বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ও ইংরেজি ভাষা

প্রায় তিন শতাব্দী ধরে সুপ্রিম কোর্টের পূর্বসূরিরা ইংরেজিতে তাদের আইনি যুক্তি সাজিয়েছেন, যুক্তি উপস্থাপন করেছেন এবং রায় লিখেছেন। ফলে আদালত যে হঠাৎ করে অন্য কোনো ভাষায় কথা বলার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দেখাবেন না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এ ধরনের কোনো পরিবর্তন জোর করে চাপিয়ে দেয়া হবে ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনার পরিপন্থী; কারণ সেই আন্দোলন ছিল নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে, অনিচ্ছুক কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর জোর করে কোনো ভাষা চাপিয়ে দেয়ার জন্য নয়। তা ছাড়া সুপ্রিম কোর্টে ব্যবহৃত ইংরেজি ভাষাটি দীর্ঘকাল ধরে এ দেশের উপযোগী করে নেয়া হয়েছে এবং তা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস ও সাবলীলতার সাথে ব্যবহৃত হচ্ছে

এহসান এ সিদ্দিক
এহসান এ সিদ্দিক |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলে নির্ভুল নিয়মে এক চেনা দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। কলাম লেখক ও সম্পাদকরা তখন চরম উষ্মার সাথে লক্ষ করেন, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট এখনো বিচারিক কার্যক্রমের বেশির ভাগ ইংরেজিতে পরিচালনা করছেন। প্রকৃতপক্ষে, এটি দেশের একমাত্র শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান যারা আজও এ ধারা বজায় রেখেছেন। যদিও আদালতের প্রশাসনিক আদেশ কিংবা অভ্যন্তরীণ নির্দেশনাবলি বাংলায় জারি করা হয়, তবে রায় দেয়ার ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার আধিপত্য এখনো নিরঙ্কুশ। এ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রতি বছর ভাষা-শহীদদের মাসে (যখন জাতীয়তাবাদী চেতনা তুঙ্গে থাকে) সুপ্রিম কোর্ট সমালোচকদের এক সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। আমাদের এই সর্বোচ্চ আদালতে ইংরেজি কেন এখনো নিজের জায়গা দখল করে আছে এবং একে বাংলায় প্রতিস্থাপন করা কি আসলে ন্যায়বিচার ত্বরান্বিত করবে, নাকি কেবল প্রতীকী সংস্কারের এক মৌসুমি দাবি মেটাবে? বক্ষমান নিবন্ধে এসব প্রশ্ন সামনে রেখে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি।

শুরুতে বলতে হয়, আমাদের আইনিব্যবস্থার মূল ভিত্তিটি হলো ইংরেজি। এটি কোনো সাংস্কৃতিক বিলাসিতার বিষয় নয়; বরং এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা। আমাদের আদালতগুলো প্রতিদিন যেসব আইনি নীতি প্রয়োগ করেন, সেগুলোর একটি বড় অংশ মূলত ‘ইংলিশ কমন ল’ থেকে নেয়া; যার অনেক সহজে অনুবাদযোগ্য নয়। ‘প্রমিসরি এস্টোপেল’ বা ‘লেজিটিমেট এক্সপেক্টেশন’-এর মতো যেসব ধারণা সরাসরি ইংরেজি আইনশাস্ত্র থেকে আত্তীকরণ করা হয়েছে, সেগুলোর যথাযথ কোনো বাংলা প্রতিশব্দ নেই। চুক্তি আইনটি বিধিবদ্ধ হলেও এটি এখনো কয়েক শতাব্দী ধরে পরিশীলিত ‘কমন ল’ যুক্তির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। এর চেয়েও বড় কথা হলো– আমাদের বিচারিক পদ্ধতির মূল কাঠামোটি মূলত তিনটি আইনের ওপর দাঁড়িয়ে, যা আদি অবস্থায় ইংরেজিতে রচিত, দেওয়ানি কার্যবিধি (১৯০৮), ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮) এবং সাক্ষ্য আইন (১৮৭২)। এসব আইন আজও ইংরেজিতে বিদ্যমান, কার্যকর ও ব্যাখ্যা করা হয়। যদিও এগুলোর বাংলা অনুবাদ রয়েছে; কিন্তু আদালতগুলো আজও মূল ইংরেজি পাঠের ওপর চূড়ান্তভাবে নির্ভর করেন।

আইন নিয়ে চলমান বিতর্কে যে বিষয়টি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়, সেটি হলো ইংরেজি আইন শিক্ষা ঘিরে গড়ে ওঠা বিশেষ সুবিধা কাঠামো। উদাহরণস্বরূপ, ইংল্যান্ডের ডিগ্রিধারী ব্যারিস্টারদের বাংলাদেশে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বার কাউন্সিল এক বছরের বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে। এটি কেবল ইংরেজি সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা থেকে করা হয় না; বরং এর পেছনে রয়েছে এক বাস্তব অবস্থার স্বীকৃতি। ইংল্যান্ডে আইন পড়ানো, যুক্তি উপস্থাপন এবং বিচার ভাবনার ধরন আমাদের উচ্চ আদালতে মামলাগুলো যেভাবে শোনা ও নিষ্পত্তি হয়; তার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পাশাপাশি বাংলাদেশের আইনের বিবর্তন বহুলাংশে ভারতীয় আইনশাস্ত্রের দ্বারাও প্রভাবিত। আমাদের আদালত নিয়মিতভাবে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের রায় পর্যালোচনা করেন, বিশ্লেষণ করেন এবং উপযুক্ত মনে হলে সেসব নীতি গ্রহণ করে থাকেন। দুই দেশের উচ্চ আদালতে ইংরেজি ভাষার অভিন্ন ব্যবহার এই তুলনামূলক বিচারিক চর্চাকে কেবল সম্ভবই করেনি; বরং একে সহজ ও ফলপ্রসূ করেছে। দশকের পর দশক ধরে বিকশিত ইংরেজি-নির্ভর এ আইন কাঠামোর ওপর বর্তমান সময়ে জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো আকস্মিক ভাষাগত রূপান্তর আরোপের প্রস্তাব দিচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টে বাংলার বাধ্যতামূলক ব্যবহারের দাবি যারা তুলছেন, তারা সম্ভবত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনাটি ভুল বুঝেছেন। সেই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার এবং নিজের কথা অন্যকে শোনানোর অধিকার নিশ্চিত করা; অন্য কোনো ভাষার পথ রুদ্ধ করা নয়, বিশেষ করে সেই ভাষার ক্ষেত্রে, যার মাধ্যমে কেউ সবচেয়ে নির্ভুলভাবে চিন্তা করতে, যুক্তি দিতে এবং নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন। সর্বোপরি ভাষা হলো প্রকাশের একটি মাধ্যম মাত্র, এটি আনুগত্যের কোনো মাপকাঠি নয়। একজন বিচারক বা আইনজীবী যে ভাষায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন, সেই ভাষা ব্যবহারে বাধা দেয়া সাংস্কৃতিক গৌরবের প্রকাশ নয়; বরং তা চিন্তা ও ভাষা উভয়ের পরিসর সঙ্কুচিত করার নাম।

আমাদের সুপ্রিম কোর্টের যদি কোনো মাতৃভাষা থেকে থাকে, তবে তা নিশ্চিতভাবে ইংরেজি। এ ভাষাতে সুপ্রিম কোর্ট নিজেকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারেন। বাংলাদেশের সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীসংক্রান্ত মামলা কিংবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাবিষয়ক মামলার মতো সব ক’টি যুগান্তকারী রায়ের ভাষাই ছিল ইংরেজি। সুপ্রিম কোর্টের এ উত্তরাধিকারের ইতিহাস যদি আমরা খুঁজি, তবে এর উৎস ১৭২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ‘মেয়রস কোর্ট’ পর্যন্ত প্রসারিত হয়; যা পরবর্তীতে ১৭৭৪ সালে কলকাতার সুপ্রিম কোর্ট এবং ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ-পরবর্তী ডামাডোলের পর ১৮৬২ সালে কলকাতার হাইকোর্টে রূপান্তর লাভ করে। দেশভাগের পর এটিই হয় পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট এবং ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট। এই ইংরেজি-ঔপনিবেশিক ইতিহাসের স্বীকৃতি খোদ আদালতের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা আছে। এ দীর্ঘ পরিক্রমায় শাসনব্যবস্থা বদলেছে, সংবিধান নতুন করে লেখা হয়েছে; কিন্তু বিচারকদের আইনি যুক্তি ও রায় প্রকাশের ভাষাটি সবসময় অপরিবর্তিত থেকে গেছে।

সুপ্রিম কোর্টের সমালোচকরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই এড়িয়ে যান– ভাষার দু’টি স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য রয়েছে। এক দিকে এটি যেমন যোগাযোগের মাধ্যম, অন্য দিকে তেমনি সংস্কৃতির বাহক। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট মূলত প্রথম দিকটি অর্থাৎ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভাষার ব্যবহার নিয়ে ব্যাপৃত থাকেন, সংস্কৃতির বাহক হিসেবে নয়। আদালতের প্রধান দায়িত্ব হলো আইনের সূক্ষ্ম ও নিখুঁত ব্যাখ্যা দেয়া, কোনো প্রকার সাংস্কৃতিক প্রতীকায়ন করা নয়। আদালতকে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে বাধা দিলে তা বাংলাকে উচ্চাসনে বসাবে না; বরং আদালতের স্পষ্টভাবে কথা বলার সক্ষমতাকে কেবল রুদ্ধ করে দেবে।

স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলোতে ভাষাগত জাতীয়তাবাদের তীব্র জোয়ার মোটেও বিস্ময়কর ছিল না। ১৯৭২ সালে নবগঠিত সুপ্রিম কোর্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেয়া এক ভাষণে তৎকালীন প্রথম প্রধান বিচারপতি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বাংলা টাইপরাইটারের অভাবে বিচারিক কার্যক্রম বাংলায় পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আজ অর্ধশতাব্দী পর সেই ব্যবহারিক সমস্যা আর নেই। কম্পিউটারে এখন বাংলা লিপি সহজে লভ্য এবং ওয়ার্ড-প্রসেসিং সফটওয়্যারগুলো দীর্ঘকাল আগে সব ধরনের কারিগরি বাধা দূর করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও বাস্তবতা কিন্তু অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। আজও বেশির ভাগ পিটিশন ইংরেজিতে দাখিল করা হচ্ছে এবং রায়ের বিশাল অংশ এখনো ইংরেজিতে দেয়া হচ্ছে। এর কারণ এ নয় যে, আইনজীবী বা বিচারকদের দেশপ্রেমের অভাব রয়েছে; বরং কারণ হলো– আইনের ভাষা হিসেবে যেটিতে তারা চিন্তা করেন, যুক্তি দেন এবং সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে লিখতে পারেন, সেটি পরিত্যাগ করতে তারা অনিচ্ছুক।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু ইংরেজি ভাষাকে কারো ওপর জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছেন না। চাইলে বাংলাতে পিটিশন বা আরজি খসড়া করা যায়, আইনি সওয়াল-জবাবও বাংলায় করা সম্ভব; কেবল ভাষার কারণে কোনো বিচারপ্রার্থীকে আদালত থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয় না। ভাষাগত এ স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও আদালত নিজেই তার বিচারিক যুক্তি প্রদর্শনে মূলত ইংরেজি ভাষা বেছে নেন। এই পছন্দ কোনো জবরদস্তির কারণে নয়; বরং দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও প্রায়োগিক প্রয়োজনীয়তার কারণে টিকে আছে। এটি মূলত এ সহজ সত্যটি প্রতিফলিত করে যে, ইংরেজি এখন এমন এক ভাষায় পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট আইনের নিখুঁত ব্যাখ্যা প্রদানে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

প্রায় তিন শতাব্দী ধরে সুপ্রিম কোর্টের পূর্বসূরিরা ইংরেজিতে তাদের আইনি যুক্তি সাজিয়েছেন, যুক্তি উপস্থাপন করেছেন এবং রায় লিখেছেন। ফলে আদালত যে হঠাৎ করে অন্য কোনো ভাষায় কথা বলার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দেখাবেন না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এ ধরনের কোনো পরিবর্তন জোর করে চাপিয়ে দেয়া হবে ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনার পরিপন্থী; কারণ সেই আন্দোলন ছিল নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে, অনিচ্ছুক কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর জোর করে কোনো ভাষা চাপিয়ে দেয়ার জন্য নয়। তা ছাড়া সুপ্রিম কোর্টে ব্যবহৃত ইংরেজি ভাষাটি দীর্ঘকাল ধরে এ দেশের উপযোগী করে নেয়া হয়েছে এবং তা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস ও সাবলীলতার সাথে ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে যারা সুপ্রিম কোর্ট থেকে ইংরেজিকে নির্বাসিত করার দাবি তোলেন, তারা মূলত আমাদের এমন এক প্রস্তাব দিচ্ছেন, যা আইনি বিচারে অনেকটা এমন– আমাদের গায়ের গাউনটি ছিঁড়ে ফেলে মহাত্মা গান্ধীর ল্যাঙট পরে বিচারিক কাজ পরিচালনা করা। এটি প্রতীকীভাবে হয়তো কিছুটা তৃপ্তিদায়ক হতে পারে, কিন্তু বর্তমানে আমাদের হাতে থাকা বিচারিক কাজের জন্য তা একেবারে অনুপযুক্ত।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি