রমজানের ভোরের পাখি- মেসাহারাতি

বাংলাদেশে একসময় মাহে রমজানে সাহরির সময় ঢাকার মানুষের ঘুম ভাঙত কাসিদার মোহনীয় আবৃত্তিতে, সুরে ও ছন্দে। উর্দু রোড, কসাইটুলী, বকশিবাজার, হোসেনি দালান ও বংশালে কাসিদা এখনো খুব সীমিত আকারে পরিবেশিত হয়। মোগল আমলে ঢাকায় কাসিদার প্রচলন ঘটে। ১৯৪৭-৪৮ সালে এখানে কাসিদা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তেমনিভাবে মিসরেও রমজানে উঁচুদরের গায়করা সাহরি খাওয়ার জন্য মানুষকে ডাকে, তাদের বলা হয় মেসাহারাতি। মিসরের মেসাহারাতি এবং পুরো আরব বিশ্বে ভোরের পাখিরা কীভাবে কাজ করে তাই নিয়ে আজকের লেখা।

মেসাহারাতিরা রাস্তায় রাস্তায় চরে বেড়ায়, হাতে ঢোল জাতীয় বাদ্য বাজায়, অনেকের হাতে থাকে আরবীয় দফ। ঘুমন্ত লোকজন এই আওয়াজে ঘুম থেকে উঠে রমজানের সাহরি খায়। সুবেহ কাজেবের সময় একটি ড্রাম নিয়ে মেসাহারাতিরা হাঁটে, ডাক দেয়, ‘জেগে ওঠো, হে ঘুমন্ত মানুষ, ঘুমের চেয়ে উপাসনা ভালো!’ বিশেষ করে পুরাতন কায়রোতে রমজানের একটি লালিত ঐতিহ্য শতবর্ষ ধরে।

রমজানের রাতে মেসাহারাতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে তার রাউন্ড শুরু করে, সাধারণত ফজর নামাজের এক-দুই ঘণ্টা আগে। সাহরির সময় আসার সাথে সাথে তিনি বাসিন্দাদের ডাকতে পাড়ার মধ্য দিয়ে হেঁটে যান। ঐতিহ্যগতভাবে, মেসাহারাতিরা একা রাস্তায় হাঁটেন, উচ্চস্বরে ডাকেন, কাব্যিক বা ছন্দময় বাক্যাংশ ব্যবহার করেন- যেমন, ‘হে ঘুমন্ত লোকেরা, ওঠো তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত করো। হে ঈমানদারগণ, সাহরির জন্য জেগে ওঠো! হে পাড়ার বাসিন্দারা, এখন সাহরির সময়’— এসব বাক্য সুর করে বলেন। মেসাহারাতিরা প্রায়ই ঐতিহ্যবাহী মিসরীয় পোশাক, বা নিজেদের আরবীয় পোশাক পরিধান করেন, গালাবেয়া (দীর্ঘ পোশাক) এবং কখনো কখনো পাগড়ি বা তাকিয়া (টুপি)। তার উপস্থিতি রমজানের রাতের নস্টালজিক এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশকে আরো বাড়িয়ে তোলে।

মহল্লাবাসি মেসাহারাতিকে ঐতিহ্য, সম্প্রদায়ের যত্ন এবং রমজানের চেতনার প্রতীক হিসেবে দেখে। অনেক পরিবার রমজান শেষে তাকে ছোট ছোট উপহার, খাবার বা নগদ অর্থ দেয়। শিশুরা প্রায়ই তার কণ্ঠস্বর শোনার অপেক্ষায় থাকে— এটি মিসর ও অন্য আরব দেশগুলোতে রমজানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।

অ্যালার্ম ঘড়ি, স্মার্টফোন এবং আধুনিক জীবনের উত্থানের সাথে সাথে শহুরে কেন্দ্রগুলোতে মেসাহারাতির ভূমিকা হ্রাস পেয়েছে। এখনো জীবন্ত ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে পুরনো পাড়া, গ্রামীণ অঞ্চল এবং সাংস্কৃতিক উৎসবের সময় সক্রিয়। কিছু শহর এবং ঐতিহ্যবাহী সংগঠন এখন মিসরীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ঐতিহ্যটি পুনরুজ্জীবিত করে।

কথিত আছে, আল্লাহর রাসূল সা:-এর জামানায়, বিলাল বিন রাবাহ, যিনি মধুর কণ্ঠের জন্য বিখ্যাত ছিলেন, তিনি এই দায়িত্ব পালন করতেন। ৮৫৩ সালে মিসরের গভর্নর নিজেই আসকর শহরের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে লোকজনকে জাগিয়ে দিতেন। ওই স্থানটি বর্তমান ফুসতাতের ইবনে তুলুন থেকে আমর আল আসের রা: মসজিদ পর্যন্ত রাস্তাকে বুঝায়। গভর্নরের সাথে সহকারীও থাকতেন। তিনিই মূলত জোর গলায় সাহরির জন্য আহ্বান জানাতেন। গভর্নরের নাম ছিল ঘাবসা বিন ইসহাক, যিনি এই প্রথা মিসরে চালু করেন।

ফাতিমী রাজত্বের সময়, একজন নাম করা গায়ক, ‘ইবনে নোকতা’ এই ঐতিহ্যকে আরো সুন্দরভাবে মিসরের সমাজে প্রচলন করেন; শিল্পকলার অন্তর্ভুক্ত করেন। ৫৭০ সালের দিকে, তিনি ‘কাওমা’ গীত আবিষ্কার করেন। তার পথ ধরে অনেকেই, অনেক গায়কই মিসরীয় সমাজে এই গীত-পদ্ধতি চালু রাখেন। মেসাহারাতিরা সমাজে বিশেষ সম্মানের পাত্র ছিলেন। তারা নিজেরা কবির মতো কবিতা রচনা করেন, সুর দেন এবং নিজেরা গেয়ে রমজানে মানুষকে জাগিয়ে দেন। সবসময়ই এই সব গীত বা গান ধর্মীয় বিষয়ে ভরপুর থাকে। আবেগ দিয়ে তারা রাতে এই গান গেয়ে থাকেন। একটি গানের কলি বা লিরিক এ রকম, ‘ওহে ঘুমিয়ে থাকা মানুষ, ওঠো। আল্লাহর প্রশংসা করতে থাকো, যিনি বাতাসকে করেন নিয়ন্ত্রণ। ছাউনিতে ফিরে যাচ্ছে রাতের সেনাপ্রহরীরা, দিনের সেনারা আসছে দলে দলে সজ্জিত হয়ে।’ অত্যন্ত সুন্দর এসব গানের কলি।

মিসরের আল-মেসাহারাতিরা ঐতিহ্যগতভাবে রাতের ডাক শুরু করেন ‘মাদিহ’ বা রাসূল সা:-এর বন্দনা, প্রশংসা ও সালাম দিয়ে। যেমন, ‘আমার হৃদয় আজ উন্মুখ রাসূল সা:-এর জন্য; তা-হা আল হাশেম আল জমজমি।’ এরপর শিল্পী ‘তাহিয়া’ সুর করে। তাহিয়া হলো গানের দুই চরণ, যার বাড়ির সামনে দিয়ে যাবে তাদের কারো নাম বা পরিবারের উপাধি ধরে গান করা। যেমন— ‘ভাই আহমেদ, আল্লাহ তোমাকে দয়ার সাগর দিয়ে ভরিয়ে দিক, তুমি কি দেখেছ কাবা? তোমার সামনে অন্যায়কারী যেন দাঁড়াতে না পারে’ ইত্যাদি।

রমজানের শেষের দিকে মেসাহারাতিরা ‘আল ওয়াদা’ গাইতে থাকে। আল ওয়াদা বিদায়ের গান বা গীত। এর আরেক নাম, ‘খাত্তামা’ যা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এটি গীতিকাব্যের মতো। ইংরেজিতে যাকে বলে IW-Ode ।

শেষ রাতের এই ডাকে রয়েছে এক বিশেষ ধরনের সুর। গভীর রাতে সুর মূর্ছনার মতো মানুষকে যেন জাদু করে। মেসাহারাতিরা কোনো অর্থের জন্য এই কাজ না করলেও রমজানের শেষে সমাজের সবাই একটি ভালো অঙ্ক তাদের হাতে তুলে দেয়। অনেকে কাপড়-চোপড়, কেক-মিষ্টিও দেয় শুভেচ্ছাস্বরূপ।

ছোট যে ঢোলকটি পেটায় তাকে বলা হয় ‘আল-বাজা’। এটি পিতল বা মাটির তৈরি, মুখে লাগানো হয় পাতলা চামড়া অনেকটা দফের মতো। যে দফ রাসূল সা:-এর জমানায়ও লোকজন বাজাত।

বর্তমানে মেসাহারাতিরা আগের মতো বেশি গায় না। কিন্তু আল বাজার বাজনা সেই আগের মতো বেজেই চলছে। মিসরীয় সমাজে তাদের অবস্থান ও কর্মসূচি নিয়ে টিভি, রেডিও ও পত্র-পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়। ‘মেসাহারাতি’ নামে রেডিওতে বিশেষ অনুষ্ঠানও চলে। সাম্প্রতিক সময়ে রেডিওতে ফুয়াদ হাদ্দাদের কবিতা খুবই জনপ্রিয়।

মামলুক আমলে, মেসাহারাতিদের রাজকীয় কর্মচারী হিসেবে গণ্য করা হতো। এরা নিজেরাই কবিতা লিখত এবং সুর দিত। রাতে পরিবেশনের সময় আরো দু-একজন সাথী থাকত। ফলে নির্জন রাতে সুরের পরিবেশনা বাঙময় হয়ে উঠত। মামলুক আমলে দেশের সেরা কবি ও সঙ্গীতজ্ঞরাই আল-মেসাহারাতির দায়িত্ব পালন করত। এ থেকেই বোঝা যায়, সমাজের বড় স্তরে তাদের সম্মান-মর্যাদা ছিল। বর্তমানে আল-মেসাহারাতিরা চার স্টোর্কের রিদমে গান করে। এই ধরনটি কম করে হলেও শত বছরের পুরনো।

মেসাহারাতিরা ভোরের আগে পাড়ার রাস্তার মধ্য দিয়ে হেঁটে যান, একটি ড্রাম বাজিয়ে এবং ‘আল সাহর, ইয়া সাহরান’-এর মতো ছড়ার ডাক উচ্চারণ করেন। কায়রো এবং আলেকজান্দ্রিয়ার মতো শহরগুলোতে কিছু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ভূমিকা পালন করছে। সিরিয়াতেও মেসাহারাতি রয়েছে, তাদের ডাকা হয় ‘দুকদুক’ নামে। দামেস্কের পুরনো কোয়ার্টারে এই প্রথা বেশ জমজমাট ছিল। মাঝে মাঝে ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা জলসা চলত। তারাবির পর সারা রাত ধরে। খাওয়া দাওয়া ও ফজরের নামাজের পর ঘুমিয়ে পড়ত। বিশেষ রমজানের রাতে এ ধরনের অনুষ্ঠান সমাজে যেন আত্মার পুনরুজ্জীবন বা রৌশনী ছড়ানোর কাজ করত।

মেসাহারাতি ত্রিপোলি এবং বৈরুতের ঐতিহাসিক জেলাগুলোতে দেখা যায়; আজ লেবাননে বেশির ভাগই ঐতিহ্যবাহী পারফরম্যান্স হিসেবে সংরক্ষিত। পূর্ব জেরুসালেম, হেবরন এবং আম্মানের পুরনো পাড়ায় প্রতীকী হিসেবে এখনো অনুশীলন করা হয়। লেবাননে কখনো কখনো রমজানের সময় স্বেচ্ছাসেবক ও স্কাউটরা এসব কাজের আনজাম দিয়ে থাকে। মেসাহারাতি ইরাকের বাগদাদেও সচল। সেখানে দাদের বলা হয় দুক্কাই। ঐতিহ্যটি স্থানীয় কবিতার সাথে ধর্মীয় ভক্তিকে মিশ্রিত করে এখন পরিবেশিত হয়। ইরাক যুদ্ধের পর যদিও আজ এটি অনেক হ্রাস পেয়েছে।

সৌদি আরবেও দেখা যায় মেসাহারাতি। একসময় ঐতিহাসিক জেদ্দা, যার আরেব নাম আল-বালাদ, মদিনা এবং তাইফে মেসাহারাতি সক্রিয় ছিল। আধুনিকতার কারণে শহরে এর প্রচলন নেই তবে দূরাঞ্চলে দেখা যায়, তাও অনেক কম। কুয়েত ও বাহরাইনে মেসাহারাতি ১৯৭০-৮০ এ বেশি সচল থাকলেও এখন জাতীয় লোককাহিনীর অংশ। রমজান পরবর্তী উৎসবে স্টেজে দেখানোর জন্য এদের জমকালো করে উপস্থাপন করা হয়। ইয়েমেন মেসাহারাতি এখনো সানা এবং তাইজের মতো শহরগুলোতে উপস্থিত রয়েছে। মেসাহারাতি সুদানের খার্তুম এবং ওমদুরমানের আশপাশে সক্রিয়; মাঝে মাঝে শিশুরা রমজানের আনন্দের অংশ হিসেবে আহ্বানকারীকে অনুকরণ করে যোগ দেয়।

মরক্কোতে সাহরির জন্য ড্রামের পরিবর্তে একটি দীর্ঘ শিং ব্যবহার করে। আরবিতে যাকে নাফির বলা হয়। সেজন্য মেসাহারাতিকে সেখানে নাফার নামেও ডাকা হয়। এই ধরনটি ইসলামিক অনুশীলন আমাজিগ এবং আন্দালুসিয়ান ঐতিহ্যের সাথে মিশ্রণ বলে স্কলাররা মনে করেন। মরক্কো ফেজ ও মারাকেশে অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে সাহরির সময় অতিবাহিত হয়। বিদেশী পর্যটকরাও এসব দেখার জন্য রাস্তায় নেমে পড়ে। আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ায় এভাবে লোকজনকে ডেকে দেয়ার প্রচলন বহু আগেই বন্ধ। শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিষয়টি স্মরণ করা হয়।

মেসাহারাতিরা রমজানের সাম্প্রদায়িক এবং আধ্যাত্মিক সারমর্মকে মূর্ত করে তোলে ইবাদত, মননশীলতা এবং ভাগ করে নেয়া অভিজ্ঞতাকে উৎসাহিত করে। তার উপস্থিতি সাহরির জন্য জেগে ওঠার কাজটিকে একটি সম্মিলিত আচারে পরিণত করেছে, প্রতিবেশীদের কণ্ঠস্বর, ছন্দ এবং বিশ্বাসের মাধ্যমে সংযুক্ত করেছে। মেসাহারাতি কেবল একটি ‘মানব অ্যালার্ম ঘড়ি’ নয়- তারা ঐতিহ্যের অভিভাবক, ভোরের আগে শান্ত ঘণ্টাগুলোতে ভক্তির একটি মৃদু অনুস্মারক, মধুর ভোরের পাখি।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার