অপরাধের তিন ধরনের শ্রেণিবিভাজন আছে— যথা জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধ, আমলযোগ্য ও আমল অযোগ্য অপরাধ এবং আপসযোগ্য ও আপস অযোগ্য অপরাধ। দণ্ডবিধির অধীন কৃত অপরাধের ক্ষেত্রে দুই ধরনের মামলা হয়। এর একটি হলো নালিশি দরখাস্তের মাধ্যমে আমলি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে মামলা দায়ের। অন্যটি হলো থানায় এজাহার দায়েরের মাধ্যমে মামলা রুজু। নালিশি দরখাস্তের মাধ্যমে যেসব মামলা করা হয় সেগুলো বিচারাঙ্গনে সিআর (কমপ্লেইন্ট রেজিস্টার) মামলা হিসেবে পরিচিত। অন্য দিকে থানায় এজাহার দাখিলের মাধ্যমে করা মামলাকে জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) মামলা বলা হয়। সিআর মামলা নালিশি মামলা হিসেবেও অভিহিত হয়। অন্য দিকে জিআর মামলাকে বলা হয় পুলিশি মামলা।
সিআর মামলার ক্ষেত্রে মামলার পরিচালনার ব্যয়ভার বাদি বা ফরিয়াদিকে বহন করতে হয়। পক্ষান্তরে জিআর মামলা পরিচালনার ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করে। নালিশি দরখাস্তের মামলার ক্ষেত্রে অভিযোগ বস্তুনিষ্ঠ হলে আমলি ম্যাজিস্ট্রেট বাদি ও তার সাথে উপস্থিত সাক্ষীদের পরীক্ষাপূর্বক তাৎক্ষণিক মামলা বিচারার্থে নিতে পারেন। অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠতা বিষয়ে ম্যাজিস্ট্রেট সন্ধিহান হলে তিনি তা খারিজ করে দিতে পারেন অথবা বস্তুনিষ্ঠতার বিষয়ে নিশ্চিত হতে তদন্তে পাঠাতে পারেন। এরূপ ক্ষেত্রে তদন্তের ফলের ওপর নির্ভর করে ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি বিচারার্থে গ্রহণ করবেন কি করবেন না, সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। থানায় এজাহার দায়েরের মাধ্যমে যেসব মামলা রুজু হয় সেসব মামলায় পুলিশ তদন্ত সমাপনান্তে অভিযোগপত্র দাখিল করলে ম্যাজিস্ট্রেট যদি অভিযোগপত্র বিষয়ে সন্তুষ্ট হন; সে ক্ষেত্রে মামলা বিচারার্থে গ্রহণ করেন। নালিশি মামলার ক্ষেত্রে একজন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক নালিশি দরখাস্ত গৃহীত হলে তিনি তাৎক্ষণিক আসামিদের বিরুদ্ধে সমন বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন। কিন্তু পুলিশি মামলায় যতক্ষণ না ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন গৃহীত না হয়; ততক্ষণ পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক আসামিদের বিরুদ্ধে সমন বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির সুযোগ নেই।
একজন ব্যক্তি কর্তৃক অপরাধ সংঘটন পরবর্তী মামলা দায়েরের আগে বা মামলা তদন্তাধীন থাকাবস্থায় বা মামলা বিচারাধীন থাকাবস্থায় বা মামলার বিচারের ফলস্বরূপ যদি তার মৃত্যু হয়, সে ক্ষেত্রে মৃত্যুর সাথে সাথে তার অপরাধেরও মৃত্যু ঘটে। যেকোনো ফৌজদারি অপরাধ সময় দ্বারা বারিত নয়। তাই অপরাধ সংঘটন পরবর্তী একজন অপরাধীর মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো সময় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যায়। সে মামলাটি নালিশি অথবা পুলিশি মামলার যেকোনো একটি হতে পারে।
ফৌজদারি মামলার বিচারে পৃথিবীব্যাপী দুই ধরনের পদ্ধতি অনুসৃত হয়। এর একটি হলো প্রতিদ্বন্দ্বীমূলক বিচারব্যবস্থা (অ্যাডভারসারিয়ার ট্রায়াল সিস্টেম) এবং অন্যটি অনুসন্ধানমূলক বিচার ব্যবস্থা (ইনকুইসিটরিয়াল ট্রায়াল সিস্টেম)। প্রতিদ্বন্দ্বীমূলক বিচারব্যবস্থায় অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োজিত কৌঁসুলির ওপর বর্তায়। অন্য দিকে অনুসন্ধানমূলক বিচারব্যবস্থায় স্বয়ং অপরাধীকে প্রমাণ করতে হয় যে সে নির্দোষ। প্রতিদ্বন্দ্বীমূলক বিচারব্যবস্থা যে মৌল নীতিটির ওপর প্রতিষ্ঠিত সেটিকে বলা হয় নির্দোষতার প্রলগভতা (প্রেসুমশন অব ইনোসেন্স)। এর অর্থ যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতের সম্মুখে রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত না হবে একজন ব্যক্তি অপরাধী, ততক্ষণ পর্যন্ত আদালত ধরে নেবে যে সে নির্দোষ।
আমাদের দেশে ফৌজদারি মামলা বিচারে প্রতিদ্বন্দ্বীমূলক বিচারব্যবস্থা অনুসৃত হয়। ব্যবস্থাটিতে বিচারকের ভূমিকা অনেকটা ক্রিকেট খেলার আম্পায়ারের মতো। ব্যবস্থাটিতে মামলার প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর সাক্ষ্য, বাদানুবাদ ও যুক্তিতর্ক হতে যে সত্য বেরিয়ে আসে তার ভিত্তিতে একজন বিচারক অপরাধীর অপরাধ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে উপনীত হন।
পাশ্চাত্যে এবং পৃথিবীর বেশির ভাগ উন্নত রাষ্ট্রে ফৌজদারি মামলার বিচারে অনুসন্ধানমূলক বিচারব্যবস্থা অনুসৃত হয়। আমাদের বিচারব্যবস্থা প্রতিদ্বন্দ্বীমূলক হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংশ্লেষে যেসব বিচারকার্য পরিচালিত হয়েছে, তাতে ফৌজদারি কার্যবিধি ও সাক্ষ্য আইন যেভাবে সাধারণ ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, সেভাবে প্রযোজ্য হওয়া বারিত করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে একজন অপরাধী তার নির্দোষতার প্রমাণে কতজন সাক্ষী উপস্থাপন করতে পারবেন তা আদালত কর্তৃক নির্ধারণ করে দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিচারের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিটি অনুসরণ করে, এটি অনেকটা প্রতিদ্বন্দ্বী ও অনুসন্ধানমূলক বিচারব্যবস্থার সংমিশ্রণ।
একজন মানুষের দু’ভাবে মৃত্যু হতে পারে। এর একটি স্বাভাবিক মৃত্যু। অন্যটি বিচারিক মৃত্যু। স্বাভাবিক মৃত্যুর আবার রকমভেদ রয়েছে, যেমন— পরিণত বয়সে মৃত্যু, অপরিণত বয়সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু প্রভৃতি। পরিণত বয়সে যখন একজন ব্যক্তির মৃত্যু হয়, তখন সেটি না যতটুকু দুঃখ ও মর্মবেদনার কারণ হয়; অপরিণত বয়সের যেকোনো মৃত্যু তার চেয়ে অধিক দুঃখ ও মর্মবেদনার কারণ হিসেবে দেখা দেয়।
নরহত্যার একমাত্র সাজা মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর হত্যাটি ঠাণ্ডামাথায় কৃত হলে সর্বোচ্চ সাজা অর্থাৎ— মৃত্যুদণ্ড যথার্থ গণ্য করা হয়। পৃথিবীর অনেক দেশে নরহত্যার সাজা তা যেভাবে কৃত হোক না কেন, মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয়েছে। এর পেছনে যে কারণ তা হলো— মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা-পরবর্তী এরূপ একাধিক মামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যে ব্যক্তিটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন। কিন্তু বিচার বিভ্রাটে ভুলের ভিত্তিতে বিচারিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। ভুল সিদ্ধান্তে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে ভুল ধরা পড়লেও প্রতিকারের কোনো সুযোগ থাকে না। যদি ভুল সিদ্ধান্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়, সে ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে ভুল ধরা পড়লে অপরাধীকে অবমুক্ত করে দিয়ে প্রতিকারের অবকাশ থাকে।
যেকোনো মামলা তদন্তাধীন বা বিচারাধীন থাকাবস্থায় একজন অপরাধী বা আসামির মৃত্যু হলে বিষয়টি সম্পর্কে ম্যাজিস্ট্রেট বা জজকে অবহিত করা হয়। একই সাথে যে মুহূর্তে ম্যাজিস্ট্রেট বা জজ আসামির মৃত্যু বিষয়ে নিশ্চিত হন; তখন তিনি তার নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেন। অভিযোগপত্র থেকে নাম বাদ দেয়ার অর্থ— মৃত ব্যক্তি হিসেবে তিনি মামলা থেকে সম্পূর্ণরূপে অবমুক্ত। এমন অনেক অপরাধী বা আসামি রয়েছে, যাদের সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে মৃত্যু ঘটে। এরূপ মৃত্যুর ক্ষেত্রে অপরাধী বা আসামির লাশ জেল কর্তৃপক্ষ তার আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করে। আত্মীয়স্বজন যথারীতি ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী তার সৎকার সম্পন্ন করেন। আবার মামলার ফলস্বরূপ যদি একজন অপরাধী বা আসামির ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, সে ক্ষেত্রে জেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর লাশ আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ক্ষেত্রেও আত্মীয়স্বজন ধর্মীয় বিধানমতে মৃতের সৎকার সম্পন্ন করেন।
পৃথিবীর বেশির ভাগ ধর্মাবলম্বী ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মতো পরকালে বিশ্বাসী। পরকালে বিশ্বাসীরা মনে করেন, ইহজগতের কর্মফলের ওপর পরকালে একজন ব্যক্তির ভাগ্য নির্ধারিত হবে। একজন অপরাধী বা আসামির মৃত্যুর সাথে সাথে তার অপরাধের মৃত্যু হওয়ায় মৃত্যু-পরবর্তী যদি কেউ তার নামে এমন কিছু বলেন যা সত্য নয় এবং কুৎসামূলক; সে ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি এমন অসত্য বা কুৎসামূলক কথা বলেন তা তার পরকালের হিসাবের খাতায় পাপ হিসেবে গণ্য হয়। যে মৃত ব্যক্তির নামে অসত্য বা কুৎসামূলক বক্তব্য দেয়া হয়, তার পরকালের হিসাবের খাতায় অসত্য বা কুৎসামূলক বক্তব্য দানকারী ব্যক্তির পুণ্য যোগ হয়। সুতরাং পরকালে বিশ্বাসীদের যেকোনো মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে অসত্য ও কুৎসামূলক বক্তব্য প্রদান পরিহার করা উত্তম। আবার এমনও দেখা যায়, অসত্য বা কুৎসামূলক বক্তব্য দেয়ার পাশপাশি কার্টুনের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তিটির ব্যাঙ্গাত্মক ছবি প্রদর্শন করা হয়। এটি নেহাত অন্যায় ও গর্হিত কাজ। যেকোনো সৎ ও বিবেকবান ব্যক্তি যিনি পরকালে বিশ্বাসী তার এ ধরনের কাজ পরিহার করা শ্রেয়।
অনেকসময় দেখা যায়, একজন অপরাধীর মৃত্যুর পর ঘৃণার বহিঃপ্রকাশে তার প্রতি জুতা, ঝাড়ু বা থুথু নিক্ষেপ করা হয়। একজন মৃত ব্যক্তির ইহকালের যেকোনো ভালো-মন্দ কাজের বিচারের মালিক একমাত্র বা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মতে সৃষ্টিকর্তা। আর তাই মৃত ব্যক্তি যিনি কোনোরূপ জবাব দিতে বা প্রতিবাদ করতে অক্ষম; তার প্রতি এমন আচরণ হতে বিরত থাকা, যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকে সমীচীন প্রতীয়মান হয়। তা ছাড়া এহেন আচরণ একজন মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যসহ আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের জন্য বিব্রতকর ও অপমানজনক। এভাবে বিব্রত ও অপমানিত হওয়ায় তাদের মধ্যে যে ঘৃণা ও ক্ষোভের জন্ম হয় তা সমাজ ও দেশের মধ্যে অস্থিরতা জিইয়ে রাখতে সহায়ক।
অপরাধী-নিরপরাধী নির্বিভেদে একজন ব্যক্তির মৃত্যু হলে ইহজগতের সাথে তার সবধরনের সম্পর্ক ছিন্ন হয়। এ ধরনের মৃত ব্যক্তি অপর কারো উপকার ও অপকার কিছু করতে পারেন না। পৃথিবীর সর্বত্র দেখা যায়, মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি মানুষ সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এর অন্যথায় পারস্পরিক হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ও ক্রোধের কারণ হয়ে দেখা দেয়। অপরাধীর মৃত্যুর সাথে সাথে অপরাধেরও মৃত্যু ঘটে— এটি একটি ইংরেজি প্রবচন। ইংরেজিতে প্রবচনটি হলো— অফেন্স ডাইস উইথ দ্য ডেথ অব দ্য অফেন্ডার। প্রবচনটি পুরো বিশ্বে দীর্ঘকাল ধরে অনুসৃত হওয়ায় বেশির ভাগ দেশে দেখা যায়, অপরাধী-নিরপরাধী নির্বিভেদে সব শ্রেণিপেশার মানুষ একজন মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে এমন কিছু বলা থেকে বিরত থাকে; যাতে তার চরিত্রে কালিমা লেপনের কারণ না হয়।
লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক



