পুতিন-হাসিনা বৈঠকের কল্পকাহিনী

কেবল পছন্দের কোনো সরকার এভাবে বিনাশ ও বিতাড়ন নয়, ঢাকা দিল্লির দিকে চোখ রাঙাবে- তা ভারতের কাছে এখনো ধারণাতীত। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশগুলো একে একে এভাবে ড্যামকেয়ার হয়ে ওঠা দিল্লির জন্য মর্মপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শোধ নেয়ার হেন অপচেষ্টা নেই, যা ভারত না করছে। কিছু দিন ধরে তা ভর করেছে কিছু গণমাধ্যম, লেখক-কলামিস্ট, টকশো করনেওয়ালাদের ওপর। বিভিন্ন মাধ্যমে ধারণা দেয়ার চেষ্টা চলছে, ‘আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না। দেশের বহু মানুষ শেখ হাসিনার উন্নয়নের কথা স্মরণ করছেন, বিশ্বের প্রভাবশালী কিছু দেশও তাকে চায়’ ইত্যাদি। এছাড়া সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনও ভারতে এসে শেখ হাসিনার বিষয়ে কিছু কাজ করে গেছেন, এমনকি শেখ হাসিনার সাথে কথাও বলে গেছেন- এমন গল্প পর্যন্ত ছড়ানো হয়।

আওয়ামী লীগের প্রতি বিদ্বেষ কমাতে নির্বাচন সামনে রেখে এই অ্যাজেন্ডা বেশ জোরালোর চেষ্টা চলছে। নানা জরিপও ছাড়ছে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে। বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষ যে ফের আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকছে তা প্রতিষ্ঠিত করতে একটি অপশক্তি মরিয়া। ভোটের হিসাব মেলাতে দু-একটি রাজনৈতিক দলও শামিল হয়েছে এতে। এরকম সময়ে ভারতে সফর করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এটিকেও হাইপ তোলার সাবজেক্ট করে ছড়ানো হয়, ভারত সফরকালে পুতিন গোপনে বৈঠক করেছেন শেখ হাসিনার সাথে। এটি সত্য প্রমাণ করতে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া হয়। ভিডিওটি আসলে ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি মস্কোতে শেখ হাসিনা ও ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকের।

গত ৪ ডিসেম্বর ভারত সফরে আসা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ঠিক এই সময়ে কাকতালীয়ভাবে ভারতে বসবাস করছেন বাংলাদেশের পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পুতিনের ভারত সফরের সময় দিল্লির রাস্তায় বাংলাদেশ সরকারবিরোধী পোস্টার দেখা গেছে মর্মে সংবাদও ছড়ানো হয়। শেখ হাসিনার পতন ও তার ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর থেকে ভারতীয় আয়োজনে সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু অ্যাকাউন্ট এবং ফেসবুক পেজ থেকে বাংলাদেশ ঘিরে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। এসব ছবি ও ভিডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। দেশে চলমান গুজব ও ভুয়া তথ্য ছড়ানো ঠেকাতে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টওয়াচ এসব বিষয় নিয়মিত যাচাই করছে।

ভূ-রাজনীতিসহ বিশ্ব ক‚টনীতিতে শেখ হাসিনামুক্ত বাংলাদেশ ক্রমে ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে। যথারীতি বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের তাপ-উত্তাপের আঁচ বাংলাদেশেও লাগছে। তা কেবল ভারত নয়, সুদূরের যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা নিকটবর্তী চীনেরও। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সদ্য শেষ হওয়া একটি বৈঠকের দিকেও তাকাতে হয় বাংলাদেশকে। গত ৩ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে সন্ত্রাসবাদ দমন-সংক্রান্ত ভারত-মার্কিন যৌথ কর্মী গোষ্ঠীর তিন দিনের বৈঠক হয়েছে। এতে সন্ত্রাসী নিয়োগ, সন্ত্রাসী উদ্দেশ্যে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের মতো বিস্তৃত উদীয়মান হুমকি এবং চ্যালেঞ্জের পর্যালোচনা করেছে উভয় পক্ষ। দুই দেশ প্রশিক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা, সর্বোত্তম অনুশীলন বিনিময় এবং অব্যাহত দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে তথ্য শেয়ারসহ চ্যালেঞ্জগুলোর বিরুদ্ধে সহযোগিতা জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছে।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভারত ও আমেরিকা কাউন্টার টেরোরিজম বা আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ নিয়ে একযোগে কাজ করার বিষয়ে আবারো সহমত হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের তালিকায় থাকা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যেমন এবার অভিযান হবে, তেমনি আরো কয়েকটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও কথা হয়েছে। বিশেষ করে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন- দুই পক্ষ সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় একটি টেকসই ও একটি সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন বলে যৌথ বিবৃতিতে দাবি করেছে।

শিগগিরই ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভারতে আসছে উচ্চ পর্যায়ের এক মার্কিন প্রতিনিধিদল। তারা দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে বৈঠক করবেন। এরপর মার্কিন প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসবে। বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের মনোভাব বদলের কোনো তথ্য নেই; বরং ক্ষোভে-দুঃখে ভারত আরো আগ্রাসী হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে না দেয়ার সিদ্ধান্তে অটল ভারত। বেশি দিন আর রাখতেও চাচ্ছে না। আবার তৃতীয় কোনো দেশে অবস্থানের ব্যবস্থাও করে দিতে পারেনি। এ অবস্থায় হাসিনার ভারতে অবস্থান সম্পূর্ণ শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলে স¤প্রতি মন্তব্য করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। জয়শঙ্কর আরো বলেন, শেখ হাসিনা যে পরিস্থিতিতে এখানে এসেছেন; সেটি মূল বিষয়। তবে, তার সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হবে। শেখ হাসিনা দিল্লির কাছে সাময়িক সময়ের জন্য আশ্রয়ের অনুমতি চাইলেও দেশটিতে তার অবস্থান দীর্ঘ।

ভারতের নামকরা ক‚টনীতিকরা একাধিক দেশে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিতে তদবির করলেও ফল আসেনি। ক‚টনীতিতে অনেক সফলতা থাকলেও ভারত শেখ হাসিনা ইস্যুতে এখন পর্যন্ত পেরে ওঠেনি। তাকে সুরক্ষা দেয়া ভারতের দুর্নামের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে শেখ হাসিনা থেকে আগেই মুখ ফিরিয়ে নেয় পশ্চিমা দুনিয়া। ফলে পশ্চিমা কোনো দেশ তাকে আশ্রয় দিতে চাচ্ছে না। তার ওপর এর মধ্যে আবার তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। এর মধ্যেও ভারত-বাংলাদেশ উভয়ই চাইছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়মিত করতে। এ নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মধ্যে বৈঠকও হয়েছে। তবে দুই দেশের সম্পর্কে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন শেখ হাসিনা। ঢাকা খুব স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, ভারতে বসে শেখ হাসিনার বক্তব্য বা বিবৃতি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সহায়ক হবে না। প্রায়ই বাংলাদেশ নিয়ে নেতাকর্মীর সাথে তার দিকনির্দেশনামূলক ও আক্রমণাত্মক কথোপকথন ফাঁসের ঘটনায় বিরক্ত বাংলাদেশ। এ নিয়ে বিশ্বের কাছেও প্রশ্নের মুখে পড়ছে ভারত। আর তাই যুক্তরাজ্য, ফিনল্যান্ড, বেলারুশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি দেশে তার আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার চেষ্টা বিফল হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-আইসিসির তেমন তোয়াক্কা করে না, রাশিয়ার আশপাশের এমন কয়েকটি দেশও ‘না’ করে দিয়েছে।

ছেলে জয়, মেয়ে পুতুল, ছোট বোন শেখ রেহানা, তার মেয়ে টিউলিপ, ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকসহ তাদের গোটা পরিবার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বা অভিযুক্ত সবাই। এটি ভারতকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। তারপরও মাঝে মধ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগের কথা বলে দিল্লি। আবার পেছায়।

ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের বৈঠকের পর নতুন কিছু কথা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। এদিকে, ঢাকায় পাকিস্তানের সামরিক জেনারেল বা সরকারি কর্মকর্তাদের ঘন ঘন সফরও ভারতকে খুব চিন্তায় ফেলেছে। ড. ইউনূস ভারত বিষয়ে কিছু সাহসী মন্তব্য করে তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। বাংলাদেশকে ডিস্টার্ব না করে ভারতকে সেভেন সিস্টার্স নিয়ে বেশি মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। কয়েক দফায় ভারতের চোখে চোখ রেখে কড়াবার্তা দিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে বলেছেন, নতুন বাংলাদেশ মেনে নিতে। একটি বিশেষ পরিস্থিতি বা উত্তেজনার মধ্যে দল-মতনির্বিশেষে সবাইকে এক জায়গায় এনে গোটা বিশ্বকে একটি বার্তা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। পতিত আওয়ামী লীগ ও এর মিত্ররা ছাড়া দেশের সব রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও বিভিন্ন ধর্মীয় নেতার সাথে বৈঠক করে তার অবস্থান তিনি ভারতসহ বিশ্ব স¤প্রদায়কে জানিয়েছেন। বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন, বাংলাদেশের মানুষ আর নতজানু নীতি মেনে নেবেন না, সম অধিকার ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব চায় ঢাকা। ভারত তা নাকচ না করেও নতুন বাংলাদেশ এখনো মেনে নেয়নি। একদিকে বন্ধুত্ব এগিয়ে নেয়ার পয়গাম দেয়, আরেক দিকে কুৎসা রটায়।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের শুরু থেকে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে একের পর এক বাংলাদেশবিরোধী গুজব ছড়ানো হচ্ছে। শুরু থেকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে ইসলামপন্থীদের উত্থান হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা করে আসছে। বাংলাদেশের হিন্দুরা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে বলে রটাচ্ছে, রটায় অবিরাম। যত সময় যাচ্ছে, গুজব তত ছড়াচ্ছে, সামাজিক মাধ্যম থেকে ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যমেও যাচ্ছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের অনুরোধ ছিল, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু কোনো পদ্ধতিগত ব্যবস্থা নেয়নি দিল্লি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের হাতে বিলিয়ন ডলার রয়েছে, তারা মিথ্যা এবং অপতথ্য ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কয়েকটি এই অ্যাজেন্ডা নিয়ে কাজ করছে। সব শেষে সেখানে যোগ হয়েছে শেখ হাসিনার সাথে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের বৈঠকের কল্পকাহিনী। অথচ ভারতে এসে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী দেশ রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন সেখানে কোন পর্যায়ের নিরাপত্তা বলয়ে থাকেন, তা সবার জানা। ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে একটি দেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী যিনি অন্য দেশের আশ্রয়ে রয়েছেন; সেরকম একজন ব্যক্তির সাথে পৃথিবীর ক্ষমতাধর কোনো প্রেসিডেন্ট বৈঠক করবেন, তা কল্পনাতীত।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]