রুবি আমাতুল্লাহ
বাংলাদেশ আবার এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি হতে পারে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিক জীবনের গতিপথ বদলে দেয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ। প্রশ্ন হলো— এ সুযোগ কি আমরা কাজে লাগাতে পারব?
বাস্তবতা হলো— দেশের ভবিষ্যৎ বদলাতে খুব বেশি শর্তের প্রয়োজন নেই। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে মাত্র তিনটি মৌলিক শর্ত যদি জনগণ সচেতনভাবে মেনে চলেন, তাহলে রাষ্ট্রকাঠামো, শাসনব্যবস্থা এবং নাগরিক আস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন সম্ভব।
১. গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিন : এটি একটি গণসিদ্ধান্ত। গণভোট দেয়া মানে কেবল কোনো দল বা প্রার্থীকে সমর্থন করা নয়; বাস্তবে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার মানে হলো রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে জনগণের পক্ষ থেকে একটি গণরায় দেয়া।
দেশের জনগণের সামনে আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে : আমরা কি ভয়ের রাজনীতি, অনাস্থা ও স্থবিরতার সাথে আপস করব, নাকি গণতন্ত্র, সংস্কার ও জবাবদিহির পথে এগোব?
ভোট না দেয়া নিরপেক্ষতা নয়। এটি এক ধরনের নীরব সম্মতি, যার সুযোগে অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার টিকে থাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন জনগণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্র চলে যায় সংগঠিত কিন্তু সঙ্কীর্ণ স্বার্থগোষ্ঠীর হাতে। এই প্রেক্ষাপটে ‘হ্যাঁ’ ভোট একটি রাজনৈতিক বার্তা। এটি কোনো দলীয় স্লোগান নয়; এটি রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে জনগণের গণস্বাক্ষর। ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া মানে জনগণ ঘোষণা করছেন, আমরা পরিবর্তন চাই, আমরা জবাবদিহি চাই এবং আমরা গণতন্ত্রকে কার্যকর দেখতে চাই। আসলে এই নির্বাচন কার্যত একটি গণভোট, গণতন্ত্র বনাম নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি, যোগ্যতা বনাম অন্ধ আনুগত্য এবং ঐক্য বনাম বিভাজনের মধ্যে।
২. দল নয়, যোগ্যতা বেছে নিন : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুরবস্থার বড় কারণ অন্ধ দলীয় আনুগত্য। দলীয় পরিচয়, গোষ্ঠীগত আনুগত্য, ধর্ম বা লিঙ্গের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচনের প্রবণতা সংসদকে বারবার অকার্যকর করেছে। এর ফল ভোগ করেছে পুরো জাতি।
এবার জনগণের দ্বিতীয় শর্ত হওয়া উচিত— দল, গোষ্ঠী, ধর্ম ও লিঙ্গ নির্বিশেষে যোগ্য, সৎ ও সক্ষম ব্যক্তিকে সংসদে পাঠানো। যদি ৩০০ আসনে প্রকৃত অর্থে যোগ্য মানুষ নির্বাচিত হন, তবে সংসদ কেবল ক্ষমতাসীনদের সমর্থনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে না, হয়ে উঠবে জবাবদিহিমূলক আইন প্রণয়নের কেন্দ্রস্থল।
যোগ্য সংসদ সদস্য মানে শুধু জনপ্রিয় বক্তা বা প্রভাবশালী নেতা নন। এর অর্থ হলো— যিনি সংবিধান বোঝেন, রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বোঝেন এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে প্রস্তুত।
৩. নির্বাচনের পর জাতীয় ঐক্যের সরকারে বাধ্য করা : নির্বাচনের দিন জনগণের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা শুরু হয় নির্বাচনের পর। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন, প্রতিহিংসা ও অবিশ্বাসে ক্ষত-বিক্ষত বাংলাদেশ আজ আর একক দলীয় শাসনের একচেটিয়া ক্ষমতা বহনের অবস্থায় নেই। এই বাস্তবতা থেকে জাতীয় ঐক্যের সরকারের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। এটি কোনো দুর্বলতার প্রকাশ নয়; বরং গভীর রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞার প্রতিফলন। বিভক্ত সমাজে ঐক্যমূলক শাসন পারে প্রয়োজনীয় সংস্কারে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে।
জাতীয় ঐক্যের সরকার জরুরি কেন : নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও নিরাপত্তা খাত— এসব প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে একক দলের রাজনৈতিক সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সর্বদলীয় অংশগ্রহণ, পারস্পরিক নজরদারি ও সম্মিলিত দায়বদ্ধতা। এ কারণে জনগণের তৃতীয় শর্ত হওয়া উচিত, নির্বাচনে জয়ী দলকে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনে বাধ্য করা। এটি জনগণের নৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার।
ফল কী হতে পারে : এ তিন শর্ত বাস্তবায়িত হলে জিতবে কোনো নির্দিষ্ট দল নয়, জিতবে বাংলাদেশ। জরুরি সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়িত হলে শাসনকাঠামো আরো ভারসাম্যপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক হবে। গণতন্ত্র ও সুশাসন কেবল স্লোগান নয়, চর্চায় রূপ নেবে। জনগণের আস্থা রাষ্ট্রের ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
এটি নিছক আদর্শবাদী কল্পনা নয়। ইতিহাস প্রমাণ করে, সচেতন ও সংগঠিত জনগণ চাইলে রাষ্ট্রের গতিপথ বদলাতে পারে। তাই এ নির্বাচন শুধু ব্যালটের লড়াই নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত। জনগণ যদি এই তিন শর্ত মেনে চলেন, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সত্যিই উজ্জ্বল হতে পারে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক



