উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল প্রসঙ্গে

মেধার মূল্যায়ন ও পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণায় দীর্ঘসূত্রতার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয় কোনো অবস্থাতেই মেনে নেয়া যায় না। জীবনের শুরুতেই তাদের মধ্যে নৈরাজ্য ও নিরাশা সৃষ্টি কাঙ্ক্ষিত নয়। একই সাথে যেসব প্রতিষ্ঠানের পাসের হার শূন্য সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের যোগ্যতা, নিয়োগপদ্ধতি ও শিক্ষকদের পারিতোষিকের ব্যবস্থাও কঠোর তত্ত্বাবধানে আনা দরকার। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে

১৬ অক্টোবর, ২০২৫। পুরো জাতি মুখোমুখি হলো এক নৈরাশ্যকর ঘটনার। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডামাডোলের আড়ালে ঘটনাটি সবার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। এ দিন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষিত হয়। পাসের হার ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৪ সালের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম। ২০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য, যা ২০২৪ সালে ছিল ৬৫টি। উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬১ জন। অনুত্তীর্ণ ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা পাঁচ লাখ আট হাজার ৭০১ জন, যার মধ্যে চার লাখ ২৮ হাজার ৪৫৮ জন উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেছে। এই সংখ্যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। প্রতি বছরই উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণ করা হয়ে থাকে। নতুন করে পরীক্ষার ফলাফল ঘোষিত হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো- যারা প্রথমে অনুত্তীর্ণ, পুনঃনিরীক্ষণের পর তাদের একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যকের জিপিএ ৫ পাওয়ার ঘটনা। এ ব্যাপারে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, সংশ্লিষ্ট বোর্ডের এর সাথে সম্পর্কিত কর্মকর্তাদের জবাবদিহির কোনো উদাহরণ আজো তৈরি হয়নি। যেসব পরীক্ষকের বিচারে অনুত্তীর্ণ ছাত্র-ছাত্রীরা পুনঃপরীক্ষণের পর মেধা তালিকায় উঠে আসে সেসব পরীক্ষককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি না করলে এ ধারা চলতেই থাকবে। দিন দিন বাড়বে ফেলের সংখ্যা। পরীক্ষাপদ্ধতি ও বোর্ডের প্রতি সৃষ্টি হবে অবিশ্বাস। হতাশায় ডুবে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে শিক্ষার্থীদের। পরিণামে বিকল্প মাধ্যম, ইংরেজি ও অন্যান্য মাধ্যম শিক্ষায় ঝুঁকে পড়বে অভিভাবকরা। বর্তমানে জ্যামিতিক হারে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি এর জাজ্বল্যমান উদাহরণ। এভাবে জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিপথে ঠেলে দেয়ার মহান (!) দায়িত্ব পালন করছেন শিক্ষা ও পরীক্ষা-সম্পর্কিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। অবশ্য উত্তরপত্র পুনঃপরীক্ষণের একটি লাভের দিকও রয়েছে। প্রতিটি উত্তরপত্রের পুনঃপরীক্ষণ ফি-১৫০ টাকা। এ হিসাবে শুধু একটি উত্তরপত্র পুনঃপরীক্ষণ বাবদ বোর্ডগুলো এ বছর আয় করবে ছয় কোটি ৪২ লাখ ৬৮ হাজার ৭০০ টাকা। একাধিক উত্তরপত্র পুনঃপরীক্ষণের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক আরো বাড়বে। সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত এই অর্থের জোগানের দায় কে নেবে? এ ব্যাপারে শিক্ষা বোর্ডের কর্তাদের জবাবদিহির আওতায় না আনলে শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য ঠেকানো কঠিন হবে।

এ ক্ষেত্রে আরো একটি তথ্য আলোচনার দাবি রাখে। এ বছর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ ভর্তির সম্ভাব্য আসন সংখ্যা সাত লাখ ৪৭ হাজার ৭০০-এর মতো। চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৯ হাজার ৩৩৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন জিপিএ ৫ প্রাপ্ত ৬৯ হাজার ৯৭ জন যা সামগ্রিক জিপিএ ৫ প্রাপ্ত সংখ্যার চেয়ে বেশি। ফলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মেধামান রক্ষা করা দুরূহ হবে। সামগ্রিকভাবে সাত লাখ ৪৭ হাজার ৭০০ আসনের বিপরীতে ভর্তি ইচ্ছুক হবেন সাত লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন। অর্থাৎ- উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রসঙ্কটে ভোগার সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাসকৃত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে অনেকেই ইতোমধ্যে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে গেছেন এবং যাবেন। সবমিলিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল নিঃসন্দেহে নিরাশা ও নৈরাজ্য তৈরি করবে। এর সুদূরপ্রসারী ফলাফলের দায় নির্ধারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি টাস্কফোর্স গঠন করা জরুরি। মানুষ তৈরির আঙিনায় এ ধরনের নিরাশা ও নৈরাজ্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। টাস্কফোর্স ছাত্র-ছাত্রীদের খারাপ ফলাফলের কারণ খতিয়ে দেখবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পরামর্শ দেবে রিপোর্টসহ।

মোটাদাগে এই ফলাফলের জন্য বেশির ভাগ দায়ী শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবর্তে কোচিং বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকে পড়া। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের মানসম্পন্ন পারিতোষিকের অভাব। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা শিক্ষকতার পাশাপাশি কোচিং বাণিজ্যসহ অন্যান্য কাজের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় এবং মনোযোগ দিতে পারেন না। শোনা যায়, অনেক পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর ছেড়ে দেন।

দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধের জন্য পরীক্ষক কর্তৃক উত্তরপত্র মূল্যায়নের একটি কার্যকর ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়। তারা নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট পরীক্ষককে পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রে উপস্থিত করান। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মধ্যাহ্নভোজ ও নামাজের বিরতিসহ উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলে। দিন শেষে পরীক্ষক উত্তরপত্র জমা দিয়ে ফিরে যান। প্রতিজন শিক্ষকের ভাগে ৭৫টি উত্তরপত্র মূল্যায়নে প্রতিটি বিষয়ের জন্য প্রয়োজন হয় গড়ে ১৬ হাজার ৪৭৫ জন পরীক্ষকের। প্রতিটি বিষয়ে তিন দিন বা চার দিনের অনুপাতে পরীক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দিন শেষে প্রধান পরীক্ষক অকৃতকার্য ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বাছাই করে পরবর্তী দিনে তাদের উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারেন। পাশাপাশি ব্যবহারিক পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থাও থাকতে পারে নির্দিষ্ট কেন্দ্রে। উল্লেখ্য, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, পুনঃনিরীক্ষণ ও ব্যবহারিক পরীক্ষার পরীক্ষক থাকবেন আলাদা। ফলে এক দিকে পরীক্ষক যেমন অন্য কাউকে দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন না, তেমনি পুনঃনীরিক্ষণের আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। সর্বোপরি ফলাফল ঘোষণাও স্বল্পসময়ে করা সম্ভব হবে। প্রাথমিকভাবে এই পদ্ধতিটি জটিল মনে হলেও মোটেও অসম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃঢ় ইচ্ছা ও বাস্তবে পরিণত করার আন্তরিক চেষ্টা।

মেধার মূল্যায়ন ও পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণায় দীর্ঘসূত্রতার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয় কোনো অবস্থাতেই মেনে নেয়া যায় না। জীবনের শুরুতেই তাদের মধ্যে নৈরাজ্য ও নিরাশা সৃষ্টি কাক্সিক্ষত নয়। একই সাথে যেসব প্রতিষ্ঠানের পাসের হার শূন্য সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের যোগ্যতা, নিয়োগপদ্ধতি ও শিক্ষকদের পারিতোষিকের ব্যবস্থাও কঠোর তত্ত্বাবধানে আনা দরকার। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]