ক্যালেন্ডার যথানিয়মে তার গন্তব্যে ছুটছে। সে কারো জন্য অপেক্ষা করে না। দুনিয়ার কোনো দিনপঞ্জি কার কিসে অপেক্ষা, কার কী প্রত্যাশা-প্রাপ্তি, তা দেখে না। সে আপন গতিতে চলমান, ধাবমান। ঘটনার ঘটক, অনুঘটক মানুষই।
বিদায়ী ’২৫ এর আগে ’২৪ সাল ছিল রাজনৈতিকভাবে ঐতিহাসিক। বছরটির ৫ আগস্ট বাঁক ঘুরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের। ফ্যাসিস্টের বিচার, সংস্কার নিয়ে তাগিদ ছিল জনগণের। গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ ছিল জাতীয় নির্বাচন। পঁচিশ সালজুড়েই প্রশ্ন ঘুরেছে- নির্বাচন হবে তো? হলে সেটি কবে? এ দুই প্রশ্নেরই জবাব মিলেছে নতুন বছর শুরুর আগেই। এরপরও ঘোর কাটেনি, যা ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত চর্চিত হবে। এটিই বাস্তবতা। কোনো বিষয়ে কারো আকাক্সক্ষা বেশি থাকলে যা হয়।
২০২৫ সাল পুরনো রাজনীতির ক্লান্তি, নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা, সহিংসতার ভয় ও সংস্কারের আকাক্সক্ষা- সবকিছু একসাথে এগিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারায়। বিচ্ছিন্নভাবে নানা সময় মিছিল করার চেষ্টা করেছিল দলটি, তার সাথে ককটেল ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টাও ছিল। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তিনটি মামলায় ২৫ জন (মোট ৩২) সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিও বড় ঘটনা। ২৫ কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জন সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং একজন অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (এলপিআর) ছিলেন। পরে সেনাবাহিনী ১৫ কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেয়ার তথ্য জানায়। তাদের বিচার চলছে। বিদায়ী বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে এসে ঘোষণা হয় ভোটের তারিখ। জানানো হয়- ১২ ফেব্রুয়ারি এক দিনে হবে দু’টি ভোট। একটি সাধারণ নির্বাচনের ভোট, আরেকটি গণভোট।
গত বছরের পুরোটা সময়ই গেছে জুলাই সনদ ও সংস্কার প্রণয়ন নিয়ে। বছরের শেষ দিনে উপসংহার ঘটল বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের। আগের দিন ৩০ ডিসেম্বর ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার। পরদিন নামাজে জানাজা। স্বামী জিয়াউর রহমানের জানাজাস্থল ঢাকার মানিক মিয়াতেই হলো বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা। এরপর স্বামীর পাশেই কবর। জমায়েতের ভারে আক্রান্ত ঢাকা। আগের সপ্তাহে লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় জমায়েত হয় আবেগ-উচ্ছ¡াসে তার ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বরণ করতে। তারও আগে হয় বিষাদে, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদির জানাজা পড়তে। এবারের জমায়েতও বিদায় ও বিষাদের। নির্বাচনকে ঘিরে সামনেও জমায়েতের বিশাল ট্রেনে কেবল ঢাকা নয়; গোটা বাংলাদেশ। বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সার্থকতা- বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হলেন।
তারেক রহমান দেশে ফিরেই জানিয়েছিলেন, আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান। তার এ প্ল্যান বাস্তবায়ন অবশ্যই নির্বাচনের পরের বিষয়। তবে শুরুটা নির্বাচনের আগেই দৃশ্যমান হতে থাকে। চলনে-বলনে এক ব্যতিক্রম ও অন্যরকম তারেক রহমানকে দেখতে থাকে বাংলাদেশ। যেখানে যাচ্ছিলেন সেখানেই মানুষ ছুটে যাচ্ছে। উচ্ছ¡াস সাধারণ মানুষের। অভিবাদনের জবাবে হাত নাড়তে নাড়তে কাহিল হয়ে পড়লেও; মিলছিল না মুখের হাসি।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শেখ হাসিনার শোক, কুমিরের কান্না। আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তার পক্ষ থেকে ওই শোকবার্তায় বলা হয়- বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার অবদান অপরিসীম। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এবং বিএনপি নেতৃত্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ও পরিবারের অন্য শোকাহত সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও একটি পোস্ট দেয়া হয়েছে। সেখানে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে। গণমাধ্যমগুলোতে শেখ হাসিনা ও তার ছেলে জয়ের এ শোক গুরুত্ব পায়নি। এই শোক যে তাদের চরম ভণ্ডামি বিষয়টিতে প্রায় সবাই একমত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার পক্ষে দাখিল করা তিনটি আসনে নতুন করে তফসিল ঘোষণা করতে হবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আনতে দেরি হয়নি। তার মৃত্যুর আগের দিন ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন। খালেদা জিয়ার পক্ষে বগুড়া-৭, দিনাজপুর-৩ ও ফেনী-১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়। এই তিন আসনে বিএনপির একজন করে বিকল্প প্রার্থীও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যেই পরদিন মঙ্গলবার ভোর ৬টায় খালেদা জিয়া মারা যান। জাতীয় নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা আছে- প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি, এমন কোনো বৈধভাবে মনোনীত প্রার্থীর মৃত্যু হলে ওই আসনে নতুন করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তিনটি আসনে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র জমা হলেও তিনি বা কেউ এখনো বৈধ প্রার্থী হননি। কারো মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে টিকে যাওয়ার পর তিনি বৈধ প্রার্থী বিবেচিত হন। খালেদা জিয়া মারা যাওয়ায় তার মনোনয়ন স্থগিত থাকবে। বৈধভাবে মনোনীত ঘোষণার পর কোনো প্রার্থীর মৃত্যু হলে সেখানে আবার তফসিল ঘোষণা করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সেটি করতে হবে না।
কোনো আসনে কোনো দল একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন দিতে পারে। তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে প্রতীক বরাদ্দের আগে যার নামে দল থেকে প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দেয়া হয়, তিনিই দলীয় প্রার্থী হন। তাই খালেদা জিয়ার নামে তিনটি আসনে নতুন করে তফসিল ঘোষণা দরকার হবে না। এরপরও খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের তফসিলে পরিবর্তন আনার দাবি তুলে অতিরাজনীতির ফাঁক খোঁজার লোক ও মহল রয়েছে। এ যাত্রায় তা বাজার পায়নি।
বছরজুড়ে আলোচনার আরেকটি বড় বিষয় ছিল- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে? তিনি আসছেন না কেন, এলে কবে নাগাদ আসবেন- এসব প্রশ্নে কৌশলগতভাবে কিছুটা কাবু হয়ে পড়ে বিএনপি।
শিগগিরই আসবেন, দ্রুত আসবেন- ধরনের জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারছিল না সাধারণ মানুষ। এর অবসান ঘটে ২৫ ডিসেম্বর বড় দিনে; কিন্তু অবসান হয়েও না হওয়ার মতো অবস্থা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায়। ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশে নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরুর পরদিনই ঘটে বিপত্তি। ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় ১৮ ডিসেম্বর। এর জেরে ফুঁসে ওঠে তার সমর্থকরা। খুনিদের গ্রেফতার ও বিচার দাবিতে আন্দোলন থামেনি। হাদি জুলাইযোদ্ধাদেরই একজন। এ যোদ্ধাদের রাজনৈতিক গন্তব্য কী হয়, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল ছিল বছরের শুরুতে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি গঠনে এই প্রশ্নের কিছুটা জবাব মেলে। বাকিটা এখনো বলতে গেলে বাকির খাতায়ই পড়ে আছে।
দুই যুগ আগে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হলেও বিএনপিতে তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল মা খালেদা জিয়ার সহযোগী হিসেবে। হাসিনা সরকার ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে পাঠালে বিদেশে থেকে দল পরিচালনার দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। এক-এগারোর তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বন্দী অবস্থা থেকে বের হয়ে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান তিনি। মা কারাগারে যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের হাল ধরেন তারেক রহমান। এরপর প্রতিটি লড়াই-সংগ্রামে বিদেশে থেকেই বিএনপি ও সমমনা দলগুলোকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি।
২০২৬-এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- অবাধ, সুষ্ঠু ও জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে রাজনীতিকে আবার নিয়মের ভেতরে ফিরিয়ে আনা, জনগণকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী ও আস্থাশীল করা। দলগুলোর পক্ষে জনমুখী কৌশল ও গণসংশ্লিষ্ট কর্মসূচি নির্ধারণ করে, পরিবর্তন ও সংস্কারের বিষয়গুলোকে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা। ক্ষমতা প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে, নির্বাচনের মাধ্যমে জন-আস্থার পথে এগিয়ে যাওয়া। তাহলেই দেশের মানুষ সমস্ত শোক, দুঃখ ও হতাশা কাটিয়ে স্বপ্ন দেখবে নতুন বাংলাদেশের। যেখানে কেবলি থাকবে সুদৃঢ় ঐক্য আর সমৃদ্ধি।
আরেক বছর বাড়ল বিশ্বের বয়স। কার না আশা জাগে বিগত বছরের কষ্ট-বেদনা পেছনে ফেলে নতুন বছরে নতুন কিছু প্রাপ্তির? বাস্তবে তা মিলুক না মিলুক এ প্রত্যাশা ও আকাক্সক্ষা দুর্নিবার। নতুন বছরে বিশ্বরাজনীতি, অর্থনীতি, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিতে ঘটতে পারে একাধিক ঘটনা। কিন্তু আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয় নির্বাচন। যদি নির্বাচনকে ঘিরে আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়, রাজনৈতিক দলগুলো অভ্যন্তরীণ সংস্কারে যায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা দেখায়, তবে ২০২৬ হতে পারে স্থিতিশীলতার সূচনা বছর। তাই নতুন বছর কেবল বরণ করে নেয়ার উৎসব নয়, আকাক্সক্ষা পূরণের বছরও। এমন আশায় বিদায়-২০২৫। স্বাগত-২০২৬।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট



