হিজরি দশম সনে ৯০ হাজার অথবা এক লাখ ১৪ হাজার সাহাবা নিয়ে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা: হজ সম্পন্ন করেন। সহধর্মিণীরা এবং নবী দুলালি ফাতেমা রা: এ তীর্থযাত্রায় তাঁর সফরসঙ্গিনী ছিলেন। এটি তাঁর জীবনের প্রথম ও শেষ হজ। হজের আরাকান-আহাকাম পালন উপলক্ষে রাসূলুল্লাহ সা: মিনা, মুজদালিফা, আরাফাত ও কাবাগৃহে অবস্থানের সময় জনসমক্ষে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। রাসূলুল্লাহ সা: তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের সূচনা করে বলেন, ‘হে জনগণ! এ বছরের পর তোমাদের সাথে এখানে আমার আর কখনো দেখা হয় কি না জানি না। আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো!
আল্লাহ ওই ব্যক্তির প্রতি দয়া করুন, যে আমার বক্তব্য শুনে স্মরণে রেখেছে এবং এমন ব্যক্তির কাছে তা পৌঁছিয়েছে যে (তা প্রত্যক্ষভাবে) শুনেনি। অনেকসময় জ্ঞান-বিজ্ঞান (ফিক্হ) বহনকারী ব্যক্তি ওই সব বিষয়ে পারঙ্গম হয় না, অন্য দিকে যার কাছে ওই সব পৌঁছানো হয়, সে তুলনামূলকভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞান (ফিক্হ) অধিকতর হৃদয়ঙ্গম করতে পারে।’ ‘হে জনগণ! এটা কোন দিন? লোকেরা বলল, পবিত্র দিন। রাসূলুল্লাহ সা: জিজ্ঞাসা করলেন, এটি কোন শহর? লোকেরা বলল, পবিত্র শহর। রাসূলুল্লাহ সা: জিজ্ঞাসা করলেন, এটি কোন মাস? লোকেরা বলল, পবিত্র মাস। নিশ্চয় তোমাদের প্রাণ, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সম্মান তোমাদের জন্য মর্যাদাসম্পন্ন তোমাদের এ দিনের মর্যাদার মতো; তোমাদের এ মাসের মর্যাদার মতো এবং তোমাদের এ নগরীর মর্যাদার মতো’। তিনি বাক্যটি কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করলেন। অতঃপর মাথা উত্তোলন করে বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছিয়েছি? হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছিয়েছি? উপস্থিতরা অনুপস্থিতদের পৌঁছিয়ে দেবে’।
আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে প্রদত্ত রাসূলুল্লাহ সা:-এর বিদায় হজের ভাষণ ছিল যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক। আধুনিক যুগের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এ ঐতিহাসিক ভাষণের আবেদন খুব তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা যদি তাঁর ভাষণের শিক্ষাগুলো অনুসরণ করি তাহলে জুলুমের অবসান হয়ে মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ নিশ্চিত হবে। মদিনায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজকাঠামোতে যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল পৃথিবীর অন্য কোনো সমাজে তার নজির পাওয়া মুশকিল। রাসূলুল্লাহ সা:-এর শিক্ষা ও আদর্শের অনুসরণে খুলাফায়ে রাশিদিন যে সমাজব্যবস্থা কায়েম করেন তা ছিল পুরোপুরি মানবতা ও ইনসাফনির্ভর। মানুষের প্রতি ন্যায়বিচারের যে নজির ইসলামের মহান রাসূল সা: দুনিয়ার বুকে স্থাপন করে গেছেন, তার আলোকশিখা এখনো পৃথিবীতে অনির্বাণ।
এ ভাষণের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সা: তাঁর ২৩ বছরের রিসালতের মূল বিষয়বস্তু জনগণের কাছে তুলে ধরেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি তাঁর কালজয়ী আদর্শ ও অনুপম শিক্ষার মৌল নীতিমালা জনগণের মধ্যে তুলে ধরতে প্রয়াসী হন। তাঁর ভাষণের কার্যকারিতা কেবল সপ্তম শতাব্দীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বর্তমানসহ সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য।
জাহিলি যুগের কুসংস্কার রহিত
‘সাবধান! জাহিলিয়াতের সবকিছু আমার দুই পায়ের তলায় রহিত, জাহিলি যুগের রক্তপণ রহিত কিয়ামত পর্যন্ত। প্রথম রক্তপণ যা আমি (পরিত্যাগের) ঘোষণা করছি, আমাদের নিজ গোষ্ঠীর রক্তপণ, ইবন রাবি‘আ ইবনু হারিছের রক্তপণ, বনু সাদ গোত্রে সে (ধাত্রীমাতার) দুধপানরত ছিল, হুযায়লা তাকে হত্যা করে। পবিত্র কাবাগৃহের রক্ষণাবেক্ষণ এবং হাজীদের পানীয়জল সরবরাহ ব্যতীত জাহিলি যুগের অন্য সব নিদর্শন বাতিল ঘোষণা করা হলো।’
সুদ প্রথার উচ্ছেদ
‘সাবধান! জাহিলিয়াতের সুদ রহিত; প্রথম সুদ যা আমি রহিত ঘোষণা করছি। আমাদের প্রাপ্য ‘আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের সুদ তা সম্পূর্ণ রহিত। মূলধনে তোমাদের অধিকার অব্যাহত থাকবে। (যত দিন বেঁচে থাকবে) জুলুম করবে না, তোমরা জুলুম করবে না, জুলুমের শিকারও হবে না।’
বর্ণ-গোত্রীয় বৈষম্যের অবসান
রাসূলুল্লাহ সা: শতাব্দীর এমন এক ক্রান্তিকালে এ ভাষণ দেন, যখন গোটা দুনিয়ার নানা সমাজে বর্ণপ্রথা, বর্ণবৈষম্য, বংশ কৌলীন্য ও আভিজাত্যের দম্ভ মানুষকে গৃহপালিত জন্তু অথবা বিশেষ বৃক্ষের চেয়ে হীন পর্যায়ে নিয়ে আসে। জন্তু ও বৃক্ষবিশেষকে পবিত্র জ্ঞানে অর্চনা করা হতো তখন। সাধারণ মানুষের তুলনায় এসব জন্তু-বস্তুর মর্যাদা ছিল অনেক বেশি। রাসূলুল্লাহ সা: মানুষের মনন ও মানসিকতায় এ কথা চিত্রায়িত করতে সক্ষম হন যে, সৃষ্টিজগতে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান, সম্মানের যোগ্য ও ভালোবাসার পাত্র হলো মানুষ। মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। দুনিয়ার সবকিছু মানুষের কল্যাণে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দেন, ‘হে জনগণ! নিশ্চয় তোমাদের প্রভু এক। তোমাদের পিতা (আদম আ:) এক। প্রত্যেকে আদমের সন্তান আর আদমের সৃষ্টি মাটি থেকে। সাবধান! অনারবের উপর আরবের কিংবা আরবের উপর অনারবের, কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের কিংবা শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। যার মধ্যে আল্লাহভীতি আছে, সে-ই শ্রেষ্ঠ।’
মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধন
‘জেনে রেখো! নিশ্চয় মুসলমানরা পরস্পর ভাই ভাই, গোটা মুসলিম জগৎ এক অখণ্ড ভ্রাতৃসমাজ। কোনো মুসলমানের মাল তার সন্তুষ্টি ছাড়া হালাল হয় না। জুলুমের শিকার হয়ো না। হে আল্লাহ, আমি তোমার পয়গাম পৌঁছিয়েছি কি? (জনগণ জবাবে বলল হ্যাঁ) রাসূলুল্লাহ বলেন, হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থেকো।’
রাসূলুল্লাহ সা:-এর এ ঘোষণা ছিল তৎকালীন সমাজের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ও দ্রোহ। কারণ বংশ কৌলীন্য ও রক্তের মর্যাদা ছিল সামাজিক আভিজাত্যের ভিত্তি। তিনি ঈমানদারদের সুভ্রাতৃত্বের বন্ধনে সুদৃঢ় করে এক অখণ্ড দেহসত্তায় পরিণত করেন।
দাসপ্রথা উচ্ছেদ
সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ সা: তৎকালীন সমাজে প্রচলিত দাসপ্রথা উচ্ছেদে সাহসী ভূমিকা রাখেন। বিশ্ব-ইতিহাসে রাসূলুল্লাহ সা:-ই প্রথম যিনি দাসপ্রথার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। দাস মুক্তিতে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে নবীজি সা: ঘোষণা দেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমান দাসকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করবে, (আজাদকৃত দাসের) প্রত্যেকটি অঙ্গের বিনিময়ে আল্লাহ তার (মুক্তি দানকারীর) প্রত্যেক অঙ্গকে দোজখের আগুন থেকে মুক্তি দান করবেন।’
রাসূলুল্লাহ সা: কেবল ঘোষণা দিয়ে ক্ষান্ত হননি, নিজে দাস মুক্ত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সাহাবায়ে কিরাম রা: ও রাসূলুল্লাহ সা:-এর সুন্নতের অনুসরণ করে দাসমুক্তিতে অংশগ্রহণ করেন।
নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা
জাহিলি যুগে আরব দেশে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। কারণ কন্যাসন্তান জন্মদান করা ছিল তাদের জন্য সামাজিকভাবে অমর্যাদাকর। পিতা তার ঔরসজাত কন্যার নিষ্পাপ মুখ দেখতেও রাজি ছিল না। কেবল আরবে নয়, সারা দুনিয়ায় বিশেষত : চীনা, গ্রিসীয়, রোমান ও ভারতীয় সমাজে তীব্র লিঙ্গবৈষম্য ছিল। নারীদের অপবিত্র মনে করা হতো এমনকি মানুষরূপেও গণ্য করা হতো না। সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ও যৌনতৃপ্তি সাধনের অনুষঙ্গী ছিল নারী। প্রাচীন ইউরোপীয় সমাজে নারী ছিল সব পাপের মূল, নরকের দরজা অথবা শয়তানের মুখপাত্র। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে স্বামীর মৃত্যুর পর নারীর বেঁচে থাকার অধিকার ছিল না। স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দেয়া ছিল তার সামাজিক ও ধর্মীয় কর্তব্য।
এ অবস্থা পরিবর্তনে নবী সা: কন্যাশিশুর লালন উৎসাহিত করেন। তিনি নিজে কন্যাসন্তানদের সাথে সমতা ও হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ করেছেন সারা জীবন, অন্যদেরও কন্যাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন তাগিদপূর্ণ ভাষায়। যে ব্যক্তি তিনটি মেয়ে অথবা তিনটি বোন লালন-পালন করবে, সুশিক্ষায় শিক্ষিত করবে, উপযুক্ত পাত্রে বিয়ে দেবে, তিনি তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে বলেন, ‘সে ও আমি দুই আঙুলের মতো পাশাপাশি জান্নাতে প্রবেশ করব।’ তিনি আরো বলেন, ‘কারো কন্যাসন্তান থাকলে সে যেন তাকে জীবন্ত কবর না দেয়; তার অমর্যাদা না করে এবং পুত্রসন্তানের চেয়ে কম আদর না করে তাহলে আল্লাহ তাকে বেহেশতে স্থান দেবেন।’
মানবিক নীতিমালা
রাসূলুল্লাহ সা: বিদায় হজের ভাষণে মানবিক নীতিমালা জনগণের সামনে পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘কারো কাছে কোনো আমানত জমা থাকলে মালিককে তা ফেরত দিতে হবে। হে জনগণ! আল্লাহ পাক প্রত্যেক হকদারের অধিকার আদায়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন (অর্থাৎ মিরাসের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন) আর ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত বৈধ নয়। অপরাধী নিজ অপরাপধের জন্য দায়ী। সাবধান! পিতার অপরাধে পুত্র দায়ী নয় এবং পুত্রের অপরাপধে পিতাও দায়ী নয়। ধারে নেয়া বস্তু প্রত্যর্পণযোগ্য; দুগ্ধপানে দানের পশু প্রত্যাহারযোগ্য; ঋণ আদায় অপরিহার্য ও জামিন ক্ষতিপূরণের জিম্মাদার।
হজের রীতিনীতি শেখার তাগিদ
‘তোমরা আমার কাছ থেকে হজ পালনের রীতিনীতি শিখে নাও, আমি জানি না এ হজের পর আর হজ করতে পারব কি না। তোমাদের মধ্যে যারা উমরাহর ইহরাম বেঁধেছ এবং সাথে হাদি (কোরবানির পশু) নিয়ে এসেছ তারা যেন বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করে এবং সাফা-মারওয়ায় সাঈ করে, তাদের হজ সমাধা না করা এবং ১০ তারিখে তাদের হাদি কোরবানি না করা পর্যন্ত তাদের জন্য যা হারাম করা হয়েছিল তার কিছু হালাল হবে না। আর তোমাদের মধ্যে যারা উমরাহর ইহরাম বেঁধেছ তবে সাথে হাদি (কোরবানির পশু) নিয়ে আসেনি, তারা যেন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করে এং সাফা-মারওয়ায় সাঈ করে, তারপর চুল ছাঁটে ও হালাল হয়ে যায়। পরে যেন (যথাসময়) হজের ইহরাম করে এবং ‘হাদি’ কোরবানি করে; অবশ্য যারা তাতে সমর্থ না হবে তাদের জন্য হজের দিনগুলোতে তিনটি এবং যখন বাড়ি প্রত্যাবর্তন করবে তখন সাতটি (মোট ১০টি) রোজা। জিবরাইল আলাইহিস সালাম আমার কাছে আসলেন, তখন আমি আকিকে ছিলাম। তিনি বললেন, এ বরকতময় উপত্যকায় দুই রাকাত সালাত আদায় করুন এবং বলুন ‘হজের সাথে উমরা; কেননা, কিয়ামত পর্যন্তে উমরা হজের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে গেছে। যা আমি পরে বুঝেছি, তা যদি আগে বুঝতে পারতাম তা হলে অবশ্যই আমি এটাকে উমরায় পরিণত করতাম; কিন্তু আমি হাদি নিয়ে এসেছি এবং হজ ও উমরা একত্রিত করেছি। যার সাথে হাদি রয়েছে সে উমরার সাথে হজের ইহরাম বেঁধে নেবে। তারপর সে হালাল হবে না। অবশেষে একত্রে দু’টি থেকে হালাল হবে।’ ‘যে (মুহরিম) ব্যক্তির ইযার (খোলা লুঙ্গি) নেই সে পায়জামা পরবে এবং যার জুতো নেই সে (চামড়ার) মোজা পরবে।’
আরাফায় অবস্থানকালীন তিনি বলেন, ‘এটা উকুফ (অবস্থানের ক্ষেত্র); পাহাড়কে ঘিরে আরাফার যে এলাকা তার পুরোটা উকুফের স্থান।’ মুজদালিফায় তিনি বলেন, ‘এটা উকুফের স্থান। গোটা মুজদালিফা উকুফের স্থান।’ যখন মিনাতে কোরবানি করেন তখন তিনি বলেন, ‘এটা কোরবানির ক্ষেত্র, গোটা মিনা কোরবানির ক্ষেত্র।’
‘অংশীবাদী ও প্রতিমা পূজারীরা এ স্থান থেকে প্রস্থানকরত সূর্যাস্তকালে- যখন সূর্য পাহাড়চূড়ায় থাকে, যেমন লোকদের পাগড়ি থাকে তাদের মাথায়। ‘আমাদের পন্থা তাদের পন্থার বিপরীত’। আর তারা মাশআরুল হারাম থেকে প্রস্থানকরত পাহাড়চূড়ায় সূর্যোদয়কালে, যেমন লোকদের পাগড়ি তাদের মাথায়। আমাদের পন্থা তাদের পন্থার বিপরীত। আরাফায় অবস্থান হজ। সুতরাং মুজদালিফার রাত্রির ফজর শুরু হওয়ার আগে যারা আরাফাত রজনী (অবস্থান) পেয়ে যাবে তাদের হজ পূর্ণ হয়ে যাবে।’
চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
ক. আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শরিক করবে না;
খ. আল্লাহ যে প্রাণ বধ করা হারাম করেছেন, তা ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া বধ করবে না;
গ. ব্যভিচার করবে না এবং
ঘ. চুরি করবে না।
ইবাদতের প্রতি গুরুত্বারোপ
‘হে জনগণ। তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করবে; পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে; রামাদান মাসের সিয়াম পালন করবে; সম্পদের জাকাত আদায় করবে এবং তোমাদের শাসকদের আনুগত্য করবে, তবেই তোমাদের প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।’
খতমে নবুওয়ত
‘হে মানবমণ্ডলী আমার পরে আর কোনো পয়গাম্বরের আবির্ভাব হবে না। তোমাদের পরে আর কোনো উম্মত নেই’ (অতঃপর দু’হাত উত্তোলন করে বলেন, হে আল্লাহ সাক্ষী থেকো)।
ধর্মের ব্যাপারে সতর্কতা
‘সাবধান! তোমাদের এ শহরে শয়তানকে কেউ পূজা করবে, শয়তান এ আশা চিরতরে পরিত্যাগ করেছে; কিন্তু যেসব কাজকে তোমরা অতি হালকা বলে মনে করো, এ রূপ কাজে তোমরা শয়তানের আনুগত্য করবে এবং এতে সে সন্তুষ্ট হবে। সুতরাং তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থেকো। হে জনগণ! সাবধান! দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ির ফলে তোমাদের আগে বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।’
দাজ্জালের আবির্ভাব
‘আল্লাহ এমন কোনো নবী প্রেরণ করেননি, যিনি তাঁর উম্মতকে সতর্ক করেননি; নূহ আ: এবং তাঁর পরবর্তী নবীগণও সতর্ক করেছেন। বস্তুত তোমাদের মধ্যে (মুহাম্মদ সা:-এর উম্মত) সে আবির্ভূত হবে তার কিছু লক্ষণ তোমাদের কাছে গোপন থাকতে পারে; কিন্তু আল্লাহর ঘোষণা তোমাদের কাছে মোটেই গোপন নয় (রাসূলুল্লাহ সা: এটি তিনবার বললেন)। নিশ্চয় তোমার প্রভুর এক চক্ষু অন্ধ নয়, পক্ষান্তরে তার (দাজ্জালের) ডান চক্ষু অন্ধ, দেখতে মনে হয় যেন বের হয়ে পড়া আঙ্গুরের থোকা।’
কুরআন ও সুন্নাহ : মুক্তির পথ
‘হে মানবমণ্ডলী! আমার কথা শোনো! আমি আমার কথা পৌঁছিয়েছি? আমি তোমাদের কাছে দু’টি বস্তু রেখে যাচ্ছি, এগুলো দৃঢ়তার সাথে আঁকড়ে (অনুসরণ করলে) ধরলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না তা হলোÑ ‘আল্লাহর কিতাব’ ও ‘আমার সুন্নত’ (জীবনাদর্শ)। (আরেক বর্ণনায় ‘আমার পরিবারবর্গ’)। নিঃসন্দেহে ‘সাদাকাত’ আমার নিজের জন্য, আমার পরিবারবর্গের জন্য এবং আমার বংশধরদের জন্য অবৈধ। স্বীয় উষ্ট্রীর কেশর থেকে একটি চুল হাতে ধারণপূর্বক তিনি বলেন, দৈর্ঘ্য ও ওজনে এ পরিমাণ ‘সাদাকাত’ও যদি গ্রহণ করা হয়, তা হলে গ্রহীতার ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হবে ।’
নিকটাত্মীয়ের সাথে সদাচরণ
‘তোমাদের মা, তোমাদের পিতা, তোমাদের বোন, তোমাদের ভাই, তোমাদের নিকটাত্মীয় এবং পরবর্তী নিকটাত্মীয়ের সাথে সদাচরণ করবে।’
‘যে সন্তান তার পিতা ব্যতীত অন্য কারো নামে বংশসূত্র দাবি করবে কিংবা দাস-দাসী নিজের মনিব ব্যতীত অন্য কাওকে মনিব সাব্যস্ত করবে, তার ওপর কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর লানত এবং সব ফেরেশতা ও মানুষের অভিশাপ; আল্লাহ তার কোনো নফল কিংবা ফরজ (ইবাদত) কবুল করবেন না।’
বিশেষ প্রার্থনা
‘আরাফার দিনের শ্রেষ্ঠ দোয়া এবং আমি ও আমার আগেকার নবীগণের উচ্চারিত উত্তম বাণী হলোÑ ‘এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। যিনি একক, যার কোনো শরিক ও অংশীদার নেই। রাজস্ব-রাজস্ব তার, হামদ-স্তুতি তাঁর এবং তিনি সবকিছুতে ক্ষমতাবান।’
ক্ষমা ঘোষণা
‘হে জনগণ! আমার কাছে জিবরাইল এলেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম পেশ করে বললেন, আরাফাত ও পবিত্র স্থানে অবস্থানকারীদের ত্রুটিবিচ্যুতি আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ উমর ইবনে খাত্তাব রা: জানতে চাইলেন। এটা কি (কেবল) আমাদের বিশেষত্ব? রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘তোমাদের এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করবে (হজ করবে) তাদের ক্ষমা করে দেয়া হবে।’
শেষ কথা
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে প্রদত্ত রাসূলুল্লাহ সা:-এর বিদায় হজের ভাষণ ছিল যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক। আধুনিক যুগের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এ ঐতিহাসিক ভাষণের আবেদন খুব তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা যদি তাঁর ভাষণের শিক্ষাগুলো অনুসরণ করি তাহলে জুলুমের অবসান হয়ে মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ নিশ্চিত হবে। মদিনায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজকাঠামোতে যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল পৃথিবীর অন্য কোনো সমাজে তার নজির পাওয়া মুশকিল। রাসূলুল্লাহ সা:-এর শিক্ষা ও আদর্শের অনুসরণে খুলাফায়ে রাশিদিন যে সমাজব্যবস্থা কায়েম করেন তা ছিল পুরোপুরি মানবতা ও ইনসাফনির্ভর। মানুষের প্রতি ন্যায়বিচারের যে নজির ইসলামের মহান রাসূল সা: দুনিয়ার বুকে স্থাপন করে গেছেন, তার আলোকশিখা এখনো পৃথিবীতে অনির্বাণ।
লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা



