স্বজাতির ইতিহাস ভুলে যাওয়া বহু জাতির পতন কেউ রুখতে পারেনি। ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাপঞ্জি নয়; একটি জাতির আত্মা, তার পথচলার মানচিত্র, পথে তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকনির্দেশ। যে জাতি নিজের ইতিহাস মনে রাখে, সে তার ভুল থেকে শিক্ষা নেয়। সংগ্রামের শক্তি ধারণ করে এবং নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। নতুন দিগন্ত আবিষ্কারের নকশা প্রণয়নের প্রেরণা পায়। কিন্তু যে জাতি ইতিহাস ভুলে যায়, সে নিজের চোখ বেঁধে অন্ধকারে পথ চলতে থাকে। সেই পথের শেষ কোথায়, সেটি সে জানে না। এ কারণেই ইতিহাস ভুলে যাওয়া বহু জাতির পতন হয়েছে নীরবে, ধীরে ধীরে, কখনো বা হঠাৎ করেই।
এই প্রসঙ্গটি এত বিশাল, চাইলে বিশ্বের হাজারো জাতির পরিণতি এই আলোচনায় টেনে আনা যায়। সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, সভ্যতার বিকাশ ও বিলুপ্তি, এসব নিয়ে এক বিশাল মহাকাব্য রচনা সম্ভব। কিন্তু সে পথে গেলে আলোচনা শেষ হবে না। তাই আমরা সেই বিস্তৃত মহাসমুদ্রের মধ্যে ডুব না দিয়ে বরং আমাদের নিজের ভূখণ্ডের ইতিহাসের দিকে তাকাই। কারণ ইতিহাস ভুলে যাওয়ার যে ইতিহাস, তার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি আমাদের নিজেদের বিধিলিপিতেই স্থান করে আছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা যেন ইতিহাস ভুলে যেতে ভালোবাসী। আমাদের সংগ্রাম, আমাদের ত্যাগ, আমাদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া অর্জনের গভীর অর্থ আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। অথচ এই ভুলে যাওয়ার চরম মূল্য কোনো না কোনো সময় দিতেই হয়। সেই মূল্যটা দিতে হয় খুব বেশি, সে কারণে আমাদের পতন বিপর্যয় রোখা সম্ভব হয় না। কখনো মনে হয়, যেন আমরা এখনো ইতিহাসের চত্বরে পুরোপুরি ঢুকতে পারিনি। আমরা যেন ইতিহাসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি; কিন্তু ভেতরে ঢোকার সাহস বা প্রস্তুতি আমাদের হয়নি।
এই ভূখণ্ডের ইতিহাস কম জটিল নয়। অনেক মনীষী মনে করেন, আমাদের এই ভূমি যেন ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাসের ফল। ঔপনিবেশিক শক্তি যখন এই অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারণ করছিল, তখন তাদের সিদ্ধান্ত ছিল অনেকটা ‘পোকায় খাওয়া এক খণ্ড জমি’ দান করে দেয়ার মতো। সেই ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার আজও আমাদের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতির বহু স্তরে বিন্যস্ত হয়ে আছে। এই শিকল ভাঙতে না পারলে, আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি ও নৈতিকতার এসব বদ্ধ দুয়ার খোলা সম্ভব হবে না। তা সে যতই মূল্যবান বুলি উচ্চারণ করা হোক না কেন। সবটাই অর্থহীন প্রলাপে পর্যবসিত হবে।
ঔপনিবেশিক শক্তির প্রস্থান কোনো জাতির মুক্তি এনে দেয়– এই ধারণা সবসময় সত্য হয় না। অনেকসময় তারা চলে যাওয়ার আগে এমন সব বিভাজনের বীজ বপন করে যায়, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হয়ে ওঠে দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটের কারণ। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সেই বাস্তবতার একটি তীব্র উদাহরণ আমরা দেখছি। যে নীতি ও চেতনার ভিত্তিতে এই অঞ্চলকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল, তারই একটা অংশ আবার ভেঙে জন্ম নিয়েছে আরেকটা স্বাধীন রাষ্ট্র–বাংলাদেশ। অর্থাৎ ভাগের ভেতর ভাগ, বিভাজনের ভেতর নতুন বিভাজন– এই চক্র আমাদের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে।
কিন্তু বিভাজনের এই দীর্ঘ ইতিহাসের পরও আমরা কি আমাদের ভাগ্যকে মলিন থেকে মসৃণ করতে পেরেছি? প্রশ্নটা সহজ নয়। স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল– নিজস্ব মর্যাদা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক বিকাশের স্বপ্ন। সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেলেও আবার পিছিয়ে গেছি। তাতে আমাদের সম্বিত ফিরেছে কি?
এই জল-জলাঙ্গির ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে আছে। নদীভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়– প্রকৃতির কঠোর পরীক্ষার সাথে তাদের পরিচয় নতুন নয়। কিন্তু প্রকৃতির পরীক্ষার চেয়েও কঠিন ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাস। এই ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা অর্জনের জন্য কত ত্যাগতিতিক্ষা সহ্য করেছে, তার হিসাব করা সহজ নয়। সাধারণের সেটি উপলব্ধি হলেও, রাজনীতির কোটাদের কখনো কি হয়েছে।
অগণিত মানুষ অন্ধকার রজনী পার করেছে নতুন ভোরের অপেক্ষায়। কত মায়ের চোখে ঝরেছে অশ্রু, কত তরুণের স্বপ্ন থেমে গেছে পথেই। তবু মানুষের আশা মরে যায়নি। তারা অপেক্ষা করেছে দিগন্তে সম্ভাবনার নতুন সূর্য ওঠার।
এই ভূখণ্ডের দীর্ঘ বঞ্চনা সহ্য করে যে নতুন স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেই স্বপ্নের ভিত ছিল খুবই শক্ত। মানুষ বিশ্বাস করেছিল, একদিন এই দেশ হবে ন্যায় ও সমতা ও ইনসাফের দেশ। যেখানে মানুষের মর্যাদা থাকবে, যেখানে শোষণ ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে। কিন্তু সময়ের স্রোত অনেক দূর বয়ে গেছে, সেই স্বপ্ন, সেই আশা এখনো অপূর্ণ থেকে গেছে।
পেরিয়ে গেছে অর্ধশতকেরও বেশি সময়। ইতিহাসের হিসেবে এটি খুব বেশি না হলেও একটি জাতির জন্য একেবারে কম সময়ও নয়। বহু জাতি এই সময়ের মধ্যে তার অর্থনীতি, শিক্ষা, সমাজ ও রাজনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পেরেছে। কিছু ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই এগিয়েছি; কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে যে মৌলিক স্বস্তি আসার কথা ছিল, তা এখনো বহুলাংশে অধরা।
বাংলার একটি পুরনো প্রবাদ আছে, ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’, এই প্রবাদের মধ্যে লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের নির্মম বাস্তবতা। মানুষের জীবন এখনো সেই বাস্তবতার বৃত্তে আবদ্ধ। তারা প্রতিদিন বেঁচে থাকার লড়াই করে। কিন্তু তাদের জীবনে নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা এ পর্যন্ত খুব কমই এসেছে। এসব বঞ্চিত মানুষকে বারবার কত আশার বাণী শোনানো হয়েছে। বাস্তবে সব ছিল কল্পনার ফানুস।
এই মানুষগুলো যেন বেঁচে থেকেও অনেকটা মৃতের মতো জীবন কাটায়। তাদের স্বপ্ন ছোট, আশা সীমিত, সংগ্রাম অবিরাম। এই সাধারণ মানুষকেই একদিন নতুন দিনের বাণী শুনিয়েছিলেন রাজনীতিবিদরা। বলেছিলেন, সেই নতুন দিনে সমাজ গড়ে উঠবে, যেখানে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা সেই প্রতিশ্রুতির সাথে মেলে না। এখানে মনে পড়ে ইংরেজ সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েলের সেই বিখ্যাত উক্তি– ‘সবাই সমান, কিন্তু কেউ কেউ একটু বেশি সমান।’ এই বাক্যটি আমাদের সমাজের অনেক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। কারণ সাধারণ মানুষের জীবন যেখানে সংগ্রামে ভরা, সেখানে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষের জীবন অনেকসময় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতায় আবদ্ধ থাকে। তারা সাধারণের চেয়ে একটু বেশি।
যারা সাধারণ মানুষের কাছে সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তাদের অনেকেই আজ ভিন্ন জগতে বাস করে। সাধারণ মানুষ যেখানে সকালের খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা করে, সেখানে ক্ষমতাবানদের জীবন সবসময় প্রাচুর্যে ভরা। এই বৈপরীত্য সমাজের ভেতরে গভীর হতাশা তৈরি করে।
আমাদের ইতিহাসের আরেকটি নির্মম সত্য হলো, এই ভূখণ্ড বারবার শোষণের শিকার হয়েছে। ঔপনিবেশিক শক্তি এই অঞ্চলকে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। এরপর এসেছে আরেক ধরনের রাজনৈতিক শোষণ। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা এই অঞ্চলকে সবসময় সম্পদের উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যা অসত্য নয়। তবে মানুষের মনে এ নিয়ে চিন্তার রেখা। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে অগ্রাধিকার দেয়া হয়নি।
ফলে মানুষের মনে একধরনের দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। তারা মনে করে, তাদের সাথে বারবার প্রতারণা করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, কোনো জাতি যদি নিজেকে পরিবর্তন করতে না পারে, তবে অন্য কেউ এসে তার ভাগ্য বদলে দেবে না। তাই ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। ইতিহাস কেবল স্মরণ করার জন্য নয়, শিক্ষা নেয়ার জন্য। যদি আমরা অতীতের ভুলগুলো বুঝতে পারি, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতের পথে সেই ভুলগুলো এড়িয়ে চলা সম্ভব। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির কিছু ইতিবাচক দিক আশার আলো জাগায়। রাজনীতিতে আমরা দীর্ঘ দিন ধরে সঙ্ঘাত, বিদ্বেষ ও বিভাজনের দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ভিন্ন দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে, যা আমাদের রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
বিরোধীপক্ষের সাথে সরকারি দলের সৌহার্দ্যপূর্ণ যোগাযোগ, নির্বাচনের পর পরস্পরের সাথে দেখা করা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িতে গিয়ে শুভেচ্ছা জানানো– এসব দৃশ্য আমাদের রাজনীতিতে খুব একটা দেখা যায়নি আগে। বিরোধী দলের ইফতারে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি কিংবা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক নেতাদের আলিঙ্গন– এসব আচরণ সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির লক্ষণ হতে পারে। রাজনীতির এমন গুণগত পরিবর্তন শুধু ইতিহাসের চাকা নয়, জাতির চাকাও অগ্রসরমান হতে পারে।
নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক বা প্রশ্ন থাকতেই পারে, গণতান্ত্রিক সমাজে তা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া এবং তার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে শিষ্টাচার ও সৌহার্দ্যরে পরিবেশ তৈরি হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক।
রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য তো কেবল মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। যদি রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রেখেও পারস্পরিক সম্মান ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে, তাহলে তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে। কারণ রাজনীতির সঙ্ঘাত যখন সীমা অতিক্রম করে, তখন সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ।
আজকের পৃথিবীতে উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন সহযোগিতা, সমন্বয় ও সুস্থ প্রতিযোগিতা। রাজনৈতিক দলগুলো যদি কেবল ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, তাহলে জাতির স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। তাই রাজনীতিতে এই নতুন ধরনের কুশলবিনিময় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণকে আমরা একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখতে চাই। যদি এই সংস্কৃতি টিকে থাকে, তাহলে তা ভবিষ্যতের রাজনীতির বিন্যাস আরো মানবিক ও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।
আবার সেই প্রশ্নে ফিরে আসি, এই জাতির সামনে কি সত্যিই একটি নতুন সূর্যোদয় অপেক্ষা করছে? ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, কোনো জাতির ভাগ্য চিরকাল অন্ধকারে থাকে না। যদি সেই জাতি নিজের ইতিহাসকে মনে রাখে, নিজের ভুলগুলোকে স্বীকার করে এবং ভবিষ্যতের জন্য সঠিক পথ বেছে নেয়– তাহলে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
আমরা চাই না আমাদের সমাজে পক্ষ-বিপক্ষের নামে দ্বন্দ্ব চিরস্থায়ী শত্রুতায় রূপ নিক। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো মতভেদ সত্ত্বেও পারস্পরিক সহাবস্থান। তাই আমরা পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে প্রতিপক্ষ দেখতে চাই না; বরং দেখতে চাই সহযাত্রী– যারা ভিন্ন পথ থেকে হলেও একই লক্ষ্য, অর্থাৎ দেশের কল্যাণের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।
ইতিহাস বিস্মৃত জাতির পরিণতি সাধারণত সুখকর নয়; কিন্তু ইতিহাস স্মরণকারী জাতির সামনে সবসময় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খোলা থাকে। যদি আমরা সত্যিই আমাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারি, তাহলে হয়তো একদিন এই ভূখণ্ডের মানুষ সত্যিকার অর্থে সেই প্রতীক্ষিত সূর্যোদয় দেখতে পাবে।
লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
[email protected]


