বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অনেক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি (যেমন— ট্রানজিট, বিদ্যুৎ আমদানি, নিরাপত্তা সহযোগিতা) এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের বিকল্প সীমিত এবং দরকষাকষির ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল। দীর্ঘমেয়াদে এসব চুক্তি নীতিনির্ধারণে নীতিগত নির্ভরতা তৈরি করে, যেখানে বাংলাদেশকে ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকার বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
অবকাঠামোগত ও ট্রানজিট নির্ভরতা
বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দিয়েছে। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) সাথে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ সহজ হয়েছে। এই অবকাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যা ভারতের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে কোনো কারণে এই সুবিধা সীমিত করতে চায়, তবে তা ভারতের সাথে বড় ধরনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণ হতে পারে। অর্থাৎ— এই ব্যবস্থাটি অপরিবর্তনীয় (Irreversible) একটি কাঠামো তৈরি করেছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের নির্ভরশীলতা
বর্তমানে বাংলাদেশ ভারত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করে (যেমন— আদানি গ্রুপের সাথে চুক্তি)। নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিবর্তে আমদানির ওপর এই নির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। দাম নির্ধারণ বা সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা এখানে তুলনামূলকভাবে কম।
নিরাপত্তা সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়
নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে গভীর সমন্বয় রয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দমনে বাংলাদেশ যে ভূমিকা রেখেছে, তা ভারতের জন্য বিশাল কৌশলগত বিজয়। বাংলাদেশের অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যতটা উদারতা দেখিয়েছে, সীমান্ত হত্যা বন্ধ বা তিস্তা পানি বণ্টনের মতো মৌলিক দাবি আদায়ে ভারত ততটা আন্তরিকতা দেখায়নি। এটি একটি ‘একতরফা’ নির্ভরতার জন্ম দেয়।
যখন একটি দেশ অন্য দেশের ওপর বিদ্যুৎ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। নির্ভরশীলতা কাঠামোর প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, কূটনীতি ও রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতি ও ভারতীয় পণ্যের একচেটিয়া বাজার গড়ে ওঠার ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় তার হেজেমনি বা আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কৌশলগত খুঁটি’ হিসেবে বিবেচনা করে, দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে ভারতের এই কৌশল এবং বাংলাদেশের অবস্থানের ওপর এর প্রভাবকে কয়েকটি বিশেষ দিক থেকে দেখা যেতে পারে :
কৌশলগত সুবিধা : ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহ দমন এবং ওই অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার ভারতের জন্য এক বিশাল কৌশলগত বিজয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। বাংলাদেশ যখন চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এ যুক্ত হয়েছে, তখন ভারত তার নিরাপত্তা ও কৌশলগত উদ্বেগের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশকে অনেক ক্ষেত্রে সংযত থাকার চাপ দিয়েছে।
কূটনৈতিক সমন্বয় : বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ বা বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ নিয়ে ভারতের সংবেদনশীলতা বাংলাদেশের সার্বভৌম নীতিনির্ধারণী ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। অনেক সময় ভারতকে ‘খুশি’ রাখতে গিয়ে বাংলাদেশ লাভজনক বিদেশী বিনিয়োগ বা প্রকল্প থেকে পিছিয়ে আসতে হয়, এটিই মূলত নীতিনির্ধারণী সমন্বয় বা নির্ভরশীলতা। ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি বনাম একতরফা অবস্থান— ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ পলিসির কেন্দ্রে বাংলাদেশ থাকলেও এর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে একতরফা।
অমীমাংসিত ইস্যু : সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন বা বাণিজ্যিক শুল্ক বাধার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ বছরের পর বছর ছাড় দিলেও ভারত তার অবস্থানে অনড় থাকে। ভারতের কূটনৈতিক কৌশল হলো দ্বিপক্ষীয় আলোচনা জারি রাখা কিন্তু চূড়ান্ত সমাধানে না আসা, যাতে বাংলাদেশ সবসময় ভারতের প্রতি এক ধরনের প্রত্যাশা ও নির্ভরশীলতার মধ্যে থাকে।
গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা
সন্ত্রাসবাদ ও সীমান্ত নিরাপত্তার নামে গোয়েন্দা সহযোগিতা জোরদার হলেও এতে তথ্য ও সিদ্ধান্তের অসম প্রবাহ তৈরি হয়েছে। ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও বাংলাদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ বিশেষত সীমান্ত হত্যা যথাযথ গুরুত্ব পায় না। ভারত ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার মূলে রয়েছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা। বাংলাদেশ তার ভূখণ্ড থেকে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন— ULFA) নির্মূল করেছে। এটি ভারতের জন্য কয়েক দশকের একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সঙ্কটের সমাধান। বিনিময়ে বাংলাদেশ ভারতের কাছে যা চেয়েছিল বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং মাদক (ফেনসিডিল) চোরাচালান রোধ তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে প্রশ্ন ওঠে, এই নিরাপত্তা সহযোগিতা কি কেবল ভারতের একতরফা সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য?
সীমান্ত হত্যা একটি অনন্য নিরাপত্তা বৈষম্য, বিশ্বের আর কোনো দু’টি দেশের মধ্যে এত ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও সীমান্তে এত নিয়মিত সাধারণ মানুষ হত্যার নজির বিরল। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, একজন অপরাধীকেও বিনা বিচারে হত্যা করার অধিকার কোনো বাহিনীর নেই। ‘নন-লেথাল উইপন’ বা অ-মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রাণঘাতী গুলি চালানো হয়, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর (যেমন— HRW, Amnesty) কাছে বড় প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক চিত্র : ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, সীমান্তে নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের তথ্যমতে, ২০২৫ সালেই সীমান্তে ৩৯ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৩০ জনই মারা গেছেন সরাসরি বিএসএফের গুলিতে। সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হলেও দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা বৈঠকের টেবিলে বাংলাদেশ এ বিষয়ে ভারতকে কঠোর অবস্থানে বাধ্য করতে পারছে না। এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার এক ধরনের নীতিগত দুর্বলতা বা নির্ভরশীলতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
ডিজিটাল ও নজরদারি প্রযুক্তির বিস্তার— সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের নজরদারি বা গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অনেক সরঞ্জাম ভারতের কাছ থেকে বা ভারতের মধ্যস্থতায় সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি ‘ব্যাক-এন্ড’ বা নেপথ্য সংযোগ ভারতের সাথে তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা ডাটার সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করে।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অসমতা
বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি বিদ্যমান। অশুল্ক বাধা, সীমান্তে পণ্য আটকে রাখা এবং বাজার প্রবেশাধিকারে জটিলতা বাংলাদেশের রফতানিকে সীমিত করে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ ভারতের বাজার ও অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্কটি কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত অসমতার (Structural Inequality) প্রতিচ্ছবি। তুলা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের (পেঁয়াজ, চাল, চিনি) জন্য বাংলাদেশ ভারতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ভারত যখনই অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের অজুহাতে রফতানি বন্ধ করে (যেমন-পেঁয়াজ), তখনই বাংলাদেশের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। এই সরবরাহ ব্যবস্থাটি অনেক সময় ভারতের জন্য একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে, যা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে পরোক্ষ চাপ তৈরি করে। ভারত কাগজে-কলমে শুল্কমুক্ত সুবিধার কথা বললেও বাস্তবে অসংখ্য ‘অশুল্ক বাধা’ দিয়ে বাংলাদেশের রফতানিকে বাধাগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের পণ্য ভারতে প্রবেশের সময় বিএসটিআইয়ের (BSTI) সনদ অনেক সময় গ্রহণ করা হয় না। বাংলাদেশের পাট বা সিমেন্টের মতো সম্ভাবনাময় পণ্য যখন ভারতের বাজারে ভালো করতে শুরু করে, তখন ভারত প্রায়ই ‘অ্যান্টি-ডাম্পিং’ শুল্ক আরোপ করে সেই বাজার প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের বেশির ভাগই সম্পন্ন হয় স্থলবন্দরের মাধ্যমে (যেমন— বেনাপোল-পেট্রাপোল)। সীমান্তে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ভারতীয় কাস্টমসের ধীরগতির কারণে ট্রাকের দীর্ঘ লাইন পড়ে থাকে। এতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়ে, যা প্রকারান্তরে ভারতীয় আমদানিকারকদের চেয়ে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ভারত বাংলাদেশকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের যে ঋণ দিেেয়ছে তার শর্তাবলি অত্যন্ত কঠোর। এই ঋণের বড় একটি অংশ দিয়ে ভারত থেকেই পণ্য ও সেবা কিনতে হয় এবং কাজগুলো ভারতীয় ঠিকাদাররাই পায়। এতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে ভারতের নিজস্ব শিল্প ও জনবল বেশি লাভবান হয়। ফলে এটি এক ধরনের ‘ফিরে আসা অর্থ’ যা বাংলাদেশকে ঋণের জালে এবং ভারতীয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল করে রাখে।
সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের প্রভাব
ভারতীয় টেলিভিশন, সিনেমা ও ডিজিটাল কনটেন্ট বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এতে সফট পাওয়ার এর মাধ্যমে জনমত ও সাংস্কৃতিক বোধে এক ধরনের আধিপত্য তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক উপলব্ধিতেও প্রভাব ফেলছে। সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের এই প্রভাবকে সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ’ বা ’সফট পাওয়ার হেজেমনি’ হিসেবে অভিহিত করেন। ভারত তার বিশাল মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের জনমানসে যে প্রভাব তৈরি করেছে, তা কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
ভাষাগত ও সামাজিক রুচির পরিবর্তন— ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল (বিশেষ করে হিন্দি ও বাংলা সিরিয়াল) বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গেছে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষাগত সংমিশ্রণ (হিন্দি শব্দের ব্যবহার বৃদ্ধি) এবং সামাজিক রীতিনীতিতে পরিবর্তন আসছে। বিয়ে বা উৎসবের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে ভারতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিচ্ছে। এই সাংস্কৃতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় ফ্যাশন ও প্রসাধনী সামগ্রীর একটি বিশাল বাজার বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে।
মিডিয়া ও ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ
ভারতীয় গণমাধ্যম ও ডিজিটাল কনটেন্ট অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা ‘ন্যারেটিভ’ প্রচার করে। সিনেমা বা ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে ভারত প্রায়ই নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার ‘ত্রাতা’ বা একমাত্র স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মনে এমন একটি ধারণা তৈরি করতে পারে, ভারতের কৌশলগত অবস্থানই সঠিক। বাংলাদেশের নাটক বা সিনেমা ভারতে সম্প্রচারের ক্ষেত্রে নানা আইনি ও বাণিজ্যিক জটিলতা থাকলেও, ভারতীয় কনটেন্ট বাংলাদেশে অবাধে প্রবেশ করে। এই একমুখী প্রবাহ তথ্যের ভারসাম্য নষ্ট করে।
সফট পাওয়ারের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো— এটি মানুষকে বুঝতে দেয় না যে, তারা প্রভাবিত হচ্ছে। যখন বাংলাদেশের মানুষ নিয়মিত ভারতীয় গণমাধ্যম গ্রহণ করে, তখন ভারতের অভ্যন্তরীণ বা পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের নমনীয়তা তৈরি হয়। এটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের ওপর ভারতের চাপ প্রয়োগের কাজকে সহজ করে দেয়, কারণ জনমতের একটি বড় অংশ মানসিকভাবে ভারতের সাংস্কৃতিক বলয়ে থাকে। এই পুরো চিত্রটি ইঙ্গিত করে, বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কে একটি অসম ক্ষমতার কাঠামো বিদ্যমান, যেখানে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে থাকে। বাংলাদেশ কৌশলগত ভারসাম্য (চীন, মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, আসিয়ান, পশ্চিমাবিশ্ব) জোরদার করলে এই নির্ভরতা কমানো সম্ভব। কার্যকর কূটনীতি, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়তা এবং অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণই এই অসহায়ত্ব কাটানোর মূল পথ।
লেখক : সিনিয়র ফেলো, এসআইপিজি নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটি
e-mail : [email protected]



