ভিত্তিরিয় ডিসিকার কালজয়ী ছবি সানফ্লাওয়ারে (১৯৭০) একটি স্মরণীয় সংলাপ হলো— ‘হি হু গোজ টু রাশিয়া গোজ টু গ্রেভ’। মহাযুদ্ধের ডামাডোলে নবপরিণীতার (সোফিয়া লরেন) রোমান্টিক সৈনিক স্বামী (মারসেলো মাস্ত্রইনি) রাশিয়ায় যুদ্ধে গিয়ে বরফে চাপা পড়ে। রাশিয়ান এক নারী (লুদমিলা) ওই সৈনিককে উদ্ধার করে আনেন। সৈনিক স্বামী তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে ভুলে যায়। সেই সাথে উদ্ধারকারিণীর সাথে প্রণয়ে জড়িয়ে পড়ে। প্রেমিককে খুঁজতে খুঁজতে ইতালীয় প্রেমিকা রাশিয়ায় গিয়ে খোঁজ পায় তার। প্রেম-ভালোবাসাকে যুদ্ধ কিভাবে হত্যা করে— তা এই উক্তি থেকে বেরিয়ে আসে। যে যায় রাশিয়ায় সে আর ফিরে আসে না। এ মুহূর্তে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে, সেখানে কত শত করুণ উপাখ্যান শোকসাগরে হারিয়ে যাচ্ছে। আমি আজ হারাতে চাচ্ছি বাংলার সাথে শ্রীলঙ্কার আদি সম্পর্কের রসায়নে।
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক জটিল পরিস্থিতি এবং এর প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের যোগসূত্রে চোখ রাখার সুযোগ নিতে চাচ্ছি। শ্রীলঙ্কার প্রতি ঐতিহাসিক অনুরাগ ও বিরাগের কারণগুলোর দিকে যদি তাকাই— সীতা হরণের কাহিনী ছোটবেলায় রাবণের শ্রীলঙ্কার প্রতি আমার বাজে ধারণার সূত্রপাত। পরে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদ বধ কাব্যের কুশীলব ও প্রেক্ষাপট পাঠ এবং পর্যালোচনা করে ভিন্ন এক ধারণা পোষণ করি। শ্রীলঙ্কায় এসে প্রথমে জানতে ইচ্ছে হয়েছিল রাবণ সীতাকে হরণ করে কোথায় রেখেছিল? রামায়ণ অনুসারে জানলাম, রাবণ সীতাকে হরণ করে লঙ্কার অশোকবনে এনে রেখেছিল। স্থানটি সাধারণভাবে ‘অশোকবন’ বা ‘অশোকবাটিকা’ নামে পরিচিত। সেখানে সীতাকে রাক্ষুসীরা পাহারা দিত এবং রাবণ নানাভাবে তাকে ভয় ও প্রলোভন দেখিয়ে নিজের অনুকূলে আনার চেষ্টা করেছিল। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বর্তমান শ্রীলঙ্কার নুয়ারা এলিয়া অঞ্চলের সীতা এলিয়া এলাকাকে সেই অশোকবনের স্মৃতিবাহী স্থান হিসেবে মানা হয়।
এরপর শ্রীলঙ্কা-বাংলা সম্পর্কের ঐতিহাসিক তাৎপর্য উদ্ধারে বাংলার বিজয় সেন ও তার ৭০০ সঙ্গীর শ্রীলঙ্কায় আগমন এবং শ্রীলঙ্কায় বাংলা পত্তন প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদের বিশ্লেষণে যা জানলাম— শ্রীলঙ্কার প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থ মহাবংশ ও দীপবংশ অনুসারে খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৫৪৩ অব্দে বঙ্গদেশ (বাংলা/বঙ্গ) থেকে এক যুবরাজ নাম বিজয় তার সাথে ছিল ৭০০ অনুসারী। তারা সমুদ্রপথে লঙ্কায় এসে উপকূলে অবতরণ করেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় ‘বিজয় সেন’ নামে কোনো ঐতিহাসিক রাজা বাংলায় পাওয়া যায় না। শ্রীলঙ্কার সূত্রে নামটি কেবল ‘বিজয়’। মহাবংশ অনুযায়ী, বিজয় ছিলেন এক অশান্ত ও দুরন্ত রাজপুত্র। তাকে বঙ্গদেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়। এরপর তিনি সমুদ্রপথে নতুন ভূমি সন্ধানে বের হন। লঙ্কায় এসে স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষ ও সমঝোতার মাধ্যমে একটি নতুন রাজশক্তির ভিত্তি স্থাপন করেন। লঙ্কার সভ্যতা গঠনে বাংলার ভূমিকায় পাই শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যগত ইতিহাস অনুযায়ী, বিজয় ও তার অনুসারীরা সিংহলি জাতির পূর্বপুরুষ। ‘সিংহল’ শব্দটি এসেছে সিংহ+লা (সিংহের বংশধর) থেকে। বিজয়ের পিতা ছিলেন সিংহবাহু, মাতা সিংহসিবা (কিংবদন্তি চরিত্র)। ফলে শ্রীলঙ্কার জাতিগত পরিচয়ের সাথে বঙ্গদেশের একটি প্রতীকী যোগসূত্র স্থাপিত হয়। এটি কি বাস্তব ইতিহাস না কিংবদন্তি? এখানে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত— প্রাচীনকালে বঙ্গোপসাগরভিত্তিক বাংলা-লঙ্কা সামুদ্রিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, বৌদ্ধ ধর্ম, সংস্কৃত ভাষার আদান-প্রদান; পাল যুগে বাংলার বৌদ্ধ পণ্ডিতদের লঙ্কাযাত্রা। বিজয়কে সরাসরি ‘বাংলার রাজা’ বলা হয়তো ঘটনাগুলোর অতিরঞ্জিত রূপ। তবে বাংলাদেশের জনগণের উদ্যোগ হিসেবে বিষয়টির গুরুত্ব রয়েছে। যদিও এটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নয়; বরং বাংলা অঞ্চলের মানুষের সাথে শ্রীলঙ্কার জনগণের প্রাচীন আত্মিক সম্পর্কের প্রতীক। দুই অঞ্চলের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম, পালি-সংস্কৃত ভাষা, সামুদ্রিক বাণিজ্য এই সম্পর্ককে আরো গভীর করেছে। এ কারণে শ্রীলঙ্কার বহু ইতিহাসবিদ আজও বলেন, সিংহলি উৎস প্রাচীন বাংলার সাথে সম্পর্কিত।
বাংলা ও শ্রীলঙ্কার ইতিহাসবিদদের মতভেদ রয়েছে। শ্রীলঙ্কার বহু ইতিহাসবিদ মনে করেন, বিজয় একজন বাস্তব ঐতিহাসিক চরিত্র, তার থেকে সিংহলি জাতির সূচনা। বঙ্গদেশ ছিল একটি বাস্তব ভৌগোলিক উৎস। তাদের মতে— ‘বিজয়’ ঐতিহ্য শুধু পৌরাণিক কাহিনী নয়; বরং প্রাথমিক ইন্দো-আর্য অভিবাসনের স্মৃতি। বাংলাদেশের ইতিহাসবিদরা তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক : তারা বলেন, ‘বিজয়’ কোনো নির্দিষ্ট রাজা নাও হতে পারেন। এটি হতে পারে বহু শতাব্দীর বঙ্গ-লঙ্কা জনবসতি আন্দোলনের প্রতীক। ড. নীহাররঞ্জন রায় ও রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এটি একটি এথনো-হিস্টোরিক্যাল লিজেন্ড (জাতিগত স্মৃতি, সরাসরি রাজ-ইতিহাস নয়)। আধুনিক গবেষণার আলোকে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ পাই— আধুনিক ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও জিনতাত্ত্বিক গবেষণা এ কাহিনীকে তিনভাবে ব্যাখ্যা করে, যা সমর্থিত, তা হলো খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে বঙ্গোপসাগরভিত্তিক সামুদ্রিক যাতায়াত, বাংলা-উড়িষ্যা উপকূল থেকে শ্রীলঙ্কায় মানুষের গমন, ভাষাগত মিল প্রাচীন সিংহলি ভাষায় বহু ইন্দো-আর্য ও পূর্ব ভারতীয় উপাদান। তবে প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায় একজন মাত্র ব্যক্তি ‘বিজয়’ পুরো জাতির উৎস এই দাবি, ৭০০ জনের নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং বুদ্ধের পরিনির্বাণের সাথে সময়গত মিল। আধুনিক গবেষকরা বলেন, বিজয় সম্ভবত একক ব্যক্তি নয়; বরং একটি নেতৃত্বগোষ্ঠীর প্রতীক। প্রাচীন বঙ্গ অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক সামুদ্রিক বিস্তার, বাণিজ্য, বসতি ও সাংস্কৃতিক প্রভাব, বাংলা অঞ্চলের জনগণের প্রাচীনতম সাংস্কৃতিক অবদানগুলোর একটি। মহাবংশ বিজয়কে বঙ্গদেশীয় বলে স্বীকৃতি দেয়। শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে তিনি রাষ্ট্রগঠনের প্রতীক এবং বাংলার ইতিহাসে তিনি একটি অর্ধ-ঐতিহাসিক স্মৃতি। আধুনিক গবেষণায় এটি জনবসতি ও সাংস্কৃতিক বিস্তারের প্রতীকী কাহিনী।
শ্রীলঙ্কার ওপর আমার রাগ বা অনুরাগের আধুনিক কারণ হলো— আমরা গলের যে অবকাশ কেন্দ্রে ছিলাম, তার অদূরে এই ভারত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও মহাসেনের উৎপত্তিস্থল জেনে। এখান থেকে ‘সিডর’ (সিংহলি ভাষায় চোখ) চোখ মেলে এবং কিভাবে ২০০৭ সালের ৬ থেকে ১৫ নভেম্বর রীতিমতো কারসাজি করে উত্তরে এগিয়ে বাংলাদেশের সুন্দরবন-সংলগ্ন জনপদে আঘাত হানে। শ্রীলঙ্কায় উৎপত্তি ঘূর্ণিঝড় ভিয়ারু বিতর্কিত রাজা মহাসেনের নাম নিয়ে মহাসেন ২০১৩ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে। তবে আক্রমণের মাত্রা কমিয়ে এবং গতিপথ পাল্টিয়ে মহাসেন মোটামুটি মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছিল বলে ‘মহাসেনের মহানুভবতা’ নামে একটি লেখা লিখেছিলাম।
লেখক : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান



