ইসলামী মৌলবাদ বনাম হিন্দু মৌলবাদ

পতিত স্বৈরাচারী সরকার অনেক দলের মধ্যে কেবল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল। কারণ জামায়াতের নেতাকর্মীরা এ দেশের স্বাধীনতার অতন্ত্র প্রহরী (অথচ তাদের স্বাধীনতাবিরোধী আখ্যা দেয়া হয়)।

প্রফেসর কর্নেল (অব:) ডা: জেহাদ খান

মৌলবাদ বা ফান্ডামেন্টালিজমের সাধারণ সংজ্ঞা হলো, যেকোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিশ্বাস বা কর্মপন্থা যা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন চায়। উগ্র মৌলবাদ বা এক্সট্রিমিজম হচ্ছে, পরমত অসহিষ্ণুতা, বলপ্রয়োগ, হিংসাত্মক বা ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা করা।

ধর্মীয় মৌলবাদের ভিত্তি রচিত হয় কোনো ধর্মের মৌলিক বা আদি গ্রন্থাবলির আলোকে। ইসলামী মৌলবাদের ভিত্তি হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহ।

কুরআনে বলা হয়েছে : ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোরজবরদস্তি নেই। (আল বাকারাহ : ২৫৬)

ইসলাম কখনো জোর করে ধর্মান্তরিত করার অনুমতি দেয়নি। এ জন্য আমরা দেখতে পাই যে, অনেক আরব ও অনারব মুসলিম দেশে অমুসলিম সংখ্যালঘুরা সুখে-শান্তিতে এবং রাষ্ট্রীয় কোনো নিপীড়ন ছাড়া বাস করে থাকেন। অথচ অন্যান্য ধর্মে মানুষকে জোর করে ধর্মান্তরিত করার বহু উদাহরণ আছে। নানা উদ্দেশ্যে মানুষ যুদ্ধ করে। যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল কুরআনে বলা হয়েছে- ‘তাদের অনুমতি দেয়া হলো যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে, কেননা তারা নির্যাতিত। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের সাহায্য করতে সক্ষম’। আল হজ : ৩৯) এভাবে কুরআনে অনেক আয়াত রয়েছে, যা থেকে বুঝা যায়, ইসলামে যুদ্ধ বা সংগ্রামের উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্যায় প্রতিহত করা, অন্যের সম্পদ দখল নয়। আল্লাহ আরো বলেন- ‘তোমরা কি হাজীদের পানি পান করানো এবং মসজিদুল হারামের সেবা ও তত্ত্বাবধান করাকে ওই ব্যক্তির কাজের সমান মনে করে নিয়েছ, যে ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি এবং প্রাণপাত করলো আল্লাহর পথে’। (আত তাওবাহ : ১৯)

একটি মুসলিম দেশের স্বাধীনতা যখন বিপন্ন হয় বা হুমকিতে থাকে তার জন্য চেষ্টা করা মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মুহাম্মদ সা: বলেছেন- ‘সাবধান! যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের (অমুসলিম) কোনো ব্যক্তির ওপর জুলুম করবে বা তার প্রাপ্য কম দেবে কিংবা তার সামর্থ্যরে বাইরে কিছু করতে বাধ্য করবে অথবা তার সম্মতি ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে বাদি হবো।’ (আবু দাউদ : ৩৩৫২)

হিন্দু ধর্মের ধর্মগ্রন্থগুলোর মধ্যে বেদকে সবচেয়ে বেশি পবিত্র বিবেচনা করা হয়। এ গ্রন্থের অনেক বাণী কুরআনের সাথে মিলে যায়। যেমন তৌহিদের ব্যাপারে বেদের বর্ণনা সুস্পষ্ট। মুহাম্মদ সা:-এর নাম উল্লেখ করে কালকি অবতার বা শেষ নবী হিসেবে আগমনের কথা বাইবেল বা তাওরাতের তুলনায় বেদে বেশি উল্লেখ আছে। পরবর্তী সময়ে আর্যরা ভারত আক্রমণ ও পরবর্তী পর্যায়ে বেদকে নানাভাবে পরিবর্তন, পরিবর্ধন করে। যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে বেদে তারা অনেক শ্লোক রচনা করেছেন। যেমন- মহাশক্তিমান ইন্দ্র রাজা নিজের গৌরবর্ণের (আক্রমণকারী আর্য) বন্ধুদের সহযোগে ভূমি জয় করলেন, সূর্যের কিরণ এবং সাগর জয় করলেন। ‘হে ইন্দ্র, আমাদের সহায় থাকো, যেন আমরা নির্ভয়ে সম্পদ লুটতে পারি। (ঋগবেদ ১৩৩ঃ৪৮)

‘হে সোমরসপায়ী! জতুধনদের সন্তান-সন্ততিদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে এসো এবং ধ্বংস করে দাও। স্বীকারোক্তিকারী পাপীর দুই চোখ বের করে নাও’ (অথর্ববেদ ৩২ ঃ ১-৩)। এভাবে চারটি বেদে অনেক শ্লোক রয়েছে, যা থেকে বুঝা যায়, যুদ্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ভিনদেশের জমি, সম্পদ, জীবজন্তু ইত্যাদি দখল করা এবং যুদ্ধে অমানবিক পন্থা অবলম্বনে কোনো বাধা নেই। আরএসএস একটি হিন্দু মৌলবাদী সংগঠন, যা ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটানো। এর রাজনৈতিক শাখা বিজেপি, যা দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। আরএসএস এবং বিজিপি মিলে ভারতে বিগত সময়ে যে উগ্র কর্মকাণ্ড করেছে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।

বাবরি মসজিদ : মসজিদটি ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোদ্ধায় ১৫২৮-২৯ ইসায়ি, সম্রাট বাবরের জেনারেল মিরবাকি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯২ সালে আএসএস,বিজেপি ও অন্যান্য উগ্রবাদী সংগঠন এলাকাটিকে রামের জন্মভূমি দাবি করে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ধ্বংস করে। অথচ রাম কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নন। এই ঘটনা-পরবর্তী ভারতে প্রায় ২০০০ মানুষ নিহত হন। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ওই ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করাকে অবৈধ ঘোষণা করে দায়িত্ব পালন করে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় কংগ্রেস পার্টি বাবরি মসজিদ ধ্বংস প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে হিন্দু মৌলবাদকে নীরব সমর্থন দেয়।

গুজরাট হত্যাকান্ড : ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার চার-পাঁচ মাসের মধ্যে ২০০২ সালে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়। তাতে প্রায় ২০০০ মুসলমান নিহত হন। মুসলমানদের বাড়িঘর-মসজিদ ধ্বংস করা এবং মুসলিম নারীদের ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনার ব্যর্থতার দায়ে যুক্তরাষ্ট্র নরেন্দ্র মোদিকে ২০০৫-২০১৪ পর্যন্ত ভিসা প্রদান বন্ধ রাখে। ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

কাশ্মির : ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া এক ধারায় বলা হয়, কাশ্মিরের জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে যা ভারত কিছুতেই বাস্তবায়ন করেনি। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী কাশ্মিরিরা বিশেষ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতেন। ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার ২০১৯ সালে এই সুবিধা বাতিলের পর সেখানে অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। এখনো মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে।

মুর্শিদাবাদ দাঙ্গা : এপ্রিল, ২০২৫-এ ভারতীয় মুসলিমদের ওয়াকফ সম্পত্তির ওপর বিজেপি সরকারের হস্তক্ষেপের পর সেখানে দাঙ্গা সংঘটিত হয়।

নাগপুর দাঙ্গা : মার্চ, ২০২৫-এ মুসলিম স্মৃতিসৌধ সরানো নিয়ে দাঙ্গা সংঘটিত হয়।

ত্রিপুরা : ২০২১ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দাঙ্গা বাধায়।

মনিপুর : ২০২৩ সালে দাঙ্গায় মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

আসাম : বোড়ো মুসলিম সংঘর্ষে ১০০ জন নিহত হন। এ ছাড়া প্রায় চার লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন, যার বেশির ভাগ মুসলিম।

বাংলাদেশ : ভারতের হিন্দাত্ববাদী সরকার বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যা করে এমন এক সৈরাচারী সরকার চাপিয়ে দেয়, যা গুম, খুন, গণহত্যা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে এ দেশকে দেউলিয়া রাষ্ট্রে পরিণত করে। এ ছাড়া অনেক অসম গোপন চুক্তি করে এ দেশকে ভারতের করদ রাজ্যে পরিণত করে। বিজেপি সরকার সম্প্রতি ভারতের নতুন পার্লামেন্ট ভবনে অখণ্ড ভারতের একটি মানচিত্র স্থাপন করেছে; যেখানে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কার কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি হচ্ছে, বিজেপির পাশের দেশের প্রতি সম্প্রসারণবাদের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। কাজেই যারা ভারতের সাথে নতজানু অবস্থান গ্রহণ করে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বপ্ন দেখেন তারা নিশ্চয় স্বাধীনতার অর্থ জানেন না বা জেনে-বুঝে ভারতের দাসত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত।

মুসলিমরা ৭০০ বছর ভারত শাসন করেছেন। এ দীর্ঘ সময়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতে একটিও দাঙ্গার নজির নেই।

মুসলিম মৌলবাদ ও উগ্্র মৌলবাদ : ভারতীয় প্রচার মাধ্যম, বাংলাদেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ, কিছু গণমাধ্যম হিন্দু মৌলবাদ সৃষ্ট চরম সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে নীরব। তারা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে টেলিস্কোপ দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের কাহিনী খুঁজে বেড়ায়। আমাদের দেশেও উগ্র মৌলবাদী সংগঠন আছে। কিন্তু এর উত্থান ও কর্মকাণ্ডের সাথে গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইসলামকে জঙ্গি ধর্ম হিসেবে উপস্থাপনা করা আর নিজেদের কুৎসিত চেহারা আড়াল করা।

উদাহরণ : জেএমবি ১৯৯৮ সালে আওয়ামী সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাভাই ছাড়া এ দলের মজলিসে শূরার বাকি সদস্য সবাই আওয়ামী পরিবারের। তাদের নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ ও ভারতে বিস্তৃত। উদ্দেশ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতে ইসলামী শরীয়ত প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৯৮-২০০১ পর্যন্ত জেএমবি পরিচালিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কোনো তদন্ত ও বিচার হয়নি। ২০০৫ সালে জেএমবি সারা দেশে একই সময়ে ৫০০-এর বেশি বিস্ফোরণ ঘটায়। এ কর্মকাণ্ডে ভারতের কিছু লোকও অংশগ্রহণ করে; যা তৎকালীন ডিজি, বিডিআর উল্লেখ করেছিলেন। এ ধরনের বিস্ফোরণের উদ্দেশ্য ছিল চারদলীয় জোট সরকারের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করা। সেই সাথে ইসলামকে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে প্রচার করা। জোট সরকার জেএমবিকে নিষিদ্ধ করে। বাংলাভাই ও আব্দুর রহমানকে গ্রেফতার করে। পরবর্তী সময়ে তাদের ফাঁসি কার্যকর হয়। ২০১৬ সালে আওয়ামী সরকারের আমলে নতুন একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী হোলে আর্টিজানে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এতে জাপানি নাগরিকও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। অথচ জাপান আমাদের অন্যতম সাহায্যকারী দেশ। বোঝাই যাচ্ছে, ইসলামের নামে গঠিত এসব সংগঠনের কর্মকাণ্ড কুরআন ও রাসূলের শিক্ষা থেকে থেকে কত দূরে। জেএমবির কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশের সব আলেমরা নিন্দা জানিয়েছেন। অথচ বিজেপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে বেশির ভাগ হিন্দু পুরোহিতরা প্রকাশ্যে বা নীরবে সমর্থন দিয়ে থাকেন। বর্তমানে ভারতীয় মিডিয়া ও আমাদের সুশীল সমাজের সবচেয়ে বড় নিশানা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এর উত্থান তাদের বড় অপছন্দ। অথচ এ দলের একজন সাধারণ কর্মীও হিন্দুর জমি দখল করেননি বা হিন্দু নারীর শ্লীলতাহানি করেননি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাতো দূরের কথা, হিন্দুদের মন্দির জামায়াতের নেতাকর্মীরা পাহারা দিয়েছেন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের কোনো নেতাকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি। তারপরও তাদের প্রতি এত আক্রোশ কেন? তাদের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় হত্যা করা হয়েছে। পতিত স্বৈরাচারী সরকার অনেক দলের মধ্যে কেবল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল। কারণ জামায়াতের নেতাকর্মীরা এ দেশের স্বাধীনতার অতন্ত্র প্রহরী (অথচ তাদের স্বাধীনতাবিরোধী আখ্যা দেয়া হয়)। অর্থের লোভ দেখিয়ে গুম, খুন, জেল-জুলুম করে তাদের নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত করা যায় না। তাদের শীর্ষ নেতারা হাসিমুখে প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, দেশের ও জাতির স্বার্থের বিনিময়ে কোনো আপস করা যায় না।

লেখক: মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