সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ২৬ মার্চ এনসিপির দলীয় সভায় বলেন, ‘ডিপ স্টেট’ (গভীর ক্ষমতাবলয়) থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিছু শর্ত দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে উল্লিখিত সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। এর আগে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বক্তব্যেও এসেছে ‘ডিপ স্টেট’ প্রসঙ্গ। ১০ মার্চ রাজশাহীতে এক সভায় তিনি বলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদি হত্যায় ডিপ স্টেট জড়িত’। উল্লিখিত দু’জনের বক্তব্যে ডিপ স্টেট প্রসঙ্গ আসায় নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। মানুষের মধ্যে তুমুল কৌতূহল জাগিয়েছে।
ডিপ স্টেট বা গভীর ক্ষমতাবলয় আজকের লেখার বিষয় হলেও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পক্ষে বিষয়টি জনপরিসরে আনা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত বা বিবেচনাপ্রসূত হয়েছে, তা নিয়ে দুুু-চার কথা বলা দরকার মনে করছি। কারণ, উপযুক্ত সময় ছাড়া সত্য বলায় কোনো মহত্ব নেই। মন যা চায় তা-ই বলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। যে কথা প্রকাশ করলে শিষ্টাচারের খেলাপ হয়, তেমন সত্য প্রকাশ্যে আনা পরিপক্বতার অভাব প্রকাশ করে। আসিফ মাহমুদ রাজনীতিতে নবাগত। রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতা বা পরিপক্বতার অভাবে ‘তিতা সত্য’ বলে চারদিকে হইচই ফেলে দিয়েছেন। এর আগেও অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা নীলা মার্কেটে হাঁসের গোশত খেতে যান বলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে এমন কোনো কাজ করা, কথা বলা বা জায়গায় যাওয়া উচিত নয়, যাতে ওই পদের মর্যাদা ম্লান হয়।
এবার আসি মূল আলোচনায়। ডিপ স্টেট বলতে কী বোঝায়! সাধারণত সরকারের বাইরে থেকেও রাষ্ট্রের নীতি ও রাষ্ট্র ক্ষমতায় প্রভাব খাটাতে সক্ষম প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে বোঝাতে ‘ডিপ স্টেট’ ধারণা ব্যবহৃত হয়। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো নয়, রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যবহৃত একটি ধারণা। এটি এমন এক ধারণা, যা দিয়ে বুঝানো হয়, কোনো দেশের নির্বাচিত সরকার বা প্রকাশ্য ক্ষমতার বাইরে থাকা একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী অতি গোপনে রাষ্ট্রের নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে।
গোপনীয়তা বজায় রাখা আর নীরবে নিভৃতে কিছু করার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে। নীরবে নিভৃতে কাজ করার মানে প্রচারবিমুখতা। তাতে যেকোনো কাজের সৌন্দর্য আরো প্রস্ফুটিত হয়। অন্যদিকে গোপনীয়তা রক্ষার অর্থ প্রায় ক্ষেত্রে হয়ে থাকে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন।

রাষ্ট্রের গভীর ক্ষমতা বলয়ের পরিধি সাধারণত হয়ে থাকে— কিছু সামরিক-বেসামকি উচ্চপদস্থ আমলা, প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, গুটিকয় মিডিয়া মালিক ও কিছু সাংবাদিক, সুশীল সমাজের একাংশ। এরা নিজেদের স্বার্থে বা নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণে পর্দার আড়ালে কাজ করেন। এক্ষেত্রে সম্মতি উৎপাদনে মিডিয়ার মালিকানা কাঠামো, ব্যবসায়িক স্বার্থ বা রাজনৈতিক সম্পর্ক সংবাদ পরিবেশনে প্রভাব ফেলে। তাই দেখা যায়, যেকোনো দেশে মিডিয়া, সরকার, ব্যবসায় ও অন্যান্য শক্তির মধ্যে জটিল সম্পর্ক থাকে। উল্লিখিত গোষ্ঠীটি নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রভাব বিস্তার করে। মূলত এই নেটওয়ার্ককে বোঝাতে ডিপ স্টেট শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
‘ডিপ স্টেট’ ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু দৃশ্যমান রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পর্দার অন্তরালে আরো কিছু স্তর, প্রভাব ও স্বার্থ কাজ করে। ডিপ স্টেট ধারণাটি জটিল ও বিতর্কিত। এটি এমন ব্যবস্থা, যে রাষ্ট্রে সক্রিয় থাকে, সহজে বোধগম্য, ওই দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দুর্বল। অন্য দিকে অনেক সময় ব্যাখ্যাতীত ঘটনা সহজভাবে বোঝানোর একটি মাধ্যমও হয়ে ওঠে ডিপ স্টেট।
সাধারণত রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে এক ধরনের অদৃশ্য ক্ষমতাধর কিছু পক্ষ থাকে, যাদের রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেন্দ্রের সাথে গভীর সংযোগ থাকে। ডিপ স্টেট সাধারণত রাষ্ট্রক্ষমতা বা সরকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। কখনো এতটা ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে, ডিপ স্টেট ঠিক করে দেয় কারা ক্ষমতায় আসবেন, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন বা কাকে কোথায় বসাতে হবে। এমনকি অনেক দেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটাতে ভূমিকা রাখে। সমকালীন বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ডিপ স্টেট যেমন জোরালোভাবে কাজ করে, তেমনি বিভিন্ন দেশেও এর তৎপরতা আছে।
কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার ওপর ভিত্তি করে ডিপ স্টেট গঠিত হয় না; বরং নানা মহলের সমন্বিত নেটওয়ার্ক বা ক্ষমতার মঞ্চ এটি। নাগরিকদের কাছে এদের জবাবদিহি করতে হয় না। যারাই নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করুন, ডিপ স্টেট নিজস্ব দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বা স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। এরা প্রভাব বিস্তার করতে বা শাসকদের বাধ্য করতে সরকারের ভেতরে তথ্য ফাঁস, অসহযোগিতা করা বা বিশেষ কাউকে ক্ষমতায় বসানোর মাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
নানা দেশে ডিপ স্টেটের ব্যাখ্যা ও ব্যবহার ভিন্ন ভিন্ন। নির্বাচিত সরকার বদলালেও কিছু স্থায়ী শক্তি (যেমন— নিরাপত্তা সংস্থা বা আমলাতন্ত্র) একইভাবে প্রভাব বিস্তার করে। কৌতূহলোদ্দীপক হলো— ‘ডিপ স্টেট’ ধারণাটি বিতর্কিত। এই ধারণার ব্যবহার মূলত এসেছে তুরস্ক থেকে। তুর্কি ভাষায় একে বলা হয়— ‘দেরিন দেভলেত’ (অর্থ— গভীর রাষ্ট্র)। ২০ শতকের মাঝামাঝি থেকে শব্দটি ব্যবহার হতে থাকে। তুরস্কে রাষ্ট্রের সেক্যুলার চরিত্র ঠিক রাখতে ডিপ স্টেট কাজ করত। উৎপত্তি তুরস্কে হলেও এই ধারণা দেশে দেশে বিরাজিত। বর্তমানে এটি রাজনৈতিক বিতর্ক বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ডিপ স্টেট বুঝতে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে সাধারণত কিছু সম্ভাব্য প্রভাবের ধরন নিয়ে আলোচনা করা হয় :
আমলাতন্ত্র : সরকার বদলালেও থেকে যায় আমলাতন্ত্র। এটি নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে। কখনো আমলাতন্ত্রের অভিজ্ঞতা বা অবস্থান সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
গোয়েন্দা কাঠামো : সাধারণত গোপনীয় নীতিনির্ধারণ, নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত বা সঙ্কটকালে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা বেশি থাকে। এ প্রভাব কখনো পর্দার আড়ালের ক্ষমতা হিসেবে দেখা হয়।
ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠী : বড় ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী নীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনীতি, মিডিয়া বা রাজনীতির সাথে তাদের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গণমাধ্যম : কিছু ক্ষেত্রে গণমাধ্যম মালিকানা, বিজ্ঞাপন বা রাজনৈতিক সম্পর্কে জনমত গঠনে নির্দিষ্ট দিক প্রভাবিত হতে পারে।
বিচার ও আইনি কাঠামো : বিচারব্যবস্থা স্বাধীন হলেও, অনেক দেশে এর ওপর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থাকে। সংবেদনশীল মামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
উপরি উল্লিখিত এসব বিষয়কে কেউ কেউ ডিপ স্টেট হিসেবে আখ্যা দেন। বাংলাদেশে ডিপ স্টেট হিসেবে সরাসরি প্রমাণিত কোনো গোপন কাঠামো আছে, এমন বলার অবকাশ নেই। তবে রাষ্ট্রের ভেতরে বিভিন্ন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীর প্রভাবশালী ভূমিকা থাকতে পারে, যাকে এ ধারণার সাথে বিশ্লেষকরা মিলিয়ে ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট হন।
‘ডিপ স্টেট’ এখন বিশ্ব রাজনীতিতে একটি পরিচিত ধারণা। এটি দৃশ্যমান সরকার নয়; বরং পর্দার আড়ালে শক্তিশালী সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা। এটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এমন এক অনানুষ্ঠানিক, স্থায়ী ও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, যা নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিজেদের মতো করে কাজ করে। কখনো এতে দেশী-বিদেশী নানা গোষ্ঠী মদদ দেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন বা অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তের পেছনে অনেক সময় গভীর ক্ষমতাবলয়কে দায়ী করা হয়। বিশেষ করে যখন কোনো সিদ্ধান্তের স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, তখন ধারণাটি আরো বেশি সামনে চলে আসে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে একটি অদৃশ্য শক্তিবলয় সব সময় চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে যার জ্বলন্ত উদাহরণ ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি, যা ওয়ান-ইলেভেন নামে পরিচিত। তৎকালীন সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার ছিল বাংলাদেশের ডিপ স্টেটের একটি ধ্রুপদি রূপ। ওই সরকার বিরাজনীতিকরণের যে অপচেষ্টা করেছিল, তা ছিল মূলত গভীর ক্ষমতাবলয়ের একটি সুদূরপ্রসারী প্রকল্প।
রাজনৈতিক সঙ্কটকালে ডিপ স্টেট সক্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। মানে রাষ্ট্রযন্ত্রের তিনটি অঙ্গ— নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা (জাতীয় সংসদ) ও বিচার বিভাগ যখন ঠিকমতো দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে পারে না; তখনই ডিপ স্টেট নামের ‘কালো বিড়াল’ সক্রিয় হতে পারে। তবে রাষ্ট্রে উল্লিøখিত তিন বিভাগ ঠিকঠাক কাজ করলে গভীর ক্ষমতাবলয় ফাংশনাল হতে পারে না।
গভীর ক্ষমতাবলয় নিয়ন্ত্রণে প্রধানত জবাবদিহির কোনো বিকল্প নেই। আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা সংস্থাকে সংবিধানের আলোকে আইনি কাঠামোয় এনে কর্মপরিধি নির্ধারণ করা। আইনসভা অর্থাৎ সংসদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিতের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বি-রাজনীতিকরণ কিংবা অপরাজনীতি রুখতে পারলে গভীর ক্ষমতাবলয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। যদি নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা পায়, রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকে; তাহলে অসাংবিধানিক কোনো শক্তি জনগণের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ বা সরকার নিয়ন্ত্রণের দুঃসাহস দেখায় না। এ জন্য আমলাতান্ত্রিক সংস্কার আবশ্যক। প্রশাসনকে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করে পেশাদার ও নিরপেক্ষ হিসেবে গড়তে পারলে গভীর ক্ষমতাবলয় কাজ করতে পারে না।
প্রকৃত বাস্তবতায় ডিপ স্টেট গণতন্ত্রের ‘অদেখা শত্রু’। এটি যখন শক্তিশালী হয়, তখন জনগণের সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ওয়ান-ইলেভেনের শিক্ষা এবং বর্তমান সময়ে সংস্কারের জন-অভীপ্রায়, উভয় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি টেকসই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য ডিপ স্টেট অকার্যকর করা অবশ্যই রাজনৈতিক কর্তব্য হওয়া উচিত। দেশের নীতি-নির্ধারণ ও পরিচালনার যাবতীয় কাজ গণতান্ত্রিক রীতি এবং সুশাসনের লক্ষ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধির অধীনে পরিচালিত হলে ক্ষমতার গভীর প্রভাব বলয় রুখা অসম্ভব নয়।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



