বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক মানুষের জীবন থেকে হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে গেছে সাড়ে পাঁচটি বছর। এ লেখার এমন সূচনা পাঠ শেষে হয়তো অনেকে হেয়ালিতে পড়তে পারেন। আবার কেউ এর মর্ম উদ্ধারের ভাবনায় ডুবতে পারেন। আসলে, সম্প্রতি দেশের শীর্ষে থাকা বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ভীতিকর এক খবরের সারনির্যাস থেকে এমন সূচনার অবতারণা।
প্রকাশিত খবরটির কিছু অংশ উদ্ধৃত করলে সূচনার অবগুণ্ঠন উন্মোচিত হবে। গত ২৯ আগস্ট ২০২৫, খবরটি প্রকাশিত হয়। একটি পত্রিকার শিরোনামসহ খবরের কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হলো। শিরোনামটি ছিল, ‘বায়ুদূষণে বাংলাদেশীদের গড় আয়ু কমেছে সাড়ে পাঁচ বছর।’ খবরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ এমন- ‘বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুর জন্য সব চেয়ে বড় বাহ্যিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বায়ুদূষণ।’ বায়ুদূষণে বাংলাদেশের মানুষের আয়ু গড়ে কমেছে সাড়ে পাঁচ বছর। এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের (একিউআই) ২০২৫ সালের হালনাগাদ বার্ষিক প্রতিবেদনে এমন ভীতিকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের (ইপিআইসি) ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশ। দেশটিতে ১৬ কোটি ৬৮ লাখ জনসংখ্যার সবাই এমন এলাকায় বসবাস করেন। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী, মাত্র ২ দশমিক ৫ পয়েন্ট বালুকণার ঘনত্ব বাংলাদেশে কমানো গেলে, মানুষের আয়ু ৬ দশমিক ২ বছর বৃদ্ধি পেত। তা করতে না পারায় বায়ুদূষণের অবনতিতে এখন গড়ে মানুষের আয়ু কমেছে সাড়ে পাঁচ বছর। এ যেন স্বেচ্ছা আত্মাহুতি।
পরিবেশ-প্রকৃতির প্রতি যে অবিচার-অত্যাচার গত ৫০-৫২ বছর হয়েছে, তা নিয়ে অনুতাপ করা দূরের কথা; বরং অত্যাচার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে প্রতিনিয়ত। এখন সেই বঞ্চিত পরিবেশ-প্রকৃতি ফিরিয়ে দিচ্ছে, পাল্টা অভিশাপ। বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানি হরেদরে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব অপরাধ এখন যেন গা-সহা হয়ে গেছে। আমাদের সামাজিক বাস্তবতা এমন যে, বাংলাদেশে যে যত অপরাধ করতে পারে, কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের আসন-সম্মান সহানুভূতি বেড়ে যায় বহুগুণে। তাদের অবস্থান ধরাছোঁয়া ও আইন-কানুনের ঊধ্বের্, সবার উপরে। তাতে যদি সব প্রাণীর জীবন যায়, তাতেও কিছু যায় আসে না। এমন নির্মমতা কেউ এখন গোনায় ধরে না। বাংলাদেশে আইন-কানুন অনেকটা প্রবাদের মতো, কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই। বাংলাদেশের মাদার ল তথা মৃতপ্রায় সংবিধানের ১৮, ক অনুচ্ছেদে বর্ণনা করা হয়েছে- ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।’ এই সর্বোচ্চ আইনের কিতাব নিয়ে কর্তৃপক্ষের কী ভয়ঙ্কর উদাসীনতা। বিগত ৫০-৫২ বছর কত মন্ত্রী-বাহাদুর তাদের পদ-প্রাপ্তির আগে সংবিধান সংরক্ষণের শপথ নিয়েছেন। কেউ কি কখনো ১৮, ক অনুচ্ছেদের মর্মবাণী উপলব্ধি করেছেন। প্রকৃতির ওপর অত্যাচার অবিচারের ধারাক্রম রুখতে কেউ এ পর্যন্ত এক কদমও সামনে অগ্রসর হননি। নিছক ক্ষমতার দণ্ড হাতে পেতে সবাই শুধু সত্য-মিথ্যার সলিলে সাতার কেটেছেন।
পরিবেশ বিপর্যয়ে যেসব সমস্যা অহরহ হতে পারে, নিম্নে তার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো : পরিবেশের বিপর্যয় ঘটলে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাণবৈচিত্র্য হ্রাস, বিশুদ্ধ বাতাসের অভাব, পানীয় জলের সঙ্কট, মাটি ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যায়, যা জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি হুমকি তৈরি করে।
পরিবেশ বিপর্যয়ে সৃষ্ট প্রধান সমস্যাগুলো :
জলবায়ু পরিবর্তন : জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো ও বন উজাড় করার মতো মানুষের কর্মকাণ্ড পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। এর ফলে বৈশ্বিক উঞ্চতা বৃদ্ধি পায়, মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে।
প্রাণবৈচিত্র্য হ্রাস : বাসস্থান ধ্বংস, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনে অনেক উদ্ভিত ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, বহু মানুষকে উদ্বাস্তু হতে হচ্ছে।
বায়ু ও জলের গুণমান হ্রাস : কলকারখানা ও গাড়ির ধোঁয়া এবং অন্যান্য দূষণকারী পদার্থ বাতাসে মিশে বায়ুদূষণ ঘটায়। একইভাবে, শিল্প ও কৃষিজ বর্জ্য পানিকে পান করার অযোগ্য করে তোলে।
মাটির অবক্ষয় : অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার এবং বন উজাড় করায় মাটি উর্বরাশক্তি হারায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের বৃদ্ধি : পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাবে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা এবং ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বেড়ে যায়। বিপর্যস্ত পরিবেশ নিয়ে বাংলাদেশ এখন আত্মবিনাশের সারিতে।
স্বাস্থ্যগত সমস্যা : বায়ু ও পানিদূষণে হাঁপানি, হৃদরোগ, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং পানিশূন্যতার মতো স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।
জীবনের ঝুঁকি : পরিবেশগত দুর্যোগে মানুষের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, যেমন বাংলাদেশের একটি বড় অংশ সাগরের পানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি : পরিবেশগত বিপর্যয়ে কৃষি খাত ও অবকাঠামোর ক্ষতি এবং স্বাস্থ্য খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, যা অর্থনৈতিকভাবে দেশকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
নদী ও বায়ুদূষণ রোধে কর্মপরিকল্পনা হলেও সার্বিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে আশার কথা, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে বনের জমি উদ্ধারে কিছু সাফল্য রয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে কথিত উন্নয়ন প্রকল্পে দেয়া বরাদ্দ বাতিল করে ১০ হাজার একর বনভূমি ফিরিয়ে এনেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। তবে এ সময়ে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও এখনো তা সাফল্যের মুখ দেখেনি। এক খবরে প্রকাশ, কক্সবাজারের বনাঞ্চলে স্বস্তি ফিরলেও বন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মহাবিপন্ন প্রজাতি হাতি মারা গেছে ১৯টি। এর মধ্যে হাতি সংরক্ষণের একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে নদী দখল ও দূষণমুক্ত করার ঘোষণা দেয়া হলেও এতে সফলতা নেই। তবে নদীর সংখ্যা নিয়ে নদী রক্ষা কমিশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যেকার বিভ্রান্তি দূর করা হয়েছে। বিগত লীগ সরকারের আমলে বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের চাপ পড়ে কক্সবাজার বনভূমির ওপর। এ জেলার রামুতে ফুটবল একাডেমি নির্মাণে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ২০ একর সংরক্ষিত বন, জনপ্রশাসনের লোকপ্রশাসন একাডেমি নির্মাণে শুকনাছড়িতে ৭০০ একর বন ও সোনাদিয়ায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে ৯ হাজার ৪৬৭ একর বনভূমি বরাদ্দ দেয় বিগত লীগ সরকার। এ ছাড়া ২০১৭ সালে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলমের ভাইয়ের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ১৫৫ একর বনভূমি। গত এক বছরে এসব বরাদ্দ বাতিল করে বন অধিদফতরের অনুকূলে নিয়ে আসা হয়। সাবেক পরিবেশমন্ত্রী শাহাবুদ্দিন সিলেটে নিজের এলাকায় লাঠি টিলার সংরক্ষিত বনের ভেতরে এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সাফারি পার্ক করতে চেয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার তা বাতিল করেছে।
তবে গত এক বছরের বায়ুমানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং বায়ুমান ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে চলেছে। পরিণতিতে ঢাকাসহ প্রায় সব স্থান এখন বলতে গেলে ‘গ্যাস চেম্বারে’ পরিণত হয়েছে। মানুষের গড় আয়ুতে আঘাত হেনেছে। বায়ুমান পতন রুখতে না পারলে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ এক পরিণতি অপেক্ষা করছে। শুধু সরকার নয়, দেশের প্রত্যেক মানুষকে এ জন্য সতর্ক হতে হবে।
প্রকৃতির প্রতিশোধ নেয়ার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ থেকে মুক্তি পেতে, সব রাজনৈতিক সংগঠনকে বুঝতে হবে; তারা ক্ষমতায় থাকাকালে ক্ষমতার যে অপচর্চা হয়েছে, এর জের হিসেবে গত ৫০-৫২ বছরে দেশ এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। পরিবেশ নিয়ে সোচ্চার যত এনজিও তাদের কর্মকাণ্ড একেবারে ছোট পরিসরে। সেখানে তাদের কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নীতিগত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সুশাসন জবাবদিহি না থাকে- তাহলে তাদের কর্মকাণ্ডের যোগফল হবে শূন্য। বাংলাদেশের জন্য এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বিষয় নিয়ে আলোচনা অগ্রাধিকার পাওয়া ভিন্ন আর কিছু হতে পারে না। কেননা এ জনপদের অস্তিত্বের জন্য পরিবেশ নিয়ে ভাবনার চেয়ে এখন অন্য কিছু প্রাধান্য পেতে পারে না।
আবারো রাজনীতিক ও রাজনীতি নিয়ে কথা বলে এ নিবন্ধের পরিণতিতে পৌঁছাতে চাই। আজ পরিবেশ নিয়ে যে দুশ্চিন্তা সেটি হাঠাৎ করে দেশের দুয়ারে কড়া নাড়ছে না। ৫০-৫২ বছরে তিল তিল করে সেটি তালে পরিণত হয়েছে। সে তাল এখন বিস্ফোরণের মুখে। এ দীর্ঘ সময়, রাষ্ট্রযন্ত্রের যারা যখন ম্যান বিহান্ড দ্য মেশিন ছিলেন; প্রধানত তাদের ব্যর্থতা এ দেশ ও জনতাকে ‘ভলক্যানোর’ চূড়ায় নিয়ে এসেছে। তাদের পরিবেশ নিয়ে অমনোযোগিতা উপেক্ষা অক্ষমতা, জ্ঞানগরিমার স্বল্পতা এমন ভয়ঙ্কর পরিণতির জন্য দায়ী। তারা রাজনীতি থেকে প্রাপ্তি, তৃপ্তি নিয়ে এত ‘বেচান’ থাকতেন যে, অন্য দিকে তাদের মনোনিবেশের কোনো সময়-সুযোগ ছিল না। পরিবেশ নিয়ে এখন যে সরব সংলাপ হচ্ছে, অতীতে এমন কোনো সংলাপ ছিল না এ কথা ঠিক নয়। সংলাপ শঙ্কা সবকিছু কম বেশি ছিল; কিন্তু রাজনীতিকরা তা শুনতে আগ্রহী ছিলেন না। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট পরিবেশ নিয়ে আলোচনাকে কল্পিত ও আজগুবি এক আলোচনা বলে মনে করেন। আমাদের নেতারাও তাই মনে করেন। এভাবে যদি বানের জলে সবাই গা ভাসিয়ে চলেন, তবে অচিরে এমন এক বান আসবে; তখন কিন্তু সে বানের তোড়ে সবাইকে বঙ্গোপসাগরে ডুবে মরতে হবে।


