গেরুয়া সন্ত্রাসে বিপন্ন ভারতের বাংলাভাষীরা

বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির পরিচয় একটি বৃহৎ ব্যাপার। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচিতির সাথে একে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।

মোহাম্মদ সাদউদ্দিন

খোদ পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র কলেজ স্ট্রিট ও শিয়ালদহ লাগোয়া বৈঠকখানা রোডে ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল হোস্টেলের পড়ুয়া মার খেলেন ও হামলার শিকার। বিষয়টি গভীর উদ্বেগের। এতদিন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বিজেপি-শাসিত বা বিজেপি জোট-শাসিত রাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের যারপরনাই হেনস্তা, শারীরিক নির্যাতন, হামলা ও খুন সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছেও। এমনকি তাদেরকে বাংলাদেশে পুশইন ও পুশব্যাক করা হচ্ছিল। এখন সেই কাণ্ডটি খোদ কলকাতায় ঘটে গেল যা গভীর উদ্বেগের। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শুধু নয়, তিনি বলেছেন- আমিও নিশানা হয়ে যেতে পারি। আমি ঢাকা চলে যেতেও পারি। সেখানে অনেক নিরাপদ থাকব। তবে অমর্ত্য সেনকে ন্যায্য কথা বলার জন্য তাকে খোদ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতীতেও নানাভাবে অপমানিত হতে হচ্ছে।

আজকে আমাদেরকে স্বীকার করতেই হবে যে, আরএসএস-বিজেপির ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’ তত্ত¡কে খাড়া করতে গিয়ে একদিকে বিজেপি আক্রমণের নিশানা করেছে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলিমদের। অন্যদিকে বাংলাভাষী ও বাঙালিদের যা একটি আশঙ্কাজনক ঘটনা। একটি মারাত্মক প্রবণতাও। ভারতের সংবিধানে লিখিত ভাষার সংখ্যা ১৯। তার মধ্যে অন্যতম ভাষা বাংলা। কেউ কারুর থেকে ছোট বা বড় নয়। সম-মর্যাদায় মর্যাদা-সম্পন্ন। কিন্তু বিজেপি বা আরএসএস সংবিধান কি মানে? তাহলে আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা কেন বলবে, যাদের মাতৃভাষা বাংলা তারা সব বিদেশী। তাহলে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসম, বিহার, ঝাড়খণ্ডে বসবাসকারী বাঙালিরাও বিদেশী। আসামে আজ বুলডোজার দিয়ে কিভাবে বাঙালি বা বাঙালি মুসলিমদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আতঙ্ক যেমন গ্রাস করছে, তেমনি নিজেদের পরিচয় সঙ্কটে আত্মহারা ভারতে বসবাসকারী বাঙালি ও বাঙালি মুসলিম সমাজ।

অসমে বাঙালিরা বহুদিন থেকেই নির্যাতনের শিকার। সেটিকে আরো সঙ্কটাপন্ন করে তুলেছে আরো বেশি। এই একই ঘটনাগুলো ঘটছে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে। সবগুলোই তো বিজেপি-শাসিত। অসমে এনআরসির নামে ৪০ লাখ বাঙালি আজ ডিটেনশন ক্যাম্পে যার মধ্যে বেশির ভাগই বাঙালি হিন্দু। বিহারে এসআইআর নিয়ে যা হচ্ছে তার প্রভাব বাঙালি শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে। একদিকে বিজেপি এনআরসির মাধ্যমে নাগরিকহীন করছে, অন্যদিকে এসআইআরের মাধ্যমে ভোটারহীন করছে। আর এর শিকার বাঙালি ও বাংলাভাষীরা। অসমের প্রভাব পড়ছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশের জেলাগুলোর মধ্যে। যেমন- কোচবিহার, জলপাইগুড়ি বা আলিপুরদুয়ারের মধ্যে। কেননা, অসমে এনআরসি এখনো চলমান। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে কাজ করতে যাওয়া মালদা-মুর্শিদাবাদ-দুই দিনাজপুর-নদীয়া-দুই বর্ধমান-বীরভূম-দুই চব্বিশপরগণার পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিক ও পেশাজীবীদের ওপর।

কোথাও বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের আটক করে তাদেরকে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলা হলো। কোথাও বাঙালি বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে অবাঙালিদের হাতে প্রহৃত হলো। কোথাও বাঙালিকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা হলো। বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের এরূপ হেনস্তা হওয়ার ঘটনা একদম নতুন না হলেও এবার বাংলা ভাষা ও বাঙালির পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একজন অবাঙালি রাজনৈতিক নেতা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ যে ভাষায় কথা বলে তাকে বলা হয় বাংলাদেশী ভাষা। একটি রাজ্যের পুলিশ আধিকারিকও অনুরূপ কথা লিখেছেন। বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশী ভাষা বলে অভিহিত করে ওই অবাঙালি নেতা ও আধিকারিক অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলাদেশের বাংলাভাষীরা যেমন বাঙালি তেমনি পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীরাও সমানভাবে বাঙালি। ভারতের ত্রিপুরা, অসম ও মেঘালয়েও বহুকাল আগে থেকে ভালো সংখ্যক বাঙালি স্থায়ীভাবে বসবাস করে। গোটা বিশ্বে বাঙালির সংখ্যা আনুমানিক ৩০ কোটি।

জনগোষ্ঠী ও জনপদের সাথে ভাষার শব্দগত সাযুজ্য থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। যেমন- যে জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা তাদেরকে বাংলাভাষী অথবা বাঙালি বলা হয়। কিন্তু যে জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা হিন্দি তাদেরকে হিন্দিভাষী বলেই ক্ষান্ত থাকতে হয়। বাংলাভাষীদের জন্য যেমন বাঙালি শব্দটি ব্যবহার করা যায় হিন্দিভাষীদের জন্য তেমন কোনো শব্দ ব্যবহার করার সুযোগ নেই। উর্দুভাষীদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। জনপদ বা স্থানিক পরিচয়ে যেমন বিহারের অধিবাসী বিহারি, গুজরাটের অধিবাসী গুজরাটি, রাজস্থানের অধিবাসী রাজস্থানি, ভারতের অধিবাসী ভারতীয় তেমনি বাংলাদেশের অধিবাসী বাংলাদেশী আর পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে পরিচিত।

যেকোনো ভাষার একাধিক আঞ্চলিক রূপ থাকা সম্ভব। একটি ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপকে বলা হয় উপভাষা। এই উপভাষা ভাষা সাধারণত লেখার ক্ষেত্রে হয় না, হয় বলার ক্ষেত্রে। অর্থাৎ ভাষার লেখ্য রূপ এক থাকলেও বদলায় তার কথ্য রূপ। কলকাতা ও ঢাকার সাহিত্যিকদের লেখনী বা রচনাশৈলী প্রায় একই রকম হলেও এই দুই শহরের দু’জন সাহিত্যিক যখন কথা বলেন তখন তাদের উচ্চারণগত ভিন্নতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুই শহরের সাধারণ মানুষের উচ্চারণের প্রভেদ আরো বেশি। তবে এই পার্থক্য শুধু দু’টি দেশের দু’টি শহরের মধ্যেই নয়, একই দেশের বিভিন্ন শহর বা এলাকার মধ্যেও হয়ে থাকে। মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষের কথা বলার ধরন কলকাতা বা বর্ধমানের লোকদের থেকে বেশ কিছুটা আলাদা। বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা প্রভৃতি এলাকার অধিবাসীদের বাংলা উচ্চারণেও ফারাক রয়েছে।

