতিহাসিক কমেন্ট জুড়ে দিয়েছেন টিম, ‘ইন্ডিয়া ইজ নট অ্যা ন্যাশন, নর অ্যা কান্ট্রি। ইট ইজ অ্যা সাবকন্টিনেন্ট অব ন্যাশনালিটিজ।’ আমরা মনে রাখব, ১৯৪৭-এ বা জিন্নাহর সমকালে ব্রিটিশের বিদায়ের প্রাক্কালে জিন্নাহর চেয়ে বিচক্ষণ কোনো নেতা ভারতে ছিল না। তিনি বলছেন, ভারতের বিচিত্র সব জাতিসত্তা একটি ন্যাশন স্টেটের অধীনে সংহত হওয়া সম্ভব নয় এবং হলেও সেটি হবে একটি কৃত্রিম ও জোড়াতালির ঐক্য। জিন্নাহর পর্যবেক্ষণ যে যথার্থ ছিল তার প্রমাণ স্বাধীনতার প্রায় ৮০ বছর পরও দেশটির রাজ্যে রাজ্যে অসংখ্য বিচ্ছিন্নতাবাদী অথবা স্বাধীনতার আন্দোলন, ভাষা, ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী ও বর্ণভেদের বিষাক্ত ছোবল। পাঞ্জাবের শিখ ও চেন্নাইয়ের তামিলদের জাত্যাভিমানের প্রসঙ্গ আলাদা করে উল্লেখ করেন টিম। সুতরাং জিন্নাহর রাষ্ট্রবীক্ষা যে আজো শতভাগ প্রাসঙ্গিক তারই প্রত্যক্ষ স্বীকৃতি টিমের এই উদ্ধৃতি দান। তবে টিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখেননি; বরং দেশটির বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে সংহতির অভাব, গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, সন্ত্রাসে প্রশ্রয় দেয়া, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন, আফগানিস্তানে অতিরিক্ত নাক গলানোর বিষয়গুলো কিভাবে দেশটির জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে সে বিষয়েই গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। আফগানিস্তান প্রসঙ্গে বলেছেন, পাকিস্তান যে বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছিল সেই বাঘ এখন তাকে আক্রমণ করছে। বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে তার মন্তব্য দেশটির মোট আয়তনের প্রায় ৪৬ শতাংশ বেলুচিস্তান না থাকলে পাকিস্তানেরই কোনো অস্তিত্ব থাকে না। ইসলাম, ক্রিকেট, গোয়েন্দা সংস্থা, সেনাবাহিনী ও ভারতের ভয়কে দেশটির ঐক্যের মূল উপাদান হিসেবে উল্লেøখ করেন টিম। বলেন, এসব উপাদানের কোনোটিই কাজে আসবে না যদি বিচ্ছিন্নতার শক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বেলুচিস্তানের এই মুহূর্তের ঘটনাবলি সত্যি আশঙ্কাজনক। আর গত এক দশকে দেশটির সামরিক বাহিনীর উপর্যুপরি হঠকারী কর্মকাণ্ড আমাদের চোখের সামনে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার দৃষ্টান্ত তো আছেই।
বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান নিয়ে টিমের পর্যবেক্ষণ, এই দেশগুলো কখনো ভারতের জন্য হুমকি সৃষ্টির মতো অবস্থায় আসবে না। ভারতের বৈদেশিক নীতির প্রথম প্রায়োরিটি শুধু পাকিস্তান, কারণ এটি ভারতের দোরগোড়ায় পরমাণু শক্তিধর দেশ। টিমের মতে, ভারত কখনো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করলে এক হাজার ৯০০ মাইল দীর্ঘ পাক-ভারত সীমান্তের মধ্যে তার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক ফ্রন্ট হবে পাঞ্জাব। এই সীমান্ত থেকে রাজধানী ইসলামাবাদ মাত্র ২৫০ মাইলের মধ্যে।
টিম মার্শাল পাকিস্তানের আজন্মের সমস্যার কথা বলেন। ব্রিটিশ ভারতের মোট সম্পদের ৮৩ শতাংশ ভারত এবং মাত্র ২৭ শতাংশ পাকিস্তানকে দিয়ে হাত ধুয়ে বিদায় নেয় ইংরেজ। বাংলা ভাগ করে ব্যাংক ব্যবস্থাসহ সমস্ত আর্থিক ব্যবস্থাপনার কেন্দ্র কলকাতা শহর দিয়ে দেয়া হয় পশ্চিম বাংলাকে। ফলাফল আজকের স্ট্রাগলিং পাকিস্তান ও বাংলাদেশ।
বিপরীতে ভারতকে সম্ভাব্য বিশ্বশক্তি হিসেবে দেখাতে চান টিম। কিন্তু বর্তমান ভারতের হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসী চরিত্র তার নজর এড়িয়ে গেছে। বন্দুকের দোকানের সাইনবোর্ডের নিচে খুর কাঁচি শান দেয়ার প্রসঙ্গটা শুরুতে এ জন্যই তুলেছিলাম। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের তকমার আড়ালে ভারতজুড়ে কিভাবে একবিংশ শতাব্দীর নাৎসিবাদ অস্ত্র শানাচ্ছে সে খবর না জানলে ভারতের বাইরের দক্ষিণ এশিয়া টিমকে কেন পড়বে?
পড়বে, কারণ প্রতিটি দেশের ভূ-রাজনৈতিক যেসব সমস্যা টিম চিহ্নিত করেছেন সেগুলো উপেক্ষার সুযোগ সামান্যই।
সবশেষে আরেকটি সংশয়ের কথা বলে উপসংহার টানব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার কথা তুলেছি শুরুর দিকে। ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরা। হ্যাঁ, তিনি, ডোনাল্ড জে ট্রাম্প মধ্যযুগীয় কায়দায় পররাজ্য দখলের মাধ্যমে রাজ্য বিস্তারে মন দিয়েছেন। মহাপরাক্রান্ত সম্রাটের মতো বিভিন্ন দেশকে করদরাজ্যে পরিণত করতে চাইছেন; কোনো সরকারপ্রধানকে দরবারে খাসে তলব করে অধীনতা স্বীকারে বাধ্য করছেন। কোনো স্বাধীন দেশ দখলের ঘোষণা দিচ্ছেন। কোথাও বা সমস্ত ভূমিপুত্রদের অন্য দেশে নির্বাসনে পাঠিয়ে বিলাসী অবকাশ নগরী বানানোর খোয়াব দেখছেন। আর গোটা বিশ্ব অবাক তাকিয়ে দেখছে পাগলা হাতির উন্মত্ত তাণ্ডব। কারো কিছু বলার বা করার নেই। কানাডা মেক্সিকো ডেনমার্ক অসহায় ক্ষোভে ফুঁসছে, দীর্ঘকালের ধামাধরা ইউরোপ অপুষ্টিজনিত অশক্ত পেশি নিয়ে থরকম্প। নব্য আমেরিকান এম্পায়ারের এই কাল পর্বে, নতুন প্রেক্ষাপটে শুধু মার্শালের বিচার বিশ্লেষণই নয়; বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জাতিগত দ্বন্দ্ব, সভ্যতার সঙ্কট সঙ্ঘাত বিষয়ে গত দুই তিন শতকের সমস্ত পাঠ, পর্যবেক্ষণ, সমীকরণ তামাদি হতে চলেছে। পাল্টা শক্তি দাঁড় করাতে না পারলে সম্ভবত ২০২৫ পরবর্তী বিশ্বদর্শন নতুন করে শুরু করতে হবে।



