গ্রন্থাগার কি কেবল এমপিওর শর্ত

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
‘হাসপাতালের চেয়ে গ্রন্থাগার জরুরি’ এটি প্রমথ চৌধুরীর উক্তি। কিন্তু বাংলাদেশের স্কুল-কলেজগুলোতে গ্রন্থাগার কেবল এক আনুষ্ঠানিকতার নাম। অনেক ক্ষেত্রে এমপিও পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে গ্রন্থাগার রাখা হয়। কেন এই অবস্থা? শিক্ষার্থীরা কি গ্রন্থাগারমুখী নয়? পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই?

এসবের কোনোটিই নয়। নতুন ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা বই পড়তে চায়, গ্রন্থাগারে যেতে চায়। প্রতিটি স্কুলে গ্রন্থাগার শিক্ষক আছে। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা অনেক জায়গায়। শিক্ষা প্রশাসন ও স্কুল প্রশাসনের অবহেলা। স্কুলে গ্রন্থাগার চালু রাখতে হলে ‘লাইব্রেরি ক্লাস’ চালু রাখা জরুরি। এ সংশ্লিষ্ট পরিপত্র থাকলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকাশিত রুটিনে লাইব্রেরি ক্লাসের উল্লেখ নেই। অন্য দিকে সহকারী শিক্ষকদের (গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান) সাথে যা হচ্ছে তা রীতিমতো খামখেয়ালিপনা।

ছোটবেলায় দেখতাম, গবেষণার জন্য ব্যাঙের বুক চিড়ে এর ভেতরের অঙ্গ দেখানো শেষে আবার সেলাই করে ছেড়ে দেয়া হতো। ব্যাঙের পরিণতি কী হতো, সেটি খোঁজ নিয়েছেন বলে জানা যায়নি। গ্রন্থাগার সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সাথেও এমনটিই হচ্ছে। ২০১২ সালে কোনো কারণ ছাড়াই তাদের বানানো হলো কর্মচারী। বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পর ২০২১ সালের নীতিমালায় গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের শিক্ষক হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের নীতিমালায় সহকারী শিক্ষক (গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান) পদোন্নতির অযোগ্য হিসেবে বলা হয়েছে। পরিশষ্ট ‘ঘ’ এর ১২ নং কলামের বর্ণনা অনুযায়ী— সহকারী শিক্ষক গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান’ তার উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক সুবিধাদি প্রাপ্য হবেন, তবে তিনি ‘সিনিয়র শিক্ষক’ হিসেবে পদোন্নতি প্রাপ্য হবেন না। এই নীতি শুধু অন্তঃসারশূন্যই নয়; সম্পূর্ণ অমানবিক, অসাংবিধানিক। অন্যান্য পদে শিক্ষকরা পদোন্নতিযোগ্য হলেও গ্রন্থাগার শিক্ষকরা কেন পদোন্নতি পাবেন না, এই ব্যাখ্যা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আসেনি।

নীতিমালার খসড়া প্রকাশ হওয়ার পরপরই এ বিষয়ে গ্রন্থাগার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো মন্ত্রণালয় সচিবের সাথে সাক্ষাৎ করে এই ধারা চূড়ান্ত নীতিমালায় না রাখার আবেদন করে। কিন্তু ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব রেহানা পারভীন স্বাক্ষরিত চূড়ান্ত নীতিমালায় ওই ধারাটির কোনো পরিবর্তন ছাড়াই অনুমোদিত হয়।

সম্প্রতি সহকারী প্রধান ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে। এতে গ্রন্থাগার শিক্ষকদের আবেদনের সুযোগ রাখা হয়নি। যোগ্যতায় সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে তিন বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। একজন গ্রন্থাগার শিক্ষক তার যোগ্যতা দিয়ে যদি সহকারী প্রধান/প্রধান শিক্ষক হতে পারেন তাহলে বাধা কেন? কেবল উল্লিখিত শর্তের কারণে গ্রন্থাগার শিক্ষকরা এতে আবেদনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। এ বিষয়ে কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে মনে করি।

গ্রন্থাগার বিজ্ঞানকে পাঠ্য করে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ নম্বর পাঠাগারকেন্দ্রিক কার্যক্রমের উপর রাখা যেতে পারে। স্কুল-কলেজের গ্রন্থাগারগুলোকে বিতর্ক, বক্তৃতা ও ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ের মতো সহপাঠক্রমিক কাজের হাব হিসেবে গড়ে তোলা যায়। এর জন্য গ্রন্থাগার ক্লাসকে রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষায় বিপ্লব ঘটাতে চাইলে দেশে প্রায় ২৩ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারকে কার্যকর করার বিকল্প নেই। সেই সাথে গ্রন্থাগার শিক্ষকদেরকে রাখতে হবে সম্মানের জায়গায়।

লেখক : সহকারী শিক্ষক (গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান), আরজত আতরজান উচ্চবিদ্যালয়, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা