ড. এ কে এম আজহারুল ইসলাম
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর উচ্চশিক্ষা হলো সেই মেরুদণ্ডের শক্তি ও স্থায়িত্বের প্রধান ভিত্তি। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে নানা সঙ্কটে জর্জরিত। রাজনৈতিক দলীয়করণ, অযোগ্য নিয়োগ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও বাজেট ঘাটতি শিক্ষাঙ্গনের সুস্থ পরিবেশ নষ্ট করেছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা হলো— উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য একটি মুক্ত, সৃজনশীল ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিক্ষার মান : বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান বিতরণ ও সৃজনের কেন্দ্র হলেও শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি বহু মেধাবীকে বঞ্চিত করেছে। এর ফলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গবেষণার ক্ষেত্র হয়েছে অনুর্বর, আর জাতি পিছিয়ে পড়েছে জ্ঞানের প্রতিযোগিতায়।
সব অনিয়মের মধ্যেও অনেক শিক্ষক আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করছেন; কিন্তু তা যথাযথভাবে দৃশ্যমান হয় না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্বৈরাচারের আমলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এতে শুধু শিক্ষার পরিবেশ কলুষিত হয়েছে তাই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর সাফল্যের গল্প যেমন প্রচারিত হয়েছে, বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হয়েছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান না পাওয়াই প্রমাণ করে, গুণগত মানে আমাদের দুর্বলতা রয়ে গেছে।
অতএব, নতুন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা, গবেষণায় পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দেয়া এবং শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা। কেবল এভাবেই উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা নজিরবিহীনভাবে একাডেমিক পরিবেশের অবনতির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন যথার্থই মন্তব্য করেছিলেন, দলীয় রাজনীতির কারণে শিক্ষক নিয়োগে মেধার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পেয়েছে, ফলে কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক মান অর্জন ব্যাহত হয়েছে।
শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ বলতে বোঝায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্তরিক সম্পর্ক, সুষ্ঠু পাঠ্যক্রম, নিয়মিত পরীক্ষা ও গবেষণার সুযোগ। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও দুর্নীতি শিক্ষার মেরুদণ্ডকে প্রায় অকেজো করে তুলেছে। এর ফলে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার মান ক্রমেই নিম্নগামী।
অতএব, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এখন জরুরি জাতীয় অগ্রাধিকার। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, শিক্ষাক্রমে জাতীয় আদর্শ ও সমকালীন চাহিদার প্রতিফলন এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় সঙ্কীর্ণতা পরিহার করে সর্বজনগ্রাহ্য শিক্ষানীতি প্রণয়নই পারে আমাদের শিক্ষা ও গবেষণাকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে।
শিক্ষক ও শিক্ষাঙ্গনের সঙ্কট : সুশিক্ষা জাতিকে শক্তিশালী করে। অথচ আজ শিক্ষার মান নাজুক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষার হার বৃদ্ধির বড়াই করা হলেও নৈতিক শিক্ষার অভাবে সমাজে অনৈতিকতার ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বইবিমুখ হচ্ছে, আর শিক্ষার পরিবেশ ক্রমেই কলুষিত হচ্ছে।
একজন শিক্ষকের হওয়া উচিত জ্ঞানতাপস, ব্যক্তিত্ববান, সুবিচারক ও আন্তরিক গবেষক। তারা হবেন সত্যনিষ্ঠ, অকুতোভয়, শ্রমনিষ্ঠ এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিক্ষকই যোগ্যতা ও গাম্ভীর্যের অভাবে শিক্ষার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছেন।
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত করছে। আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা প্রমাণ করে, ছাত্ররাজনীতি যখন সন্ত্রাসে রূপ নেয় তখন তা কেবল শিক্ষার পরিবেশ নয়, জাতির ভবিষ্যৎকেও ধ্বংস করে। সন্ত্রাসের কারণে সেশনজট, অভিভাবকদের আর্থিক কষ্ট এবং শিক্ষার্থীদের হতাশা বেড়েছে।
অতএব, শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাসমুক্ত করা, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের মান-মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে শিক্ষক সমাজকে হতে হবে দৃঢ়, সৎ ও জ্ঞাননিষ্ঠ— এমন শিক্ষকই পারে জাতিকে আলোকিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে।
উপাচার্য নিয়োগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম : ২০২১ সালের ৬ মে মেয়াদের শেষ দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অস্থায়ী ভিত্তিতে ১৪১ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেন। রেজিস্ট্রার স্বাক্ষর না করায় উপ-রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে তা সম্পন্ন হয়। এর ফলে ক্যাম্পাসে সুবিধাভোগী ও বঞ্চিত গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, আর উপাচার্য পুলিশ পাহারায় ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।
স্বৈরাচার আমলে গত দেড় যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ উচ্চপর্যায়ের লবিং ও দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যোগ্য একাডেমিক ব্যক্তিত্বের পরিবর্তে স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতা ও কোটারি স্বার্থই নিয়োগে প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে অনেক উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়; বরং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থের আখড়ায় পরিণত করেন।
আমার দৃষ্টিতে নতুন শিক্ষামন্ত্রী : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয় পাওয়ার পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এতে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। ড. এহছানুল হক মিলন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষায় নকল দমনে অনন্য ভূমিকা রাখেন। নব্বইয়ের দশকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় নকল ছিল মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়া সমস্যা। দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি নিজে কেন্দ্র পরিদর্শন করেন, সাংবাদিকদের সাথে নিয়ে অভিযানে যান, এমনকি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছান। শিক্ষকদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন এবং নকল সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। তার দৃঢ় সংকল্প ও কঠোর পদক্ষেপের ফলে পরীক্ষায় নকল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই সাফল্যের জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তার প্রশংসা করে।
বলা যায়, মিলনের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল— বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষায় নকলবাজি দমনে কার্যকর ভূমিকা রেখে শিক্ষাক্ষেত্রে সততা ও শৃঙ্খলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
আমি তাকে চিনি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামের (IIUC) ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকে। সে সময় তিনি চট্টগ্রামে আমার অফিসে এসেও শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করেন। তার আন্তরিকতা, শিক্ষাবান্ধব মনোভাব ও বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আমার নিশ্চয় ধারণা হয় যে, তিনি কেবল একজন রাজনীতিক নন, একজন প্রকৃত শিক্ষানুরাগী।
এরও আগে, ২০০১ সালে যখন আমার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার ফাইল তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ওমর ফারুক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে পাঠান, তখন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির হস্তক্ষেপে সেটি আটকে যায়। ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর অগোচরে দফতর থেকে সরানো হয়। ড. মিলন সে ঘটনার খবর জানতেন এবং এ নিয়ে তিনি আমার কাছে অনুতাপের সুরে কথা বলেন। সে সময়ে তার কিছু করার সুযোগ ছিল না।
শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষিত কর্মপরিকল্পনা : দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছেন। তার লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আত্মবিশ্বাসের সাথে অংশ নিতে পারে।
ঘোষিত অগ্রাধিকারসমূহের মধ্যে আছে :
আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম প্রবর্তন : চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দক্ষতা অর্জনে গুরুত্ব (ন্যানোটেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি)
শিল্প-শিক্ষা সংযোগ জোরদার করা : কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (VET) প্রসারিত করা।
আমাদের প্রত্যাশা : বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা এগিয়ে নিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ভাইস চ্যান্সেলর। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও যোগ্যতার কারণেই অগ্রসর হয়েছে। আমাদেরও সেই পথ অনুসরণ করতে হবে। যদি ভাইস চ্যান্সেলর একাডেমিকভাবে উচ্চমানসম্পন্ন হন এবং গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হন, তবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে একাডেমিক ঔৎকর্ষের দিকে নিয়ে যেতে পারেন। দলীয় প্রভাবমুক্ত নেতৃত্বে জ্ঞান, উদ্ভাবন ও গবেষণার সংস্কৃতি বিকশিত হয়।
অতএব, সরকারকে ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগে ন্যায্য মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে, যাতে নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৃত জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ড. মিলনের প্রত্যাবর্তন আমাদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আশা করি তিনি পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে শিক্ষাক্ষেত্রে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মান প্রতিষ্ঠা করবেন।
মূল করণীয় : উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য মুক্ত, সৃজনশীল ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা; দলীয়করণ পরিহার; অযোগ্যদের নিয়োগ বন্ধ করা; ছাত্ররাজনীতির সংস্কার; চাঁদাবাজি, দুর্বৃত্তায়ন ও দলখদারি বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত নেতৃত্ব ও গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ দেয়া; বাজেট বৃদ্ধি; বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথ শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমে গুরুত্ব দেয়া।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সঙ্কট
শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি মেধাবীদের বঞ্চিত করছে। গবেষণায় পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ না দিয়ে অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা ও প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত রূপরেখা
যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ; গবেষণার বাজেট বৃদ্ধি; শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন; জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী বৈষম্য দূরীকরণ ও আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা চালু করা;
আন্তর্জাতিক মান অর্জন; ছাত্র-রাজনীতিকে ইতিবাচক ও গঠনমূলক পথে পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
লেখক : প্রাক্তন ভাইস-চ্যান্সেলর, আন্তর্জাতিক
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম



