আব্দুর রহমান
ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে পতিত দেড় দশকের ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনা পালিয়ে তার প্রিয় সেকেন্ড হোম ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। শুধু তার সরকারের পতন ঘটানো গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল না। সব ক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসান ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে ভবিষ্যতে যাতে কোনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম করতে না পারে এমন রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কার সম্পন্ন করার প্রশ্নও ছিল।
গণ-অভ্যুত্থানের ফসল ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের জন্য কয়েকটি কমিশন গঠন করেছিল। কমিশনের দাখিলকৃত সুপারিশের ভিত্তিতে ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ও তার দোসরদের পরিণতি দেখেও রাজনৈতিক দলগুলো কোনো শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে হয় না। ফলে ২৫-৩০টি রাজনৈতিক দলের শতাধিক বিজ্ঞনেতা অন্তর্বর্তী সরকার ও তার গঠিত ঐকমত্য কমিশনের সাথে প্রায় ৯ মাস ম্যারাথন সংলাপ করেও জনগণের চাওয়া অনুয়ায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কারের যে চারটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেননি সেই চারটি বিষয়ের ওপর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের পাশাপাশি গণভোটও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে জনগণের জিজ্ঞাস্য হচ্ছে, যেখানে ২৫-৩০টি রাজনৈতিক দলের শতাধিক নেতা দীর্ঘ সংলাপ করেও ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেননি জনগণের কাছে দুর্বোধ্য সেই চারটি বিষয়ের ওপর মতামত ব্যক্ত করে রাজনৈতিক দলগুলোর মতভেদ নিরসনের গুরু দায়িত্ব গণভোটের নামে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে কেন?
নেতারা ভুলে গেলেও জনগণ এখনো ভুলতে পারেনি যে, ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে প্রস্তাবিত নবম সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ নিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন চারদলীয় জোট সরকার আওয়ামী লীগের সাথে দীর্ঘ সংলাপ করেও ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। এর অনিবার্য পরিণতি হয়েছিল এক-এগারোর সরকার, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন দেড় দশক স্থায়ী হওয়া ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ ১৯৭২ সালের মতো জেঁকে বসা। শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নিজে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করার সাংবিধানিক ক্ষমতা অধিগ্রহণ করেন। তারপর থেকে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থা পুনর্বহাল দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘ ১৩ বছর আন্দোলন করেও সফল হতে পারেনি। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একটি মাত্র দাবিতে আন্দোলন করায় ছাত্র-জনতাকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে পারেনি।
তাই শেখ হাসিনা বিরোধী দলের আন্দোলনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের বর্জনের মুখে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিনাভোটের নির্বাচন করে ক্ষমতার মেয়াদ পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন করতে পেরেছিলেন। পরপর দু’টি নির্বাচন বর্জনকারী রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে এই ভয়ে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ১৪ দলের ক্যাডাররা প্রশাসন, পুলিশ ও পোলিং অফিসারদের সহায়তায় রাতে ভোটকেন্দ্র দখল করে নৌকা ও লাঙলের প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বাক্স পূর্র্ণ করলেও এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলো কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে শেখ হাসিনার শাসনকাল আরো পাঁচ বছর দীর্ঘায়িত হয়।
২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন রক্ষা পাওয়ায় তারা ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে। জনগণ আবারো হতাশ হয়। ফলে শেখ হাসিনা আমি ডামির ভোটারবিহীন নির্বাচন করে ক্ষমতার মেয়াদ আরো পাঁচ বছরের বাড়িয়ে নেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা ২০২৪ সালের পয়লা জুলাই থেকে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনে ক্ষতিগ্রস্ত বিক্ষুব্ধ জনগণ ব্যাপকভাবে আন্দোলনে অংশ নেয়ায় মাত্র ৩৬ দিনের আন্দোলনে তার সরকারের পতন ঘটে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে পেতে ও ড. ইউনূসকে ক্ষমতায় বসাতে ছাত্র-জনতা আন্দোলনে অংশ নেয়নি, দেড় সহস্রাধিক প্রাণ অকাতরে বিসর্জন দেয়নি।
বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে- রাজনৈতিক দলগুলো অতীতের ঘেরাটোপ থেকে যেমন বের হয়ে আসতে পারেনি, ঠিক তেমনি গণ-অভ্যুত্থানের কারণ মূল্যায়নেও ব্যর্থ হয়েছে।
এ কারণেই তারা গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র-সংস্কারের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেননি। কিন্তু ছাত্র-জনতা তো ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে এ ব্যাপারে তাদের মতামত ক্ষমতা প্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলোকে জানিয়ে দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় রাজনৈতিক দলগুলোর আগ্রহ যত বেশি গণভোটের প্রচার-প্রচারণায় তারা ততটাই পিছিয়ে। গণভোটের সমর্থক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ভোটের প্রচারে গিয়ে একটি ব্যালটে তাদের দলের প্রতীকে অপরটিতে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে বললে ভোটাররা জানতে চাইতে পারেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কি ড. ইউনূস আরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবেন? কাজেই গণভোটের চারটি বিষয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া দলগুলো যদি অতিসত্বর ঐকমত্যে পৌঁছে একটি অঙ্গীকারনামা প্রধান উপদেষ্টার সমীপে দাখিল করে গণভোট পরিহার করতে পারেন, তবে সেটাই হবে সর্বোত্তম। রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছতে না পারলে আগামী নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল তাদের মতভিন্নতার নিরসন করতে পারবে না। নির্বাচনে জয়ী হয়ে যে দল বা জোট সরকার গঠন করুক না কেন ১৯৯৪-৯৬ সালের মতো রাজনৈতিক অচলাবস্থার পুনরাবৃত্তি যে ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দল বা জোট গত ১৮ মাস যাবৎ যে ভুল করে চলেছে তা শেখ হাসিনাকে প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে। জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা শহীদ ওসমান হাদিকে আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। শেখ হাসিনার দোসর ও ক্যাডারদের যে আতঙ্কে থাকার কথা, সে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে আন্দোলনকারীদের।
বিএনপির অনেক নেতার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে, তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় বিএনপিকে বেছে নেয়া ছাড়া জনগণের সামনে বিকল্প নেই। আগামী নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ হওয়া শুধু অন্তর্বর্তী সরকার ও তার প্রশাসন এবং পুলিশের ওপর নির্ভর করছে না। নির্বাচনে অংশ নেয়া সব দলের নেতাকর্মীদের আচরণের ওপরও নির্ভর করছে। যদি তাদের আচরণের কোনো পরিবর্তন না ঘটে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে সরকারসহ সবারই সতর্কতা জরুরি।



