কলোনিয়াল মানসিকতা ভাঙার লড়াই ও জুলাই বিপ্লব

শরিফ ওসমান হাদিসহ তরুণদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে হলে বাংলাদেশকে যেতে হবে গভীর ডিকলোনাইজেশনের পথে- যেখানে ক্ষমতা, ইতিহাস ও চিন্তার কাঠামো নতুন করে নির্মিত হবে।

একাত্তরে বাংলাদেশ এক গৌরবময় স্বাধীনতা অর্জন করে। বিপুল ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে জন্ম নেয় একটি নতুন রাষ্ট্র। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থে স্বাধীনতা এলেও বুদ্ধিবৃত্তিক অর্থে সেই স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়নি। পতাকা বদলেছিল, মানচিত্র বদলেছিল; কিন্তু চিন্তার কাঠামো বদলায়নি। ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটলেও কলোনিয়াল মানসিকতা বহাল রইল। এই বৈপরীত্য গত পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

কলোনিয়াল চিন্তা বলতে এমন এক মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্ঞানচর্চার কাঠামোকে বোঝায়, যা ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠে। রাজনৈতিকভাবে উপনিবেশের অবসান ঘটলেও তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক রেশ বহুদিন রয়ে যায়। মানুষ নিজের ইতিহাস, পরিচয়, সংস্কৃতি ও বিশ্বে নিজের অবস্থানকে যেভাবে দেখে- তার গভীরে এই কলোনিয়াল চিন্তা কাজ করতে থাকে। এটি কেবল উপনিবেশিত হওয়ার স্মৃতি নয়; বরং এমন এক মানসিক উত্তরাধিকার, যা পশ্চিমা মানদণ্ড ও জ্ঞানব্যবস্থাকে শ্রেষ্ঠ বলে ধরে নেয় এবং স্থানীয় ইতিহাস, চিন্তা ও অভিজ্ঞতাকে অবমূল্যায়ন করে।

কলোনিয়াল চিন্তার প্রভাব ব্যাখ্যা করতে যারা গভীরভাবে কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে ফ্রাঁৎস ফ্যানন অন্যতম। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ঞযব ডৎবঃপযবফ ড়ভ ঃযব ঊধৎঃয-এ ফ্যানন দেখিয়েছেন, কিভাবে ঔপনিবেশিক শাসন কেবল ভূমি বা রাষ্ট্র নয়, মানুষের মনকেও দখল করে। তিনি লিখেছিলেন, ‘উপনিবেশবাদ কোনো চিন্তাশীল যন্ত্র নয়; এটি নগ্ন সহিংসতা, যা আরো বড় সহিংসতার মুখে পড়লে নতি স্বীকার করে।’ ফ্যাননের বিশ্লেষণে উপনিবেশিত মানুষের ভেতরে জন্ম নেয়া হীনম্মন্যতা ও আত্ম-অবিশ্বাসই কলোনিয়াল চিন্তার মূল ভিত্তি।

অ্যাডওয়ার্ড ডবিøউ সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম ধারণা কলোনিয়াল চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়। সাঈদ দেখিয়েছেন, কিভাবে পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চা ‘প্রাচ্য’কে একটি ভিন্ন, পশ্চাৎপদ ও রহস্যময় জগৎ হিসেবে নির্মাণ করেছে। তার মতে, ওরিয়েন্টালিজম কেবল কল্পনা নয়; এটি ক্ষমতা ও আধিপত্যের সাথে যুক্ত একধরনের চিন্তার কাঠামো। এর ফলে উপনিবেশিত সমাজ নিজেদের সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শেখে।

ভাষা, শিক্ষা ও নেতৃত্বের ধারণার মধ্যেও কলোনিয়াল চিন্তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। যখন কোনো সমাজ উন্নতি বা আধুনিকতার মানদণ্ড নির্ধারণে কেবল পশ্চিমা নমুনা অনুসরণ করে, তখন সে অজান্তে ঔপনিবেশিক কাঠামোকে পুনরুৎপাদন করে। আফ্রিকান চিন্তাবিদ এনগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো বলেছেন, ‘ভাষা সংস্কৃতি বহন করে, আর সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের ও আমাদের অবস্থান বুঝে নিই।’ ফলে উপনিবেশকের ভাষাকে অগ্রাধিকার দেয়াও একধরনের কলোনিয়াল চিন্তা।

কলোনিয়াল চিন্তা থেকে মুক্তি মানে পাশ্চাত্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা নয়; বরং এর অর্থ হলো- নিজস্ব ইতিহাস, জনমানুষের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞানকে নতুন করে মূল্যায়ন করা এবং চিন্তার স্বাধীনতা অর্জন করা। এই অর্থে ডি-কলোনাইজেশন বা বি-উপনিবেশীকরণ কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি এক গভীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির প্রক্রিয়া।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা শুধু শাসনব্যবস্থা বা প্রতিষ্ঠান গড়তে না পারা নয়; বরং কলোনিয়াল চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারা। নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব কার্যত ব্রিটিশ আমলের রাষ্ট্রযন্ত্র উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করল এবং সেটিকে চালু রাখল। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রইল, প্রশাসন রইল জনগণ-বিচ্ছিন্ন, শাসনের ধরন হয়ে উঠল কর্তৃত্ববাদী- যা ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিচ্ছবি। জনগণ আবারো প্রজায় পরিণত হলো; এবার কোনো বিদেশী শাসকের নয়; বরং দেশীয় এক ক্ষমতাশালী শ্রেণীর।

এই বাস্তবতায় সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা হওয়ার কথা ছিল জাতির বিবেকের; কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাদের বড় একটি অংশও সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন। কলোনিয়াল জ্ঞানকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার বদলে তারা অনেকসময় তাকেই পুনরুৎপাদন করেছেন। ইতিহাস, আধুনিকতা, প্রগতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যায় পশ্চিমা ফ্রেমওয়ার্কই হয়ে উঠেছে চূড়ান্ত মানদণ্ড। উপমহাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ঐতিহ্য, ইসলামী সংস্কার আন্দোলন, কৃষক-জনতার প্রতিরোধ ইতিহাস কিংবা প্রাক-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রচিন্তা- এসবকে কখনো অবহেলা করা হয়েছে, কখনো ‘পিছিয়ে পড়া’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ফলে তরুণ প্রজন্ম ক্রমে নিজেদের ইতিহাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এই শূন্যতা দীর্ঘ দিন জমতে জমতে একসময় বিস্ফোরণের উপযোগী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যখন একটি একমাত্রিক ইতিহাস চাপিয়ে দেয়, আর বাস্তব জীবনে মানুষ দেখে দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও বৈষম্য- তখন প্রশ্ন উঠতেই থাকে। বিশেষ করে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শাসনামলে এ বৈপরীত্য চরমে পৌঁছে। ক্ষমতার নামে ইতিহাসের একচেটিয়া মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা হয়, ভিন্নমতকে দমন করা হয়, আর মুক্তিযুদ্ধের ভাষ্যকে ব্যবহার করা হয় শাসনের বৈধতা হিসেবে।

এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মধ্যে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে শুরু করে। তরুণরা আর অপেক্ষা করেনি রাজনৈতিক দল বা প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবীদের নির্দেশনার জন্য। তারা নিজেরাই কলোনিয়াল চিন্তার বেড়াজাল ভাঙতে শুরু করে। প্রশ্ন করতে শেখে- আমাদের প্রকৃত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নায়ক কারা? আমাদের ইতিহাস কি কেবল ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু? এ প্রশ্নের উত্তরে তারা ফিরে যায় নিজেদের শিকড়ে।

নতুন করে আলোচনায় আসেন বখতিয়ার খিলজি, নুর কুতুব, শাহজালাল, শাহ মাখদুম, হাজী শরীয়তউল্লাহ, তিতুমীরের মতো ঐতিহাসিক চরিত্ররা। এরা কেউ ঔপনিবেশিক ক্ষমতার স্বীকৃত নায়ক ছিলেন না; বরং তারা ছিলেন প্রতিরোধের, সংস্কারের ও জনমানুষের নেতৃত্বের প্রতীক। তাদের জীবন ও সংগ্রাম তরুণদের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে- কারণ তারাও দেখছিল এক দমবন্ধ করা রাজনৈতিক বাস্তবতা।

এই ফিরে তাকানো নস্টালজিয়া ছিল না। এটি ছিল নিজস্ব ইতিহাস ও চিন্তার ওপর অধিকার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। তরুণরা আধুনিকতাকে অস্বীকার করেনি; তারা অস্বীকার করেছে কলোনিয়াল সংজ্ঞায়িত আধুনিকতাকে। তারা বুঝেছে, রাজনৈতিক সচেতনতা বা সংস্কার পশ্চিমের দান নয়; এই ভূ-খণ্ডে তার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ একসময় রূপ নেয় রাজনৈতিক বিস্ফোরণে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব কেবল একটি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল শাসনের একটি দর্শনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, চিন্তার একচেটিয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রত্যাখ্যান। এটি ছিল ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি প্রজন্মের সম্মিলিত ‘না’।

এই আন্দোলনের তরুণ নেতৃত্ব কোনো একক দলীয় আদর্শে আবদ্ধ ছিল না। তাদের দাবি ছিল আরো মৌলিক-মর্যাদা, সত্য ও রাজনৈতিক মালিকানা। তারা নিজেদের আর কলোনিয়াল প্রজা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের ভোগদখলভিত্তিক উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখেনি। তারা নিজেদের দেখেছে ইতিহাসের সক্রিয় নির্মাতা হিসেবে।

এই জাগরণের কেন্দ্রস্থলে ছিলেন কিছু ব্যক্তি, যাদের প্রভাব সাংগঠনিক সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে শরিফ ওসমান হাদির নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হবে। হাদি কেবল একজন একটিভিস্ট ছিলেন না, তিনি ছিলেন নৈতিক দৃঢ়তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাহসের প্রতীক। এমন এক সময়ে, যখন আপস পুরস্কৃত হয় আর প্রশ্ন শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হয়, হাদি নির্ভয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষমতা, ইতিহাস ও পরিচয় নিয়ে।

হাদির বিশেষত্ব ছিল এই যে, তিনি বুঝতেন- আসল মুক্তি শুরু হয় চিন্তায়। তরুণদের বইয়ের দিকে, ইতিহাসের দিকে, প্রশ্নের দিকে ফেরাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। চিন্তা ও আন্দোলনের সংযোগ ঘটিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক সংগ্রাম কেবল স্লোগানে নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতিতে শক্তিশালী হয়।

এ কারণে জুলাই বিপ্লবকে কেবল অর্থনৈতিক সঙ্কট বা রাজনৈতিক দমনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি দীর্ঘ দিন জমে থাকা এক বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ- কলোনিয়াল চিন্তার বিরুদ্ধে, তার নতুন দেশীয় রূপের বিরুদ্ধেও।

এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এ বিপ্লবকে অর্থহীন করার অপচেষ্টা। সেই অপচেষ্টা অনেক গোষ্ঠী থেকে শুরু হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়- অনেক বিপ্লবই ব্যর্থ হয়েছে, কারণ নতুন এলিট পুরনো কাঠামো বহাল রেখেছে। যদি জুলাই বিপ্লবের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিকে উপেক্ষা করা হয়, তবে আমরা আবারো একই বৃত্তে আটকা পড়ব।

শরিফ ওসমান হাদিসহ তরুণদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে হলে বাংলাদেশকে যেতে হবে গভীর ডিকলোনাইজেশনের পথে- যেখানে ক্ষমতা, ইতিহাস ও চিন্তার কাঠামো নতুন করে নির্মিত হবে। তবেই চব্বিশের জুলাই কেবল স্মৃতির বিষয় হয়ে থাকবে না, বাস্তবতায় পূর্ণতা পাবে- একটি চলমান, জীবন্ত মুক্তির প্রকল্প হিসেবে। স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন আমরা চিন্তায়ও স্বাধীন হতে পারব।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন