বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা

শক্তিশালী মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে হলে এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাগুলোকে বুঝে সুপরিকল্পিত ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার প্রধান নির্ধারক।

আশরাফ আল দীন

বিশ্বরাজনীতির গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনশীল। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ এক ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করেছে। ১৯৭১ সালে অর্জিত স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন আর কেবল একটি ভৌগোলিক সত্তা নয়। এটি ভারত ও চীনের প্রভাববলয়ের সন্ধিস্থলে দাঁড়ানো এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভূমি, যা বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে গড়ে ওঠা নতুন আঞ্চলিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

কৌশলগত গুরুত্ব

বাংলাদেশের উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব- তিন দিকজুড়ে ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিক স্পর্শ করে মিয়ানমার। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, তারপর ভারত মহাসাগর। এই অবস্থান বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে স্থলপথে মূল ভারতের সাথে সংযুক্ত করার একমাত্র প্রবেশদ্বার বাংলাদেশ সংলগ্ন। ফলে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সংযোগ আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়েছে। সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ জীব-বৈচিত্র্য ও গ্যাস সম্পদ সমৃদ্ধ ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা যেমন পেয়েছে তেমনি গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়নের সুযোগও পেয়েছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সকলেই ভারত মহাসাগরে তাদের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী। বাংলাদেশ সেই কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক জটিলতা

ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ভারতের জড়াজড়ি করে থাকা। এই নৈকট্য বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, যোগাযোগ, জ্বালানি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। এক দিকে ভারত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রতিবেশী ও অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী। দুই দেশের মধ্যে উন্মুক্ত সীমান্ত, নৌ ও রেলযোগাযোগ, নদী ভাগাভাগি, জ্বালানি বাণিজ্য এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা সবই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের রফতানি বাজারও ভারতের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্থলরুটে সম্প্রসারিত। অন্য দিকে সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, অভিবাসন-সংক্রান্ত বিতর্ক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতা মাঝে মধ্যে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনার জন্ম দেয়। তিন দিক দিয়ে ভারতবেষ্টিত অবস্থান বাংলাদেশের কৌশলগত স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রশ্ন তোলে, আবার একই সাথে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

চীন : অর্থনৈতিক অংশীদার ও কৌশলগত ভারসাম্য

বাংলাদেশের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং সামরিক সরঞ্জামের প্রধান সরবরাহকারী। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (ইজও) অংশ হিসেবে চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে- পদ্মা সেতু রেল লিংক, পায়রা বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ইত্যাদি তার উদাহরণ।

তবে ভারত-চীন প্রতিযোগিতা বাংলাদেশকে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের কূটনীতি পরিচালনা করতে বাধ্য করে। ভারতের উদ্বেগ বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে সম্পর্ক পরিচালনা করতে হয়, আবার চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাশক্তি : ইন্দো-প্যাসিফিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশকে ঘিরে ভূ-রাজনীতির আরেকটি মাত্রা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল। যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে মুক্ত বাণিজ্যপথ এবং চীনের প্রভাব প্রতিরোধে কাজ করছে। বাংলাদেশের অবস্থান ভারত মহাসাগরকে পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সাথে সংযুক্ত করা সামুদ্রিক রুটের কেন্দ্রে, তাই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার, নির্বাচন, শ্রম অধিকার ইত্যাদি ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে মাঝে মধ্যে টানাপড়েন দেখা গেলেও অর্থনীতি, বাণিজ্য, জলবায়ু এবং নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রেই উভয় দেশের সম্পর্ক গভীর। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার অন্যতম প্রধান উৎস।

বঙ্গোপসাগর ও নৌনিরাপত্তা

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা শুধু অর্থনৈতিক সুযোগই সৃষ্টি করেনি বরং এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে নৌনিরাপত্তা, সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। ভারত মহাসাগরকে বর্তমানে বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার নতুন কেন্দ্র বলা হয়।

কারণ :

ক) বিশ্বের ৬০ভাগ বাণিজ্যিক পণ্য রুট এই অঞ্চল অতিক্রম করে।

খ) এটি জ্বালানি পরিবহনের প্রধান রুটগুলোর একটি এবং

গ) এটাই চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার নৌকৌশলের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হচ্ছে। কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সমুদ্রসীমা নজরদারি প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সমুদ্র-সহযোগিতা বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার মূল উপাদানে পরিণত হয়েছে।

নিরাপত্তার নতুন বাস্তবতা, রোহিঙ্গা সঙ্কট

মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আন্তঃসম্পর্ক রোহিঙ্গা সঙ্কট আরো জটিল করে তুলছে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহলে সক্রিয় কূটনীতি ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সঙ্কট মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের নতুন রূপ জলবায়ু পরিবর্তন

জলবায়ু পরিবর্তন এখন বাংলাদেশকে শুধু পরিবেশগত নয়, কৌশলগত নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও হুমকির মুখে ফেলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় ক্ষয়, লবণাক্ততা এবং ঘূর্ণিঝড় সব মিলিয়ে উপকূলবর্তী জনসংখ্যার জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে। ফলে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসন, খাদ্যনিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা ইত্যাদি নতুন ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপান্তরিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের নেতৃত্বও এই বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।

অর্থনৈতিক করিডোর ও আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোরের কেন্দ্রবিন্দু। যেমন : বিমসটেক, বিবিআইএন, বিআইএমপিএস (ইধু ড়ভ ইবহমধষ রহরঃরধঃরাবং) এবং এশিয়ান হাইওয়ে ও রেলওয়ে নেটওয়ার্ক। এসব সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশকে ‘ট্রানজিট রাষ্ট্র’ থেকে ‘ট্রেড হাবে’ রূপান্তরের সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। তবে এসব প্রকল্পে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ বাস্তব চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্যের কৌশল

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বহুমাত্রিক। ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, বঙ্গোপসাগরভিত্তিক নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সঙ্কট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক সংযোগ সবই বাংলাদেশের জন্য সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশকে তাই ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’ ও ‘বহুমুখী অংশীদারিত্ব’-এর নীতি অবলম্বন করতে হচ্ছে যেখানে একদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, অন্য দিকে সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্বও নিতে হবে। শক্তিশালী মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে হলে এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাগুলোকে বুঝে সুপরিকল্পিত ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার প্রধান নির্ধারক।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক