গাজার পুনর্গঠন ও অন্তর্বর্তীকালীন শাসন তদারকি করার উদ্দেশ্যে বহুল আলোচিত বোর্ড অব পিস গঠন করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ২০২৫ সেপ্টেম্বরে এ বোর্ড গঠনের প্রস্তাব করা হয় এবং ২২ জানুয়ারি ২০২৬-এ দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে স্বাক্ষরিত হয়। নবগঠিত বোর্ড অব পিসের সভাপতি ট্রাম্প নিজেই। তিনি কয়েক ডজন দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৫টি দেশ যোগ দিয়েছে।
আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান— এই তিনটি দেশকে প্রথম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যান্য দেশের মধ্যে তুরস্ক, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্দান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। হাঙ্গেরি, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত- দাভোস ২০২৬-এ স্বাক্ষর করেছে। যেসব দেশ দাভোসে এই বোর্ডে যোগ দেয়নি তার মধ্যে আছে কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি। রাশিয়াকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও দেশটি কোনো প্রতিনিধিও পাঠায়নি।
বোর্ডের ম্যান্ডেট বছরের পর বছর যুদ্ধের পরে গাজার পুনর্গঠন, অন্তর্বর্তীকালীন শাসন এবং নিরাপত্তা তদারকির কথা উঠে এলেও কিছু সমালোচক যুক্তি দেন, এটি জাতিসঙ্ঘের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ট্রাম্পের নেতৃত্বে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার কৌশল। কিছু পশ্চিমা মিত্র যেমন— যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, কানাডা সমর্থন বন্ধ করে এর বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দেশের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে টনি ব্লেয়ারকে গাজার যুদ্ধোত্তর শাসনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের জন্য নিযুক্ত করা হয়। জ্যারেড কুশনার ট্রাম্পের জামাতা, মার্কো রুবিও, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের ব্যবসায়িক অংশীদারের মতো ব্যক্তিরা রয়েছেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ট্রাম্পের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। তুরস্ককে এই বোর্ডে রাখায় নেতানিয়াহু নাখোশ। ইলন মাস্কের মতো ব্যবাসায়ীর পরিবর্তে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ স্টিভ উইটকফকে নেয়া এবং ব্যাপক সমালোচিত-নিন্দিত টনি ব্লেয়ারের মতো ব্যক্তিকে নেয়ায় বিশ্বে ব্যাপক হইচই পড়েছে।
প্রথমেই যা জানা গেল
বোর্ড অব পিসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ডে ব্লেয়ার ছাড়াও থাকছেন মার্কো রুবিও, জ্যারেড কুশনার, স্টিভ উইটকফ, অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের সিইও মার্ক রোয়ান এবং অন্যরা, যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাতের মন্ত্রী রিম আল-হাশিমি, জাতিসঙ্ঘের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত নিকোলাই ম্লাদেনোভ। এরা গাজায় সঙ্ঘাত অবসানে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার কৌশলগত তদারকির ব্যবস্থা করবে, গাজার ডি-র্যাডিক্যালাইজেশন, ডিমিলিটারাইজেশন, পুনর্গঠন এবং অস্থায়ী প্রশাসনিক কাজের ওপর জোর দেবে।
টনি ব্লেয়ার ২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, উইটকফ এবং কুশনারের সাথে কাজ করেছেন। তবে বোর্ডে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি রাখা হয়নি। তাই ইতোমধ্যেই এটি সমালোচিত হয়েছে। ট্রাম্পের অফিস থেকে বলা হয়েছে— এটি ঐতিহ্যবাহী ‘শান্তি কমিটি’ নয়; বরং একটি মার্কিনকেন্দ্রিক তদারকি সংস্থা। ব্লেয়ারের কারণে এটিকে অনেকে ‘অন্ধকার কৌতুক’ বলেছেন। ইতোমধ্যে ফাঁস হওয়া খসড়াগুলো বোর্ডের ইসরাইলপন্থী ঝোঁক তুলে ধরেছে।
দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ
মধ্যপ্রাচ্যে দূত হিসেবে ব্লেয়ার দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের লক্ষ্যে এই অঞ্চলে ঘন ঘন সফর করেন। তিনি ইসরাইলের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন, নিরপেক্ষতা খর্ব করেছিলেন। যেমন— ২০১৩ সালে একজন প্রাক্তন ইসরাইলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেন, ২০১১ সালে জাতিসঙ্ঘে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে বিরোধিতা করেন এবং ইসরাইলের ২০০৮-০৯ গাজা হামলার সময় পুরোপুরি নীরব ছিলেন। সে হামলায় এক হাজার চার শতাধিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়। তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও আছে।
২০১০ সালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে ব্লেয়ার ওয়াতানিয়াকে নামের একটি ফিলিস্তিনি টেলিকম ফার্মকে মোবাইল ফ্রিকোয়েন্সি দেয়ার জন্য ইসরাইলি নেতাদের চাপ দিয়েছিলেন, যা সমালোচকরা তার বেতনভোগীদের অনুকূলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব বলে অভিহিত করেন। টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল চেঞ্জ এবং তার ব্যক্তিগত বিভিন্ন উদ্যোগ ইসরাইলপন্থী উৎস থেকে তহবিল পেয়েছে। এভাবে পশ্চিম তীরের বন্দোবস্তের সময় ব্লেয়ারের ফাউন্ডেশন ১০ লাখ ডলার অনুদান পায়। ২০০৯ সালে, তিনি গাজা যুদ্ধের পরপরই পুরস্কার হিসেবে তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১০ লাখ ডলার পান। নিরপেক্ষ সমালোচকরা ব্লেয়ারের কর্মকাণ্ডকে উপরে বর্ণিত ২০ লাখ ডলার প্রাপ্তির ফসল বলে বর্ণনা করেন। এগুলো সরাসরি ঘুষ না হলেও অযৌক্তিক প্রভাব এবং দুর্নীতি বলে স্বীকৃত।
গণবিধ্বংসী অস্ত্র, ইরাক যুদ্ধ ও চিলকোট তদন্ত
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯৭-২০০৭, ব্লেয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সাথে জোট বাঁধেন। সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ছিল বলে মিথ্যা দাবির ওপর ভিত্তি করে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণে ন্যায্যতা দেন। ২০১৬ সালে চিলকোট তদন্তে ব্লেয়ারকে যুক্তরাজ্যের ১৭৯ সেনার মৃত্যু এবং ইরাকিদের মৃত্যুর জন্য অভিযুক্ত করা হয়। বিরোধী শিবির ব্লেয়ারকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যায়িত করে। কিন্তু তিনি কোনো অনুশোচনা করেননি।
যুক্তরাজ্য ও টনি ব্লেয়ার
ব্লেয়ার ২০২৫ সাল থেকে গাজার আন্তর্জাতিক তদারকির পক্ষে সমর্থন করেছেন, হামাস ছাড়াই পুনর্গঠনের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ‘গাজার প্রশাসনের জন্য জাতীয় কমিটির ধারণা, ট্রাম্পের পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার জন্য কেউ কেউ ব্লেয়ারকে শ্রদ্ধা করেন। ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের জন্যও তাকে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু ইরাকে হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে পক্ষপাত, ঘুষ নেয়া তার সম্মান ধুলায় লুটিয়েছে। এসব কারণে বোর্ড অব পিসে ব্লেয়ারের নিয়োগ অত্যন্ত বিতর্কিত এক রাজনৈতিক পদক্ষেপ। এই নিয়োগ ইঙ্গিত দেয় যে, বোর্ড অব পিস নিরপেক্ষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরিবর্তে লেনদেনমূলক, রাজনৈতিকভাবে অভিযুক্ত এক উদ্যোগ।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার



