নির্বাচনী দৌড়ে জামায়াতে ইসলামী: একটি পর্যালোচনা

প্রার্থীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও প্রভাব, পারিবারিক ঐতিহ্য, অতীতের কৃতকর্ম, অর্থ ও পেশিশক্তি, এলাকার বিশেষ কোনো ইস্যু ইত্যাদি নির্বাচনে উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে।

তরুণ সাংবাদিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর উদ্যোগে ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়। তার মতে, মুসলমান শুধু সাধারণ একটা জাতি নয়, বরং একটি বিপ্লবী ও মিশনারি দল, যারা বিশ্বব্যাপী ইসলামী আদর্শ প্রচারের দায়িত্বে নিয়োজিত। তিনি মনে করতেন, মুসলিম লীগ যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে; তা নিছক মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হতে পারে, কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র হবে না। এ জন্য তিনি মুসলিম লীগের সাথে একাত্ম হতে পারেননি। উপমহাদেশের মুসলমানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে আলাদা সংগঠন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। শুরু থেকে দলটি বৈপ্লবিক আদর্শের কথা বললেও সাংবিধানিক রাজনীতিকে কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী পাকিস্তানে হিজরত করেন। সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় গণতান্ত্রিক পন্থা অনুসরণের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর পাকিস্তানে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে দলটি অংশ নেয়।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের নতুন সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন নিষিদ্ধ করা হয়। এতে সবচেয়ে বিপাকে পড়ে ইসলামী দলগুলো। জামায়াতে ইসলামী ছাড়া অন্যান্য ইসলামী দলের সাংগঠনিক ও জনভিত্তি উল্লেখ করার মতো ছিল না। জামায়াত গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ১৯৭৯ সালে জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতসহ কয়েকটি ইসলামী দল মিলে ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১৮টি আসন পায়। এরপরে প্রায় সব সংসদ নির্বাচনে জামায়াত অংশ নেয়। দলটির ইতিহাস সম্পর্কে বর্ণনা দেয়ার উদ্দেশ্য হলো- এ কথা বলা, ইসলামী বিপ্লবের কথা বললেও মূলত জামায়াতের গণতান্ত্রিক তথা নির্বাচনমুখী রাজনীতি প্রধান কর্মকৌশল।

পাকিস্তান আমল ছাড়াও বাংলাদেশ আমলেও দলটির জোটবদ্ধ নির্বাচন ও রাজনৈতিক আন্দোলন করার ইতিহাস রয়েছে। বাংলাদেশে রাজনীতি শুরু করে জোটবদ্ধভাবে অর্থাৎ ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগ নামে। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ না হলেও আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের পাশাপাশি একই দাবিতে আন্দোলন করেছে দলটি। জামায়াত ও আওয়ামী লীগ সম্মিলিতভাবে তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনে আন্দোলন করে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনী জোট ব্যাপক সফলতা পেয়ে একত্রে সরকার গঠন করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করলে ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়ে জামায়াত ও বিএনপি। জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা ও ট্রাইব্যুনালে বিচার করে দলটির শীর্ষ ছয় নেতাকে ফাঁসি দেয়া হয়। সেই সাথে বেশ কয়েকজন কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে গত ১৬ বছরে বিএনপি ও জামায়াতসহ বহু দল আন্দোলন করলেও চব্বিশের আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আদালতের রায় পেয়ে জামায়াত আবার সাংবিধানিক রাজনীতিতে ফিরে এসেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী দ্বিতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের সাথে সাথে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের দাবি করে। তখন দলটির জনপ্রিয়তা ছিল সবার ওপরে। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে বিএনপির এক সময়ের জোটসঙ্গী জামায়াত ভোটের মাঠে তাদের প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে উঠেছে। আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি জরিপ করেছে। তাতে দেখা যায়, ভোটের মাঠে এখন বিএনপি ও জামায়াত প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী।

শিগগিরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আশা করা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রতিদ্ব›দ্বী সব দল ভোটের মাঠে সরব। বৃহৎ দুটো রাজনৈতিক দল নিজেদের মনোনীত প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছে। নির্বাচনী জোট ও সমঝোতা গঠনের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। আর সপ্তাহ খানেকের মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণের বিষয়টি হয়তো আরো এগোবে। গত সপ্তাহে বিএনপির নির্বাচনী শক্তি, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী শক্তি, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করবো।

প্রথমে দেখে নেয়া যাক ভোটের মাঠে জামায়াতের সুবিধাজনক অবস্থান কী।

প্রথমত, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের দৃঢ় আদর্শিক চেতনাসম্পন্ন একটি বিরাট জনশক্তি রয়েছে। সংগঠন দুটো নিজেদের জনশক্তিকে ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধের আলোকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করে তোলে, যা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলে নেই। তাদের জনশক্তি দিন দিন বেড়েছে। ১৯৭১ সাল ও আওয়ামী লীগের বৈরিতা ও প্রতিহিংসার মুখেও জনশক্তি কমেনি, বরং বেড়েছে।

দ্বিতীয়ত, শুধু সমর্থক ও কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধি নয়, তারা সবাই একটি যূথবদ্ধ সাংগঠনিক কাঠামোতে দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত একটি চেইন অব কমান্ড রক্ষাকারী বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে। সাংগঠনিক কাঠামোর সব স্তরে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও ইসলামী চেতনার আলোকে নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়। ফলে দলটির ভেতরে অনৈক্য বা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় না। দলটির কর্মী ও সমর্থকরা দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্যশীল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যা ব্যতিক্রমধর্মী।

তৃতীয়ত, ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারে অংশগ্রহণ করে জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল যথাক্রমে মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রী হিসেবে যে সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা সর্বজনবিদিত। আওয়ামী লীগ সরকার তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো নজির খুঁজে পায়নি। ফলে জনমনে দলটির নেতৃত্বের সততা সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ভাবমর্যাদা গড়ে উঠেছে।

চতুর্থত, জামায়াত দলীয় নীতির অংশ হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজে সক্রিয়ভাবে সংযুক্ত রয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশব্যাপী বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে আর্থিক খাতে ইসলামী ব্যাংক, স্বাস্থ্য খাতে ইবনে সিনা হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। শুধু সংখ্যা নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর মানসম্মত সেবাও সবার দৃষ্টি কেড়েছে। এরূপ কোনো নজির অন্য কোনো রাজনৈতিক দলে নেই বললেই চলে।

পঞ্চমত, দলটি সমাজের সব স্তরে একটি শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ জনশক্তি গড়ে তুলেছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনে দলটির যোগ্যতাসম্পন্ন সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। বিষয়টি শুধু দেশে নয়, বিদেশীদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে দলটির সরকার পরিচালনায় নেতৃত্ব দেয়ার মতো নিজস্ব দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তি রয়েছে কি না কেউ কেউ সে প্রশ্ন করে থাকেন।

ষষ্ঠত, জামায়াতের সব নেতাকর্মী সবাই নিজেদের ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে সংগঠনকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা করে। এমনকি, তাদের শুভাকাক্সক্ষীদের সংখ্যাও কম নয়, যারা সংগঠনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকলেও আর্থিক সহায়তা দেন। প্রবাসীদের মধ্যে জামায়াতের সংগঠন রয়েছে; যারা আর্থিক অবদান রাখেন। এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আর্থিক অংশগ্রহণ সমন্বিতভাবে বড় তহবিলের আকার ধারণ করে। নিজস্ব জনশক্তির অর্থে রাজনৈতিক দল পরিচালনার দৃষ্টান্ত অন্য কোনো দলে নেই।

সপ্তমত, ইসলামী ছাত্রশিবির অফিসিয়ালি জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গসংগঠন নয়। একই আদর্শ ও চিন্তা-চেতনার অনুসারী হলেও কৌশলগতভাবে শিবির স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে। তবে রাজনৈতিক মহলে জামায়াত ও শিবিরকে একইসাথে গণ্য করা হয়। ছাত্রশিবিরও একইভাবে জনশক্তিকে ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধের আলোকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করে তোলে; যা অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনে নেই। ছাত্রশিবিরের নেটওয়ার্কও বিস্তৃত। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সম্পর্কে অতীতে নেতিবাচক প্রচারণা থাকলেও জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকায় তারা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হতে থাকে। ঢাকাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদে শিবিরের নিরঙ্কুশ ও অভাবনীয় বিজয় সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এর ফল স্বাভাবিকভাবে জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলো জামায়াতের জন্য ইতিবাচক উপাদান হিসেবে গণ্য হলেও বিভিন্ন দুর্বল দিকও রয়েছে যা তুলে ধরা হলো :

প্রথমত, একাত্তরের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে। হাসিনা আমলে তা তীব্র আকার ধারণ করলে দলটির নেতৃত্বকে বিচারিক হত্যার দিকে ঠেলে দেয়া হয়। দলটিকে সেক্যুলার শক্তির কাছে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’, ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’, ‘রাজাকার’ ইত্যাদি অভিধায় প্রতিনিয়ত ক্ষত-বিক্ষত হতে হয়েছে। তবে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে প্রবল প্রতাপশালী শেখ হাসিনা যখন তরুণ প্রজন্মকে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দিলেন, তখন শিক্ষার্থীরা তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। এর মধ্য দিয়ে ‘রাজাকার’ গালির ধার আগের চেয়ে কমেছে। এতদসত্তে¡ও দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এমন একটি জনগোষ্ঠী তথা ভোটার রয়েছেন; যারা জামায়াতকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ হিসেবে গণ্য করে কখনো ভোট দেবেন না বলে মনে হয়।

দ্বিতীয়ত, দেশের ৯০ শতাংশের বেশি ভোটার মুসলিম হওয়া সত্তে¡ও উদারনৈতিক মুসলিম ভোটারের সংখ্যাও কম নয়। অনেকে শুক্রবারে জুমার নামাজ বা ঈদের নামাজ আদায় করতে মসজিদে যান। তবে সমাজের এই অংশ কঠোরভাবে ইসলামের নীতি-নৈতিকতা অনুসরণ করেন না। তারা নিজেদের মুসলিম দাবি করলেও ইসলামের নিয়মনীতি পালনে শিথিলতা দেখান। জামায়াতের মতো ইসলামী দল সরকারে গেলে কঠোর শরিয়াহ আইন চালু করতে পারে বলে তাদের মধ্যে একটি ভীতি কাজ করে। বিশেষ করে পাশ্চাত্য ঘেঁষা আধুনিক ও কথিত বাঙালি সংস্কৃতির অনুসারীদের মধ্যে এ প্রবণতা রয়েছে।

তৃতীয়ত, জামায়াতের শাসনপদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষিত মহলের অনেকের কাছে অস্পষ্টতা রয়েছে। কারণ ইসলামী দলগুলোর কেউ খিলাফত প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, কেউ শরিয়াহ আইনের কথা বলেন, কেউ ইসলামী বিপ্লবের কথা বলেন। কিন্তু খিলাফত বা ইসলামী বিপ্লবের রূপ বা বৈশিষ্ট্য কী তা অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়। জামায়াত এবং সাম্প্রতিককালে চরমোনাই পীরের অনুসারী ইসলামী আন্দোলন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামী রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার কথা বলছে। জামায়াত ইদানীং কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করছে। বিশে^ ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন মডেল রয়েছে ইরান, তুরস্ক বা সৌদি আরব। আবার রাজতান্ত্রিক সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আমিরাত প্রভৃতি রাষ্ট্রও ইসলামী নীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে মেনে চলে। জামায়াত কোন মডেলে দেশ চালাবে তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন রয়েছে।

চতুর্থত, বাম, সেক্যুলার দল ও ভারতের দিক থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানাবিধ অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এখনো তা অব্যাহত আছে। এসব অপপ্রচার মোকাবেলার মতো গণমাধ্যম জামায়াতের আছে বলে দেখা যায় না। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রবল উপস্থিতি রয়েছে।

পঞ্চমত, দেশের কিছু ট্র্যাডিশনাল ধর্মীয় শক্তি বিশেষ করে কিছু পীরের অনুসারী ও মাজারভিত্তিক সংগঠন জামায়াতের বিরুদ্ধে সব সময় ফতোয়া দিয়ে থাকে। এরা বুঝে হোক, না বুঝে হোক বা বিশেষ কোনো মতলবে হোক জামায়াতবিরোধী থাকবে। তবে এদের প্রভাব ভোটারদের ওপর খুব বেশি পড়বে বলে মনে হয় না। সম্প্রতি জামায়াত-চরমোনাই পীরসহ কয়েকটি ইসলামী দলের সাথে যে নির্বাচনী সমঝোতায় পৌঁছেছে; তা ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয়।

ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক মহলে ‘ইসলামোফোবিয়া’ আগের চেয়ে কমে এলেও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশের সরকারি নীতি বিশেষ করে ফিলিস্তিনের বিষয়ে তাদের ভূমিকা দেখলে তা সহজে বুঝা যায়। পাশ্চাত্যের এসব শক্তি বিশেষ করে একটি প্রভাবশালী মহল বাংলাদেশে কোনো ইসলামী দলকে ক্ষমতায় দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে মিসরে ব্রাদারহুড প্রেসিডেন্ট মুরসির পতন ও আলজেরিয়ার নির্বাচন বানচালের স্টাইল থেকে ধারণা করা যায়। অন্যদিকে, ভারতের কংগ্রেস ও বিজেপি ঊভয় সরকার জামায়াতের ব্যাপারে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। আবার শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতারা ভারতে অবস্থান করে জামায়াতবিরোধী বিভিন্ন কৌশল বাস্তবায়ন করছেন। জামায়াত এসব কিভাবে মোকাবেলা করবে তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে।

ইতোমধ্যে জামায়াতের ব্যাপারে ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ ও অনুরাগ সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আদর্শিকভাবে জামায়াতবিরোধী রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও দলটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কথা স্বীকার করছেন। দলটির জনপ্রিয়তা ২০-২৫ বছর আগে ৫-১০ শতাংশের মতো ছিল বলে বিভিন্ন নির্বাচনী ফলে দেখা গেছে। এখন জনপ্রিয়তা বেড়ে কত হয়েছে তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে, আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও বিএনপির চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বদনামের বিপরীতে জামায়াতের একটি ক্লিন ইমেজ রয়েছে যা ভোটাররা বিবেচনায় রাখবে বলে মনে করা যেতে পারে।

সপ্তমত, আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জামায়াত-শিবিরের সক্রিয় ভূমিকা সব মহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। একইভাবে রাষ্ট্রসংস্কার প্রশ্নে তাদের ইতিবাচক ভূমিকাকে সবাই প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখছে বলে মনে হয়।

অষ্টমত, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী উত্তেজনার সময় অমুসলিম জনগোষ্ঠী তাদের নিরাপত্তা বিধানে জামায়াত-শিবিরের ইতিবাচক ভূমিকায় তাদের প্রতি আস্থা অনেক বেড়েছে। এর আগে জামায়াতের আমির বিভিন্ন বিপদে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাও তারা বিবেচনায় নিয়েছেন। সম্প্রতি জামায়াত আগামী নির্বাচনে অমুসলিম প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সর্বত্র প্রশংসিত হচ্ছে। সুতরাং প্রচলিত ধারণা মতে, জামায়াত অমুসলিমদের ভোট পাবে না বলে যে ধারণা রয়েছে; তা ভেঙে যেতে পারে। তবে উল্লেখ্য যে, অতীতে বেশি অমুসলিম ভোটার অধ্যুষিত এলাকায় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও গোলাম পরওয়ার নির্বাচিত হয়েছেন সে উদাহরণ রয়েছে।

নবমত, নারীরা মোট ভোটার সংখ্যার অর্ধেক বা কিছু বেশি। এরা নির্বাচনী বিজয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। অতীতের নির্বাচনে এমন একটা ধারণা রয়েছে, বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি নারী ভোটারদের একটি বিশেষ অনুরাগ ও পছন্দ ছিল যা তার দলকে বিজয়ী করতে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে, জামায়াতের প্রতি নারী ভোটাররা কতটা অনুরক্ত হবে তা নিয়ে অস্পষ্টতা ছিল। বিশেষ করে জামায়াত হিজাবের ব্যাপারে কড়াকড়ি করতে পারে মর্মে- একটি ধারণা অনেকের মধ্যে ছিল। কিন্তু সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির আধুনিক নারীদের অন্তর্ভুক্ত করে প্যানেল দিয়ে সে ভুল ভেঙে দিয়েছে। বহু আধুনিক মহিলা বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা ছাত্রশিবিরকে দলে দলে ভোট দিয়ে দেশের নারীদের কাছে এ বার্তা দিয়েছেন, ইসলামপন্থীরা নারীবান্ধব ও নিরাপদ। সুতরাং এবারে জামায়াত নারী ভোটারদের ভালো ভোট পাবে বলে মনে হয়।

উপরে যেসব বিষয় আলোচনা হলো, একমাত্র সেগুলো যে নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে তা মনে করার কারণ নেই। প্রার্থীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও প্রভাব, পারিবারিক ঐতিহ্য, অতীতের কৃতকর্ম, অর্থ ও পেশিশক্তি, এলাকার বিশেষ কোনো ইস্যু ইত্যাদি নির্বাচনে উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। সাধারণ পর্যবেক্ষণে বলা যেতে পারে, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জামায়াত এবারের নির্বাচনে বেশ ভালো করবে তা দৃশ্যমান। তবে নির্বাচনী মাঠের ফসল ঘরে তুলতে কতটা পারদর্শী হবে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। সর্বোপরি সরকার ও নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে কতটা সক্ষম হবে তাও বিবেচনায় রাখতে হবে।

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব