ইরানে হামলা : উম্মাহ কি কেবল দর্শক

আজ সময় এসেছে দ্বাদশ শতাব্দীর সেই মহান বীর গাজী সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর মতো আপসহীন ও দূরদর্শী নেতৃত্বের, যিনি খণ্ড-বিখণ্ড উম্মাহকে এক সুতায় গেঁথে ক্রুসেডারদের হাত থেকে জেরুসালেম মুক্ত করেছিলেন। আধুনিক চিন্তা কিংবা পারস্যের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী তেজস্বী চেতনা ও আরব বিশ্বের প্রকৃত লড়াকু ঐতিহ্যের সমন্বয়ে আজ একজন নতুন ‘সালাহউদ্দীন’ প্রয়োজন। ইরানের বর্তমান সংগ্রাম হয়তো সেই নতুন নেতৃত্বের সোপান তৈরি করছে

১৯৮৩ সাল। সাবেক যুগোস্লাভ নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ জাহাজ ‘গালেব’-এ আমরা তখন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছি। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দিগন্তজোড়া জলরাশি দেখতে দেখতে আমরা মেতে উঠতাম নাবিকদের এক রোমান্টিক ও প্রাচীন ঐতিহ্যে। কাচের স্বচ্ছ বোতলে পরম মমতায় ভরে দিতাম মা-বাবার কাছে লেখা চিঠি। সাথে থাকত একটি মাত্র ডলার যাতে সিসিলি বা ইতালির কোনো সহৃদয় জেলে বোতলটি খুঁজে পেলে সে যেন সেই ডলার দিয়ে ডাকটিকিট কিনে চিঠিটি গন্তব্যে পাঠিয়ে দিতে পারে। আশ্চর্য হলেও সত্য, সাগরের নোনা জলরাশি পাড়ি দিয়ে সেই বোতল ঠিকই বাংলাদেশে আমার মা-বাবার হাতে পৌঁছেছিল। মাসের পর মাস লোনা পানিতে ভেসেও চিঠির একটি অক্ষরও অস্পষ্ট হয়নি। কারণ, বোতলের মুখে লাগানো সেই ‘কর্ক’ বা ছিপিটি ছিল বিশ্বাসের মতো অভেদ্য। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আধুনিক জিপিএস আর রাডারের ভিড়ে সেই রোমাঞ্চ হয়তো হারিয়ে গেছে; কিন্তু সেই ‘অভেদ্য ছিপি’ আজও আমার স্মৃতিতে অক্ষত, যা মুসলিম উম্মাহর হারানো ঐক্যের রূপক হিসেবে ধরা দিচ্ছে।

নৌপথের নিরাপত্তা ও আধিপত্য বিস্তারের গুরুত্ব ইসলামী খিলাফতের শুরুতেই অনুধাবন করা হয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠা হয় তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান রা:-এর শাসনামলে (২৮ হিজরি/৬৪৯ থেকে ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ)। এ নৌবাহিনীর প্রথম বড় সাফল্য ছিল সাইপ্রাস বিজয়। তবে এর চেয়েও বড় মাইলফলক ছিল ৬৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ‘জাতুস সাওয়ারি’ বা মাস্টসের যুদ্ধ, যেখানে মুসলিম নৌবাহিনী বাইজেনটাইন সম্রাট কনস্ট্যান্স দ্বিতীয়কে পরাজিত করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মুসলিমদের নৌ-আধিপত্য নিশ্চিত করে। ইতিহাস সাক্ষী, ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগে নৌশক্তিই ছিল বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার প্রধান চাবিকাঠি।

আজ ২০২৬ সালেও সেই গুরুত্ব কমেনি। হরমুজ প্রণালী আজ বিশ্বরাজনীতির স্নায়ুকেন্দ্র। তেলের এই প্রধান ধমনীর নিয়ন্ত্রণ পেতে পশ্চিমা শক্তিগুলো মরিয়া, কারণ এটি অচল হওয়া মানে বিশ্ব অর্থনীতির নাভিশ্বাস ওঠা। ইরান ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসি দেশগুলোর রাজতন্ত্র আজ এক ভয়াবহ ফাঁদে বন্দী। ‘পেট্রো-ডলার’ ব্যবস্থার মাধ্যমে এ দেশগুলো তেলের বিনিময়ে ডলার গ্রহণ এবং সেই ডলার মার্কিন ব্যাংকে বিনিয়োগ করার চুক্তিতে আবদ্ধ। বিনিময়ে আমেরিকা রাজতন্ত্র রক্ষার গ্যারান্টি দিয়েছে। এভাবে জিসিসি দেশগুলো মূলত পশ্চিমাদের কাছে নিজেদের সার্বভৌমত্ব বন্ধক রেখেছে। বাহরাইন, কাতার বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে স্থাপিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি কেবল ইরানকে ঠেকাতে নয়; বরং এ রাজতন্ত্রগুলোকে অসহায় করে রাখতে ব্যবহার করা হয়। আমেরিকা ও ইসরাইল আজ এসব রাজতন্ত্রের পাহারাদার। এই শাসকরা নিজেদের গদি হারাতে চায় না বলেই তারা ইরানের কট্টর বিরোধী।

মুসলিম উম্মাহর এ চরম অনৈক্যের যুগে আমরা একজন সাহসী ও দূরদর্শী নেতার অভাব তীব্রভাবে অনুভব করছি। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ ছিলেন সেই বিরল নেতাদের একজন, যিনি মুসলিম উম্মাহর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার কথা বলতেন। মাহাথির জানতেন, যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিমরা প্রযুক্তি, নৌশক্তি ও অর্থনীতিতে স্বনির্ভর না হবে, ততক্ষণ তাদের ওপর পশ্চিমাদের ছড়ি ঘোরানো বন্ধ হবে না। মাহাথিরের মতো নেতার অভাবে আজ ইরানের মতো দেশগুলোর একাকী লড়তে হচ্ছে।

মুসলিম উম্মাহর একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তানও পশ্চিমাদের গভীর ষড়যন্ত্রের লক্ষ্যবস্তু। আমেরিকা ও তার মিত্ররা কখনো চাইবে না একটি মুসলিম রাষ্ট্রের হাতে পরমাণু অস্ত্র থাকুক। ইরানকে দমানোর পর পশ্চিমাদের পরবর্তী টার্গেট হবে পাকিস্তান। কেবল পাকিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্য নয়; দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের মতো উদীয়মান মুসলিম দেশকেও বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব বুঝে নৌশক্তির আধুনিকায়ন করতে হবে, যাতে আমাদের সমুদ্রসীমা ও সার্বভৌমত্ব অন্যের দয়ায় ছেড়ে দিতে না হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন সাধারণ মুসলিমের লাশের মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে, তখন কেবল নিন্দা জানিয়ে দায় মেটানোর সময় নেই। সামরিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলিম দেশগুলোকে এখন অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ইরান আজ সেই প্রতিরোধের অগ্রভাগে রয়েছে। কেবল ইরান নয়, উম্মাহর যেসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো সংগ্রামের চেতনা জীবন্ত, তাদের এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে হবে। আরব রাজতন্ত্রগুলো পশ্চিমা চাপে মুখ খুলতে ভয় পায়, কিন্তু মুসলিম জনগণ যদি জেগে ওঠে এবং শাসকদের ঐশী বিধান (৪:৫১) মানতে বাধ্য করে, তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। এ দেশগুলোর বুঝতে হবে, ইসরাইলের ‘গ্রেটার ইসরাইল’ পরিকল্পনা তাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। আজ ফিলিস্তিন বা ইরানকে একলা ফেলে দেয়া হলে, কাল তাদের গদিও রক্ষা পাবে না। এখনই সময় শক্তির ভারসাম্য তৈরির।

কুরআনুল কারিমের সূরা মায়িদার ৫১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না; তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করলে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ এ চিরন্তন নির্দেশের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন আরব রাজা-বাদশারা।

আমাদের বুঝতে হবে, বহু বছর ধরে আমরা কেবল হাত তুলে যে মুনাজাত বা দোয়া করে আসছি, কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপ ও ঐক্য ছাড়া সেই দোয়া উম্মাহর ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে না। আরব জনগণকে জাগতে হবে। রাজতন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করতে হবে। শুধু দোয়ার ওপর নির্ভর করে নিষ্ক্রিয় বসে থাকলে উম্মাহর পতন অনিবার্য।

আমেরিকা যে ‘এককেন্দ্রিক বিশ্ব’ (ইউনিপোলার ওয়ার্ল্ড) বজায় রাখতে মরিয়া, ইরানের এ সঙ্কট মূলত সেই দাবা খেলার অংশ। এটি রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার সাথেও যুক্ত। চীন জ্বালানি তেলের জন্য ইরান ও হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। ইরানকে অস্থিতিশীল করতে পারলে চীন ও রাশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি খর্ব করা সহজ হবে। এ লড়াইয়ে ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি এবং গাজার হামাসকে সাথে নিয়ে যে প্রক্সি যুদ্ধ চালাচ্ছে, তা প্রমাণ করে যে সংগ্রামের চেতনা কোনো মতাদর্শের সীমায় সীমাবদ্ধ নয়। শিয়া-সুন্নি কৃত্রিম বিভেদ কেবল মোসাদ ও সিআইএর তৈরি একটি কূটকৌশল। অথচ ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা নিজেদের বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ।

একটি সাধারণ কাচের বোতল যেমন শক্ত ছিপি থাকায় উত্তাল সমুদ্রের নোনা জল থেকে নিজের ভেতরের চিঠিখানা রক্ষা করতে পেরেছিল, ঠিক তেমনি মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব রক্ষা আজ আমাদের বিশ্বাসের দৃঢ়তার ভিত্তিতে শক্তিশালী নৌ-আধিপত্যের ওপর নির্ভরশীল। হজরত উসমান রা:-এর আমলের সেই সাহসী নৌ-অভিযান আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমুদ্রপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছাড়া উম্মাহর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা খুব কঠিন। আবাবিল পাখি আমাদের অলসতায় ডানা মেলবে না; আমাদের উদ্যোগী হতে হবে।

আজ সময় এসেছে দ্বাদশ শতাব্দীর সেই মহান বীর গাজী সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর মতো আপসহীন ও দূরদর্শী নেতৃত্বের, যিনি খণ্ড-বিখণ্ড উম্মাহকে এক সুতায় গেঁথে ক্রুসেডারদের হাত থেকে জেরুসালেম মুক্ত করেছিলেন। আধুনিক চিন্তা কিংবা পারস্যের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী তেজস্বী চেতনা ও আরব বিশ্বের প্রকৃত লড়াকু ঐতিহ্যের সমন্বয়ে আজ একজন নতুন ‘সালাহউদ্দীন’ প্রয়োজন। ইরানের বর্তমান সংগ্রাম হয়তো সেই নতুন নেতৃত্বের সোপান তৈরি করছে।

পবিত্র কুরআনের সূরা আর রাদের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে।’ (১৩ : ১১) রাজতন্ত্রের মোহ ত্যাগ করে এবং আইয়ুবী শৌর্য পুনরুদ্ধার করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এখন সময়ের দাবি। নিজেদের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের বাধা আমাদের খুলতে হবে; নিষ্ক্রিয় বসে থাকলে উম্মাহর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়া অনিবার্য। হ

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি