এটি কি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়

মাসুম মুরাদাবাদী
ভারতে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ইস্যু হচ্ছে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর চলমান নির্যাতন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরঙ্গ দলের মতো হিন্দু উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো এ বিষয়ে বেশ হইচই করছে। শুধু কয়েকটি শহরে সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে তাই নয়; বরং উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে কয়েকটি মাজারও তছনছ করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারও গভীর উদ্বেগে রয়েছে। ডিসেম্বরে ১০ দিনের মধ্যে দু’বার নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশী হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে সোজাসাপটা কথা শুনিয়ে দেয়া হয়েছে। ২৬ ডিসেম্বর শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক প্রেস কনফারেন্স ডেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার বক্তব্য- হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর চলমান হামলা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনকালে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও জমি দখলের দুই হাজার ৯০০টি ঘটনা ঘটেছে। ভারত দাবি করেছে, অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে এবং এ ঘটনাগুলোতে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এটি বাস্তব যে, ডিসেম্বরের শেষের কয়েক দিনের অস্থিরতার সময় বাংলাদেশে দু’জন হিন্দু যুবকের মৃত্যু ও কিছু স্থানে হিন্দুদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটার পর সেখানকার সংখ্যালঘু হিন্দু অধিবাসীদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ ঘটনা অবশ্যই নিন্দনীয়। বাংলাদেশ সরকার দোষীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপও নিয়েছে; কিন্তু এ বিষয়ে হিন্দু উগ্রপন্থীরা ও মোদি সরকার যে আচরণ প্রকাশ করেছে তা অন্তত আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। কেননা ভারতের সংখ্যালঘুদের ওপর যখন নির্যাতন হয় এবং সে বিষয়ে কোনো মুসলিম দেশ প্রতিবাদ করে, তখন ভারত সরকার ওই প্রতিবাদকে এ বলে তাচ্ছিল্যের সাথে প্রত্যাখ্যান করে যে, ‘এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাইরের কোনো দেশের এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।’ কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ কথা সঠিক। কিন্তু যদি আমরা কোনো দেশকে আমাদের বিষয়ে হস্তক্ষেপের অনুমতি না দিই, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- আজ ভারত বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুর ওপর চলমান নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কেন করছে এবং ওই সব হিন্দু উগ্রপন্থী সংগঠন যারা এখানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার জন্য দায়ী, তারা এ নিয়ে কেন এত হইচই করছে? এটি কি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়? তাদের ব্যাপারে কোনো কিছু বলা এবং হস্তক্ষেপ করার অধিকার তো আমাদের নেই।

বাংলাদেশের ঘটনাবলি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ যথার্থ। কেননা তারা আমাদের প্রতিবেশী। ওখানে যখনই পরিস্থিতি খারাপ হয়, তখন ভারতেও তার আঁচ অনুভূত হয়। বাস্তবেই বাংলাদেশ এ মুহূর্তে নাজুক সময় পার করছে। সেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রয়েছে। আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। সদ্য অস্থিরতার কারণ তরুণ ছাত্রনেতা ওসমান হাদি হত্যা। তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ওসমান হাদি শেখ হাসিনা উৎখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এ কারণে তাকে ভবিষ্যতের নেতারূপে দেখা হচ্ছিল। তিনি ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণেরও ঘোষণা দিয়েছিলেন; কিন্তু তাকে হত্যার পর পরিস্থিতি হঠাৎ বিগড়ে যায়। এরই মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান ১৭ বছরের দেশান্তরীর পর লন্ডন থেকে ঢাকায় পৌঁছেছেন। তিনি জনসম্মুখে তার প্রথম ভাষণে মার্টিন লুথার কিংয়ের এই বাক্যের পুনরাবৃত্তি করেন, আমার একটি স্বপ্ন রয়েছে। উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমানই তার মায়ের দল বিএনপির নেতৃত্ব দেবেন, যার ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তাকে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ছাত্রনেতা ওসমান হাদির মৃত্যুর পর বাংলাদেশে যে সহিংসতা হয়, তাতে এখন পর্যন্ত দু’জন হিন্দু যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এক হিন্দু যুবককে রাসূল সা:-এর অবমাননার অভিযোগে হত্যা করা হয়। অন্য দিকে অমৃত মণ্ডল নামের হিন্দু যুবককে ২৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশের দাবি, অমৃত মণ্ডল এলাকায় চাঁদাবাজি গ্যাংয়ের সর্দার ছিল এবং এটিই তার মৃত্যুর কারণ। কারণ যেটিই হোক, বাংলাদেশে হত্যার এ ঘটনাবলি নিন্দনীয়। বাংলাদেশের কয়েকটি জেলা থেকেও এমনই খবর এসেছে যে, সেখানে হিন্দুদের ঘরবাড়িতে হামলা হয়েছে এবং তন্মধ্যের কিছু স্থানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে- বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে চলমান ঘটনাবলির জন্য হিন্দু উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো ভারতের মুসলমানদের দায়ী ভেবে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো শুরু করে দিয়েছে। বিহার ও উত্তরপ্রদেশে কয়েকটি মাজারের ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। এমনকি উড়িষ্যায় পশ্চিমবঙ্গের এক মুসলমান শ্রমিককে বাংলাদেশী হওয়ার সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা ওয়াজেদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়ার পর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন উভয় দেশের সম্পর্ক বেশ ভালো ছিল; কিন্তু তার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায় এবং ভারতে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা শুরু হয়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে- প্রতিটি বাংলাভাষী শ্রমিককে বাংলাদেশী ভেবে হয়রানি করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী বাংলাভাষী কয়েকজন মুসলমানকে জোরপূর্বক সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিয়ে তাদের জীবন নিয়ে খেলা হচ্ছে। বাংলাভাষী পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক যেখানেই থাকুন না কেন, তাদের অনুপ্রবেশকারী অভিহিত করে তাদের সাথে নিকৃষ্ট আচরণ করা হচ্ছে।

এখন আমরা আমাদের বিষয়ের প্রতি ফিরে আসি। ভারত বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর চলমান নির্যাতন প্রসঙ্গে যে কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করেছে, তা কতটুকু সঠিক? বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুর ওপর চলমান নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার নৈতিক সাহস আমরা আগেই হারিয়েছি। কেননা ভারতে সংখ্যালঘুদের সাথে যে অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে, তা ভারতের মতো বড় ও সেকুলার রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মানায় না। বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আমরা বিগত কয়েক দিনের ঘটনাবলির ওপরই দৃষ্টিপাত করি। গত ২৫ ডিসেম্বর সারা বিশ্বের সাথে আমাদের দেশেও ক্রিসমাস পালন করা হচ্ছিল, যা খ্রিষ্টানদের সবচেয়ে বড় উৎসব। ভারতে মুসলমানদের পর খ্রিষ্টানরা দ্বিতীয় বৃহৎ সংখ্যালঘু। তাদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো- এখানে শিক্ষার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। খ্রিষ্টান মিশনারিদের মাধ্যমে পরিচালিত স্কুল ভারতে তাদের মানসম্মত শিক্ষার জন্য বিখ্যাত। কিন্তু যখন থেকে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে, তখন থেকে মুসলমানদের পাশাপাশি খ্রিষ্টানরাও ফ্যাসিবাদী শক্তির নিশানায় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো ধর্মান্তর করানো। এ কারণে গত ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাসের সময় দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বজরঙ্গ দল ও অন্যান্য উগ্রপন্থী হিন্দু সংগঠন চার্চগুলোতে হামলা চালায় ও ভাঙচুর করে। বেশ কিছু স্থানে ক্রিসমানের প্রতীকী সান্তাক্লজকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। এক দিকে যেখানে ক্রিসমাসের বিরুদ্ধে এ উসকানিমূলক কার্যক্রম চলছিল, তখন অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লির সবচেয়ে বড় গির্জায় উপস্থিত হয়ে প্রার্থনাসভায় অংশগ্রহণ করেন এবং খ্রিষ্টানদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র বজরঙ্গ দল ও অন্যান্য উগ্র হিন্দু সংগঠনের ওই সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, যারা ক্রিসমাসের উৎসব তছনছ করে দিয়েছে ও চার্চে হামলা করেছে। এটিই আমাদের আসল চেহারা, যা সাথে নিয়ে আমরা বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান নিপীড়নের বিরুদ্ধে কুম্ভীরাশ্রু ফেলছি।

লক্ষ্ণৌর দৈনিক আগ পত্রিকায় ২৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত নিবন্ধ,

উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব

লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট