দিল্লির সাথে পিন্ডিকে একাকার করা কতটা যৌক্তিক

দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ— বিএনপির এমন নির্বাচনী ন্যারেটিভ, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী জামানার টোনকেই যেন অনেকটা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করছে ভিন্ন ফরমেটে। পিন্ডি কোনোভাবে এখন আর আমাদের শত্রুর কাতারে নেই। বিএনপির মতো দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী একটি দলের জন্য এমন তুলনা কোনোভাবে মানায় না। এতে করে দেশের ভোটাররা হতাশ হতে পারেন। আর ভোটাররা সত্যি যদি এমন মনোভাব পোষণ করেন, তা হলে আগামী নির্বাচনে দলটি কাঙ্ক্ষিত ফল না-ও পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থানই বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্য বজার রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর দাওয়াই। এর বিকল্প আমাদের সামনে নেই। থাকলে আমাদের পূর্বপুরুষরা সাতচল্লিশে দিল্লির অধীনতা কবুল করতেন।

ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এ দেশের মানুষ ব্রিটিশদের কাছে থেকে মুক্তির আশায় পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সাতচল্লিশে আজাদি আন্দোলনে তাদের গভীরভাবে অংশগ্রহণের ফলে পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়। কিন্তু এ ভূখণ্ডের বেশির ভাগ মানুষ পাকিস্তানভুক্ত হয়ে তাদের যে বঞ্চনার অবসান হবে বলে আশা করেছিলেন, কিন্তু ভাষা ইস্যুতে অল্প দিনেই তারা বঞ্চনাবোধ করতে থাকেন। ফলে পূর্ববাংলায় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জন্ম। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের পালে প্রবল হাওয়া বইতে থাকে, যা একাত্তরে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়। একাত্তরে এ দেশের মানুষ সাম্য, সামাজিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অভিপ্রায়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সশস্ত্রযুদ্ধে অংশ নেন। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ঊষালগ্নে তাদের সেই আশা ভেঙে এক গভীর হতাশার জন্ম নেয়। শেখ মুজিবের রাষ্ট্র চালানোয় ব্যর্থতা এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন এর জন্য মূলত দায়ী।

একাত্তরে স্বাধীনতা পাওয়ার পর এ দেশের মানুষ আশা করেছিল তারা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পাবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি হয়ে আসে বাকশাল। শেখ মুজিব নিজে যার জন্য দায়ী। পরিণতিতে পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সাতচল্লিশে এ দেশের মানুষ ভারতীয় আধিপত্যবাদের কবল থেকে মুক্তি পেতে পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক হন। আর একাত্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ বঞ্চনার নাগপাস ভাঙতে স্বাধীনতা যুদ্ধ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো— সেই স্বাধীনতাপ্রাপ্তির সাথে সাথে এ দেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ জেঁকে বসে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে তাও ৫৪ বছর হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে ভারতীয় আধিপত্য এ দেশের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সংস্কৃতিক অঙ্গনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুপ্রবেশ করে। মূলত স্বাধীন বাংলাদেশে খুব অল্প সময়ে বাংলাদেশ ভারতীয় আধিপত্যের কবল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়— প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাঁচ বছর শাসনামল এবং খালেদা জিয়ার দুই দফায় ১০ বছর, সর্বমোট এই ১৫ বছর এ দেশ দিল্লির প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সচেষ্ট প্রয়াস লক্ষ করা যায়। এরপর শেখ হাসিনার বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশকে আবার দিল্লি আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। কিন্তু এ দেশে কতিপয় শাসক বিশেষ করে শেখ মুজিব ও তার মেয়ে শেখ হাসিনার দিল্লির তাঁবেদারি কোনোকালে পছন্দ করেননি বাংলাদেশীরা। তাই তো দেখা যায়, পঁচাত্তরের দিল্লিবিরোধী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে এ দেশের মানুষ সানন্দে গ্রহণ করে। ঠিক একইভাবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে পতিত শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলের অবসানে বাংলাদেশের স্বকীয়তার প্রত্যাশী দেশের বেশির ভাগ মানুষ। কিন্তু ফ্যাসিবাদ-উত্তর বর্তমান সময়ে এসে দিল্লিবিরোধী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দিল্লি এবং পিন্ডিকে এক পাল্লায় মেপে একাকার করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণায় প্রাধান্য দেয়ায় এক ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।

এ কথার অবতারণা করা হলো এ জন্য যে, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারের প্রথম দিনেই বিএনপি সিলেট থেকে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করে। সেই অনুযায়ী, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদরাসা মাঠে জনসভার আয়োজন করে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করে দলটি। নির্বাচনী জনসভায় প্রধান প্রতিপাদ্য হয়ে ওঠে ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ’। (প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণ, ২২ জানুয়ারি ২০২৬)

দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, অন্য কোনো দেশ নয়, সবার আগে বাংলাদেশ উল্লেখ করে ওই নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘যেমন দিল্লি নয়, তেমন পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ’। এ ছাড়া বিএনপির দায়িত্বশীল সব পর্যায় থেকে বিভাজনের পুরনো ন্যারেটিভে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে।

সবার স্মরণে থাকার কথা বিএনপি গঠনের প্রেক্ষাপট। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত স্বাধীন দেশের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চালান। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বিএনপি দেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। জিয়াউর রহমান পরবর্তী দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি রচনা করেন তার বিধবা পত্নী বেগম খালেদা জিয়া। তার আপসহীন নেতৃত্বগুণে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের চেয়ে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। এতে বোঝা যায়, এ দেশের মানুষ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়াকে আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তাদের পেছনে জড়ো হন। শেখ হাসিনার দীর্ঘ অপশাসনেও এ দেশের মানুষ বেগম খালেদা জিয়া অর্থাৎ— বিএনপির প্রতি আস্থা রাখেন। তাই অনায়াসে আমরা এ কথা বলতে পারি, জনগণের কাছে বিএনপির ভাবমর্যাদা গড়ে উঠেছে আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে। বিশেষ করে দিল্লির আগ্রাসী আচরণ রুখতে পারবে যে রাজনৈতিক দল, সেটি বিএনপি। কিন্তু ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে যে ন্যারেটিভ দাঁড় করিয়েছে, তা দলটির আগের রানৈতিক দর্শনের কতটুকু খাপকায় তা নিয়ে ধোয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের সেই পুরনো বয়ান নিয়ে হাজির হয়েছে বিএনপি। সিলেটের জনসভায় প্রচারণার প্রথম দিনের প্রথম কর্মসূচিতে তারেক রহমান বলছেন দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ। একথা শুনতে ভালো শোনা গেলেও এই স্লোগানের বিপজ্জনক দিক হলো এটি দিল্লি অর্থাৎ ভারত এবং পিন্ডি মানে পাকিস্তানকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। দুই প্রতিবেশী দেশকে একাকার করে ফেলা হয়েছে। অথচ আমাদের সবার জানা, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ৫৪ বছরে এ দেশের রাজনীতিতে পাকিস্তানের কোনো প্রভাব শূন্যের কোঠায়। এখন যা আছে তা দুই মুসলিম ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের বন্ধুত্ব। এতে উভয় দেশ বৈষয়িকভাবে লাভবান হতে পারে। আর দিল্লি বাংলাদেশের সমাজে রাষ্ট্রে এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গন হেন কোনো জায়গা নেই, যেখানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা করেনি । এই আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে বাহন হিসেবে কাজ করেছে আওয়ামী লীগ। দিল্লির সেবাদাস হিসেবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে শেখ হাসিনা এ অপকর্ম মনের আনন্দে করেছেন। তাই শেখ হাসিনার তার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করতে গুম-খুন, বিচারিক হত্যা করতে পিছপা হননি। ফলে বিগত সাড়ে ১৫ বছরে এ দেশে দিল্লির উপস্থিতি ছিল আগ্রাসী শক্তি হিসেবে। আর পিন্ডি মানে পাকিস্তান এ দেশে সেই একাত্তরে যে বিতাড়িত হয়েছে, তারপর থেকে অনুপস্থিত।

বিএনপির নির্বাচনী ন্যারেটিভ দিল্লি আর পিন্ডিকে সমার্থক দেখানোর যে চেষ্টা, তা আসলে ভারতের সহযোগিতায় এ দেশে ফ্যাসিবাদ গেঁড়ে বসার দায় থেকে দিল্লিকে অব্যাহতি দেয়ার নামান্তর। এটি রাজনৈতিক সততার পরিচয় বহন করে না। দিল্লি এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা অবদমিত করতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি শেখ হাসিনাকে একতরফা নির্বাচন করতে মদদ জোগায়। তা না হলে কিভাবে দিল্লি নিজের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে ঢাকায় পাঠিয়ে অবাধ নির্বাচন বানচালে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করেন? একইভাবে ২০১৮ সালে দিনের ভোট আগের রাতে সেরে ফেলতে সহায়তা করেছে ভারত। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচন আমি-ডামি মডেলে সম্পন্ন করতে সার্বিক সহায়তা করে? এ তো গেল নির্বাচনী দিক। অন্য দিকে নিষ্ঠুরভাবে যাকে ভারতবিরোধী মনে করা হয়েছে; তাকে গুম-খুনের মাধ্যমে দুনিয়া থেকে বিদায় করতে কোনো কসুর করেনি দিল্লি। যেমন আমরা দেখতে পাই গুপ্তচর দিয়ে ভারত কানাডাপ্রবাসী নিজের দেশের এক শিখ নেতাকে হত্যা করেছে। আমেরিকাতে আরেক শিখ নেতাকে হত্যাচষ্টা করে বৈশ্বিকপর্যায়ে ফেঁসে গেছে দিল্লি।

এতে ভারত বৈশ্বিকভাবে একটি অবিশ্বস্ত দেশের পরিচিতি পেয়েছে, যা যেকোনো দেশের জন্য অসম্মানের, অমর্যাদার। ভারতের মতো এমন রেকর্ড পাকিস্তানের আছে বলে আমাদের জানা নেই। সেই সাথে আমাদের দেশে পাকিস্তান একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশ বিষয়ে নাক গলিয়েছে এমন নজির নেই; বরং বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। এর হালনাগাদ উদাহরণ— আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বোর্ডের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অন্যায় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নেয় ইসলামাবাদ। আর ভারত উল্টো সাম্প্রদায়িকতা উসকে দিতে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগে (আইপিএল) খেলা থেকে বাংলাদেশের পেস বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে বিরত রাখতে গায়ের জোর খাটিয়েছে। এখানে কারণ দেখানো হয়েছে, বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে মুস্তাফিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা যেখানে দিতে ভারত অপারগ, সেখানে বাংলাদেশ দলকে কিভাবে ভারত নিরাপত্তা দেবে। এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। স্বাভাবিকভাবে ভারতে খেলতে নিরাপত্তাহীনতায় বাংলাদেশ বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলতে যেতে অসম্মতি জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের আচরণ জানি দুশমনসম। আর পাকিস্তানের অবস্থান বন্ধুত্বের নিদর্শন।

দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ— বিএনপির এমন নির্বাচনী ন্যারেটিভ, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী জামানার টোনকেই যেন অনেকটা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করছে ভিন্ন ফরমেটে। পিন্ডি কোনোভাবে এখন আর আমাদের শত্রুর কাতারে নেই। বিএনপির মতো দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী একটি দলের জন্য এমন তুলনা কোনোভাবে মানায় না। এতে করে দেশের ভোটাররা হতাশ হতে পারেন। আর ভোটাররা সত্যি যদি এমন মনোভাব পোষণ করেন, তা হলে আগামী নির্বাচনে দলটি কাঙ্ক্ষিত ফল না-ও পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থানই বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্য বজার রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর দাওয়াই। এর বিকল্প আমাদের সামনে নেই। থাকলে আমাদের পূর্বপুরুষরা সাতচল্লিশে দিল্লির অধীনতা কবুল করতেন।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]