নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তারিখ। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সরকারের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের কর্তৃত্ব ইসিকে দেয়া হয়। ক্ষমতাসীন সরকার তা তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী হোক রুটিন কাজ ছাড়া কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকবে এটি প্রত্যাশা।
দেশে সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠানে ব্যাপক আন্দোলনের ফলে সংবিধান সংশোধন করে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এর আওতায় ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন অনেকটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে হয়েছিল। ২০০৬ সালে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। পরে রাজনৈতিক অস্থিরতায় সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী একটি সরকার গঠিত হলেও এর বহু কর্মকাণ্ডে বিতর্কের জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত ওই সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে বিদেশী শক্তির যোগসাজশে আওয়ামী লীগের সাথে আপস করে ২০০৮ সালে মেটিকুলাস ডিজাইনে সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে। সেই সাথে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী হতে সাহায্য করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এক বছরের ব্যবধানে বিচার বিভাগের ওপর ভর করে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। সেদিন থেকে দেশে জটিল রাজনৈতিক সঙ্কট দেখা দেয়। শেখ হাসিনা ও তার দল ক্ষমতা স্থায়ী করতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি তথা নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়। এর মধ্য দিয়ে শুধু নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস হয়নি, বরং দেশে ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
দেশের সব রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিপর্যস্ত করা হয় হাসিনার সময়। এমন প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত হয় ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান। হাজারো মানুষের রক্ত ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। তার সরকার তিনটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এক, গণ-অভ্যুত্থানকালে যেসব হত্যা ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে এর সুষ্ঠু বিচার, দুই, রাষ্ট্রব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার ও তিন, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক মানের ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করেছে। ইতোমধ্যে প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কয়েকটি মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। তারা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। ভারতে পলাতক ওই দুই আসামিকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যান্য আসামির বিচারও চলছে।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি কমিশন গঠন করে। প্রথমপর্যায়ে ছয়টি তথা সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমনবিষয়ক কমিশন সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। সংস্কারের কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত গ্রহণ ও সংলাপের মধ্য দিয়ে ঐকমত্য কমিশন ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণয়নে সক্ষম হয়। এরপর ওই সনদে উল্লিখিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে ঐকমত্য কমিশন সরকারকে আরেক দফা সুপারিশ পেশ করে। তাতে জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি দিতে একটি আদেশ ও গণভোট অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দেয়া হয়। সরকার ইতোমধ্যে সংবিধান সংস্কার আদেশ ২০২৫ জারি করেছে। জাতীয় নির্বাচনের সময় একই সাথে গণভোট আয়োজনের ব্যবস্থা করেছে।
তৃতীয়ত, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের কাজটিও অন্তর্বর্তী সরকার এগিয়ে নিয়েছে। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই ইসি পরবর্তী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। নির্বাচনের তারিখসহ তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী মনোনয়নসহ প্রয়োজনীয় কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। নির্বাচনী কৌশল হিসেবে বিভিন্ন নির্বাচনী জোট গঠিত হচ্ছে। দৃশ্যত নির্বাচনী ট্রেন পুরোদমে এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দল নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে বারবার ইসিকে আহŸান জানাচ্ছে। এবারে আমরা পরীক্ষা করে দেখি যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন কতটুকু সফল হয়েছে।
সরকারের নিরপেক্ষতা : নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সর্বদলীয় ঐকমত্য রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে তা প্রতিফলিত হয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে সেটি সংবিধানে আবার সংযুক্ত হবে। এবারের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। তবে অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে কাজ করছে। প্রফেসর ইউনূসের সরকারের ওপর নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের আস্থা প্রকাশিত হয়েছে। যদিও মাঝে মধ্যে সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টার ব্যাপারে বিভিন্ন দল থেকে নিরপেক্ষতা ভঙ্গের অভিযোগ করা হয়ে থাকে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সরকারের নিরপেক্ষতার বিষয়টি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের প্রতি সরকারের সমান আচরণ করতে হবে। বিশেষ করে জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব পালনে যাতে কোনো রকম অনুরাগ-বিরাগের প্রকাশ না ঘটে, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তবে তফসিল ঘোষণার পর ইসির দেখতে হবে যে, সরকারের কোনো এজেন্সি নিরপেক্ষতা ভঙ্গের মতো কোনো কাজ করে কি না। অতীতে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করার সময় দেখা গেছে, সরকার জনপ্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনী-বিজিবি সমন্বয়ে সিন্ডিকেট করে নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। এমনকি অসামরিক আমলাতন্ত্রের যোগসাজশে নির্বাচনী নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এমন কোনো সিন্ডিকেট হতে দিবেন না বলে জনগণ বিশ্বাস করে।
নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন : সাম্প্রতিক অতীতে ফ্যাসিবাদী সরকারের অধীনে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে সরকারের পাশাপাশি ইসিও নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করে নীলনকশার নির্বাচন করে ফল তৈরি করতে সহযোগিতা করেছে। কেউ মন্তব্য করে থাকেন, আগেকার ইসিগুলো সরকারের ভয়ে নিরুপায় ছিল। এসব খোঁড়া যুক্তি মেনে নেয়া যায় না। কারণ শির উঁচু করে নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হতে না পারলে তাদের দায়িত্ব নেয়া উচিত হয়নি। কোনো কমিশনকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থতায় পদত্যাগ করতে দেখিনি। সুতরাং তারা সরকারের সাথে যোগসাজশ করে নির্বাচনের নামে প্রহসন করেছে। এসব অনৈতিক কাজে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে বর্তমান সরকার একটি কমিশন গঠন করেছে। তাদের কাজ কতটুকু এগোলো তা জাতিকে জানানো উচিত। আমাদের জানা মতে, বর্তমান ইসি যথেষ্ট যোগ্য ও উন্নত নৈতিক মানসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত। ইতোমধ্যে তারা নির্বাচন প্রস্তুতির কাজগুলো যথাসময়ে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ, প্রবাসীদের ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করা, ইভিএম মেশিন বাতিল করা, আরপিও সংশোধন করা, নির্বাচনী এলাকা পুনর্বিন্যাস করা, প্রতীক নির্ধারণ, নির্বাচনী পর্যবেক্ষক বাছাই ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সামনের কয়েকটি দিনে বড় চ্যালেঞ্জ নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা। সরকারের প্রধান কাজ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। ঘাতকের হাতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র বিপ্লবী শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর বিভিন্ন দলের নেতা ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উদ্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব প্রদানকারী ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি অধিকতর স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তা বিধানে কোনো বৈষম্য করবে না।
ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র : নির্বাচনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও তা জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করা। অতীতে ভুয়া ও অপূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকা প্রণয়নের অভিযোগ ছিল। বর্তমান ইসি কাজটি বিতর্কমুক্ত রাখতে পেরেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের বিষয়টিও হালনাগাদ হয়েছে। এমনকি প্রবাসীদের কয়েক লাখ ভোটারও নিবন্ধিত হয়ছে, যদিও অনেকে এখনো ভোটার হতে পারেননি। ইসি প্রথমবারের মতো কাজটি হাতে নিয়েছে বিধায় সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন : নির্বাচন কমিশন মোটামুটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে বেশ কিছু নতুন দলকে নীতিমালা অনুযায়ী নিবন্ধন দিয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকায় দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধের আওতায় পড়েছে। সুতরাং দলটির পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। শুরুতে দেশ-বিদেশের কোনো কোনো মহল অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির অজুহাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে সুযোগ দেয়ার নসিহত করেছিল। তবে সময়ের ব্যবধানে প্রফেসর ইউনূসের সরকার বিষয়টি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতীক বরাদ্দ : জামায়াতে ইসলামী আদালতের মাধ্যমে নিবন্ধন ফিরে পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে দলটি দাঁড়িপাল্লা প্রতীক ফিরে পেয়েছে। তবে এনসিপিকে শাপলা প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়। তরুণদের দলটি শাপলা প্রতীকের জন্য আন্দোলন করলেও ইসি তা দেয়নি। সরকারের বহু ডকুমেন্টে শাপলা প্রতীক থাকায় সেটি কোনো দলকে দেয়া হয়তো সমীচীন হয়নি বলে ইসি কোনো দলকে শাপলা প্রতীক বরাদ্দ দেয়নি। শেষ পর্যন্ত এনসিপি ও কমিশন একটা আপসে পৌঁছায় এবং দলটিকে শাপলা কলি দিয়ে সন্তুষ্ট করা হয়।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন : আগের আরপিও নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সহায়ক ছিল না। বর্তমান কমিশন আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এর আগে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন আরপিও সংশোধনে বিভিন্ন সুপারিশ করেছিল। ইতোমধ্যে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ২০২৫ (আরপিও) জারি করা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান অভিমত ব্যক্ত করেছেন, তাদের সব সুপারিশ সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে স্থান পায়নি। সংশোধনগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য হলো, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী জোট গঠন করলেও নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে। অতীতে ছোট দলগুলো কোনো বড় দলের সাথে জোট করে সেই দলের জনপ্রিয় প্রতীকে নির্বাচন করত। এবারে তা করা যাচ্ছে না। ফলে দেখা যাচ্ছে, কোনো ছোটখাটো দল নিজস্ব অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে নির্বাচন সামনে রেখে ওই বড় দলে যোগ দিচ্ছে। আরেকটি সংশোধনী হলো, কোনো নির্বাচনী আসনে এক বা একাধিক কেন্দ্রে অনিয়ম ও গোলযোগ হলে ইসি পুরো নির্বাচন বাতিল করতে পারবে। আরো কিছু সংশোধনী রয়েছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে ইসি করেছে বলে আমাদের বিশ্বাস।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক বাছাই : প্রতিটি নির্বাচনে দেশ-বিদেশের পর্যবেক্ষক টিমকে ইসি অনুমোদন দিয়ে থাকে। অতীতে এক দিকে নিজস্ব বলয়ের প্রতিষ্ঠানকে এ কাজে বাছাই করা হতো। আবার বিদেশী কোনো দেশ বা সংস্থা পর্যবেক্ষক পাঠাবে বা কতসংখ্যক পাঠাবে, তার ওপর নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আগেভাগে আঁচ করা যায়। বিগত তিনটি নির্বাচনে পর্যবেক্ষক সংখ্যা ছিল সীমিত। এবারে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও সংস্থা থেকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক আসার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কমিশন স্বচ্ছতার সাথে পর্যবেক্ষক টিম অনুমোদন দিয়েছে। এ নিয়ে কোনো বিতর্ক দেখা দেয়নি।
ভোটগ্রহণ পদ্ধতি : সাম্প্রতিক অতীতে ভোটগ্রহণে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) দিয়ে ভোটগ্রহণে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের একগুঁয়ে নীতিতে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় হয়েছে। সে মেশিনগুলো এখন অকেজো ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। এ জন্য যারা দায়ী তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত। ধন্যবাদ বর্তমান কমিশনকে, ইভিএম মেশিন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেয়ায়। তবে এবারে যেহেতু গণভোটও একত্রে হচ্ছে, সেহেতু ভোটকেন্দ্র বা পুলিং বুথের সংখ্যা বাড়ানো এবং সময় ব্যবস্থাপনায় কমিশনকে বড় চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ : সুষ্ঠু নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে সরকারের পুলিশ বাহিনী ও ক্ষেত্রবিশেষে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরে যদিও জনপ্রশাসন ইসির আদেশ শুনতে বাধ্য, তথাপি এসব বাহিনীর কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল তথা সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ কিন্তু সরকারের হাতে থেকে যায়। সে হিসেবে সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া ইসি এককভাবে কার্যকর কিছু করতে পারে না।
আমরা আশা করি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় উৎকর্ষতা দেখাতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। প্রধান উপদেষ্টা ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়েছেন।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতকরণ : আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতকরণে ইসি এবং সরকারের ওপর গুরু দায়িত্ব রয়েছে। নির্বাচনী মাঠ সমতল নয় বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রতিনিয়ত অভিযোগ করছে। এর ব্যত্যয় হলে ইসি ও সরকার বিতর্কে পড়ে যাবে; যা কাম্য নয়। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই, প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার নিজেদের সুনামের জন্যই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকরে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ ভূমিকা : আগে দেখা যেত, সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমগুলো স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সরকারি দলের পক্ষপাতিত্ব করে সংবাদ পরিবেশন বা পর্যালোচনা করত। এবারে সরকারি গণমাধ্যম বাদ দিলেও দেখা যায়, বেসরকারি গণমাধ্যমের প্রায় সবগুলো একটি বিশেষ দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার কাছে যেতে সবাই পছন্দ করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিযোগিতা চলে। গণমাধ্যমেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ গুরুত্ব দিয়ে সব গণমাধ্যম দায়িত্বশীল আচরণ করবে। উল্লিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে একটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়া সম্ভব হতে পারে।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব



