পরিবর্তনে পরিবর্তনীয়

সবার মনোভঙ্গিতে পরিবর্তন না এলে কোনো পরিবর্তন পরিবর্তন হিসেবে আসবে না, আনা যাবে না।

চার দিকে নানান নামে, ধামে ও কামে পরিবর্তনের পাঁয়তারা চলছে। বয়ানে তো বটেই। রাজা হওয়ার আগে প্রজাবৃন্দকে কত কিছু এত্তেলা, প্রতিশ্রুতির মালা গেঁথে ক্ষমতার উৎস জনগণের দিকে তাদের গলায় পরাতে যে চেষ্টা, তাতে আগের অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি দেখতে পান পাবনার উল্লাপাড়ার ফজলুর রহমান ওরফে ফজলু মাস্টার। ফজলু মাস্টার শিক্ষক নিবন্ধন দফতর থেকে সনদপ্রাপ্ত হয়ে যে স্কুলে প্রথম ঢোকেন; সেখানে গিয়ে শোনেন সমস্যা অনেক। সেখানে সমস্যারা গলাগলি ধরে এই আগাম শীতের সকাল বেলায় একত্রে রোদ পোহায়। দেশজুড়ে সোনালি ধানের মাঠ দেখে মন জুড়ায়। কিন্তু চাল আমদানির কথা শুনলে ফজলু মাস্টারের চোখে সরষের ফুল দেখা শুরু হয়। যদিও তার চোখে ছানি পড়ার মতো অবস্থা এখনো হয়নি।

ফজলু মাস্টার এখনো কেন সবসময় আশা করেন পরিবর্তন হবে, পরিবর্তন হতে হবে মন মানসিকতার, নেতিবাচক থেকে ইতিবাচক সবকিছুতে। কিন্তু চলনবিলের আদি বাসিন্দা ফজলু মাস্টার দেখেন পরিবর্তন হতে চেয়েও হয় বা হয়নি কেন? মনের মাঝারে উথাল-পাথাল খেলে আজ হবে, কাল হবে করে। ১৫ বৈশাখ ১৩২১ শান্তিনিকেতনে বসে রবীন্দ্রনাথ আধমরাদের ঘা মেরে বাঁচবার কথা লিখেছিলেন বটে; তবে তার ভাব কল্পনায় এটি জেগেছিল শাহজাদপুরে বসে কি? বৃহৎ পাবনার জমিদারি তালুক তার ছিল না। কিন্তু শাহজাদপুরে তার প্রাণ পড়ে থাকত। পোস্ট মাস্টার গল্পে বালিকা রতনের মনে যে আশা জেগেও নিভে গিয়েছিল, ফজলু মিয়া মনে করে সে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। চলনবিলের পাঙ্গাশ মাছ ফজলু মিয়া ও বিবির পছন্দের মাছ। একবার তার আত্মীয় বাড়ি থেকে পাঙ্গাশ মাছের তরকারি পাঠানোর কথা ছিল। পাঠানোও হলো বিশেষ রেকাবিতে। খাবার টেবিলে সে মাছ পরিবেশনকালে দেখা গেল সেটি পেটমোটা উপজেলা চেয়ারম্যানের মতো কাতল মাছে রূপান্তরিত হয়েছে। মাছ ঠিকই আছে; কিন্তু পাঙ্গাশের পেটি কাতলের অবয়বে পাওয়া যায়নি। আজকাল অনলাইনে অনেক জিনিসের অর্ডার দেয়া হয়। সেখানে এ ধরনের ভুলভাল যে হয় না তা নয়। তাই বলে পাঙ্গাশ মাছ কাতল মাছে পরিবর্তন হওয়ার ঘটনা দেখে ফজলু মিয়া ভেবে পান না, কিসে কী হচ্ছে।

দেশের জন্য (?) রাজনীতি যারা করেন বলে আবার বলাবলি করা শুরু করেছেন তাদের ক্ষণে ক্ষণে ভোল পাল্টানোর পদ্ধতি প্রক্রিয়া দেখে ফজলু মিয়া এই পাঙ্গাশ, কাতল হওয়ার সাথে বেশ মিল খুঁজে পান। হাজার হোক ফজলু মাস্টারের চোখ তো। ছানি পড়ার মতো না হলেও চোখে কম দেখতে শুরু করেছেন। পরিবর্তনগুলো তার চোখে তেমন করে ধরা পড়ে না।

পাকা ধানের মৌসমে চাল আমদানির তোড়জোড়ে পয়লা ধাক্কা খাবেন দেশের কৃষক, তাদের ধানের উৎপাদনমূল্য উদ্ধার কষ্টকর হয়ে যাবে। ফজলু মাস্টার ডোনাল্ড ট্রাম্প সাহেবের ট্যারিফ রেট নাটকের কুশীলবদের চেনেন না, শিশুদের তা পড়াতেও চান না। তার দেশের অর্থনীতির চিন্তা রাজনীতির নাটকে বারবার লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে। বড় চাঁদাবাজ, ঋণখেলাপি, করখেলাপিরা পাঙ্গাশ কাতল মাছের মতো পরিবর্তিত হতে গিয়ে যাই করুক না কেন, তাতে সরাসরি আমজনতার অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি বাড়াবে বৈ কমাবে না।

ফজলু মাস্টারের পাশের বাড়ির প্যাচাল বিশেষজ্ঞ বজলু মিয়া তার বেমালুম স্বভাবের ছেলে পিয়ার আলী সম্বন্ধে বেশ কয়েক দিন ভালো ভালো কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল। রাজনীতির মাঠে পিয়ার আলীর উঁচু ঘর নিচু ঘরের সমস্যাকে কেন জড়ানো হচ্ছে, এ নিয়ে ফজলু মাস্টার ও বজলু মিয়ার মনে কোনো বুঝ আসে না। আসলে পিআর পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে ফজলু-বজলুদের মতলব বুঝতে আরো সময় লাগবে। পাঙ্গাশ মাছ কাতল মাছ হওয়ার মধ্যে ফজলু মাস্টার পিআর পদ্ধতির কিছুটা ছোপ ছোপ মিল দেখতে পান। দুর্মুখেরা বলাবলি করছে, আপার হাউজটা সংসদ গ্যালারির উপরের কোনো হল ঘরে হবে কি না জানা যাচ্ছে না। যা হোক, বাড়ির বড় দহলিজের মতো আপার হাউজে ছোট বড় সবাইকে একসাথে পানতামাক খাওয়ানো যাবে, সবাই তাদের খাতিরদারির সুযোগ দেয়া নেয়ার সুযোগ পাবে। সবাই ভোট দিয়েছে হয়তো নামকরা রহিমুদ্দীনকে, কিন্তু আসলে বলতে গেলে বড় বাংলো ঘরে দেখতে হবে ছালাম মিয়ার হ্যাংলা পাতলা পোলাকে।

‘কিসের ভেতর কী পান্তা ভাতে ঘি’-এর মতো উপরের তলা নিচের তলা করতে করতে পুঁজিবাদী বিশ্বের সংসদ গণপ্রজাতন্ত্রী দেশের দহলিজ ঘরকেও ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কাঁপিয়ে দিতে চাইছে। ঘটি ডোবে না নামে তালপুকুর এমন অবস্থা আর কী? যখনই একটু সুযোগ আসে, তখন কী খাই কী পাই করতে গিয়ে আসল কাজে মন থাকে না। ডিম আগে না মুরগি আগে করতে করতে ডিম মুরগি দুটোই যাওয়ার জোগাড়। কাজের কাজ হয় না, যদিও কিছু একটা হয়, তয় খুব কম। পরিবর্তনে যা যা হওয়ার কথা ছিল তা হয় না। পরিবর্তনেরও পরিবর্তন হওয়ার প্রশ্ন উঠে আসছে।

আসলে অজ্ঞাতসারে অনেকে নিজের কথা ও কাজে নিজে ধরা খায়- ফজলু মাস্টার ফস করে বলে ফেলেন কথাটা পাশের বাড়ির বড় ছেলে শফিককে- সে ঢাকা কলেজে পড়ে। জুলাই আগস্ট আন্দোলনের সমন্বয়কদের নাকি একজন। ফজলু মাঝে মাঝে তাজ্জব বনে যান। ছেলেবেলা থেকে লাজুক ও নম্র-ভদ্র স্বভাবের শফিক কিভাবে দেশ জাতি অর্থনীতি নিয়ে এমন চমৎকার বাক্যাবলি আওড়ায়। তিনি ভাবতেন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ইউটিউব আরো কত হাবিজাবি প্রোগ্রাম গিলে গভীর রাতে ঘুমিয়ে ভোরবেলায় লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে ওরা এত কথা শিখল কখন? ফজলুর মনে পড়ে যায়, ভাষা আন্দোলনের দিনগুলোর কথা। ঢাকা শহরে দশজন করে করে একশ’ চুয়াল্লিশ ধারা ভঙ্গের সাহস তারা দেখিয়েছিলেন। বরকত, শফিউর, রফিক, সালাম, জব্বার ২১ ফেব্রুয়ারিতে যেদিন গুলিবিদ্ধ হন- বাগেরহাটের গীতিকবি শামসুদ্দীন সে সময় ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিরিলে বাঙালি তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’ গানটি বাঁধেন। ফজলুর বন্ধুর বাবা ছিলেন তিনি। একুশ তারিখে যারা হতাহত হয়েছিলেন তাতেই সারা দেশে তোলপাড়, আন্দোলন আলোড়ন- তাতেই বাঙালি চক্ষুষ্মান হলো।

নিজেদের স্বকীয়তা স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার বাহন বাঙলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা লাভের লড়াইয়ে নামে সবাই। আর ২০২৪-এর ৩৬ জুলাই নামে খ্যাত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কিভাবে স্বৈরাচারের পতন পলায়ন-পর্ব পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেল শফিকরা। সাবাশ! সুকান্তর কবিতা ‘জ্বলে পড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’। ফজলুর চোখে পানি এসেছিল। যখন পুলিশ অফিসার বুঝাচ্ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘স্যার একজন গুলি খেয়ে মারা গেল এটা দেখেও তার সহযাত্রী পাশেরজন দেখেও ভয় পায় না, সরে গেল না। এমন অকুতোভয়দের আমরা ভয় দেখিয়ে নিবৃত্ত করতে পারব না।’ তাইতো! শফিকরা এত সাহস পেল কোত্থেকে? ফজলু নিজের বুদ্ধি ও জ্ঞানে যা কুলায় তার চৌহদ্দি চষে বের করলেন যে, কেন চব্বিশের সামান্য কোটার দাবি থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সেই থেকে স্বৈরাচার পতনের দাবিতে তরতর করে উতরাল। ফজলুর মাথায় হাজার প্রশ্ন।

এখন এবং পরে সরকারের মন্ত্রী বা দায়িত্বশীল পদে দায়িত্ব গ্রহণের সময় সবাইকে শপথবাক্য পাঠকালে তিনি দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের প্রতি সমান আচরণ করবেন- রাষ্ট্রীয় স্বার্থের নিরাপত্তা তথা গোপনীয়তা অবলম্বন করবেন। তিনি কারো প্রতি রাগ কিংবা অনুরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করবেন না। অথচ তাবত মাননীয় (বিশেষ করে যারা দলের বড় পোস্ট হোল্ড করতেন) দলমত নির্বিশেষে সবার সাথে বা ব্যাপারে এমনভাবে আচরণ করেন যে, তাতে দেশ অভ্যন্তরে তো বটে বিদেশেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। দলের কোনো পদধারীর সরকারি দায়িত্বশীল পদে আসীন হলে তিনি প্রায়ই স্ববিরোধিতায় সঙ্কুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।

মোট কথা, সবার মনোভঙ্গিতে পরিবর্তন না এলে কোনো পরিবর্তন পরিবর্তন হিসেবে আসবে না, আনা যাবে না। সবার চিন্তাভাবনা যদি পজিটিভ না হয়; তাহলে পরিবর্তনের জন্য কাক্সিক্ষত আকাক্সক্ষারাও নিষ্কণ্টক হবে না। বারবার পরিবর্তন চাওয়া হবে; আর মনের ভেতর থাকবে নেতিবাচক প্রবণতা, তাহলে তো যে লাউ সে কদুই হবে।

লেখক : অনুচিন্তক