প্রতিটি ভাষা একাধিক উৎস থেকে শব্দ সংগ্রহ করে। উৎসগুলোর মধ্যে একটি হলো বিদেশী ভাষা। যেমন- ইংরেজি ভাষা রোমের রোমান, গ্রিসের গ্রিক ও ফ্রান্সের ফরাসি ভাষা থেকে প্রচুর শব্দ গ্রহণ করেছে। ইংরেজি শব্দভাণ্ডারের স্ফীতিতে উপমহাদেশের বাংলা ও হিন্দি শব্দেরও অবদান রয়েছে। গুরু, পণ্ডিত, জগন্নাথ, ঘেরাও, দাদাগিরি, বনধ প্রভৃতি ভারতীয় শব্দ ইংরেজি সাহিত্য ও সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছে। নতুন শব্দ গঠনের প্রক্রিয়াও কখনো রুদ্ধ হয় না। এ ব্যাপারে সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সম্প্রতি আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বঘোষিত সাহিত্যিক একটি নতুন শব্দের জন্ম দিয়েছেন-শুভনন্দন।

বাংলা ভাষায় আনুমানিক এক লাখ শব্দ আছে বলে ধরা হয়। এর মধ্যে তৎসম শব্দ (সংস্কৃত ভাষা থেকে সরাসরি বাংলা ভাষায় এসেছে) ২৮ শতাংশ, অর্ধ-তৎসম শব্দ (সংস্কৃত ভাষা থেকে কিছু পরিবর্তনসহ বাংলা ভাষায় এসেছে) ১২ শতাংশ, তদ্ভব শব্দ (সংস্কৃত ভাষা থেকে প্রাকৃত ভাষার মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষায় এসেছে) ১৬ শতাংশ, দেশী শব্দ (বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ) ১৬ শতাংশ এবং বিদেশী শব্দ (ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে থেকে বাংলা শব্দভাণ্ডারে প্রবেশ করেছে) ২৮ শতাংশ বা ২৮ হাজার। বাংলা ভাষায় বিদেশী শব্দের মধ্যে ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, ফরাসি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ ও তুর্কির সংখ্যা বেশি।

বাংলা তথা অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় বহুল পরিমাণে ইংরেজি শব্দ থাকার একটি বড় কারণ হলো উপমহাদেশে প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন। পৃথক ভাষাভাষীর মানুষ দীর্ঘদিন পাশাপাশি বসবাস করলে সাংস্কৃতিক লেনদেনের অংশ হিসেবে পরস্পরের ভাষা সম্পর্কে পরিচিত হয় এবং লেখা ও বলার সময় তা ব্যবহার করে। দীর্ঘদিনের ইংরেজ শাসনের ফল হিসেবে আজও আমাদের দেশে প্রশাসনের কাজে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পঠনপাঠনে ইংরেজি সর্বাধিক ব্যবহৃত ভাষা হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলা তথা ভারতের কিছু কিছু অংশে ফরাসি, পর্তুগিজ ও ওলন্দাজদের উপনিবেশ ছিল। এ জন্য এই ভাষাগুলো থেকেও কিছু শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে। আরবি, ফার্সি ও তুর্কি ভাষার ক্ষেত্রেও প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে। এগুলো মূলত মুসলিম দেশগুলোর প্রধান ভাষা। আমরা সবাই জানি, ভারতে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার আগে মুসলিম সম্রাট, সুলতান ও নবাবদের ভারত শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই শাসকের ভাষার অনেক শব্দ এদেশের ভাষাগুলোর শব্দভাণ্ডারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফার্সি ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত ভারতে সরকারি কাজকর্মের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আরবি আরব দেশের ভাষা। বাংলা শব্দভাণ্ডারে আরবি, ফার্সির উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি সম্পর্কে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘বাংলা ভাষায় ফারসি আরবি শব্দের সংখ্যা কম নয় কিন্তু তারা সহজেই স্থান পেয়েছে।... মুসলমান সমাজের নিত্য ব্যবহৃত শব্দ যদি ভাষায় স্বতঃই প্রবেশলাভ করে তবে তাতে সাহিত্যের ক্ষতি হবে না; বরং বংশবৃদ্ধি হবে, বাংলা ভাষার অভিব্যক্তির ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত আছে।’

বাংলা ভাষায় নিত্যব্যবহার্য কয়েকটি আরবি ও ফার্সি শব্দের উদাহরণ দেয়া যাক। আরবি- আইন, আদালত, আসর, আসামি, আতর, আমানত, ইমারত, ইজ্জত, ইস্তফা, উকিল, ওকালতি, ওজন, কসরত, কৈফিয়ত, কলম, কসাই, কাহিল, কেচ্ছা, খবর, খসড়া, খতম, খাজনা, খালাস, খারিজ, খুন, খেলাপ, খেসারত, গরিব, গোলাম, গরমিল, গাফিলতি, জজ, জমা, জমি, জরিপ, জবাব, জলসা, জল্লাদ, জুলুম, জাহাজ, জালিয়াতি, তবলা, তারিখ, তালাক, তাগাদা, তালুক, তাস, দখল, দাখিল, দুনিয়া, দোয়াত, দৌলত, দালাল, নকল, নগদ, নবাব, নায়েব, নেশা, নকশা, নাজেহাল ইত্যাদি। ফার্সি- অন্দর, আন্দাজ, আওয়াজ, আয়না, আরাম, আলাদা, আমির, উজির, আমদানি-রফতানি, কাগজ, কেদারা, কারবার, কারখানা, খাতা, খানকা, চশমা, চাকর, চাদর, চিঠি, জায়গা, জরিপ, দরজা, দোকান, দুনিয়া, দস্তানা, দরগা, দরবার, বাগান, বরফ, গোলাপ, শিশি, সিন্দুক, নালিশ, নামাজ, রোজা, সর্দার, সেলামি ইত্যাদি। এই তালিকা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাংলা ভাষায় আরবি-ফার্সি শব্দের ব্যবহার কত ব্যাপক এবং সেই সাথে স্বচ্ছন্দ। শব্দগুলোর বহুমুখী ব্যবহারও লক্ষণীয়। ধর্মীয়, ব্যবসায়িক, সামাজিক, বিচারিক ও সাধারণ ব্যবহারিক সব ধরনের শব্দই আছে। জাতি-ধর্ম, সাক্ষর-নিরক্ষর নির্বিশেষে সব বাঙালি অত্যন্ত সাবলীলভাবে যুগ যুগ ধরে শব্দগুলো ব্যবহার করছে। এ জন্য শব্দগুলো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে।

জনসংখ্যার দিক থেকে ৩০ কোটি বাঙালির মধ্যে ২২ কোটির বেশি মুসলমান। অর্থাৎ, বাংলা ভাষায় আরবি-ফার্সি প্রভৃতি ‘মুসলমানি’ শব্দের প্রাধান্য থাকার পাশাপাশি বাঙালির মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য রয়েছে। এ জন্য হিন্দুত্ববাদী সা¤প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলা কিছু রাজনৈতিক দলের অবাঙালি অন্ধভক্ত বাঙালি ও মুসলমান এবং বাংলা ভাষা ও মুসলমানের ভাষাকে সমার্থক বিবেচনা করে। তারা বাঙালিকে বাংলাদেশী আর বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশী ভাষা বলে অভিহিত করে তাদের অজ্ঞতা ও অভিসন্ধির প্রকাশ ঘটায়। তারা বাংলা ভাষা ও বাঙালির ‘মুসলমানিত্ব’ নিয়ে অসন্তোষ ব্যক্ত করতে বাংলা ভাষা ও বাঙালিকেই আক্রমণ করে বসে। বিপরীতক্রমে মুসলিমদের একটা অংশ বাংলা ভাষার ‘হিন্দুয়ানি’ নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন না। পাকিস্তান আমলে পূর্ববঙ্গে প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিকদের একটা অংশ তাদের লেখা থেকে শ্মশান, ঈশ্বর, ভগবান, আমন্ত্রণ, অভিশাপ, প্রার্থনা, প্রভাত, সন্ধ্যা প্রভৃতি ‘হিন্দু’ শব্দ যথাক্রমে কবরস্থান, আল্লাহ, খোদা, দাওয়াত, গজব, দোয়া, ফজর, মাগরিব প্রভৃতি ‘মুসলিম’ শব্দের দ্বারা প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করতেন।

বাংলা ভাষা ও বাঙালিদের বহুবার কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ তার একটি বড় দৃষ্টান্ত। বাঙালির ধারাবাহিক ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চাপে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলেও ১৯১২ সালে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করে বাঙালির ওপর প্রতিশোধ নেয়া হয়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় কংগ্রেস ও লীগের অবাঙালি নেতারা বঙ্গ প্রদেশকে বিভক্ত করার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। নবগঠিত পাকিস্তানের অবাঙালি নেতৃত্ব বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব ও বাঙালির সংখ্যাধিক্যকে পাত্তা না দিয়ে উর্দুকে এক ও একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন। এর ফলে একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ ঢাকার রাজপথে ইতিহাস রচিত হয়। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ বিসর্জন দেন পাঁচজন বাঙালি। ভারতের আসাম রাজ্যে অসমিয়া জনগোষ্ঠী বাঙালির অধিকার খর্ব করার জন্য বাংলা ভাষাকে নিশানা করে। প্রচলিত নিয়ম লঙ্ঘন করে অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র রাজ্য সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দিয়ে আইন তৈরি করা হয়। ১৯ মে, ১৯৬১ বাংলা ভাষাকে অপমান করার বিরুদ্ধে আন্দোলনে শামিল হয়ে ১১ জন বাঙালির প্রাণদানের সাক্ষী থাকে শিলচর। লক্ষণীয় বিষয় হলো- একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষাশহীদরা যেমন সবাই মুসলমান, ১৯ মের ভাষাশহীদরা তেমনি সবাই হিন্দু। আসলে তারা ধর্মে হিন্দু-মুসলমান হলেও জাতিতে সবাই বাঙালি। আজও হিন্দি ভাষার আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাংলা ভাষার পক্ষে বাঙালির লড়াই চলছে।

ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলা ভাষার সাফল্য ও শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ নেই। বাংলা একটি ধ্রুপদী ভাষা। হাজার বছরের পুরনো সাহিত্য সম্ভার রয়েছে। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বইপত্র ও পত্র-পত্রিকার সংখ্যা প্রচুর। কলকাতা ও ঢাকায় প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১৩) আজ পর্যন্ত সাহিত্যে একমাত্র ভারতীয় নোবেলজয়ী। অর্থনীতিতে রয়েছেন দু’জন বাঙালি নোবেলজয়ী- অমর্ত্য সেন (১৯৯৮) ও অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯১৯)। শান্তিতে নোবেল জয় করেছেন বাঙালি অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস (২০০৬)। জন্মসূত্রে অবাঙালি হলেও কর্মসূত্রে কলকাতাবাসী মাদার তেরেসা (১৯৭৯) পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার। চলচ্চিত্র জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার অস্কার পেয়েছেন বাঙালি পরিচালক সত্যজিৎ রায় (১৯৯২)। আর কোন ভারতীয় মাতৃভাষা এত সুসন্তান জন্ম দেয়ার দাবি করতে পারে?

বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির পরিচয় একটি বৃহৎ ব্যাপার। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচিতির সাথে একে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে হিন্দু-মুসলমানে বিভক্ত করে দেখার বদলে সংযুক্ত করে দেখতে হবে। একটি সজীব ও সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে বাংলার এবং সুপ্রাচীন ভাষিক জাতি হিসেবে বাঙালির যেকোনো ধরনের সঙ্কীর্ণতা এবং ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে সফলতা অর্জন করার সামর্থ্য আছে, তা একাধিকবার প্রমাণ হয়েছে। সামনের দিনগুলোতেও তার অন্যথা হবে না বলেই আশা করা যায়।

তবুও বলব, ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’-এর যূপকাষ্ঠে বলি ভারতের বাংলাভাষী ও বাঙালি সমাজ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক